পরশপাথর

ইসরাত জাহান
গল্প
Bengali
পরশপাথর

 

অপলের সাথে আজ কুহুকের দেখা হবে। বিকেল পাঁচটা। গুলশান দুই এর গ্লোরিয়া জিন্স কফি’স এ।
কুহুক অবশ্য সাড়ে চারটার মধ্যেই চলে এসেছে। পাশেই কুহুকের অফিস। আর ও দেরি করে এলেই পারতো। তবে অফিসে কুহুক স্বস্তি পাচ্ছিল না। তাই গ্লোরিয়া জিন্সেই চলে এল। কফি নিল এক কাপ। ভাবছে সতের বছর পর কেন দেখা করতে চায় অপল? সতের বছর পর অপল কুহুকদের বাড়ি গিয়ে জেনেছে কুহুকের মোবাইল নাম্বার। তারপর কল করে কথা বলেছে। বলেছে দেখা করতে চাই। যদি ও দেখা করার কোন কারনই তো অবশিষ্ট নেই। তবে? তবে রাজি হয়েছিল কুহুক।
কুহুকের চোখে এখনও লেগে আছে সেই সব দৃশ্যপট।

অপলের সাথে কুহুকের পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিল দুজনেই। দুজনেই ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল
হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে। তারপর দুজনের ভেতর তৈরি হয় বন্ধুত্ব। অপল নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের নিজড়া গ্রামে। বাবা নিতান্তই কৃষক।ছোট ছোট আরো চার ভাই বোন মা আর বাবা গ্রামেই থাকেন। অপল মেধাবী ছাত্র। কিন্তু ভর্তির স্বপ্ন তো পূরণ হল এবার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কিভাবে হবে? তাই এলাকার দুজন উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেদের সাথে তাদের রুমে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত হল। বিনিময়ে দু’বেলা তাদের রান্না করে দিতে হবে, তাদের কাপড় চোপড় ধুয়ে দিতে হবে। অপলের তাতেই সই। বাবাকে তো অপলের থাকা খাওয়া নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। কিন্তু বই পত্র কেনা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য খরচ কিভাবে যোগাবে সেই চিন্তা অপল কে খুব ভাবালো। একে তো ঢাকায় নতুন তার উপর স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র বলে টিউশনি ও পাওয়া মুস্কিল।
তবে মেসের একজন বড় ভাই একটা টিউশনি ও যোগাড় করে দিলেন। আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অপল। পড়াশোনায় মনোযোগী হল।

