পুরান ঢাকার নূর আলম ও এরিয়া ফিফটি ওয়ান

জহিরুল ইসলাম অনি
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
পুরান ঢাকার নূর আলম ও এরিয়া ফিফটি ওয়ান

নূর আলম সাহেব’কে তাঁর মাদ্রাসার বড় হুজুর ছোটবেলা বলেছিলো- শোন নুইরা, ইহুদি নাসারাগো মতো ব্রাশ দিয়া দাঁত মাজবি না। নিম গাছের ডাল দিয়া মেসওয়াক করবি। এতে অনেক ফজিলতও আছে। আমাদের নবীজি নিজেও মেসওয়াক করতেন। এই মেসওয়াক করাতে একে’তো অনেক উপকার আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা এটা নবীজির সুন্নত। বুঝলি? মনে থাকবো?

অডিও পডকাস্ট শুনুন এখানে: 

তারপর থেকে প্রতিদিন ফযরের নামাজ পড়ে সুবহা সাদিকের সময় নিম গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করাটা নূর আলম সাহেবের বহুদিনের অভ্যাস। তাঁর দাঁতের জোর এই বয়েসেও এখনো বেশ ভালই বলা যায় । গরুর হাড্ডি চিবিয়ে ঝুরঝুরা করে ফেলতে পারেন। এই বয়েসে ওনার একটাও দাঁত পড়েনি। কম কথা?

এই সুবহা সাদিকের বাতাসটাও তাঁর খুব ভালো লাগে। কারণ, এটা সরাসরি বেহেস্ত থেকে আসে। জামে মসজিদের ইমাম সাহেব সেদিন খুৎবায় বলছিলেন- যারা সুবহা সাদিকের বাতাস গায়ে লাগায়, তারা জান্নাতের হাওয়া গায়ে লাগায়। তাদের রোগ বালাই হয় না। মাশাল্লাহ, নূর আলম সাহেবেরও তেমন কোনও রোগ বালাই নাই। মানুষ, ধর্মটা আসলে জানে না। ধর্মে অনেক সায়েন্টিফিক বিষয়-আশয় আছে। এই ভালো অভ্যাসগুলি তিনি তাঁর ছেলে মেয়েদের চরিত্রের মধ্যে আনতে পারলেন না। আজকালকার চেংড়া পুলাপান এইসব কিছুই মানে না। এটা একটা আফসোস। এমনকি তাঁর স্ত্রীও ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজে। আর দাঁতের ব্যথায় কোঁ কোঁ করে।

শিল্পী: রিয়া দাস

এই মেসওয়াক করার সময়টাতে সাধারণত তিনি বাড়ির ছাদে এমাথা ওমাথা হাঁটেন। আজো হাঁটছেন। পাশের বাড়ির সত্য সাহার বড় মেয়ে সীতা এই সময়টাতে প্রতিদিন রেওয়াজ করে। তানপুরা বাজায়। গান বাজনা যদিও নূর আলম সাহেব তেমন পছন্দ করেন না। ধর্মেও নিষেধ আছে। তবুও কেন জানি এই ভোর বেলাটা মেয়েটার রেওয়াজ শুনতে তাঁর ভালই লাগে। সীতা তাঁর ছোট মেয়ে দিলুর বয়েসি। আগে অনেক আসতো। সারাদিন দিলু আর সীতা হাহা … হিহিহি … করতো। দিলুটার বিয়ে হয়ে যাবার পরে সীতা মেয়েটা আর আসেনা। তাঁর মেয়েটাকে খুব পছন্দ ছিলো। মেয়েটা হিন্দু না হলে তাঁর ছেলে রফিকের সাথে মেয়েটির বিয়ে দেয়ার কথা ভাবতেন। মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়- রফিক বোধ হয় সীতাকে পছন্দ করে। তিনি এইসব ভাবছেন আর রেওয়াজ শুনছেন।

এই রেওয়াজ শুনে ছাদে হাঁটতে হাঁটতে তিনি উত্তর-পূর্ব আকাশে একটা আলোর ঝলক দেখতে পেলেন। বেগুনি কমলা আলোর একটা তীব্র ঝলক। তাঁর মাথাটা হালকা চক্কর দিয়ে উঠলো। তিনি চোখ পিটপিট করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আলোর দিকে। এটা কী! একটা পয়সার মতো বড়। একবার ভাবলেন সূর্য। কিন্তু সূর্য উঠতে আরো দেরী। তাছাড়া আকাশটাও মেঘলা। জিনিশটা তো তারাও নয়। আশ্চর্য!

