পরাণের পরাণ কন্যা বিবি আলিপজান

শ্যামল কান্তি ধর
প্রবন্ধ
Bengali
পরাণের পরাণ কন্যা বিবি আলিপজান

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম উপাদান লোকসাহিত্য যা সমৃদ্ধ হয়েছে জানা অজানা  রচয়িতাদের রচিত অনেক মৌখিক কেচ্ছা, ধাঁধা ও কাহিনিতে। পদ্যের ছন্দে রচিত এইসব কাহিনি কিংবা গীতিকায় যেমন বিধৃত হয়েছে প্রেম ও ব্যার্থতার উপখ্যান, তেমনি উঠে এসেছে পারিবারিক দ্বন্ধ, রাজনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের কথাও। গীতিকার প্রসঙ্গ উঠলেই, বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় “ময়মনসিংহ গীতিকার” কথাই আগে আসে কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গীতিকাগুলো রয়ে গেছে আলোচনার কিছুটা বাইরে। সিলেট গীতিকার ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটেছে।সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার দুর্বোধ্যতাও তার বড় কারন হতে পারে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত “সিলেট গীতিকার” ভূমিকায় সম্পাদক বদিউজ্জামান তা উল্লেখও করেছেন। তাঁর মতে,

“সিলেট গীতিকা সিলেটের অনেকটা দুর্বোধ্য আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবে রচিত হয়েছে। ভাষার আঞ্চলিকতা এ গীতিকা রসাস্বদনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে সন্দেহ নেই।”

তাই হয়তো সিলেট গীতিকা জনমানুষের কাছে এখনো সেভাবে পৌঁছেনি। লোকসাহিত্যের গবেষক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর হিসেব অনুসারে  ১২০ টি সিলেট গীতিকার কথা জানা যায়। তার কিছু পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলেও তা আজ দুস্প্রাপ্য। আলীপজান সুন্দরী এইরকমই একটি সিলেট গীতিকা।

ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে যখন ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের কাছে গীতিকাসমূহ  হস্তান্তর   করছিলেন তখন তার সমকালেই সিলেটের  মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন যিনি একজন প্রতিথযষা লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক তিনি গ্রাম গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে সংগ্রহ করছিলেন সিলেট গীতিকা।সিলেট গীতিকা সংগ্রহের ব্যাপারে আশরাফ হোসেনের কাছে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের লেখা চিঠিও রয়েছে। এরপর সিলেট গীতিকা সংগ্রহে যিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি চৌধুরী গোলাম আকবর। চৌধুরী গোলাম আকবর ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার পাশাপাশি তিনি দিনের পর দিন চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহে। তিনি বাংলা একাডেমির নিয়মিত সংগ্রাহক হিসাবে নিয়োজিত হন। তার সংগৃহীত গীতিকা থেকে দশটি গীতিকা নিয়ে ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে বদিউজ্জামানের সম্পাদনায় সিলেট গীতিকার প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় কিন্ত আজ পর্যন্ত পরবর্তী খন্ড প্রকাশিত হয়নি। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ও চৌধুরী গোলাম আকবরের সংগৃহীত গীতিকাগুলো প্রকাশে ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল সিলেটের প্রাচীন পত্রিকা“আল ইসলাহ”।তবে সিলেট গীতিকা সংগ্রহে  অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি সংগ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি পঞ্চদশ কিংবা ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত রাজা গৌড় গোবিন্দ বিষয়ক লোকগীতিকা “পাগল ঠাকুরের ছড়া” সংগ্রহ করেন।

