পরাজয়

আলী নাঈম
গল্প
পরাজয়

অফিস থেকে আগেই বেরিয়ে এলাম। কাজের তেমন চাপ ছিল না। আর মনটাও খারাপ। তাছাড়া সবার মাঝেই উত্তেজনা। সন্ধ্যায় বাংলাদেশের খেলা। ভারতের সাথে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কাকে দুই দুইবার হারিয়ে তবে বাংলাদেশ ফাইনালে উঠেছে। কি সব টানটান উত্তেজনা ছিল সেই ম্যাচগুলোতে। নাগিন ড্যান্স আরও কত কি!

খেলার মধ্যে ক্রিকেট খেলাই নিয়মিত দেখতাম একসময়। টেস্ট খেলা দেখার জন্যেও টিভির সামনে হা করে বসে থাকতাম। অথচ এখন আর খেলাই দেখা হয় না, সংসার-চাকুরি সামাল দিয়ে খেলা দেখার আগ্রহ থাকে না। তবু মাঝে মাঝে ছেলে-মেয়েদের টানাটানিতে ওদের সাথে গিয়ে বসি। আজও হয়ত বসব।

অফিসে যাওয়া-আসা করি হেঁটে হেঁটে। বাসে ভাড়া লাগে পাঁচ টাকা। কিন্তু মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠা-নামা ভালো লাগে না। রিক্সায় চড়ি না। কি দরকার অতগুলো টাকা খরচ করে! গত কদিন ধরে রাস্তার দু’পাশে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। গর্ত আর ধুলায় পথ চলা যায় না। তাই একটু ঘুর পথে যাতায়াত করি। একটু সময় বেশি লাগে, একটু বেশি হাঁটতে হয়। তা হোক, ঝঞ্ঝাট এড়াতে পারলেই বাঁচি।

পাড়ার ভেতরের যে গলি দিয়ে এখন যাতায়াত করি সে পথে রিকশা-গাড়ি খুব একটা চলে না। এমনকি পায়ে হাঁটা মানুষও খুব একটা চোখে পড়ে না। এই পথেই একটা বাড়ির আমগাছের কিছুটা ছায়া পরে পথের ওপরে। সেখানে একজন বয়ষ্ক মহিলা পান-সিগারেটের দোকান সাজিয়ে বসেছে। গত কদিন যাওয়া-আসার পথে তাকে দেখি। কোনো দিন তার পাশে একটা এগারো-বারো বছরের ছোট মেয়েকেও দেখি। কিন্তু এই দোকানে কোনো ক্রেতা দেখিনি। প্রতিদিনই ভাবি তাকে জিজ্ঞাসা করব। কিন্তু এটা-সেটা ভেবে আর এগোই না। আজ মনে হল, একটু তার সাথে কথা বলি। তাই দাঁড়ালাম।

: ‘কি গো চাচি, এখানে বেচা-বিক্রি কিছু হয়?’

: ‘এই একটু আধটু হয়।’

: ‘কোনো কাস্টমার তো দেখি না। এই রাস্তায় তো মানুষই তেমন চলে না। আপনার চলে?’

: ‘সহালে আর সইন্ধ্যায় একটু হয় গো আম্মা। এই গারমেন্টের লোকজন যহন যায়, তহন।’

: ‘আপনার সাথে একটা ছোট মেয়েকে দেখি — কি হয় আপনার?’

: ‘আমার নাতিন।’

: ‘আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন? সংসারে আর কে কে আছে?’

আমার প্রশ্নের তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। হয়ত একজন অচেনা মানুষের সাথে আলাপে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। অথবা আমার মনে হলো তার চোখের কোণে এক অচেনা বিষণ্নতা। আমি একটা পান চাইলাম।

: ‘একটা পান দেন, মিষ্টি জরদা দিয়ে।’

তিনি নীরবে পান বানাতে লাগলেন।

: ‘আপনার ছেলে-মেয়ে কেউ নাই?’ আমি আবার জানতে চাইলাম। ‘তারা আপনাকে দেখে না?’

আমার দিকে পান এগিয়ে দিতে দিতে বললেন : ‘থাকলে কি হইব. তাগোর নিজেরার সংসার আছে না? আমারে আর কত দেকব?’