তিনি তাড়াহুড়ো করে নীচে নেমে এলেন তাঁর স্ত্রীকে এই আলো দেখাতে। তাঁর স্ত্রী তখন রান্না ঘরে তাঁর জন্যে পাতলা রুটি আর লাবরা রান্না করছিল। নূর আলম সাহেব হন্ত দন্ত ভাবে রান্না ঘরে ঢুকে বললেন- এই রফিকের মা, একটু তাড়াতাড়ি ছাদে আসো তো।

তাঁর স্ত্রী লাবরায় কালিজিরার বাগার দিতে দিতে বললেন-

কী হইছে? আপনে এমন করতাছেন ক্যান ?

নূর আলম সাহেব খসখসে গলায় বললেন-

আরে আসো না, তিনি হাত ধরে প্রায় টেনে তার স্ত্রীকে ছাদে নিয়ে গেলেন। উত্তর-পূর্ব আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন কিছুই নাই। শুধু মেঘ। পূব আকাশ অনেকটা ফর্সা হয়ে গিয়েছে।

তাঁর স্ত্রী দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে বেশ হাঁফিয়ে গেছেন। শ্বাস টানতে টানতে বললেন-

কী? কী দেখাতে ছাদে আনলেন?

নূর আলম সাহেব- কী দেখেছেন স্ত্রীকে বললেন।

তাঁর স্ত্রী বললো- ধান্ধা দেখছেন আপনে। আলো আইবো ক্যামতে?

নূর আলম সাহেব ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রীর দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন। তাঁর নিজের কাছেও মনে হতে লাগলো ধান্ধাই দেখছেন।

স্ত্রী বললেন-

হুনেন, রুস্তমের ফার্মেসিটা খুললে হেরে ফুন দিয়া কইয়েন আপনের প্রেসারটা যেন আইয়া মাইপা দ্যাহে। বয়েস তো হইছে। অহনো বাখরখানির চুলার চিপাত যাইয়া বইতে অইবো? কর্মচারীরা কি দেখবার পারে না দোকান? নিচে আহেন। নাস্তা দিতাছি। খাইয়া ইট্টু চক্ষু বুইজ্জা হুইয়া থাহেন। আইজ কোনখানে যাইবার পারবেন না কইলাম।

নূর আলম সাহেব পুরান ঢাকার বাসিন্দা। শ্যামলা বেঁটেখাটো মতো মানুষ। স্বাস্থ্য ভালো। বয়স ষাটের মতো হবে। দেখলে অতটা বোঝা যায় না, পঞ্চাশ বলে মনে হয়। চুল দাড়িতে কলপ দেয়ায় বয়সটা আরও কম লাগে। বোম্বের অভিনেতা ওমপুরীর চেহারার সাথে তার চেহারার খানিকটা মিল আছে। হাসলে বেশি মিল লাগে।

নূর আলম সাহেবদের তিন পুরুষের ব্যবসা। সাধারণত ব্যবসা তিন পুরুষ পরে আর থাকে না। কিন্তু তাঁদেরটা আছে। বেশ ভালোভাবেই আছে। তিনি শক্তহাতে সব একাই দেখাশোনা করেন। দুইটা বাখরখানির দোকান। আর বেশ বড় একটা বেকারি কারখানা। এছাড়া কেরানীগঞ্জে একটা ইটের ভাটাও আছে। তিনি সকাল সাতটা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত বাখরখানির দোকানে বসেন। তারপর বাসায় এসে ভাত খান। খানিকক্ষণ ঘুমান। বিকেলবেলা যান বেকারিতে। রাত আটটায় বাসায় ফেরেন। সপ্তাহে একদিন যান কেরানীগঞ্জ।

তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলের নাম রফিক। প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ক্যাশ দিয়ে বড় ছেলেকে আমেরিকা পাঠিয়েছেন। ছেলে আমেরিকার নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালায়। ভালো ইনকাম। ছোট মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন, সে স্বামীর সাথে ঢাকায় নয়াপল্টন থাকে। স্বামী ব্যাংকের ম্যানেজার। নূর আলম সাহেব আর তাঁর স্ত্রীর এখন ঝাড়া হাত পা। কোনও টেনশন নেই। ছেলে মেয়েরা বাবা মার খোঁজ খবর নেয় নিয়মিত।

নূর আলম সাহেব স্ত্রীর কথা না শুনে দোকানে চলে গেলেন। বাসায় বসে থাকার কোনও মানে হয় না। কাজের মধ্যে থাকলেই বরং ভালো থাকবেন। কিন্তু সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে সকালের অভিজ্ঞতাটা মনের ভিতর কেন জানি খচখচ করতে থাকলো। কী দেখলেন ওটা? আসলেই কি ধান্দা? কেমন একটা আলোর বলয় ছিলো! এতো তীব্র আলো তিনি তাঁর জীবনে কখনো দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।

পরেরদিন সকালে একটু তাড়াহুড়ো করেই ছাদে গেলেন। উত্তর-পূর্ব আকাশের দিকে আবারও তাকালেন। না, কিছু নেই। আকাশ নীল। আজ মেঘও নেই তেমন একটা। কাল বোধ হয় তবে ধান্ধাই দেখেছেন।

আস্তে আস্তে সাত দিন কেটে গেলো। নূর আলম সাহেব ওই কথা নানান কাজের চাপে আর মনে আনতে পারলেন না।

আজ তাঁর স্ত্রী মেয়ের বাসায় যাবে। মেয়েটার বাচ্চা হবে। মাঝে মাঝেই তাঁর স্ত্রী মেয়ের কাছে গিয়ে এই সময়টায় থাকেন। নূর আলম সাহেব দুপুরে ভাত খেতে বাসায় এসেছেন। তাঁর স্ত্রী ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন- হুনেন, একতলার মজিদের বউরে কইয়া দিছি, আপনের খানা দিয়া যাইবো। সকালের নাস্তাও ভি দিয়া যাইবো। আমি দেহি পরশু দুপুরে না পারলে রাইতে চইলা আইমু।

নূর আলম সাহেব রাতে বাসায় একা একা খেলেন। এই একতলার মজিদের বউয়ের রান্না তিনি খেতে পারেন না। মিষ্টি মিষ্টি লাগে। তবু মেয়েটা এতো যত্ন করে খাবার দিয়ে যায় নিয়ে যায় যে, মুখের ওপর কিছু বলতেও পারেন না।

আজ রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে আছেন। পেট ফেঁপে আছে। এর মধ্যে নাই কারেন্ট। লোডশেডিং। তিনি গরমে অতীষ্ঠ হয়ে ছাদে গেলেন।

ছাদে বেশ ফুরফুরে বাতাস। তাঁর ছাদ থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর একটা অংশ চোখে পরে। বাতাসে একটা পাটি পেতে ছাদেই ঘুম দেবেন কিনা এটা যখন ভাবছিলেন ঠিক তখন আবার সেই আলোটা উত্তর-পূর্ব আকাশে একটা তীব্র ঝলক দিয়ে গেলো। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন আলোর তীব্রতায়। সম্মোহিত নিষ্প্রাণ মানুষের মতো তিনি স্থানু হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছে তিনি একটি আলোর বলের ভিতর রয়েছেন। চারপাশে লক্ষ কোটি আলোর তৈলচিত্রের বলয়। তার মধ্যে তিনি একা। তাঁর মাথাটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। আলোর কণাগুলি আগুনের কণার মতো মগজে এসে গেঁথে যাচ্ছে। তিনি ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে যেতে জ্ঞান হারালেন।

