পরী বুবু

ইভান অনিরুদ্ধ
গল্প
Bengali
পরী বুবু

পরী বুবু’র লাশটা ঘরের বারান্দায় উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে শোয়ানো আছে। ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসির রেখা। মনেই হচ্ছে না যে, পরী বুবু মারা গেছে। যে কেউ ভাববে, সে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য কেবল ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু পরী বুবু এই ঘুম থেকে আর জাগবে না। আর কোনোদিন আমাকে আদর করে বুকে জড়িয়ে কাঁদবে না। আমাকে নিয়ে আর কোনদিন সারা পাড়া দাপিয়ে বেড়াবে না।

হাফেজ চাচার বড় মেয়ে এই পরী বুবু। গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলো সে। প্রাইমারীর ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া হয়নি তার। তারপর বাড়িতেই একজন হুজুরের কাছে কোরান খতম করেছিলো। সারা গ্রামে তার মতো সুন্দরী মেয়ে আর একটাও ছিলো না। হাফেজ চাচা মাঝে মাঝে বলতেন, আমার মেয়েটা এক্কেবারে পরীর লাহান সুন্দরী। আমরা সবাই তাকে পরী বু বলে ডাকতাম। চাচী আক্ষেপ নিয়ে বলতেন, ও পরী, তুই য্যামনে চলাফেরা করছ, তাতে তোর উপ্রে বদ জিনের আছর পড়বার পারে। এই কথা শুনে পরী বু খিলখিল করে হাসতো। আমি সারাদিন পরী বু’র সাথে ঘুরঘুর করি। তাকে ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না যে! সব কাজে আমি হলাম তার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী।

একবার পরী বু আমার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললো, সড়কের মোড়ের দোকানের বেলাল ভাইকে গিয়ে এই চিঠিটা দিয়ে আসবি। সাবধান, লোকজনের সামনে দিবি না। আমি ঠিকমতো সেই চিঠি দিয়ে এসেছি। একদিন সন্ধ্যায় চুপি চুপি পরী বু আমাকে নিয়ে বেলাল ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিলো তার দোকানে। আমি একটু দূরে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম যাতে পরিচিত কেউ না আসে। দেখে ফেললে সারা গ্রামে কত কথা রটবে। সেদিন পরী বু অনেকক্ষণ ছিল বেলাল ভাইয়ের দোকানের ভেতর।

বাড়ি ফিরে পরীবু আমাকে জড়িয়ে সে কী আকুল করা কান্না! আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই। কিন্তু কিছু একটা বেলাল ভাইয়ের সাথে হয়েছে- এই ধারণা বারবার আমার মনে খোঁচা দিচ্ছিল। এর কিছুদিন পর থেকেই পরী বু কেমন যেন বদলে গেল। আগের মতো সাজুগুজু করে না, হাসে না। হাসলেও আমার কাছে সেই হাসি ভালো লাগে না। যেন প্রাণহীন সেই হাসি। আমাকে দেখলেই সে রেগে যায়- কীরে তোর লেখাপড়া নাই? সারাদিন খালি পই পই করে ঘুরে বেড়াস। যা, আমার সামনে থেকে! পরীবু’র মুখে এইকথা শুনে আমার খুব কান্না পায়। মনে মনে বলি আর কোনদিন পরীবু’র কাছে আসবো না। আমাকে হাজার আদর করে ডাকলেও কোন কথাই বলবো না তার সাথে। আমি বুকের ভিতর গভীর একটা কষ্ট নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে আসি। আমি বুঝতে পারি না ধীরে ধীরে পরীবু কেন বদলে যাচ্ছে। সবাই কেবল ফিসফাস করে বলে, পরীর উপর জিনের আছর পড়ছে। আরও কতো খারাপ কথা বলে। আমার এইসব কথা শুনে ইচ্ছে হয় পরীবুকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে যাই। আবার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, বেলাল ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি- আমার পরীবু’র সাথে সে কী করেছে। কিন্তু আমার সে সাহস হয় না।