কুহকের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানার পাশেই। কুহুকের বাবার কাপড়ের বড় ব্যাবসা। বড় দোকান। বড় বাড়ি। ঢাকার মগবাজারে কুহুকের ফুপুর শ্বশুরবাড়ি। ঠিক হল কুহুক আপাতত এখান থেকেই ক্লাস করবে। পরে হোস্টেলে সিট পেলে উঠে যাবে। ক্লাসের প্রথম দিনেই অপলের সাথে কুহুকের দেখা হল। দুজন বসল ও পাশাপাশি। আস্তে আস্তে দুজনের বন্ধুত্ব হল। প্রথম এক বছর এভাবেই কাটল। দ্বিতীয় বর্ষে এসে দুজনের মনে হল একে অপরের সঙ্গ খুব ভালো লাগে। একে অপরকে না দেখলে অস্থিরতা কাজ করে। দুজনেরই মনে হল দুজনের মনে জায়গা পেয়েছে। এদিকে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই কুহুক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠল। ওদিকে মেসে যাদের আশ্রয়ে অপল ছিল তারা কাপড় ধোয়া নিয়ে বাকবিতন্ডের এক পর্যায়ে অপলকে মেস থেকে বের করে দিল।
অপল কোথায় যাবে কি করবে ভেবেই দিশেহারা। সেই সময় কুহুক এগিয়ে এলো। কুহুকের এলাকার ছেলে নিহাল কুহুকের সাথেই পড়ত। কুহুক নিহালের সাথে কথা বলে সে যে মেসে থাকত সেখানেই অপলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করল।
কুহুক অপলকে বলল টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তিত না হতে। এও বলল,
কুহুকের বাড়ি থেকে যে পরিমাণ টাকা দেয়া হয় তাতে কুহুক অপল দুজনেরই চলে যাবে। অপল অবশ্য এই প্রস্তাবে রাজি হলো না। কিন্তু কুহুক বোঝালো অপল কে, লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করে ধার শোধ করে দিও। আমি হিসেব করে রাখব। এরপর অপল আর দ্বিধা করে নি।
একটা সময় কুহুক হয়ে উঠল অপলের নির্ভরতা।
দেখতে দেখতে স্নাতক শেষ হল। দুজনেই প্রথম শ্রেণী পেল। স্নাতকোত্তরে ভর্তির পরপরই কুহুকের মনে হল অপল কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কুহুকের সাথে দেখা হলে ও কেমন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কথা না বলার অনিচ্ছা প্রকাশ করে। তবে মাস পেরোতেই খরচের টাকাটা ঠিকই নিত। কুহুক ভাবল অপল কি আবার কোন সমস্যায় পড়েছে? কিন্তু কি সেই সমস্যা? যা বলা যায় না কুহুক কে? জিজ্ঞেস ও করল একদিন কিন্তু অপল এড়িয়ে গেল। এদিকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা সামনে। অপল হঠাৎই বাড়ি গেল। ফরম পূরণের সময় ঘনিয়ে এলো কিন্তু অপল ফিরল না। কুহুক অপলের জন্য ফরম পূরণের টাকা নিয়ে অপেক্ষা করল দু’দিন নিজেদের বিভাগের সামনে। কিন্তু অপল এলো না। কুহুক নিজের ফর্ম পূরণ করে হলে ফিরল। পরপর চারদিন অপেক্ষা করল। অপল তবু ও ফিরল না।
তারপর কুহুক অপলের বাড়ি যাবে বলে নিহাল কে নিয়ে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ এর বাসে উঠল। গোপালগঞ্জ নেমে কিছুটা ভ্যানে, কিছুটা পায়ে হেঁটে অপলদের গ্রামে পৌঁছালো। অপলদের বাড়ির উঠোনে পা দিতেই অবাক হল। বাড়িতে অনেক লোকজন।
একজন মহিলা এগিয়ে এসে বললেন তিনি অপলের মা। তারপর বসতে দিলেন। বললেন ছেলের মুখে কুহুকের নাম শুনেছে।
তারপর তিনি ঘোমটা দেয়া এক সলজ্জ কিশোরীকে সামনে এনে বললেন এই হল অপলের বউ। গত সপ্তাহেই বিয়ে হয়েছে। বললেন,আমার নিজের বোনের মেয়ে। তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো। বোনের ছেলে ফ্রান্সে থাকে। অপলকে ও ফ্রান্সে নেবে টাকা পয়সা খরচ করে।
কুহুকের গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। অপল
এরকম কাজ করতে পারল? আর তো মাত্র কটা দিন। তারপর চাকরি করে তো এদেশেই ভবিষ্যত গড়তে পারত। অথচ প্রবাসের ঝলমলে জীবনের লোভে এটা করতে পারল?
কুহুকের আর ভালো লাগছিল না। নিহালকে বলল, চল যাই। ওদিকে অপল ও বাইরে থেকে বাড়ি ফিরল।
বেশ সুখি সুখি চেহারা।
কুহুক কে দেখে মনে হল সে মুখে কেউ চুনকালি মাখিয়েছে।
কুহুক বলল তুমি ফরম পূরণ করতে যাওনি তাই আমি এসেছি।
অপল বলল পনের দিন পরেই আমার ফ্লাইট। ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষা দিতে পারতাম না। তাই যাই নি।

কুহুক আর কথা বাড়ালো না। চলে এল তাড়াতাড়ি সেখান থেকে। তারপর কিভাবে ঢাকা ফিরেছে তা কেবল সেই জানে।
বারবার মনে পড়ছিল অপলের সুখি সুখি চেহারা। ওর কিশোরী বধূর লজ্জিত মুখ।।
এমন ও হয়? চার বছর যাকে ঢাকা শহরে থেকে থাকা খাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে পাশে থেকেছে। যার হাত ধরে ভবিষ্যতে পথ চলবে বলে ভেবে রেখেছে। সে সব বৃথায় গেল অপলের লোভ লালসা আর নিজের নির্বুদ্ধিতার কাছে।