: ‘কে কে আছে আপনার সংসারে?’

: ‘আমার দুইডা মাইয়া গো আম্মা। তাগর আব্বায় মইরা গেছে। আর একটা নাতিন।’

: ‘মেয়েরা কি করে?’

: ‘ছোড মেয়েডা গারমেন্টে কাম করে। হের জামাই কাঁচামালের ব্যবসা করে।’

: ‘আর বড় মেয়ে?’

তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

: ‘কি আর কমু গো আম্মা। বড় মাইয়ডারে বিয়া দিছিলাম ভালো পোলা দেইখা। হেই বদমাইশ জামাই ঘরের ট্যাহা-পয়সা চুরি কইরা ভাগছে। আইজকা সাত বচ্ছর বউয়ের খোঁজ নেয় না। মাইয়াডার খোঁজ নেয় না। নাতনীডারে যে দেহেন, হেইডা আমার বড় মাইয়ার ঘরের।’

: ‘আর আপনার বড় মেয়ে, সে কোথায়?’

: ‘বহুত কষ্টে ট্যাহা-পয়সা যোগার কইরা মাইয়াডা মিডলিস্টে গেছিল। সউদি আরব। হেইহানে নাকি ঘরের কাম করলেও মেলা ট্যাহা-পয়সা পাওয়া যায়। কিন্তু গরিব মানুষের পোড়া কপাল গো আম্মা।’

: কেন, আপনার মেয়ে টাকা-পয়সা পায় না? মেয়ে টাকা পাঠায় না? কতদিন আগে গেছে?

এবার তিনি আমার দিকে সরাসরি তাকালেন। তার দুচোখে অনেক কিছু — কষ্ট, ক্ষোভ, দ্বিধা, লজ্জা।

: ‘কি আর কমু গো আম্মা। আফনেরা শিক্ষিত মানুষ। হেইডা যে কি দেশ গো আম্মা। মাইয়াডা মাঝে মইদ্যে ফুন দেয় আর কান্দে। কয়, মা, আমারে যেমন পার এই দ্যাশেত্তে লইয়া যাও। এই হানে মানুষ নাই গো মা — সব জানোয়ার। কুত্তার চাইতেও খারাপ। বাড়ির মালিক তার শইলটা খুবলাইয়া খুবলাইয়া খায়। কথা না শুনলে মাইরধর করে। তারে বাড়িত্তে বাইর হইতে দেয় না। হাতে কোনো ট্যাহা-পয়সাও দেয় না। কয়, পাঁচ বচ্ছর বাদে যহন চুক্তি শেষ হইব তখন বেতন দিব।’

: ‘আপনি কারো কাছে বিচার দেন নাই?’

: ‘কার কাছে বিচার দিমু গো আম্মা? আমি গরিব মানুষ, কাউরে চিনি না, জানি না। গরিব মানুষের লাইগ্যা দেশে কুনু বিচার আছে? খালি নাতনীডারে বুকে চাইপ্যা ধইরা কান্দি আর আল্লার কাছে বিচার দেই। আল্লায় যদি বিচার করে।’

আমি তার দিকে পানের দাম বাড়িয়ে দিলাম। আমি এই নারীকে কি বলব? তাকে কি আমি সান্ত্বনা দেব নাকি প্রতিকারের আশ্বাস দেব? আমি কিছুই বলতে পারি না। আমার ব্যাগে একটা চকলেট ছিল, ছোট মেয়ে কল্প’র জন্যে। সেটা বের করে তার হাতে দিলাম।

: ‘এটা আপনার নাতনীকে দিবেন। যাই গো চাচি।’ আমি কোনোমতে বিদায় নিয়ে বাসার পথে পা বাড়াই। সকাল থেকেই মনটা খারাপ ছিল। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মাগরিবের আজান পড়ে গেল। ড্রইংরুমে ছেলেমেয়েরা টিভির সামনে বসে গেছে। আশেপাশের বাসা থেকে ওদের আরো কিছু বন্ধু এসে জুটেছে। সবাই মিলে এক সাথে খেলা দেখবে। আমার স্বামীও ওদের সাথে মিলে হৈচৈ করছে। আজ সাকিব কেমন খেলবে, মুশফিক কি করবে, মাশরাফি থাকলে কি হতে পারত — কত জল্পনা কল্পনা!