আমাদের আলোচ্য গীতিকা “আলীপজান সুন্দরী” বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সিলেট গীতিকার অন্তর্ভুক্ত।  সিলেট গীতিকার বাকী গীতিকাগুলো হল চান্দরাজা,তিলাই রাজা, কাল দুলাই, মনিবিবি, রংগমালা, ছুরতজান বিবি, সোনামতি কন্যা, জমির সদাগর ও পাঁচ হাতনো। আল ইসলাহ সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হক  আল ইসলাহ পত্রিকার বৈশাখ শ্রাবন সংখ্যায় (১৩৭৫ বঙ্গাব্দ) “সিলেট গীতিকা – আলিপজান” নামে একটি প্রবন্ধও লিখেন। আলীপজান  সুন্দরী গীতিকাটি লোক সাহিত্য সংগ্রাহক চৌধুরী গোলাম আকবর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার বাসুদেবশ্রী গ্রামের আব্দুল মালিকের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন।সংগ্রহকালে আব্দুল মালিকের বয়স ছিল ৭০ বছর। ত্রিশ পয়ত্রিশ বছর বয়সে জনৈক ধান বেপারীর কাছে তিনি এ পালাগানটি শোনেন, কিন্তু কোন মুদ্রিত পুস্তকে কখনো দেখেন নি। এ গীতিকার রচয়িতার নাম জানা যায়নি। গবেষকদের মতে এই গীতিকার রচনাকাল অষ্টাদশ শতাব্দী বলে অনুমিত হয়।আলীপজান সুন্দরীর গীতিকায় রচয়িতা পদ্য ছন্দে লোকমানুষের আঞ্চলিক ভাষা ব্যাবহার করেছেন যার পংক্তি সংখ্যা ৯৮৪। চলুন ঘুরে আসি আলীপজান সুন্দরী গীতিকার বিভিন্ন পংক্তি থেকে।

দুই

বৈশাখী ঝড়ের পর টানা বর্ষন শেষে পূবের সূর্য  যখন পশ্চিমে হেলে যাবার পথে, মাঝি তখন  রঙিন পালে, ভাটির টানে ভাসালো  ছইওয়ালা নাইওরী নাও। বৃষ্টির  নতুন  পানিতে  খাল,বিল, নদী সব একাকার হয়ে যেন এক বিস্তৃত নদী।নাওয়ের গলুইয়ের বসে মাঝি  বৈঠায় টান দিলেও মন তার এক অশুভ ঈঙ্গিত পায়  কারন নাও ভাসানোর আগে একটি কাক এসে বসেছিল গাছের শুকনো ডালে, একটি ছাগল  দিয়েছেল হাঁচি।অবস্থাপন্ন গেরস্ত সাকির মামদের একমাত্র কন্যা,সাত ভাইয়ের আদরের বোন আলীপজান তার নাওয়ে। সেই আলীপজান, যার রূপের কথা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে । রচয়িতার বর্ণনায়-

“এমন সুন্দর পুড়ি গিরোসতর জন্মিলো
পূণ্যিমার চান যেমোন আথোর মুঠিত আইলো।
যেমন আথ তেমোন পাও তেমোন পুড়ির নাক
হকোলতা আচানক সুন্দর টাব জোড়া বাক।।
এমন গঠন পুড়ির কুন্তাত নাই খুত
অলদি পাখির ছাও যেমোন হাজাইল নিখুঁত”

হ্যাঁ,হলদিয়া পাখির ছানার মতই নিখুঁত আলীপজানের সৌন্দর্য। দেখতে দেখতে একদিন আলীপজান যৌবনে পদার্পণ করল। কবির বয়ানে-

“যইবনে জটলা বান্ধি বাসা বুকুত করছে
পাউদোর কল্লি যেমোন পানিত আধা ভাইছে।
আচানক সুন্দর কইন্যার দুই চখুর তেরা
চখুর দুই ভুরু যেমোন ধনুকর বারা।”

হায় হায়
এক এক ঠোঁট যেমোন “ হপরী কদুর” (মিষ্টি কুমড়া) বাক
ধনেশ পাখীর ঠোঁট যেমোন আলীপজানোর নাক।
গোলাব ফুলোর রং তামাম শরীল
রূপে রসে আলীপজান তে ছেমটিয়া ধরিল।।
ধনীলা বাপোর পুড়ি খায় পিন্দে ভালা
অ ঘরতো হ ঘরো যায় পথ করি উজিলা।
আবে ছায়া ধরে কন্যা ঘরতো বারৈলে
মশা মাছিয়ে চেরা দেখে পালংগো হুতিলে।।

