পল্লবীদের গল্প

ফরিদুর রেজা খান
গল্প
Bengali
পল্লবীদের গল্প

আজকাল  রনির কোনও কিছুতেই তেমন একটা মন বসছে না। রনি খেয়াল করে দেখেছে গত দুইদিন সে স্বাভাবিকের তুলনায় কম খেয়েছে। গত কয়েকদিন যাবত সে ঘুমোতেও যাচ্ছে রাতের খাবার না খেয়ে। ঘুম নামের জিনিসটা তার থেকে বিদায় নিয়েছে বলেই তার মনে হচ্ছে। ওর হাতের স্মার্ট ওয়াচ বলছে তার রক্তচাপ এখন ৬০/৭০। স্বাভাবিকভাবেই তার একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু কেন যেন তার কোনও চিকিৎসকের কাছে যেতে মন চাইছে না। শারীরিক দুর্বলতার কথা মন খুলে বলা যায়। কিন্তু মানসিক সংকটের কথা বলতে এতটা ভালো লাগে না। সেটা চিকিৎসকের কাছেই হোক আর প্রিয় বন্ধুর কাছেই হোক। বিছানার বালিশের নিচে থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট মুখে নেওয়া মাত্রই যেন ভূমিকম্প শুরু হল। সেকেন্ড খানেক যাওয়ার পর রনি বুঝতে পারলো ভূমিকম্পের আয়োজক তার মোবাইল ফোনের সাইলেন্ট মুড।

মেয়েটার সাথে কথা বলার খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রনি পল্লবীর ফোন তুলেনি। পল্লবীর ধৈর্য আছে বলতে হবে। গত ৩ দিন যাবত ও রনিকে ফোন করেই যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, একবারও রনি তার ফোন তুলিনি। আদতে পল্লবীর সাথে নতুন করে যোগাযোগ করার রনির কোনও ইচ্ছাই নেই। পল্লবীর মতো একটা মেয়েকে মিথ্যে মিথ্যে স্বপ্ন দেখাতে রনির আর রুচিতে বাঁধছে না। রনির এটাও মনে হয় যে ওর অবশ্যই উচিত পল্লবীর সাথে একদিন বসে ওকে সবকিছু খুলে বলা। তবে কেন যেন রনির তাও করতে মন সায় দিচ্ছে না। ইচ্ছা হচ্ছে প্রিয় অবহেলায় ওকে নিজের সাথে বেঁধে রাখতে। আসছে শীতে কমলালেবুর ঘ্রাণ মুখে নিয়ে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। রনি জানে যে ওর এই অবহেলায় আরও এক শহর কান্না জমছে প্রতিনিয়তই পল্লবীর মনে। হয়তো প্রতিদিনই মেয়েটা রনির কথা ভেবে বালিশ ভেজাচ্ছে। একটা সিঙ্গেল খাটে এপাশ ওপাশ করতে করতে ও একেকটা রাত পার করছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নিচে পড়া কালির পুরু স্তর ওর চোখে পড়ছে না। ভালোবাসার নেশায় ছুটে চলা মানবসন্তানেরা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি না, প্রিয় মানুষটার মুখের মানচিত্র দেখতে পায়। হয়তো পল্লবী ওর নিজের প্রতিবিম্ব ছাপিয়েও রনিকে দেখতে পাচ্ছে। আচ্ছা, ওর ঘরের আয়নায় ভেসে ওঠা রনির প্রতিচ্ছবিটা কি হাসছে? নাকি মুখের মানচিত্রে ফুটিয়ে রেখেছে আস্ত একটা ট্রায়াঙ্গল? কে জানে বাবা।

–        ভাই, নিচে চলেন। খায়া আসি।

রনির রুমমেট রাশেদ সাহেব বাড়িভাড়া চুকানোর সময় ছাড়া এমনিতে রনির তেমন একটা খোঁজখবর নেন না। তার চোখের সামনে রনির বেশ কয়েকবার মারাত্মক এপিলেপ্টিক এটাক হয়েছে। কোনোবারই তিনি রনির প্রতি কোনও সহানুভূতি দেখিয়েছেন বলে মনে করতে পারে না সে। কিন্তু প্রতিবার খাওয়ার সময় এই ভদ্রলোক ওকে ডাকবেন। গভীর ঘুমে থাকলেও ঘুম ভাঙ্গিয়ে রনিকে বলবেন-ভাই, নিচে চলেন। খায়া আসি।

–        ভাই, না গেলে মিস করবেন। জুমলার মা আইজকা মুরগি পোলাও পাকাইছে। এমন ঘেরান আইতাছে যে মন চাইতাছে লাফ দিয়া নিচে পইড়া যাই। সিঁড়ি বায়া নিচে নামতে মন করতাছে না।