হাফেজ চাচার ঘরের পিছনেই একটা বিশাল আকারের কদম গাছ আছে। অনেক পুরানো সেই গাছটা। চাচীর মুখে শুনেছি এই গাছটা ভালো না। এই গাছে কিছু একটা আছে! চাচী সেই আলামত বিভিন্ন সময় দেখেছেন। কয়েকদিন আগে পরীবু সেই গাছে উঠেছিল কদম ফুল পেড়ে আনার জন্য। চাচী হাজার বার নিষেধ করেছেন- পরী তুই এই গাছে উঠিস না। এই গাছে জিন আছে। তোর উপর জিনের বদ নজর পড়বো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। পরীবু ঠিকই দুপুরবেলা সেই গাছে উঠে কদম ফুল পাড়তে লাগলো। খানিক পরেই বিকট একটা চিৎকার দিয়ে পরীবু গাছ থেকে নেমে এলো। তাকে নাকি কিছু একটা পিছন থেকে জাপটে ধরেছে!

এই ঘটনাটার পর খুব তাড়াতাড়ি পরী বু’র অবস্থা আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। সে এখন অন্য মানুষ। সারাদিন ঝিম মেরে বসে থাকে। নাওয়া খাওয়ার কোন ঠিক থাকে না। চাচির সাথে কোন কথা বলে না। মাঝে মাঝে একা একা হাসে। পরক্ষণেই কী যেন একটা দেখে একাই আঁতকে উঠে।

হাফেজ চাচা আটপাড়া থেকে এক কবিরাজ নিয়ে এসেছেন বাড়িতে। গত দুই দিন ধরে সেই কবিরাজ বাড়িতে আছে। সন্ধার পর বাড়ির উঠানে একটা জলচৌকিতে পরীবুকে বসানো হয়। একপাশে একটা ছোট আগুনের দলা। কবিরাজ একটা ঝাড়ু সেই আগুনে গরম করে পরীবু’র নাকে-মুখে, পিঠে বাড়ি দেয়। পরীবু তবু খিলখিল করে হাসে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে এইসব দেখি আর বুক ফেটে কান্না আসে। কিন্তু আমার কী করার আছে! পরীবু’র কষ্ট আমার কেন জানি সহ্য হয় না। ইচ্ছে হয় কবিরাজকে খুন করে ফেলি।

কবিরাজের কথা মতো হাফেজ চাচা পরী বু’র চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কবিরাজ জানিয়েছে, পরীবু’কে জিনে ধরেছে। খুব বদ কিসিমের জিন। সময় লাগবে পুরোপুরি সুস্থ হতে। চাচী নিয়ম মেনে একটা তাবিজ কাঁসার গেলাসের পানিতে ডুবিয়ে তিন বেলা সেই পানি পরীবুকে খাওয়ান। এদিকে বাড়ির সবার ইচ্ছা সে একটু স্বাভাবিক হলেই তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে।

হাফেজ চাচা নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন খুব দ্রুত পরীবু’র বিয়ের জন্য। আমি মাঝে মাঝে পরীবু’র কাছে দেখা করতে যাই। খুব একটা কথা বলে না সে আমার সাথে। যেন আমাকে চিনতেই পারে না। একদিন দেখা করে চলে আসবো এমন সময় পরীবু আমাকে ডাকলো হাতের ইশারায়। আমাকে এক ঝটকায় বুকের সাথে মিশিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। আমি কেবল পাথরের মতো অনুভূতিহীন হয়ে পরীবু’র বুকে মুখ গুঁজে ছিলাম। পরীবু আমাকে জড়িয়ে ধরে কেবল কেঁদেই যাচ্ছিলো।