এই আলীপজান তার মায়ের সাথে চলছে মামার বাড়ি। মাঝির মনে চিন্তার ইঁদুরে “কুটুর কুটুর” করলেও আলীপজান ছইওয়ালা নাওয়ের মুখে বসে দেখে নদীর আশ্চর্য রূপ। নদীর পারে কত জাতের গাছ!জাল দিয়ে, বড়শি দিয়ে নানা জাতের মাছ ধরছে কত মানুষ।জালে, বরশিতে  ধরা পড়ছে রিটা, গাগলা,বোয়াল। নদীর বুকে কত নাও যায় উজানে, কত নাও ভাসে ভাটির পথে। গেরস্ত বধূ কলসি কাঁকে এসেছে নদীর ঘাটে।

“গিরোছতর বউয়ে নেয় কইলা ভরিয়া
দুই আথে গলাত ধরি কাকালিত তুলিয়া।
নাইওরি নাও দেখি গর্দনা ঘুরাই চায়
ও পারোর গরু ভইষ হপারো হাতরি যায়।।

গেরস্ত বধূ যখন কাঁকে জল ভরা কলসি নিয়ে ফিরে যাচ্ছে, তখন নাইওরী নাও দেখে সে ঘাড় ঘুরিয়ে চায়। এই  ঘাড় ঘুরিয়ে চাওয়ার দৃশ্যকল্পে যেন একটা স্থির চিত্রের জন্ম নেয় কিংবা জন্ম নেয় চলচ্চিত্রের একটি শিল্পিত  ইমেজের। এই ইমেজের শেষে জন্ম নিচ্ছে আরেকটা ইমেজের যখন গরু মহিষ সাঁতরে নদীর ওপার যায়। এই রকম আরো কিছু বর্ননা সাকির মামদের অবস্থাপন্ন গেরস্তের কথা বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে যেমন-

“গিরোছতর বউয়ে নেয় কইলা ভরিয়া
দুই আথে গলাত ধরি কাকালিত তুলিয়া।
নাইওরি নাও দেখি গর্দনা ঘুরাই চায়
ও পারোর গরু ভইষ হপারো হাতরি যায়।।
পুষ্কুন্তি ভরা মাছ রউ আর বাউশ
চরকি লাগাইল বরি দি ধরি মিটায় আউশ।
বরিত লাগাই রউ চরকি দি দৌড়ায়
তামেশা দেখিবার লাগি গাউর মানু আয়।।
ঘুরাইয়া ফিরাইয়া হেষে ফয়রান করিয়া
ভেট বানাইয়া তুলে এছুত ভরিয়া।
আঠো বাজারো গেলে বাঘাই গোয়াল আনে
মাটিভায় লেংগুড় ছেচরে উবাই চাইন মানে।।

যাই হোক,আলীপজান যখন মনভরে নদী ও নদীতীরের দৃশ্য দেখছে, তখনও মাঝির মনে শান্তি নেই বরং তার ভয় আরো বেড়ে গেল কারন উল্টো দিক থেকে ভীষণ বাতাস বইতে শুরু করেছে। হঠাৎ আসা বাতাসের তোড়ে নাওয়ের গতি থমকে গেল। বড় বড় ঢেউ এসে যখন নাওয়ে ধাক্কা দেয়, তখন মনে হয় বুঝি ভুমিকম্প হয়। মাঝি প্রানপনে বৈঠা বায় কিন্তু নাও সামনে এগোয় না। এখন বাড়ি ফিরতে গেলেও উজানে যেতে হবে আর সামনে এগোতে গেলে বাতাসের সাথে, ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হবে। কিছুক্ষন পরে সন্ধ্যার অন্ধকার নামবে আর সামনে আছে নদীর দিঘল বাঁক, যেখানে প্রায়ই ডাকাতি হয়। মাঝি তখন নিজেকে দোষারোপ করে,অসময়ে রওয়ানা দেয়া বড্ড ভুল হয়ে গেছে বলে তার কাছে মনে হয়। সে যদি নাও না ভাসাতো তবে কি কারো ক্ষমতা ছিল জোর করে তাকে রাজী করানোর।তার সব রাগ গিয়ে পড়ে আলীপজানের মায়ের উপর।