আমাকে ঢুকতে দেখেই বাহার, আমার স্বামী চেঁচিয়ে উঠল — ‘ এই যে শ্রীদেবী চলে এসেছে। আজ বাংলাদেশ জিতলে কিন্তু তোমাকে নাগিন ড্যান্স দিতে হবে।’

আমি একটু হাসলাম ওদের দিকে চেয়ে। তারপর ধীর পায়ে নিজেদের ঘরে চলে গেলাম। আগে গোসল করতে হবে।

আমার গোসল যখন প্রায় শেষ, ছেলে দৌড়ে এল, বাথরুমের দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলল : ‘মা তাড়াতাড়ি, খেলা শুরু হয়ে যাবে।’

: ‘তোরা দেখ, আমি আসছি।’ চেঁচিয়ে জবাব দিলাম।

বাথরুমের দরজা খুলে বাইরে পা রাখতে না রাখতেই মেয়েটা এলো : মা, বাংলাদেশ টসে হেরে গেছে — ব্যাটিং করছে। তুমি তাড়াতাড়ি কর।’

আমি ভেজা হাতে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। ছোট করে ছেলেদের মতো করে ছাঁটা চুল।

: ‘মা তুমি যে কি!’ মাথায় লাগা পানি মুছতে মুছতে দৌড়াতে দৌড়াদে চলে গেল। ওর ভাই যা করে, ওরও তাই করতে হবে। ভাই সাইকেল চালায়, ওকেও সাইকেল কিনে দিতে হল। ভাই গলির মধ্যে ক্রিকেট খেলে, ও গিয়ে সেখানে যোগ দেয়। ওর বাবার খুব শখ মেয়েটার বড় বড় চুল থাকবে। কিন্তু কল্প কিছুতেই বড় চুল রাখবে না। ভাই তো বড় চুল রাখে না।

দু’কাপ চা বানিয়ে ড্রইং রুমে গিয়ে বসলাম। বাহার আমার হাত থেকে চা নিতে নিতে বলল : ‘কোনো খারাপ খবর?’

আমি নীরবে মাথা নাড়লাম, না। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা : ‘অফিসে কোনো ঝামেলা হয়েছে?’

আমি পুনরায় মাথা নেড়ে জানালাম, না। বাহার আর কথা বাড়াল না। আমিও চুপ করে বসে খেলা দেখতে লাগলাম। ছেলেমেয়েরা হৈচৈ করছে, টিভিতে দর্শকদের চিৎকার। কিন্তু কোনো কিছুই আমার কানে আসছিল না। কে ব্যাট করছে, কে আউট হল — আমি তার কিছুই দেখছিলাম না। খানিক বসে থেকে উঠে এলাম সেখান থেকে। বাহার শুধু একবার তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল কি হয়েছে। ওর নীবর জিজ্ঞাসার উত্তরে বললাম : ‘মাথা ধরেছে।’ ঘরে চলে এলাম।

ঘরে এসে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। বাইরে কোথাও চিৎকার হচ্ছে, ড্রইং রুম থেকে বাচ্চাদের চিৎকার হৈচৈ ভেসে আসছে। আমি সেসব কিছুই শুনছিলাম না। কতক্ষণ পর জানি না, মেয়েটা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল : ‘মা, আমার জার্সি কোথায়?’ লাইট জ্বালিয়ে আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে ও একটু থমকে গেল : ‘তোমার কি শরীর খারাপ মা?’

আমি বললাম : ‘না রে। একটু মাথা ধরেছে শুধু।’

: ‘মোস্তাফিজ যে কি বল করেছে, তুমি যদি দেখতে মা। আমরা জিতে যাব।’ ফিরে যেতে যেতে আবার চেঁচিয়ে বলল : ‘আমার জার্সিটা বের করে দাও। আমরা মিছিল করব।’

আলমারি খুলে জামাকাপড় ঘাঁটছি। এমন সময় ফোন বেজে ওঠল।

একটা বিষণ্ণ কণ্ঠ ওপাশ থেকে জানতে চাইল : ‘ইয়াসমিন কি করছিস?’ তনুু, আমার বন্ধু।

: ‘কিছু নারে, শুয়েছিলাম।’

: ‘খেলা দেখছিস না?’