কোনও এক বিচিত্র কারণে রাশেদ সাহেব প্রতিটি খাবারেরই নিজের মতো করে একটা নাম রাখেন। এখন যেমন মোরগ পোলাওকে মুরগি পোলাও বলছেন। রনি কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বের করে বললো, তো যান না ভাই। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে যান। সেকেন্ড ফ্লোরের কাছাকাছি এসে গেলে কোনও একটা বেলকনিতে ধরে ঝুলে যাবেন। তারপর কায়দা করে ভেতরে ঢুকে যাবেন। বেশিক্ষণ লাগার কথা না।

রাশেদ সাহেব নিচে চলে গেছেন। রনিকে রেখেই। হয়তো রনির জবাবটা তার পছন্দ হয়নি। যাওয়ার সময় রনির দিকে কিভাবে যেন তাকিয়ে ছিলেন। বিড়বিড় করে কি যেন একটা বলছিলেন যেটা রনি ঠিকঠাক ধরতে পারেনি। আচ্ছা, রনি  কি পাগল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন? যদি সবকিছুই ঠিকঠাক থাকবে তাহলে রনির ইচ্ছাগুলো এতটা বেপরোয়া আর নোংরা হয়ে যাচ্ছে কেন? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে রনি। রনির মনে পড়তে থাকে গত কয়েক বছরে ওর করা অপরাধগুলো। যদিও মাঝে মাঝেই তার মনের দাঁড়িপাল্লা বলে যে সেগুলো তেমন কোনও অপরাধই না। পৌলমী, প্রিমা, অরণী, লিপি, নিরু- নামগুলো ওর যতবারই মনে পড়ে ততবারই ওর ঠোঁটের কোণে একটা করে গাড় হাসি ফুটে উঠতে থাকে। রনির আচমকাই মনে হতে থাকে ও বিগত দিনে যেগুলো করেছে এবং আগামী দিনগুলোতেও যেগুলো করবে সেগুলো কোনোভাবেই খারাপ কিছু নয়। পতিতা পল্লীতে গমনকারী পুরুষের সংখ্যা নিতান্ত কম কিছু না। নেহায়েত পতিতা পল্লীতে যাওয়াটা ওর রুচিতে বাঁধে না। সেজন্যেই হয়তোবা ও নিজের মতো করে কয়েকদিন কয়েকটা পাখি পুষে। দানাপানি খাইয়ে সেগুলোকে নিজের আকাশে কয়েকদিন উড়িয়ে আবার বেড়িয়ে পড়ে নতুন শিকারের খোঁজে। সে তো অপরাধের কিছু করছেনা। মানুষের শারীরিক চাহিদা থাকতেই পারে এবং এটাই স্বাভাবিক। যদি না থাকে বরং সেটাই অস্বাভাবিক। পতিতা পল্লীতে যাওয়া পুরুষদের মতো সে অবশ্য এতটা প্যাশনেট হতে পারে না। এর কারণ হিসেবেও ঐ পাখিগুলোকেই দোষ দেয়াটা উচিত বলে রনির ধারণা। আজ বাদে কাল তো নিজের সতীত্ব কারোর না কারোর বিছানায় জলাঞ্জলি দিতেই হবে। সেটা যদি কয়েকদিন আগে বা অন্য কোনোভাবে হয় তবে সমস্যাটা কোথায়? ভালোবাসা মানে কি শুধু চ্যাট বক্সে তুলাভাসা গল্প? বা রাত জেগে ফোনে কথা বলে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ব্যবসায়িক মুনাফার কারণ হওয়া? ভালোবাসা হতে হয় দেহ থেকে দেহে। দেহের ভালোবাসার কাছে মনের ভালোবাসারা বারবারই ঠোকর খেয়ে ফিরে এসেছে-এমনটা রনির ধারণা। বিয়ে এবং তারপর সামাজিক পরিবেশে ভালোবাসাবাসির ওপর রনির ন্যূনতম বিশ্বাস নেই। রনি খুব কাছে থেকে একটি দম্পতিকে দেখেছে যাদের প্রণয় হয়েছিলো এবং তার পর বিয়ে হয়েছিলো। বছর দুয়েক সংসার করে একটা সন্তানের জন্ম দিতে দিতে সে ভালোবাসা কর্পূরের মতো বিলীন হয়ে গিয়েছিলো। রনি সে দম্পতিরই সন্তান যারা দীর্ঘ একদশকের ভালোবাসাবাসি শেষে দুই বছর এক ছাদের নিচে বসবাস করার পর নিজেদেরকে একে অপরের বন্দি জাল থেকে মুক্ত করে নিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। বলা যেতে পারে এই ঘটনা এবং এর কারণে ওর একাকী শৈশব ওর মানসিক অবস্থায় একটি সংকট তৈরি করেছে যার ফলাফল তার এই ধরণের চিন্তাভাবনা। অন্তত রনির সাইক্রিয়াটিস্ট কায়সার কামাল সেটাই মনে করেন। অবশ্য পল্লবীর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর রনির মনে হয়েছে এই মেয়েটির সাথে এক ছাদের নিচে নিশ্চিন্তে এবং বিনা আপত্তিতে কয়েক দশক কাটিয়ে দেয়া যেতেই পারে। কারোরই তেমন কোনও মানসিক সংকট বা সমস্যার কারণ হবে না। গত কয়েক মাসে পল্লবী বেশ কয়েকবার রনির বাসায় এসেছে। না, অন্যদের মতো প্রথম দেখাতেই ওকে বিছানায় নিয়ে যেতে পারেনি রনি। সত্যি কথা বলতে নিয়ে যেতে চায়নি। পল্লবীর মতো মেয়েরা পৃথিবীতে খুব বেশি একটা জন্মায় না। এদের চোখগুলো হয় টানাটানা। এদের মা গাভীর মতো চোখের ভেতর থাকে আস্ত এক একটা কালো দীঘি। সেই দীঘির জলে নোংরা মনের খোলসরূপ নোংরা দেহ নিয়ে ইচ্ছামতো সাঁতার কাটা যায় না। অনেক দক্ষ সাঁতারুই এইসব পুকুরে নেমে নেমে আর ঘাটে ফিরতে পারেনা। অতল জলে ডুবে যায়। পল্লবীর চোখজোড়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা ওই গোলাকার পুকুরে ডোবার ইচ্ছা নিয়ে রনিও নেমেছিল সেই পুকুরে। ফলাফল এতদিন ধরে নিজের মানসিকতায় লালন করে আসা অস্তিত্বের সাথে একটা নীরব মনস্তাত্ত্বিক সংঘর্ষ যা ও কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