তিন

বৈশাখ মাসে যখন ধান তোলার পুরো মৌসুম তখন আলীপজানের নানী  আলীপজানকে নিয়ে যাবার জন্য লোক পাঠালেন। অনেকদিন তিনি তার আদরের নাতিনকে দেখেননা। আলীপজানের সাত ভাই কিছুটা বিরক্ত হন কারণ কাজের মানুষজনদের নিয়ে  এখন তাদের দিনরাত হাওরে থাকতে হয়। ভোর বেলা হাওরে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতে হয়।

“বুরো ধান কাটি আনা কাতারী করা বাইন
নলিয়ার ঘাস বাচিতে বাকী দিন যাইন।
কালাঞ্জিবালা(ভোর বেলা) আওরোগি (হাওড়ে গিয়ে) আওয়া হাইঞ্জাবাদ (সন্ধ্যা বেলা)।
এরূমাঝে নাইওরি নেয়া একি পরমাদ”।

এই সময়ে নাইওরী নেয়াটা নানীর অবিবেচনাপ্রসূত কাজ হয়েছে বলে তাদের কাছে মনে হয়। ভাইয়েরা তাই সমালোচনামুখর হয়ে উঠে। পুত্রদের মুখে এসব কথা শুনে আলীপজানের মা রেগে গেলেন। তিনি তার পুত্রদের বলেন,“আমার মা তোমাদের সবাইকে  কোলে নিয়ে মানুষ করেছেন, এখন তোমরা বড় হয়ে সব ভুলে গেছ। মায়ের তার নাতিনকে দেখার সাধ জেগেছে আর তোমরা এখন তোমাদের নানান অসুবিধা তোলে ধরছ। কাজ সারা জীবন থাকবে,আমার মা মারা গেলে কি আর পাবে? তাই কোন কথা না বলে একজন গিয়ে আলীপজানকে দিয়ে আস।”

মায়ের কথা শুনে সাত ভাই নিরব হয়ে গেল। তারা তাদের মাকে ভালো করে চিনে। মা রাগ করলে খাওয়া বন্ধ করে দেন,কাঁথা গায়ে দিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকেন, কারো সাথে কোন কথা বলেননা। তাই সাত ভাই মিলে ঠিক করল তাদের ঠাকু ভাই ( বড় ভাই)  মাকে গিয়ে বুঝাবেন। সন্ধ্যার পর বড় ভাই তাদের মাকে গিয়ে বললেন-

“আমার বেস্ত অইলো তোমার পাওর তলে
তোমারে বেজার না করিমু কুনু কলে।
ভিজা কাপড় হুকার না তোমার নি চখুরবার
অখোন কেমনে যাই কও সোনামাই আমার।।
পরতি দিন যে সাজ করে আঢ়ি কোনে দিয়া
কোন দিন পড়িবো ঝড়ি ঘুড়ুততি ডাকিয়া
বৈশাখী লাগিয়া গিয়া পানির অইবো ঢল
খেতোর জমি পাতি অইয়া যাইব তল।।

ছিল (শিল) বরিষণ অইলে বুরোর ভাংবো আগা
ঢল অইলে ডুবি যাইবো আমনোর জাগা।
এর আগে আথাপিতি কাম হারতাম চাই
আলীপজানরে লইয়া নাইওর তুমি যাওগি মাই।।”