: ‘না।’

দুজনই চুপচাপ রইলাম কিছুক্ষণ। একসময় এক সাথে বসে বাংলাদেশের খেলা দেখতাম। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতাম। নীরবতা ভেঙে আমি জানতে চাইলাম : ‘তুই খেলা দেখছিস না?

: ‘তুই যেমন পারছিস না, তেমনি আমিও পারছি না। আচ্ছা রাখিরে, পরে ফোন করব। ভালো থাকিস।’

: ‘আচ্ছা রেখে দে।’ লাইনটা কাটতে গিয়েও কাটলাম না, — ‘আচ্ছা তনু, কাকা কাকির কোনো খবর জানিস? তারা কেমন আছেন?’

: ‘জানি নারে। রাখলাম।’

আমার আর কোনো কিছু জানার নেই, বলার নেই। লাইন কেটে গেল। কাকা-কাকি মানে কল্পনার বাবা-মা। আজ চৌদ্দ-পনের বছর তাদের কোনো খবর আমরা জানি না। কল্পনা, আমাদের বন্ধু কল্পনা।

আমি জানি তনু এখন কাঁদছে। আমিও কাঁদছি।

আমি ইয়াসমিন, তনু আর কল্পনা — আমরা ছিলাম দূর কোনো এক মফঃস্বল শহরের বেণীদুলানো তিন কিশোরী। এক সাথে স্কুলে যেতাম, এক সাথে কলেজে যেতাম। এক সাথে বসে বাংলাদেশের খেলা দেখতাম। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতাম। আমরা ছিলাম হরিহর আত্ম। কলেজ জীবন শেষ করার পর আমি আর তনু এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, কল্পনা চলে গেল অন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি। তারপর আজ থেকে ২০ বছর আগে এই দিন কে বা কারা কল্পনাকে তুলে নিয়ে গেল। কল্পনাকে ধর্ষণ করল। ওর লাশে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। ২০ বছর আগের কথা।

কল্পনার বাবা, আমাদের প্রিয় কাকা, আমাকে আর তনুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন : ‘আমি এক হতভাগ্য বাবা যে তার নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে পারলাম না। তার লাশটা পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারলাম। বিচার আদায় করতে পারলাম না। তোরা আমাকে ক্ষমা করিসরে মা।’

ধীরে ধীরে কাকা একটু অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। কাকি ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন। কাকা আমাদের দেখলেই বলতেন, ‘কল্পনাকে ডেকে দে ত মা।’ আমরা কল্পনাকে ডাকতে পারতাম না। আমরা, আমি আর তনু, নিজের নিজের জগতে চলে এলাম। কাকা-কাকির সামনে আর যেতে পারতাম না।

২০ বছর। কতদিনে ২০ বছর হয়? অনেক অনেক দিন। তবু আমি কল্পনাকে ভুলতে পারিনি। তনুও পারেনি। আমাদের মেয়ে হওয়ার পর আমি ওর নাম রাখতে চেয়েছিলাম কল্পনা। বাহার বলল, ‘একটু সেকেলে নাম।’ কল্পনা হয়ে গেল ‘কল্প’। কল্প আমার কাছে কল্পনার জীবন্ত স্মৃতি।

কল্প ঘরে ঢুকে দেখল আমি বসে বসে কাঁদছি।

: ‘বাংলাদেশ হেরে গেছে’ — বলে কাঁদতে কাঁদতে কল্প আমাকে জড়িয়ে ধরল।

আমরা দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম।

 

===================================

বন্ধুপ্রতীম মারুতী মহান বিশ্বাসকে গল্পটা উৎসর্গ করলাম।

===================================

আলী নাঈম। লেখক ও সংবাদকর্মী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার নাখালপাড়ায়। স্কুলজীবন থেকেই পাঠাগার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কলেজজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়। বিজ্ঞান সংগঠন গড়ে তোলা, দীর্ঘদিন যাবৎ পত্রিকা সম্পাদনার কাজসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে সম্পৃক্ত। ছাত্রজীবন শেষে বামপন্থী রাজনীতির সাথে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..