শেষ পর্যন্ত পরীবু’র বিয়ের বিষয় পাকা হয়ে গেলো। শুনই গ্রামের রুস্তম বেপারির ছেলের সাথে। মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবার। ছেলে কেবল ডান পা’টাএকটু টেনে হাঁটে। তবু সবাই খুশি যে শেষমেশ জিনে ধরা মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে এই ছেলে। নগদ পঁচিশ হাজার টাকা আর একটা সাদাকালো টেলিভিশনের বিনিময়ে ছেলে পক্ষ পরীবুকে বউ করে নিয়ে গেছে।

বিয়ের তিন দিনের মাথায় ছেলে আর তার বাবা হাফেজ চাচার বাড়িতে এসে হাজির। গতরাত থেকে পরীবু তাদের কিছু না বলে কোথায় নাকি চলে গেছে। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে। কোথাও না পেয়ে ভেবেছে হয়তো নিজের বাড়িতেই বাবা মায়ের কাছে এসে থাকবে। কিন্তু মেয়ের জামাইয়ের মুখে হাফেজ চাচা ঘটনা শুনে খুব মুষড়ে গেলেন। চাচী বিলাপ করে সারা বাড়ি মাথায় তুলে ফেললেন। ছেলের বাপ নিজের বাড়ি ফিরে গেছে। পরীবু’র জামাই রয়ে গেছে বউয়ের অপেক্ষায়, যদি এখানে কোন খোঁজ পাওয়া যায়।

পরদিন ভোর বেলায় পরীবুকে ঘরের পিছনে সেই কদম গাছের মগ ডালে বসে থাকতে দেখা গেল। বিয়ের সাজে সেজেছে সে। বিয়ের শাড়িটা পরা, গায়ে গয়না। এই খবরে সারা পাড়ায় হইচই পড়ে গেল। সবাই ছুটে এলো হাফেজ চাচার বাড়িতে। আমি গাছের নীচ থেকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলাম পরীবু’কে। কয়েকবার গলা ছেড়ে ডাক দিলাম- পরী বু …পরী বু …ও পরী বু। কিন্তু উপর থেকে কোন সাড়াশব্দ পেলাম না।

সবাই বলাবলি করতে লাগলো, শাড়ি পরে এভাবে কি গাছের এতো উপরে উঠা সম্ভব? আমি নিজেও ভেবেছি- এটা সম্ভব না। তাহলে কেমন করে পরীবু গাছের মাথায় উঠে বসে আছে? আমি আবার গলা ফাটিয়ে নীচ থেকে ডাকলাম, পরীবু, পরীবু। কিন্তু পরীবু নির্বিকার। একটু পরেই সে গাছের উপর থেকে সবার চোখের সামনে লাফ দিয়ে নীচে পড়লো। এ রকম একটা ঘটনা যে পরীবু ঘটাবে তা কেউই ভাবতে পারেনি। তার নাক মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। আর সেই তাজা রক্তে সারা মাটি ভিজে লাল হয়ে যাচ্ছে। উফ, কী বীভৎস সেই দৃশ্য! গাছ থেকে পড়ার সাথে সাথেই তার মৃত্যু হয়েছে। কেন পরীবু এমন নিষ্ঠুর ভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো কিংবা কীভাবে সে গাছের এতো উঁচুতে উঠলো, তা আজও আমার কাছে রহস্য।

আলিঙ্গনের আনন্দেই হয়তো মৃত্যুর সময়ও পরবু’র ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে আছে। সবাই এসে লাশ দেখে যাচ্ছে। ভেতরের ঘরে মেয়েরা করুণ সুরে কোরান তেলাওয়াত করছে। আমি শেষবারের মতো পরীবু’র কপালে একটা চুমু খেয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বার বার মনে হচ্ছে পরীবু আমাকে ডাকছে।

যখন একা থাকি তখন সেই ডাক যেন আজও আমি শুনতে পাই!

ইভান অনিরুদ্ধ। গল্পকার ও কবি। জন্মঃ ২৬ জানুয়ারি ১৯৭৮, আটপাড়া, নেত্রকোণা। উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। কর্মসূত্রে দীর্ঘ ছয়বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ছিলেন। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