এরপর নূর আলম সাহেবকে এই এলাকায় আর দেখা যায় নি। তাঁর স্ত্রী এসে অনেক খোঁজ খবর করলেন। থানায় জিডি করলেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন। তাঁর ছেলেকে জানানো হলো। রফিক ঢাকায় এসে মিসিং পার্সন ব্যুরোতেও অনেক খোঁজ লাগালেন। কেউ বললো তাঁকে চৌরাস্তার মোড়ে পান কিনতে দেখেছে, কেউ বলতো তাঁকে দেখেছে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে। পীর, ফকির, জ্যোতিষী যে যা বলেছে তারা করেছে। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে আর পাওয়া গেলো না। জলজ্যান্ত মানুষটা শ্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।

নূর আলম সাহেব মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে চোখ খুললেন। চারপাশে উজ্জ্বল শাদা আলো। তাঁকে মাথার ওপরে লাইট ঝুলছে। কে যেন পাশ থেকে ইংরেজিতে বললো- রিলেক্স। রিলেক্স।

প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছে নূর আলম সাহেবের। বমি আসছে। তিনি চোখ খুললেন। প্রথমে চোখ পড়লো ঘরের সিলিং-এ। সিলিং অনেক উঁচুতে। অন্তত পঞ্চাশ ফুট উঁচু সিলিং। নানান ধরনের যন্ত্রপাতিতে ঠাসা একটা বিশাল হলরুমের মতো জায়গায় তিনি আছেন। চারপাশে সাদা এপ্রোন পরা বিদেশি লোকজন। এদের মধ্যে একটি মেয়ে কণ্ঠ রিনরিনে গলায় পরিষ্কার বাংলাতে বললো-

— নূর আলম সাহেব, আপনি কেমন বোধ করছেন?

নূর আলম সাহেব আস্তে আস্তে বললেন- এটা কোন জায়গা? আমি কি হাসপাতালে?

মেয়েটি হাসিমুখে বললো- না, এটা একটা ল্যাব। তবে মেডিক্যাল ফেসেলেটি এখানে আছে।

নূর আলম সাহেব আবার বললেন- এটা কোথায়? আমার স্ত্রী কই?

বলতে বলতে তিনি মাথার ব্যথায় গোঙাতে শুরু করলেন। চোখ টকটকে লাল হয়ে যেতে থাকলো।

মাঝবয়েসি এক ডক্টর নূর আলম সাহেবকে ট্রাংকুলাইজার দিতে বললেন। একটি নার্স দৌড়ে এসে তাকে ইনজেকশন দিয়ে গেলো।

নূর আলম সাহেব আরো ৩৬ ঘণ্টা অচেতন হয়ে রইলেন।

নূর আলম সাহেবের কোড নাম্বার T-CD9।

তাঁকে রাখা হয়েছে একটি 4GL-3EL কক্ষে। এটা মূলত 4th generation Codon series এর একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন level 3 EL (Extraterrestrial life ) DNA কক্ষ। এখানে যাদের DNA structure পৃথিবীর মানুষের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন তাদেরকে রাখা হয়। তাদের নিউরন থেকে একধরনের রেডিয়েশন হতে থাকে। যেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে এই কক্ষে তাদের রাখা হয়- ৩৬ ঘণ্টা। তাদের দেহকে প্রায় ফোটনের কাছাকাছি গতিতে একটি ছোট জার্নি ফেস করতে হয়। এতে করে নিউরনে ইলেকট্রিক সিগন্যাল প্রসেসে একটি পরিবর্তন ঘটে। সেটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এই কক্ষ। এই পৃথিবীতে এমন বিশেষ ধারার মানুষ রয়েছে মাত্র- ৩৭ জন। এবং নূর আলম সাহেব তাদের মধ্যে একজন, যিনি এই সমস্ত প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন। এই পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এই মানুষরাই অবদান রাখেন। এরা যার যার নিজ নিজ ক্ষেত্রে- বিষয়ভিত্তিক থিওরি প্রদান করেন। যার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগটা করেন বিজ্ঞানিরা এবং তাদের কর্মীবাহিনী।

নূর আলম সাহেবকে একটি মিউজিয়ামের লবিতে আনা হয়েছে।

বড় বড় পাথরের গায়ে দুর্বোধ্য সব প্রাচীন শিলালিপি। দশজনের একটি বিশেষজ্ঞ দল তাঁর জন্য এখানে অপেক্ষা করে আছে। হাই এন্ড লো হার্জ ডিটেক্ট করতে পারে এমন রেকর্ডিং সিস্টেম অন করা হয়েছে।

নূর আলম সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছেন। তিনি এখনো ঠিক বুঝতে পারছেন না তাঁকে কোথায় আনা হয়েছে?