বড় ছেলের কথা তার মনে ধরল কিন্তু  মনে একটা খটকা রয়ে গেল এইজন্য যে তার  পুত্রবধূরা গিরস্থালিতে পটু নয়।তাই তার অনুপস্থিতিতে সংসার কর্ম অগোছালো হয়ে যাবার আশংকা করলেন তিনি। এখানে গীতিকাটির রচয়িতা  গ্রাম বাংলার শাশুড়ি ও পুত্রবধূদের  মধ্যে অম্লমধুর এক সম্পর্কের বর্ণনা করেছেন। আলীপজানের মা যখন পুত্রবধূদের ডেকে সংসারের সকল কাজ বুঝিয়ে দেন এবং যার যার কাজ ভাগ করে দেন তখন তার সংসারের প্রধান কর্ত্রীর রূপের এক পরিচয় পাওয়া যায়।

নাইওর যাবার জন্য সবাই মিলে আলু,চাল ভিজিয়ে গুড়ি করে  হান্দেশ (চালের গুড়ি দিয়ে তৈরী সিলেটের জনপ্রিয় পিঠা) তৈরী করলেন কিন্তু সেই রাতেই আকাশের চাঁদকে আড়ালে রেখে, চারিদিক অন্ধকার করে মেঘ জমা হল নৈঋত কোণে। মাঝরাতে থেকে শুরু হল বৈশাখী ঝড় এবং  টানা বর্ষণ, যা চলল পরের দিন বিকেল পর্যন্ত।  বর্ষণ থামলে আলীপজানের মা আলীপজানকে নিয়ে রওয়ানা দিতে চাইলেন কিন্তু পুত্রবধূরা বাধা দিলেন কারন বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে,  চারিদিকে নতুন পানির ঢল, নদীর পানিও ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তারা তাদের শাশুড়িকে বুঝাতে চাইলেন-

“তে একদিন দেখি যাউকা এতুত অইবো কি
একদিন বাদে গেলে কুন্তা খেতি (ক্ষতি)নি।
বিয়া নায় শাদী নায় আজার( রোগ শোক) না বেমার
একদিন বাদে গেলে কিবা অইতো কার’

কিন্তু শাশুড়ি পুত্রবধূদের কোন কথা শুনতে চাইলেননা। এ নিয়ে অনেক বাকবিতন্ডা, মান অভিমান হয়ে গেল। আজকে না যেতে পারলে তার হান্দেশ নষ্ট হয়ে যাবে,এছাড়াও মাঝিকে অগ্রিম টাকা দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই কারো কথা না শুনে তিনি আলীপজানকে নিয়ে নাওয়ে উঠলেন, সাথে হান্দেশের পাত্র নিতে ভুল  করলেননা।

আলীপজানের পিতা সাকির মামদ অবস্থাপন্ন গেরস্ত এবং গ্রামের একজন  বিচারক কিন্তু সংসারের যে কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে আলীপজানের মার সিদ্ধান্তই প্রধান। কবির বয়ানে-

হায় হুকমত চাইল চালা বুড়া বেটির ঠাই
বুড়া যেমোন মাউগ আর বুড়ী যেমোন হাই।
কুনু মামেলাত অউ বুড়া কামো লাগেনা
বুড়ি কি পুয়াপুড়ি কেউ জিকায় না।
বুড়ির ইসারায় হককোল চলা ফিরা করে
বুড়িয়ে হকোলতে চালায় যেমনে মনে ধরে।

তাই আলীপজানকে নিয়ে তার মা”ই চলছেন আলীপজানের মামার বাড়ীর পথে। কিন্তু তারা কি শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে? এই প্রতিকুল উতল বাতাসে নৌকা যখন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব কষ্টকর তখন এক সময় নাও নদীর দিঘল বাঁকে পৌঁছে যায়।যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। তাই মাঝি যে দিঘল বাঁক নিয়ে চিন্তিত ছিল সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সন্ধ্যা নামল। সন্ধ্যার অন্ধকারে মাঝির চিন্তা ও ভয় আরো বেড়ে গিয়ে তার মনোবল কমে গেল।সে যেন তার হাতের সকল শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মাছ ধরার নৌকা, ঘাসের নাও দেখলেও তার হৃৎকম্পন শুরু হয়ে যায়, এই বুঝি এসে তার নাও আটকে দিল।নাওগুলো যখন উজান কিংবা ভাটির পথে সরে যায় মাঝির প্রান যেন শান্তি ফিরে পায়। ঠিক এমনসময়  উজান বেয়ে একটি  পানসী নাওকে  আসতে দেখা গেল। মাঝির সকল দুর্ভাবনা সত্যে পরিণত হল। পানসী নাওয়ের গলুইয়ে মশাল জ্বালিয়ে চারিদিক আলোকিত করে, বৃন্দাবনী হুকো পাশে রেখে  রূপ, যৌবন ও বৈভবের অহংকার নিয়ে বসে আছেন হিনাই নগরের জমিদারপুত্র। মাথায় তার বাবড়ী চুল, রক্তবর্ণ চোখে চারিদিক অবলোকন করে চলেছেন। মাঝির মনে পড়ল এই জমিদারপুত্র আলীপজানের জন্য বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন কিন্তু আলীপজানের ভাইয়েরা এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি, কারণ-