–        ভাই, গেলেন না তো। আইজকা মুরগি পোলাওটা যা পাকাইছিলো না-সেইরাম হইছে। আমি খায়া টিফিন বাটিতে কইরা আরও একটু লয়া আইছি। এখন একটা টানা ঘুম দিমু। ঘুম থাইকা উইঠা আবার বাকিটা খামু।

রাশেদ সাহেব রনির দিকে টিফিন ক্যারিয়ারের বাটিটা এগিয়ে দেন। সস্তায় কেনা ঘিয়ের পোড়া গন্ধে রনির নাড়িভুঁড়ি যেন উলটে আসতে থাকে। রাশেদ সাহেব বিছানার বালিশের নিচে থেকে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট মুখে নিয়ে জ্বালাতে জ্বালাতে বলেন,

–        বুঝলেন ভাইসাব, দুপুরের খাওনের পরে একটা সিগারেট ধরানির আনন্দই আলাদা। বিড়ির ধোয়ার লগে মনের পোড়া গন্ধটা মিইশ্যা একটা সেইরাম অবস্থা তৈরি হইবো। একটা পান খাইতারলে ভালা হইতো। তয় এহন নিচে নামনের মন করতাছে না।

রনি রাশেদ সাহেবের কথার জবাব না দিয়ে প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালায়। এক বুক ধোঁয়া নিয়ে চেপে বসে থাকে। রাশেদ সাহেবের মতো নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে না তৎক্ষণাৎ। রাশেদ সাহেব চিৎকার করতে থাকেন।

–        হই মিয়া! আফনের মতোন বেটেরা তো জীবনে দেহি নাই। ধোঁয়া ছাড়েন মিয়া। নাইলে চোখে ঝিরঝির দেখবেন। ইহলীলা সাঙ্গ হইয়া যাইবো।

আস্তে আস্তে আসলেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে রনির। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পল্লবীর মায়া ভরা সেই মুখ। খানিক পরেই বিছানার তোষকের নিচে রাখা সেই ছুরিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কানে বাজতে থাকে রাশেদ সাহেবের আর্ত চিৎকার। ওর চোখে টলমল করতে থাকা জলে যেন একটা অপার্থিব আগুন নিভে যেতে থাকে অপার্থিব একটা শিস দিতে দিতে।

–        ঐ মিয়া, ফিট মাইরা গেলাইন নাকি? ওই মিয়া, কথা কন না কেরে?

রাশেদ সাহেবের চিৎকার ছাপিয়ে রনির কানে কেবল একটি প্রশ্নই ঘুরতে থাকে। কি করবে ও? নিজের প্রতিশোধের আগুনটা আরও একটু উসকিয়ে দেবে? নাকি পল্লবীর ভালোবাসায় ডুবে মরবে? রুম অন্ধকার করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের মনের প্রশ্নটার উত্তর পেয়ে যায় ও। সিগারেটটা এশট্রেতে গুঁজে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। আড়চোখে একবার দেখে রাশেদ সাহেবকে। রাশেদ সাহেবের মুখটা হঠাৎ কেমন যেন রক্তশূন্য ঠেকে তার কাছে।

কলাবাগান থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক মহসিন সিকদার রঙ জ্বলে যাওয়া একটি বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পার্থ টিকটিকির কাছ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী আওলাদ হোসেন ওরফে রনি এই বাড়ির চিলেকোঠায় থাকেন। পার্থ টিকটিকি তার বিশ্বস্ত খোচর। হোটেল মঞ্জিলে ভরপেট বিরিয়ানি খাওয়ালে সে তার নাগালের ভেতর থাকা ঢাকার যেকোনো গ্যাং বা অপরাধ জগতের তথ্য বের করে এনে দিতে পারে। ডিপার্টমেন্টে প্রচলিত আছে যে সেই তথ্য সবসময়ই ঠিক হয়। মহসিন সিকদারও পার্থকেই কাজে লাগান প্রায় সব বিষয়ে। পার্থ এখন পর্যন্ত তাকেও কোনও ভুল তথ্য দেয়নি।

–        এই বাসাটা কি আওলাদ সাহেবের?

