পাটকল ও গিয়াসউদ্দিনের সেতার

সমরেন্দ্র বিশ্বাস
কবিতা
Bengali
পাটকল ও গিয়াসউদ্দিনের সেতার

গিয়াসউদ্দিনের সেতারে মিহি মিহি কেঁপে ওঠে তুঘলক দিন
অচেনা নদীর ধার ঘেঁষে ভেসে আসে জায়নামাজের হাওয়া
নিজের সাম্রাজ্যে সম্রাট গিয়াসউদ্দিন বাজায় সেতার।
কোমরে তলোয়ার, লাগামহীন রাস্তায় একটানা টগবগ শব্দ-
ঘোড়ায় চড়ে পাড়ি দেয় গিয়াসউদ্দিনের মুকুট পরা স্বপ্ন।
রাজপ্রাসাদে ষড়যন্ত্রের হিস হিস শব্দ?

 

দুই

না না ষড়যন্ত্র নয়। বস্তীর উঠোনে কেউ কিছু কথা বলছে
কোন বিপ্লবের সেবাদাস দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লিখছে
মগরাহাটের মাদ্রাসায় বেজে উঠেছে ঘন্টা।
অভাবী দিনেরা চোরাবাজার থেকে চুরি করে আনছে চাল, কাতরাচ্ছে ক্ষিধে,
মাঝেরহাট প্রিন্টিং মেশিনে থপাথপ থপাথপ ছাপা হচ্ছে আত্মগোপনকারী কবিতা!
এরই মধ্য দিয়ে সটান হেঁটে যাচ্ছে আমাদের গিয়াসউদ্দিন।

 

দুই

ভারতবর্ষের ইসলামিক হিস্ট্রিতে এই গিয়াসউদ্দিনকে খুঁজছেন?
একটু শুনুন, এই লোকটা ১৩২০ সালে দিল্লী আক্রমণ করে নি!
এই মানুষটার নামে জহরত-মোড়া কোন ডকুমেন্টে নেই,
কারণ বিষয়টা ততটা ঐতিহাসিক নয়।
কিছুদিন আগেও নরক বস্তীগুলোর মধ্যে সেতার বাজাতে বাজাতে
এই লোকটা সাম্রাজ্য নয়, সামান্য কিছু অধিকার দখলের স্বপ্ন দেখেছিলো!
তখন ইস্তাহার বানানোর দিন, স্বপ্ন দেখা উলুক ঝুলুক দিন
বেহেস্তের হুরির ডানায় ভেসে চলার দিন
মহল্লায় মহল্লায় মজুরদের খোয়াব দেখবার দিন!

 

তিন

লোকটাকে দেখা গেছিলো পহেলা মে, কোন এক চিভিয়ট কারখানার গেটে,
লোকটা ভেসে বেড়াচ্ছিল লিফলেটের উড়ানে,
লোকটা হেঁটে যাচ্ছিল জিন্দাবাদের হেলিক্যাপটার-আওয়াজে।
তাকে কার্তুজহীন ঘিরে ছিল ক্ষিদের তুঘলক সাম্রাজ্য, মজদুরদের ভুখাশুখা পা।

 

চার

একদিন এক গোলন্দাজ মজদুরের হাত
গোলায় নয়, থেঁতলে গেছিল কারখানার চলন্ত মেশিনে –
গিয়াসউদ্দিনের হুঙ্কারে
জুটমিলের মজদুরগুলো জবরদস্তি থামিয়ে দিয়েছিল একটা আস্ত কারখানা।
আপনারা কোলকাতার বাস স্ট্যান্ডে বা কারখানা গেটে নিশ্চয়ই লোকটাকে দেখেছেন,
এই গিয়াসউদ্দিন ১৯৮৪ সালের বজবজ মহল্লার উষ্ণীষবিহীন এক জুটমিল শ্রমিক!

 

পাঁচ

লাটে ওঠা পাট-কলের ধ্বংসাবশেষের পাশে
সম্রাট গিয়াসউদ্দিনের করুণ সেতার
আজও এই সন্ধ্যায় করুণ সুরে কেন বেজে বেজে ওঠে?

সমরেন্দ্র বিশ্বাস। লেখক। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