“বড়ো মানষে রূপোর ছটকায় গিরোছতর মাইয়া নিবো
খাদিমা আনিছে করি পরচার করিবো।
পুয়া পুড়ি অইলে বান্দীর পুত কইবো
জমিদারীর মালীক এরারে কখখন না করিবো”
………………………………………………

অসমানে দুস্তি কুস্তি কুন্তাত নায় মিল
একোর মাঝে বয়না আর জনোর দিল।
এরূ লাগি রাজি না অইছে ধন ছামানোর লাইলচে
আলিফের খেশ গোষ্ঠী (আত্মীয় স্বজন) কেউনা মানিছে।।”

এভাবে বিবাহের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় জমিদার নন্দন অপমানিত হয়েছেন এবং এজন্য আলীপজানকে পাবার জন্য মনে  তার জেদও বেড়ে গেছে।একথা মাঝির সাথে সাথে আলীপজানও জানে। তাই মাঝি যখন তার নাও নিয়ে পানসী নাওয়ের কাছাকাছি এলো তখন তাকে উদ্দেশ করে জমিদারপুত্রের বিভিন্ন প্রশ্ন শুনেও সে নিরব থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করল। আলীপজানের সম্মান রক্ষা এখন তার প্রধান দায়িত্ব। মাঝি জানে, আলীপজান বড় হয়েছে সবার আদরে, কোলে কোলে। সেই সাত ভাইয়ের আদরের বোন তার নাওয়ে। কবির বয়ানে-

“আলীপজান সুন্দরী বিবি মায়ের যতনে
বাড়িতে লাগিলো যেমোন চান বাড়ে আছমানে।
এনকুরতো হেনকুরো মাটিনা ছয়াইন
হাদালোভা যতোতা হক্কলে খাওয়াইন
মুখ দিয়া বার করে খাইতে কয় যিতা।
পাড় ঝাড় ভাংগিয়াও যোগাড় অয় ইতা
রাইতে নিশাত যদিও কয় খাইতো মেড়া পিঠা
রাতারাতি হকলে মিলি পুরা করৈন ইটা।।

বাড়িতে বাড়িতে কন্যার যুবতকাল অইলো
যৈবনের ঠেলায় কইন্যা মউরর পেখম ধইলো।
যইবনের ছায়ায় কন্যার শইল্লে দিলো পাক
পুরা পরা অইয়া উঠলো শইল্লোর ভাইন বাক।।

আলীপজান যৌবনে পদার্পণের সাথে সাথে চারিদিক থেকে পয়গাম আসা শুরু হয়। কিন্তু কোন পাত্রই তার পিতা ও ভাইদের পছন্দ হয়না। এভাবে হিনাই নগরের জমিদার পুত্রকেও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তারা। আজ সেই আলীপজান জমিদারের হাতের মুঠোয় প্রায়। তাই মাঝির মুখে কোন রা নাই। জমিদার যখন ধমকের সুরে মাঝির নাম পরিচয়, গন্তব্য ইত্যাদি জানতে চাইলেন তখন মাঝি বলে অন্য কথা-

“আপনে আমি দিওজন মানু নায় বেশ কম
তে কেনে কথাদি চাপি বন করো দম।”
…………………………………………….