বাড়ির সামনে একটা চেয়ার পেতে বসে থাকা ভদ্রলোক মহসিন সিকদারের প্রশ্নের জবাব দেন না। চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকেন। মহসিন সিকদার আপাতত স্বাভাবিক পুলিশ কর্তার আচরণের বাইরে। তিনি এখানে এসেছেন তথ্য সংগ্রহ করতে। তিনি কোনোমতেই চান না তাদের অনুসন্ধানের কোনও খবর রনি বা তার কোনও পরিচিতের কাছে পৌঁছাক।

–        ভাই? বাসাটা কি আওলাদ সাহেবের? প্রশ্নের জবাব দেন না কেন?

এবারও মহসিন সিকদারের প্রশ্নের উত্তর করেন না ভদ্রলোক। হাত দিয়ে মাছি তাড়িয়ে দেয়ার মতো করেন। যেন তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছিলেন যাতে মহসিন সাহেব এসে তার বিরক্তির কারণ ঘটিয়েছেন। মহসিন সিকদার লোকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাড়ির ভেতর ঢুকে যান। বাগানের মতো জায়গাটা পার করে সোজা চৌকাঠ মাড়িয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে যান। মোটামুটি পুরাতন আমলের বাড়ি। বৃহত্তর ঢাকা মহানগরী এলাকায় এখন এরকম বাড়িগুলোর আর অস্তিত্ব নাই বললেই চলে। অধিকাংশই প্রমোটারদের নজরে পড়েছে, বাকিগুলো জমি খেকোদের পেটে। বাড়ির ভেতর ঢুকে তেমন একটা আসবাব দেখেন না বাইরের ঘরে। ভেতরে দুটো ঘর। হয়তো শোবার ঘর। তার একটি থেকে মেয়েলি কণ্ঠে গুনগুনের আওয়াজ আসতে শুনে ঐ ঘরের দিকে এগোন। দরজায় ধাক্কা দিয়ে তিনি অবাক হয়ে যান। এরকম মায়া কাড়া চেহারার মেয়ে তিনি তার জীবনে খুব কম দেখেছেন। মেয়েটি আয়নার সামনে বসে নিজের চুল আঁচড়াচ্ছিল।  একজন অপরিচিত আগন্তুককে এভাবে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও সে খুব বেশি একটা অবাক হয় না। যেন এমনটা অস্বাভাবিক নয় যে সে গোসল করে ঘরে ঢুকে চুল আঁচড়ানোর সময় অপরিচিত কেউ হুট করে রুমে ঢুকে তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে।

–        চাচা, কার কাছে এসেছেন?

মহসিন সিকদার কি বলবেন বুঝে উঠতে পারেন না। হতবিহবল হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়েটার দিকে। প্রশ্নের খাতিরে উত্তর করতে চান, পারেন না। শুধুই আমতা আমতা করেন। একবার তাকান মেয়েটার দিকে। সে তখন তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে টিপে হাসছে।

–        ইয়ে মানে, হ্যাঁ। এসেছিলাম আরকি।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটা থেকে উঠে দাড়ায় পল্লবী। মহসিন সিকদার সাহেবকে তার ঘরে বসিয়ে রেখে সে যায় রান্নাঘরের দিকে। দিয়াশলাইয়ে কাঠি ঘষে চুলায় আগুন ধরায়। চুলায় চায়ের কেটলিটা বসিয়ে দিয়ে গুণগুণ করে গান গাইতে থাকে।

কলাবাগান থানায় চা দিয়ে যায় থানার পাশের মন্টুর দোকান থেকে। বলা বাহুল্য সেই চায়ের স্বাদ নিতান্তই তৃতীয় শ্রেণীর। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে মহসিন সিকদার সবচেয়ে সাহায্য পেয়েছেন চা নামের এই উষ্ণ পানীয় থেকে। খালি পেট নিয়ে যতবার তিনি বাসায় ঢুকেছেন প্রায় সবদিনই তার রান্নাঘরে ঢুকে হাড়ি পাতিলে ঠুং ঠ্যাং করে রান্নাবান্না করতে মন চায়নি। তার ফুফাতো বড়বোন অবশ্য মাঝে মাঝে এসে তার জন্য একগাদা তরকারি রান্না করে ফ্রিজে তুলে দিয়ে যান। তবু মাঝে মাঝে তার খাবার গরম করার ধৈর্যটুকুও থাকে না। খালি পেটে চা খাওয়ার অসাধারণ একটা উপকারিতা আছে বলে মহসিন সিকদারের ধারণা। খালি পেটে কড়া লিকারের এক কাপ চা খেয়ে নিলে ক্ষুধাটা সাথে সাথেই মরে যায়। পেটটাও তুলনামূলক ভরা ভরা লাগে। মহসিন সিকদার সাহেব ব্যক্তিগত জীবনে বিপত্নীক। দ্বিতীয়বার বিয়ের ইচ্ছেও তার হয়নি। এভাবেই যখন চলছে জীবন চলুক না। তবে আজ এই মেয়েটাকে দেখে তার মনে হচ্ছে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে নিলে হয়তোবা ভালোই হতো। হয়তো এরকম একটা মেয়েই তাকে নিখাদ আন্তরিকতার সাথে বলতো-বাবা, চা খাবে? চা করে আনি? কড়া লিকার দিয়ে গরুর দুধের চা। তুমি কিন্তু না করতে পারবেনা। সম্বোধনগুলোতে একটু পরিবর্তন হয়েছে। তবে এটুকুই বা মহসিন সাহেবের জন্য কম কি?