নূর আলম সাহেব প্রশ্ন করলেন-

— আমাকে আপনারা দয়া কইরা একটু কইবেন এইটা কোন জায়গা?

দোভাষী মেয়েটি উত্তর দিলো- এটা এই পৃথিবীতেই।

নূর আলম সাহেব- পৃথিবীর কোনখানে?

দোভাষী মেয়ে- আমেরিকা। দক্ষিণ নাভাদা। এরিয়া ফিফটি ওয়ান।

নূর আলম সাহেব কিছুই বুঝলেন না। শুধু বললেন,

— আমারে আমেরিকায় কেমনে আনলেন ?

দোভাষী – এটা আপনি বুঝবেন না। আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। মানুষের বন্ধুরা এইখানে আপনাদের মতো অতিমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদেরকে নিয়ে আসে। আপনারা যেনো আপনাদের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেন। পৃথিবীর সব মানুষ যাতে আপনাদের কারণে উপকৃত হয়।

নূর আলম সাহেব ভাঙা গলায় বললেন- কিন্তু আমারতো কোনও ক্ষমতা নাইক্কা। আমারে কেঠা আনছে?

দোভাষী মেয়েটি বললো- আছে, আপনার অকল্পনীয় ক্ষমতা আছে। আপনি প্রাচীন ভাষা ডিকোডেট করতে পারেন। আপনার ডিএনএ অতি শক্তিশালী। আপনি আমাদেরকে বলবেন- প্রাচীন সভ্যতার সকল রহস্যের অর্থ। পৃথিবীতে ধর্মের নামে যত হানাহানি তাতে করে একেবারে বন্ধ করা যাবে। আমরা ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক সমাধান পাবো। আপনি আমাদের বলবেন- সমস্ত ধর্মগ্রন্থের লুকানো শব্দের অর্থ। আপনি আমাদের বলবেন- মিশরীয়, ব্যবিলন, এশিরিয়, বাইজেন্টাইন, উর, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, বৈদিক, সুমেরিয় সভ্যতার সূচনা এবং ধ্বংসের ঘটনা। হাজার হাজার বছর আগে তারা কারা ছিল? তারা কোথায় চলে গেলো? তারা আমাদেরকে কী বলতে চেয়েছিলো। আপনি সব আমাদের বলবেন।

নূর আলম সাহেব বললেন, এইসব কী কন আমি তো তার নামও শুনিনাইক্কা। আমি বাংলা ভাষায় টাইনা টুইনা পাশ। বাংলা গ্রামারও পারি না। আপনারা ভুল করতাছেন। আমি ভাষা কী হেইডাই জানি না।

একজন সৌম্য দর্শন প্রৌঢ় বললেন- মিস্টার T-CD9 আপনি এই পাথরের সামনে এসে দাঁড়ান।

মেয়েটি বললো নূর আলম সাহেব, ওই পাথরের সামনে এসে দাঁড়ান।

নূর আলম সাহেব দাঁড়ালেন।

প্রৌঢ় বললেন- এবার পড়তে চেষ্টা করুন।

নূর আলম সাহেব পাথরের দিকে তাকিয়ে দেখেন ছোট ছোট নানান ধরনের আঁকিবুঁকি। সারা পাথরের গায়ে খোদাই করা।

প্রৌঢ় বললেন- এটা সুমেরিয়ানদের একটি প্রাচীন ভাষা। এর দুই একটি সিম্বলকে আমরা ডিকোডেট করতে পেরেছি। এতে করে এটা আরো দুর্বোধ্য হয়েছে জটিল হয়েছে। আপনি একটু চেষ্টা করে দেখুনতো, পড়তে পারেন কিনা?