“হমানীয়ে হমানীয়ে বুঝা বুজি ভালা
নীরূ আমি হুরু আমি কেনে ডাকো হালা।
হমানীরে ডাকি হালা জারতায় নি পারবায়
নিরূ বেটা পাইয়া কেনে আমারে কুদারায় (ধমকানো)”

এইসব বলে মাঝি যখন জমিদারের নাওয়ের পাশ কাটিয়ে সামনে অগ্রসর হল তখন জমিদার ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি তার মাঝি মল্লাদের ঐ নাওকে শুন্যে তোলে নিয়ে আসতে হুকুম দিলেন। মাঝি যেন তখন সকল ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে গেল। সে হাঁক দিয়ে বলল-

“ঝেলা মানু লইয়া চলছি কাউছাল কেনে ইনো
কেমোন বাপে পয়দা করছে তে দেখি দনো।
কোন মায় জনম দিয়া খাওয়াইছিল দুধ
আজিকুয়া এক এক করি পাইলিতায় বুদ।।

এইকথা বলে মাঝি তার ওস্তাদের শেখানো মত বৈঠা ধরে ঘুরাতে লাগল। জমিদারের একজন লোক তার কাছাকাছি আসতেই মাথায় বৈঠার বাড়ি খেয়ে পানিতে পড়ে গেল। আরো দুজন সামনে এলেও মাঝি তাদের সলিল সমাধি দিল। চারিদিকে অন্ধকার তখন আরো গাঢ় হল। মাঝি যখন অন্ধকারে তার বৈঠা ঘুরিয়ে চলছে তখন জমিদারের নাও থেকে এখজন দড়ির ফাঁদ বানিয়ে মাঝির গলায় পেঁচিয়ে, হেচকা টান দিয়ে পানিতে ফেলে দিল এবং লগি দিয়ে বুকের উপর চাপ দিয়ে ধরে নদীর গভীরে পৌঁছে দিল।

“বান খাইয়া মাঝি বেটা ডাকে বাপ মাই
মরবার কালো মুখ দেখিবার উখুম বুঝি নাই।
এরারে কইলো অখোন আমার সাধ্যি নাই
তোমরারে সপিলাম মাবুদ আল্লা ঠাই।।”

আলীপজান ও তার মাকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে মাঝি ডহরে হারিয়ে গেল চিরদিনের জন্য।জমিদার যখন জানতে পারলেন নৌকায় সাকির মামদের স্ত্রী কন্যা আছে তখন তার বুকে যেন আগুন লাগলো। আলীপজানকে পাবার জন্য কত রাত তিনি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তপ্ত বুক নিয়ে কেটেছে তার যন্ত্রনার প্রহর। আজ সেই আলীপজান তার হাতের মুঠোয়। তাই তার মনে হয়-

“পাল না টাংগায় কে পাইলে ভাইলোর বাও
মাল না কিনে কে দামোর পাইলে ভাও।।
কোন আশিক ছাড়ে পাইলে মাশুক
দুষমন কাবুত পাইলে কে না মিটায় দুখ।
আমার দুখ মিটাইমু পাইয়াছি কাবুত
রাইত আইজ ফুয়াইছিল বড়ো সই সাবুত।।”

জমিদারের নাওয়ের মাঝি মল্লা ও আলীপজানের মায়ের মধ্যে যখন কথা কাটাকাটি হচ্ছে তখন আলীপজান বুঝে নিল সে তার সম্মান বাঁচাতে পারবেনা। সে হান্দেশের পাত্র দড়ি দিয়ে বাঁধে। মাঝি ছাড়া নৌকা তখন স্রোতের টানে ভাটির পথে চলতে চলতে নদীর গহীন বুকে পৌঁছে। শাড়ীর কোনায় হান্দেশের পাত্র বেঁধে আলীপজান লাফ দেয় নদীর জলে। পাত্রের টানে আলীপজানের দেহ চলে যায় জলের গহীনে। নদীতে পড়ার শব্দ শুনে আলীপজানের মা জোরে চিৎকার দেন।