আনোয়ার সাহেবদের বাসার ছাদের চিলেকোঠায় তিনজন ব্যাচেলর ভাড়া থাকেন। তাদের মধ্যে একজনই চাকরিজীবী। বাকি দুই জন বেকার। কিন্তু কোনোবারই মাসের শেষে ভাড়া দিতে সেই চাকরিজীবী ভদ্রলোক আসেননি। এসেছেন তার বেকার রুমমেটরা। আনোয়ার সাহেবের একটা ধারণা ছিল যে হয়তোবা চাকরিজীবনের ব্যস্ততার শেষে তিনি এই কাজটুকু করার আগ্রহবোধ করেন না। কিন্তু এর মাঝে বেশ কয়েকটা শুক্রবারেও ভাড়া এসেছে তার হাতে এবং অতি অবশ্যই সেগুলো রাশেদ বা মিঠুন নামের দুইজনের হাত হয়ে। আচ্ছা, এই টাকা কি আদতেই এই দুইজন দেন? নাকি রনি হোসেনই পাঠান?

–        রনি সাহেব আছেন কোথায়?

আনোয়ার সাহেবের প্রশ্নের জবাব দেন না রাশেদ সাহেব। তিনি তখন খুব মনোযোগের সাথে হাতের সর্বকনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে নিজের কান চুলকাতে ব্যস্ত। খানিক আগে তিনি সোফার কাভার থেকে সুতা ছিড়ে দাঁতের ফাকে ঘষছিলেন। আনোয়ার সাহেবের মাঝেমাঝেই মনে হয় রাশেদ নামের এই লোকটির ভয়াবহ মানসিক বিকলাঙ্গতা আছে।

–        হুইত্যা ঘুমায়। থাকবে আর কই?

রাশেদ সাহেবের জবাবে কিছুটা অবাক হন আনোয়ার সাহেব। আজ ৩০ জানুয়ারি এবং সোমবার। সপ্তাহের এই দিনে অবশ্যই তার অফিসে থাকার কথা। কিন্তু তিনি তাহলে অফিসে যাননি কেন?

–        রনি সাহেব অফিসে যাননি কেনও? কি হয়েছে ওনার?

আনোয়ার সাহেবের প্রশ্নে বিরক্ত হন রাশেদ সাহেব। খানিক পরেই তার চেহারায় একটা উৎসাহের ছাপ ফুটে ওঠে।

–        ওনার যে মিরকি ব্যারাম আছে জানেন না?

–        মিরকি ব্যারাম টা কি?

–        ঐযে, মিরগি, মিরগি। আজিব লোক! মিরকি ব্যারামের নাম হুনেন নাই?

এবারও বিষয়টা আনোয়ার সাহেবের কাছে একেবারে পরিষ্কার হয় না। ভদ্রলোক খুব সম্ভবত এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগের কথা বুঝাতে চাচ্ছেন। আনোয়ার সাহেবকে তার সহকর্মী ইর্তেজা সাহেব একদিন বলেছিলেন বাংলা ভাষার সাড়ে সর্বনাশ করে ছেড়েছে গারো পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দারা। রাশেদ সাহেবের কথার ভাবার্থ অনেক চেষ্টা করেও যখন বুঝতে পারছিলেন না তখন এই কথাটা হঠাৎই তার আবার মনে পড়েছিলো।

–        চাচাজান, কেমন আছেন?