কুহুক!
স্বম্বিত ফিরে পেল কুহুক। কেউ ডাকছে। খুব চেনা কন্ঠ। তবুও দূরের। অপল!!
অপল এসেছে। দাঁড়িয়ে আছে কুহুকের পাশেই। সতেরো বছর পর দুজন দুজন কে দেখছে। বদলেছে দুজনেরই শারিরীক গঠন। দুজনেরই কপালের উপরে দু একটি চুল সাদা ও হয়েছে বোধ করি। ভাঁজ দেখা যায় কপালের চামড়ায়। চোখে মোটা ফ্রেমের পাওয়ার বসানো চশমা। আর মন?? তার ও কি বদল হয় নি?
স্মিত হেসে কুহুক সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলল,
-বস অপল।
অপল বসতেই কুহুক অপলের জন্য কফি ও স্ন্যাকস নিল।
অপল জিজ্ঞেস করল কেমন আছো কুহুক?
কুহুক সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল ,
দেখা করতে চেয়েছো কেন??
অপল বলল চাইতে পারি না? আমরা তো ভালো বন্ধু ছিলাম, তাই না?
কুহুক বলল , ছিলাম শব্দটা ব্যবহার করেই বোঝালে কতটা ভালো বন্ধু ছিলাম।
অপল বলল, তুমি ও নিশ্চয় চেয়েছো তাই এসেছো।
কুহুক বলল হ্যাঁ চেয়েছি দেখা হোক। দেখতে চেয়েছিলাম তুমি এখনও আগের মতোই আছো কি না?
আগের মতো মানে? অপল বলল।
কুহুক বলল-আগের মতো আত্মকেন্দ্রিক, চুপ থেকে স্বার্থপরতার শেষ ধাপে কিভাবে পৌঁছাও তাই দেখতে এসেছি।
অপল রাগান্বিত স্বরে বলল,
তুমি বলতে চাও আমি স্বার্থপর।
কুহুক বলল, নয়তো কি?
অপল বলল, আমি স্বার্থপর নই। সেটাই আজ প্রমান করব।
শোন কুহুক তুমি বলেছিলে ভবিষ্যতে চাকরি করে তোমার টাকা শোধ করে দিতে।
এ কথা বলেই অপল একটি মোটা খাম টেবিলের উপর রাখল। বলল, প্রতিমাসে তুমি আমাকে যে টাকা দিয়েছিলে চার বছরে যা হয় এখানে তার চেয়ে ও বেশি আছে।

কুহুক আশ্চর্য হলো না মোটে ও। হাসল হা হা করে। বলল, টাকা যে বেশ উপার্জন করেছো বোঝায় যায়। তবে অন্তর্গত মনোজগতের মনন উপার্জন করনি এক রত্তি ও।
তারপর কফি ও স্ন্যাকস এর বিল মেটালো। দাঁড়ালো। কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই বসে থাকা অপলের কাছে এলো। অপলের কাঁধে হাত রেখে বলল, অপল পরশ পাথরের নাম শুনেছ? যার বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। কল্প কাহিনীতেই শুধু এর বর্ণনা আছে। বলা হয়ে থাকে এই পাথরের স্পর্শে সব কিছু সোনা হয়ে যায়। তবে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এই পাথরের কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। কিন্তু কথিত আছে কারো সংস্পর্শে এসে যদি কেউ ভালো হয়ে যায় তখন এটি উপমা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

অপল আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, ভালোবাসি এখনও। আর সেই ভালোবাসা নির্লোভ, নির্মোহ। আমি কখনও তোমাকে শরীরে স্পর্শ করিনি। আজ তোমার কাঁধে হাত দিলাম। এ শুধু শরীরি স্পর্শ নয়। এই স্পর্শে আছে আমার মন। এই স্পর্শ তোমার জন্য আমার পরশ পাথর।
আমি জেনে নেব,
আজকের পর তুমি যা করবে যা ভাববে তা তোমার অসততা কে নিয়ন্ত্রণ করে সততার সাথে করবে।
সেটা হোক আমার সাথে বা অন্য কারো সাথে। আজকের পর আমি নিজেকে জানাবো তুমি মেকিত্বের সীমানা ছাড়িয়ে একটা পৃথিবী পেয়েছো। যেখানে মর্যাদা আছে, আছে আত্মমর্যাদার অ’গরিমা।
যেখানে কথা রাখার দায় নয় বরং কথাতেই কথা থাকে। যেখানে সতেরো বছর পর দেখা হলে ও অর্থ নয় বিত্ত নয় অন্তর্জালের কমনীয় শ্রেষ্ঠত্ব খেলা করে। যেখানে সময় হারায় নিষাদের মত্ততায়। যেখানে দেখা হলে দেখতেই ইচ্ছে করে। ছুঁয়ে গেলে ছুঁতেই ইচ্ছে করে। যেখানে শরীর না থাকলে ও মন থেকে যাবে শরীর আবার ফিরবে বলে।
অপলের ঠোঁট নড়ে ওঠে। কুহুক কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে,
ভালো থেকো অপল। তারপর বেরিয়ে আসে দ্রুত গ্লোরিয়া জিন্স থেকে। টেবিলের টাকার প্যাকেটে হাত রেখে অপলের বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে।

ইসরাত জাহান। কবি। জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। বর্তমান নিবাস ঢাকায়। তেরোবছর বয়স থেকে লেখালিখি শুরু। লেখা শুরু করেছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর মাধ্যমে। তারপর দৈনিক আজকের কাগজে নিয়মিত লেখালিখিতে ছিলেন। এরপর হঠাৎ করে বারোবছর লেখালিখি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকাশিত বই: 'তোমার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..