“বুড়ীর কথা হুনি হিনাইয়া চৌধুরী
মল্লারে কইন ডরো ডুব দেও জলদি করি।
ডুবদি তুলিয়া তুই জলদি করি আন
পরাণের পরাণ কন্যা বিবি আলীপজান”

কিন্তু কোথাও আলীপজানকে খোঁজে পাওয়া গেলনা। জমিদারের মাঝি মল্লারা সারারাত খোঁজে যখন আলীপজানের মৃতদেহ খুঁজে পেলনা তখন জমিদার পূত্র যারপরনাই দু:খিত হলেন। আলীপজানের মাকে তার পানসী নাও দিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন এবং তিনিও সলিল সমাধি নিলেন।

“মনের মাঝে বড়ো দুক চধরী সাব পাইলা
তান লাগি আলীপজান দুনিয়া ছাড়ি গেলা।
তাইনও করছিলা না বিয়া আ বিতা আছিলা
মনে মনে অউ পংগত তাইনও করিলা।।
আমার দোষে মারা গেলো কন্যা আলীপজান
এ দুনিয়াত না থাকৌকা আমার খানদান”

হায় হায়
দুইজনে দুই মতে রাখলা নিজোর মান
গীতায়ালে গাইলা গীত রাতির আধা খান
গীত গাওয়া অনো শেষ আলীপ সুন্দরীর
হুনড়া অখোন বাড়ীত চলি যাওগি যার জির”

এখানেই শেষ হয়ে যায় সিলেট গীতিকা আলীপজান সুন্দরীর কাহিনি । এত বছর পরেও আলীপজানের কাহিনি আরো যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।বর্তমান সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে।কত নারীর দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে আছে এসব হাওড়ে, দীর্ঘ নদীপথে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে কিন্তু আলীপজানদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এখনো রয়ে গেছে গহীন গাঙ্গের ডহরে। আলীপজানরা এখনো একা কোথাও স্বাধীন ভাবে ঘুরতে পারেনা। নৌকা, বাস, লঞ্চ কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। হিনাই নগরের জমিদারের মত নারীলোভী পুরুষরা তাদের লালসা চরিতার্থ করার জন্য ওৎ পেতে আছে সর্বত্রই। তাই এইরকম একজন প্রতিবাদী মাঝিরও আজ বড় প্রয়োজন। যে  হাঁক দিয়ে বলবে-

“কোন মায়ে জনম দিয়া খাওয়াইছিল দুধ
আজিকুয়া এক এক করি পাইলিতায় বুধ (উপলব্ধি)।

তথ্যসূত্র:

১) সিলেট গীতিকা: আলিপজান, মুহম্মদ নুরুল হক টি কে, আল ইসলাহ, ৩৭ শ বর্ষ, বৈশাখ শ্রাবণ  সংখ্যা, ১৩৭৫ বাংলা

২) সিলেট গীতিকা (প্রথম খণ্ড), বাংলা একাডেমি, ডিসেম্বর ১৯৬৮

৩) ফোকলোর চর্চায় সিলেট,  নন্দলাল শর্মা, বাংলা একাডেমি, আগস্ট ১৯৯৯

৪) লোক সাহিত্যে জালালাবাদ (প্রথম খণ্ড), মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, তাইয়্যীবা প্রকাশনী,  সিলেট, এপ্রিল ১৯৯৫

৫) ময়মনসিংহ গীতিকা বনাম সিলেট গীতিকা,  মুহম্মদ আসাদ্দর আলী,  জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ, সিলেট, অক্টোবর ১৯৯৯

৬) সিলেট গীতিকা: সমাজ ও সংস্কৃতি, ডঃ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ,উৎস প্রকাশনী,  ফেব্রুয়ারী,  ২০০৫।

শ্যামল কান্তি ধর। লেখক ও ব্যাংকার। জন্ম ও বাস বাংলাদেশের সিলেট।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