চোখ খুলে তাকানোর আগেই মহসিন সাহেব বুঝেছিলেন তাকে দেখতে কেউ একজন এসেছেন। কাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রটোকলের ডিউটি করার সময় হঠাৎই মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলেন তিনি। তারপরই হুড়োহুড়ি করে তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার কি রোগ আর কেনইবা তাকে নিয়ে এত ব্যস্ততা সেটা এখন পর্যন্ত তিনি জানতে পারেননি। ফিনাইলের কড়া গন্ধে এতক্ষণ তার মাথা ধরে গিয়েছিলো। বেলী ফুলের মিষ্টি একটা গন্ধে তার মাথা ধরাটা ছাড়তে থাকে। চোখ না খুলেও মহসিন সাহেব বুঝতে পারেন পল্লবী নামের মেয়েটিই এসেছে তার সাথে দেখা করতে।

–        আপনার রিপোর্ট তো দেখলাম চাচা। খুবই খারাপ অবস্থা। লিভার আর লাংস তো একদম ছাড়খাড় করে ফেলছেন।

উত্তরে কি বলবেন বুঝে পান না মহসিন সাহেব। শুধু আধশোয়া অবস্থায় সামনের দিকের একপাটি দাঁত বের করে একটু হাসতে চেষ্টা করেন। তাতেও লাভ হয় না। ‘পান খেয়ে দাঁতের অবস্থাও তো দেখি বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন’ এমন একটা কথা পল্লবী বলতে শুরু করলে মহসিন সাহেব নিজের দাঁতগুলো আবার লুকিয়ে ফেলেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়েটার দিকে।

–        এমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকবেন না। আপনি থাকেন কোথায়?

–        মোহাম্মদপুর।

মহসিন সাহেবের বিছানায় বসতে বসতে পল্লবী সারল্যের সঙ্গে বলে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই আপনি আমার বাড়িতে উঠবেন। অবাক হয়ে যান মহসিন সিকদার। মেয়েটার কি মাথা নষ্ট নাকি? একবার কি যেন একটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও আর করেন না। তার মাথায় অন্য একটি বিষয় ঘুরছে। মেয়েটি অবশ্যই জানে যে তার স্ত্রী পরিবার নেই। নাহলে একজন মানুষকে এভাবে সে এই কথাগুলো বলতে পারতো না। মহসিন সাহেবের ঘোর কাটার আগেই পল্লবী বলতে শুরু করে।

–        আজ থেকে নো সিগারেট, নো ড্রিংকিং। দিনে এক কাপ চা অথবা কফি। সেটাও ভরাপেটে। নো চিনি। আপনার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। ভাজাপোড়া তো চলবেই না। রোজ সকালে উঠে ভদ্র ছেলের মতো ট্রেকস্যুট গায়ে চেপে জগিংয়ে যাবেন।

পল্লবী আরও কি কি যেন বলতে থাকে। সে কথাগুলো মহসিন সাহেবের কানে পৌঁছায় না। পাথরের মতো হয়ে থাকে তার চোখ। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে যান তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময়কার এক ঝলমলে শুক্রবারে বেশ কয়েকটি বাসে পেট্রল বোমা ছোড়া হয়েছিলো। রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিলো মৃত্যুপুরীতে। যেন তিলোত্তমা ঢাকা হয়ে গিয়েছিলো একটা পোড়া চ্যালাকাঠ। চামড়া পোড়া আর মাংস পোড়া গন্ধে ঐ সময়ের প্রতিটি দিনেই ঢাকার এদিক ওদিক ম ম করতো। পাড়ার নেড়ি কুকুরগুলো অযথা হইচই করতে শুরু করতো হঠাৎ করেই। খানিক বিরতি নিয়ে আবারও একটা অভিন্ন শব্দ হতো-ব্যুম! জ্বলে যেতো একটা কিছু। হাউমাউ করে আর্তনাদ করতে শুরু করে দিতো গোটা পঞ্চাশেক প্রাণ। পুড়ে যেতো কিছু আগ্রাসী স্বপ্ন আর পোড়া গন্ধ ছুটতো বাংলাদেশ জুড়ে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটগুলোতে অর্ধপোড়া দেহগুলো কাতরাতো। ওদের কাতরানো দেখলে কেউই চাইবে না তাদের আর বিন্দুমাত্র কষ্টটুকু হোক। ধুঁকে ধুঁকে  একটা পোড়া জীবন পাওয়ার চেয়ে বীরের মতো মরে যাওয়া ভালো। বার্ন ইউনিটের বেডগুলোতে পড়ে থাকা দেহগুলোর পাশে ফোলা চোখ মুখ নিয়ে বসে থাকা স্বজনেরা কাজেই হাসিমুখে প্রিয় বিয়োগের আর্জি জানাতো আকাশে বসবাসকারী বোবা ঈশ্বরের কাছে। একযুগ আগে অবশ্য মহসিন সিকদারের এই প্রার্থনাটুকুও করতে হয়নি। বার্ন ইউনিটের বারান্দায় সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা তার স্ত্রী আর সন্তান ততক্ষণে ক্লেদযুক্ত এই দুর্গন্ধময় পৃথিবীতে শ্বাস ফেলতে অসম্মতি জানিয়ে বসেছে। নিষ্ঠুর পৃথিবীর সাথে বিদ্রোহ করেছিলো সেই পাপী প্রাণগুলো।

মহসিন সাহেব আলগোছে নিজের দু’চোখ বেয়ে পড়তে থাকা পানি মুছে নেন। হাসি হাসি মুখ করে আবার পল্লবীর দিকে তাকান। পল্লবী তখনও বলেই চলেছে-‘আপনার জন্য নর্মাল সয়াবিন বা মাস্টার্ডওয়েল সাড়ে সাতবার করে হারাম। আমি আপনার জন্য রাইস ব্র্যান ওয়েল কিনে আনবো…।‘

