পাহাড়ের মৃত্যু

রুমী আহমেদ
কবিতা
পাহাড়ের মৃত্যু

পাহাড়ের মৃত্যু

কীভাবে খুন করা যায় পাহাড়কে
প্রথমেই অস্বীকার করুন, সেইসব মানুষদেরকে
যারা নিজেদের বুকের মাপে
বানিয়ে নিয়েছেন আদিবাসী শব্দটিকে।
তাদেরকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান করুন।
প্রয়োজনে নির্যাতন করুন।
রক্ত ঝরান, পুড়িয়ে মারুন।
প্রাণ বাঁচাতে ওরাও বিদ্রোহী হবে,
এই আশঙ্কাও মাথায় রাখুন।
বৃক্ষ সবুজে আচ্ছাদিত প্রকৃতির
এইসব বিপ্লবী সন্তানদের বুকে ঢুকিয়ে দিন
ক্ষমতার, লোভের, সংকীর্ণতার হিংস্র হাত।
বন্দুকের নলে জিম্মি করুন প্রকৃতির নরম হৃদয়।
মানবতা ভুলে তৈরি করুন জাতিগত বিদ্বেষ, দাঙ্গা।
দাঙ্গা ঠেকাতে সমতল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে
বাঙালিদেরকে পাহাড়ে স্থানান্তরিত করুন।
জলপাইবহর আরও বাড়িয়ে তুলুন।
প্রাণ বাঁচাতে বিদ্রোহী করে তুলুন শান্ত সবুজ পাহাড়কে।
অতপর বিদ্রোহ দমন করতে যত গণহত্যা প্রয়োজন,
রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে তা সুসম্পন্ন করুন।
দুর্ভিক্ষ স্থায়ী করুন।
দমন, নিপীড়ন ও গণহত্যা অব্যাহত রাখুন।
কবরের মত নিষ্ঠুর-শান্তি নিয়োজিত করুন।
শিশুদের মুখ থেকে কেঁড়ে নিন মাতৃভাষা।
রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক
অন্ধকারে দুর্বিষহ করে তুলুন ওদের জীবন।
ভোরকে সন্ধ্যা করুন। সন্ধ্যাকে গভীর কালো
পঁচিশে মার্চ রাতের অন্ধকারে পরিণত করুন।
লাশের গন্ধে বাতাসকে দিশেহারা করে তুলুন।
শান্তির প্রতিশ্রুতিকে বিষধর আগুনের জিভে রুপান্তর করুন।
যারা বেঁচে যাবে, আশ্রয়ত্যাগী মৌমাছির
ঝাঁকের মত পালাতে বাধ্য করুন।
হত্যা, ধর্ষণ, দখল, অগ্নিসংযোগ আর রক্তাক্ত
উপাখ্যানে ইতিহাসকে পুণরায় জীবন্ত করে তুলুন।
অতপর, ধ্বংস করুন ইতিহাসের সমস্ত বই,
দলিল দস্তাবেজ, চুক্তিনামা,পুরনো সংবাদপত্র।
টেলিভিশন, রেডিও। এমন কি যেকোন গণমাধ্যমে
অচ্ছুত ঘোষনা করুন তাদের যাবতীয় খবরাখবর।
ধ্বংস করুন শিল্পীর ছবি, কবির কবিতা,
যুবতীর শোকার্ত কথা, মায়ের আর্তনাদ,
হাহাকার, চাষীর বুকে আঁকা জুমক্ষেত।
ধ্বংস করুন ছবির মতন সুন্দর ঘর-আদর।
লুকিয়ে ফেলুন চেঙ্গী, মাইনী, শঙ্খ, কর্ণফুলীর
সমস্ত কান্না। ধ্বংস করুন সবুজ অরণ্য,
পাখি, পাখির বাসা। স্বজনের লাশের পাশে
দাঁড়িয়ে থাকা শাল, সেগুন, ধ্বংস করুন সব।
সব নিশ্চিহ্ন করুন। পুড়িয়ে ছাই করুন।
মাটি চাপা দিন গণহত্যার সমস্ত প্রমাণাদি।
এবং সেইখানে নিযুক্ত করুন রাষ্ট্রীয় দুর্ভেদ্য পাহারাদার ।
অতপর, কাগজে-কলমে আনুষ্ঠানিকভাবে
মৃত্যু ঘোষণা করুন পাহাড়ের, পার্বত্য চট্টগ্রামের ।
যেমন ভাবে মৃত্যু ঘোষিত হয়েছিল একাত্তরে, পূর্ব পাকিস্তানের, ঠিক সেইভাবে। কাগজে-কলমে।

 

নদীর বুকের ভিতর ক্ষত

বড় বড় গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল
এদেরকে ছাড়া এখানে আর কাউকেই চিনি না আমি।
আরেকটু সামনে গিয়েই ‘অপরাজেয় বাংলা’
ছবি দেখেছি বটে, তবু এই প্রথম সামনাসামনি দেখা।
সবকিছুই নতুন।
ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে
কত কত মুখ
তবু মনে হতো
অনেকদিনের আলাপেও
এদের কাউকেই কোনদিন,
ঠিকঠাক চিনতে পারব না আমি।
ঠিক তখনই এগিয়ে এলো সে
সহপাঠী। সহজ একটা মুখ।
তারচেয়েও সহজ ছিল ছায়ার মতন সঙ্গ।
সঙ্গ পেয়ে একসঙ্গে লিখতে থাকি কতরকম গল্প!
মনে মনে আমি তার নাম দিয়েছি সাহস।
অথচ কে জানতো, হারিয়ে ফেলার কী ভীষণ ভয় ছিল তার বুকে!
একজন এসে বললো, ‘ সে তোমাকে ভালোবাসে’
শুনে হাসি। তুমি বললে, মানবো কেন?
সে এসে বলুক আমাকে!
কিন্তু না, বলল না সে। বললেই পারতো।
অথচ না-বলার এই ফাঁকতালে,
হারিয়ে গেল না-ছোঁয়া প্রেম
কী ভীষণ এক কাকতালে!
সৌন্দর্য এই, বন্ধুত্বটা আছে।
তাই এতোদিন বাদে আমরা কিন্তু বলতেই পারি,
কাছাকাছি ছিলাম, কাছাকাছিই আছি।
তবু মাঝেমাঝে এমন এমন
মুহূর্তরা আসে, ঝড় বয়ে যায় মনে।
মনে হয়, কাছে থেকেও কাছে নেই।
নদীর উৎস।
উৎসমুখে ফিরতে গেলেই মরে যায় নদী!
নদীর বুকের ভিতর ক্ষত!

 

 

রুমী আহমেদ। কবি ও লেখক পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রে। বর্তমান পেশা, শিক্ষকতা।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..