নূর আলম সাহেব পাথরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। সিম্বলগুলো যেনো তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক গভীরতম অন্ধকার অতীতের দিকে। তিনি বিড়বিড় করে বলছেন-

হে, শক্তির অংশীদার… আমি এক আদিম চিরশক্তির উৎস বলছি…

সবাই প্রচণ্ড করতালি দিয়ে উঠলো। হ্যাঁ, হচ্ছে, এইতো হচ্ছে, পড়ুন T-CD9 আপনি পড়ুন।

নূর আলম সাহেব পড়ে চলছেন- মহাসময়ের শুরুতে আমি ছিলাম… তোমরা আমারই শক্তির অন্যপ্রকাশ… আমিই সকল শক্তির আদি পিতা… আমিই সকল শক্তির আদি মাতা… তোমরা… শক্তির সাগরে… শক্তির ঢেউ…তোমরা সাগরেই মিশে যাবে…

সবাই হতভম্ব হয়ে শুনছে সুমেরিয়ান শিলালিপির দুর্বোধ্য অক্ষর। নূর আলম সাহেব প্রলাপের মতো দুলে দুলে পড়েই যাচ্ছেন।
তিনি এখন টলছেন আর পড়ছেন। আর চোখের সামনে ভাসছে অনেক স্মৃতি।

নূর আলম সাহেবের মনে পড়ছে- অনেক বছর আগে, তিনি তখন ছোট। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছেন। হঠাৎ তাকে দুই দিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে পেয়েছিলো পরে তালগাছের মাথায়। তখন তার কতইবা বয়স- তিন চার। আজ সেই স্মৃতি মনে পড়ছে। আজ যেন বুঝতে পারছেন, ওইদিন তিনি কাদের কাছে ছিলেন। তারা তাঁকে কী বলেছিল। তিনি বিড়বিড় করছেন-
তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে অন্তরিক্ষের দূরতম নক্ষত্রের আলো…তোমার দেহের ভিতর… অসীম আমার নিত্য আসা যাওয়া…
আমরা কেউ অপরের থেকে বিভাজিত নই…

এই ঘটনার পাঁচ বছর পরে।

হিলটনে আজ একটি ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার শেষ হলো। পৃথিবীর প্রায় পনেরোটি দেশের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা এই সেমিনারে তাদের সায়েন্টিফিক পেপার পড়লেন। পৃথিবী মানব সভ্যতার একটি শিখরে আজ পৌছালো। প্রচুর মানুষ জড়ো হয়েছে রাস্তায়। রাস্তায় আজ খুব ট্রাফিক। ক্যাব ড্রাইভার রফিক এক প্যাসেঞ্জার নিয়ে সেমিনার ভবনের সামনে আটকে আছে। অসংখ্য গাড়ি। সেমিনার শেষ হওয়ায় লোকজন বের হচ্ছে। রফিক হঠাৎ দেখে একজন শ্যামলা বুড়ো মানুষ অনেকগুলো সাদা চামড়ার মানুষের সাথে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে রাস্তায় পার্ক করা একটি রোলস রয়েসের দিকে। বুড়ো লোকটা ঠিক দেখতে রফিকের হারিয়ে যাওয়া পিতা নূর আলম সাহেবের মতো। রফিক অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো। গলার কাছটা ভারি হয়ে এলো রফিকের। আহা রে! পাঁচটা বছর হয়ে গেলো মানুষটা একেবারেই হারিয়ে গিয়েছে। এই বুড়োটার সাথে কী অসম্ভব মিল রফিকের বাবার। বুড়োটা রোলস রয়েসে উঠে গেলো। পিছনের গাড়ি রফিকের ক্যাবকে হর্ন দেয়ায় রফিক সম্বিৎ ফিরে পায়। আস্তে করে গিয়ার চেঞ্জ করে স্টিয়ারিং ঘোরাতে শুরু করলো। মনে মনে ভাবলো- স্ব মিল চেহারার মানুষ নাকি পৃথিবীতে ছয়জন থাকে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..