মহসিন সিকদার হাসপাতালে থাকতে যতটুকু অবাক হয়েছিলেন পল্লবীর বাড়িতে এসে তার চেয়েও বেশি অবাক হলেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব আরও প্রায় বারোজন মানুষ থাকছেন এই ভাঙা বাড়িতে। প্রায় সবাইই তাঁর মতো চাকরির শেষ দিকে অথবা অবসরপ্রাপ্ত। আবার একদম ব-কলম কয়েকজনও আছেন। পল্লবীদের বাড়িটাতে মহসিন সাহেব প্রথম যেদিন এসেছিলেন সেদিন কাউকেই দেখতে পাননি। সেদিন তারা সবাই গিয়েছিলেন রুটিন হেলথ চেক আপ করাতে। দেখা গেলো এখানকার সকল পুরুষই পল্লবীর চাচাজান। আর সকল মহিলাকেই পল্লবী ডাকেন মা বলে। সকলেই পরিবারহীন। কোনও না কোনও দুর্ঘটনায় তারা নিজেদের পরিবার পরিজন হারিয়েছেন। একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাষক পল্লবীর পক্ষে এই বিশাল ‘পরিবার’ কিভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে-এমন একটা প্রশ্ন করেছিলেন মহসিন সিকদার। রহস্যের হাসি হেসে পল্লবী জবাব দিয়েছিলো-এভাবেই চলে যায়! পল্লবীর বাড়ির সামনে এসে মহসিন সাহেবের মনে পড়ে যে এই বাড়িটাতে সে আগেও এসেছে। সেদিনও তাঁর সাথে পল্লবীর দেখা হয়েছিলো। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে পল্লবী শুরু থেকেই সেই পূর্ব পরিচয়ের কথা এড়িয়ে গেছে, মহসিন সাহেবও তাকে আর ঘাটাননি। পার্থ খোচরের তথ্য ছিল, এই বাড়ির চিলেকোঠায় রনি নামের একজন থাকেন। রনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী পরিচালক। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো একটি মামলায় তাকে সন্দেহভাজন ভাবছে। আদতে রনি নামের কেউ এই বাড়িতে থাকে না। পার্থকে এই বিষয়ে ফোনে জিজ্ঞাসা করেছেন মহসিন। কিন্তু পার্থ বলছে তার ছেলেরা এই বাড়িতেই রনিকে অনেকবার আসা যাওয়া করতে দেখেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সেই তরুণ কর্মকর্তা যে কিনা একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন তার সাথে পল্লবীর কি সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা ঠিক ভেবে পাননি মহসিন সাহেব। তবে আপাতত ‘পার্থ খোচরের  দেয়া তথ্য কোনোদিন ভুল হয়না’ বলে তার ডিপার্টমেন্টে প্রচলিত সেই মিথটা যে সত্যি নয় সেটার প্রমাণ পেয়ে মহসিন সাহেবের ভালো লাগছে।

মহসিন সিকদারের সাথে এই বাড়ির প্রায় সকলেরই একটা সুসম্পর্ক হয়ে গিয়েছে। পুলিশের চাকরি করতে করতে একটা সময় তার ধারণা হয়ে গিয়েছিলো এই পৃথিবীতে সকল মানুষের মনেই খুব গোপনে একটি অপরাধী বাস করে। সেই অপরাধী সত্ত্বাটা যখন একবার সবার সামনে চলে আসে তখনই কেবল সেই মানুষটাকে অন্যরা চিনতে পারে। কিন্তু পল্লবীদের এই একতলা বাড়িটার এই পরিবারে নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন, এতদিন ধরে তার পোষা ধারণাটা পুরোপুরি সত্য নয়। এ পৃথিবীতে এখনও এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের মনের ভেতরটা একেকটা দেবালয়। পরম যত্নে সেখানটায় মহানুভবতার পূজা করা হয়।

রনির চিলেকোঠাটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পল্লবী। ছাদে মোটামুটি একটা গাড় বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসের ঘূর্ণিতে ছাদের মেঝেতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা আর খড়কুটোগুলো খানিক পরপরই পাক খেয়ে উঠছে। রনি  নিজেকে অনেকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার পর পল্লবী যখন রনিকে নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ঠিক তখনই রনি ফোন করেছিলো পল্লবীকে। তার মাঝে জমানো অনেকগুলো কথা নাকি আছে যেগুলো সে পল্লবীকে বলতে চায়। পল্লবী অবশ্য প্রথমে রনিদের বাসায় যেতে রাজি হয়নি। রনির সাথে ওই চিলেকোঠায় আরও যে দুজন মানুষ থাকেন তাদেরকে পল্লবীর মানুষ বলে মনে হয়নি কখনও। মনে হয়েছে ওরা পিশাচ শ্রেণীর। সভ্যতার আবরণ ঢেকে আছে বলে দেখতে খানিকটা মানুষের মতোই লাগে। বেশ কতক্ষণ চিলেকোঠার দরজায় কড়া নাড়ার পর পল্লবী যখন ফিরে যাবে চিন্তা করেছিলো ঠিক তখনই ধাতব দরজায় খুটখুট শব্দ হয়। দরজা খুলে রনি মুখ বের করে পল্লবীকে ইশারায় ভেতরে আসতে বলে।

–        কেমন আছো, রনি?

পল্লবীর প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে রনি মাটির দিকে তাকিয়ে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মেঝেতে খুঁটতে থাকে। পল্লবী রনির এরকম আচরণের কোনও কারণ ধরতে পারে না। সে আবারও রনিকে একই প্রশ্ন করলে রনি উত্তর দেয় খুব সংক্ষেপে, ভালো আছি। একজন মানুষের সাথে তখনই কথাবার্তা চালিয়ে নেয়া যায় যখন সেও কথাবার্তায় সমান উৎসাহী হয় বা অন্তত প্রশ্নগুলোর জবাব দেয়। রনির মাঝে সেরকম কোনও কিছুই পল্লবী লক্ষ্য করেনি কোনোদিন। তাই আজ তার খুব বেশি একটা অবাক হওয়া হয়না।

–        তোমাকে আজ কেনও ডেকেছি তুমি জানো?

রনির প্রশ্নে অবাক হয় পল্লবী। এই প্রথম কোনোবার ও রনির মুখে এমন কোনও কথা শুনলো যে কথাটার শুরুটা রনি নিজের ইচ্ছায় করেছে। ঘাড় নেড়ে জবাব দেয় পল্লবী-না, জানি না। কেনও ডেকেছ বলো। কি যেন বলবে বলছিলে?

পল্লবীর দিকে তাকাতে তাকাতে বিছানা থেকে নামে রনি। বিছানার পাশে রাখা টুলের পায়াটার সাথে পা লেগে গেলে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। মাড়ি কেটে রক্ত বের হতে থাকে। সেই অবস্থাতেই হাসতে হাসতে তাকায় পল্লবীর দিকে।

–        হ্যাঁ, তোমার সাথে আজ আমার অনেক কথা বলার আছে। অনেক কথা বলার আছে।

রনির দিকে তাকিয়ে ভড়কে যায় পল্লবী। ওর চোখগুলো রাতের শেয়ালের মতো জ্বলজ্বল করছিলো। পল্লবী সাবধানে রনির কপালে হাত রাখে।

–        রনি, তোমার তো প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরে তো একদম গা পুড়ে যাচ্ছে। ওষুধ খেয়েছ কোনও তুমি?

পল্লবীর কথার কোনও উত্তর না দিয়ে রনি হাসে। ওর ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝড়তে থাকে। খানিক পরেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কিছুটা হাসি আর কিছুটা কান্নার মতো একটা শব্দ কর‍তে থাকে। পল্লবীর মনে হয় ওর মনের আকাশটা চিঁড়ে যেন বজ্রপাত হচ্ছে। হঠাৎ করে কেমন যেন ভয় ভয় লাগতে শুরু করে পল্লবীর। তার মনে হতে থাকে রনি নামের এই মানুষটা কোনও স্বাভাবিক মানুষ নয়। প্রচণ্ড ভয়ংকর একটা নরপশু। পল্লবীর প্রথমবারের মতো রনিকে খুব খারাপ ধরণের মানসিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন মানুষ মনে হতে থাকে।

ঢাকা মুখ্য বিচারক হাকিম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোকের দিকে। এই ভদ্রলোক কলাবাগান থানার একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ উপ পরিদর্শক। মাথার চুল আধপাকা। মুখে বিচিত্র একটা উচ্ছন্নতা। যদিও মনে হচ্ছে সেই মুখটাতে যেন একটা শিশুর সারল্য খেলা করছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার মৃত্যুর প্রেক্ষিতে দায়ের করা একটি হত্যা মামলার বিচার চলছে। সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। আর তার মাঝে বারবার বাধা দিচ্ছেন এই ভদ্রলোক। কোর্টরুমের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বলছেন, “রনির খুন আমি করেছি। আমি করেছি রনির খুন। আমার মেয়ে পল্লবী করেনি।“

যতবার লোকটি এই কথা বলেছেন ততবারই মনে হয়েছে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা পল্লবী নামের অভিযুক্ত তারই মেয়ে। কিন্তু বারকয়েক মামলার কাগজে চোখ বুলিয়ে হাকিম দেখেছেন পল্লবীর পিতৃ পরিচয় বা মাতৃ পরিচয় নেই। সে বড় হয়েছে একটা অনাথাশ্রমে।

ফরিদুর রেজা খান। কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষার্থী। জন্ম ৬ এপ্রিল। জন্ম বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলায়। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করছেন। প্রকাশিত বই: 'তখন আঁধার ছিলো' (উপন্যাস)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..