পুরুষতন্ত্র বনাম ঝাড়িতন্ত্র ও আপেক্ষিক নারীবাদ

কাকন রেজা
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
পুরুষতন্ত্র বনাম ঝাড়িতন্ত্র ও আপেক্ষিক নারীবাদ

গল্পের আবহ দিয়ে শুরু করা যাক। একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানে দুজন কাজ করেন। দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এবং পদ-পদবীও এক। এদের একজন নারী, অন্যজন পুরুষ। নারী প্রথম বললাম কেনো, ওই যে ভদ্রলোকের শিক্ষা ‘লেডিজ ফার্স্ট’। এ বিষয়ে পরে আসি, গল্পটায় যাই। এক পদ-পদবী, পাশাপাশি কেবিন। দুজনের টুকটাক কথা-টথা। তারপর চা-কফি। ড্রাইভ এগিয়ে লং-ড্রাইভ। তারপর ক্রমান্বয়ে রং-ড্রাইভ। মানে একে অপরের ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা শুরু। প্রথমে চুমু, তারপর পুরো শরীর। মানে ‘দৈহিক আত্মীয়তা’, ফিজিক্যাল রিলেশন। বলবেন অসুবিধাটা কোথায়। নেই তো। নারী হিসাবে তিনি সর্বগুনে ও যোগ্যতায় উত্তীর্ণ। তিনি একজনের সাথে লিভ-টুগেদার করতেই পারেন। এটি তার ব্যক্তি স্বাধীনতা। এখানে প্রশ্ন তোলা মানে তার স্বাধীনতায় বাধা দেয়া। যা অনৈতিক। আমিও তাই বলি।

গল্পটা আরেকটু এগুনো যাক। কদিন পরেই কাগজের শিরোনাম। স্বাবলম্বী সেই নারী অভিযোগ এনেছেন সেই পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের। বলছেন, তাকে ভালোবাসার কথা বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সর্বনাশ করা হয়েছে। সাথে সাথে গর্জে উঠলেন নারীবাদীরা। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়লেন। কেনো সেই সমপদ-পদবীওয়ালি’র সাথে ছলনা করা হলো। তাকে ধর্ষণ করা হলো। অমুক পুরুষের ফাঁসি চাই। অনেকে বলেন, আজন্ম ক্যানিবালদের মাথাতেই ফাঁসির মতন চিন্তা প্রথমে আসে। আমি বলি না। বলতে পারেন, সাহস পাই না। আবার আমার বিরুদ্ধেও ঝাণ্ডা হাতে কেউ দাঁড়িয়ে যায়।

বাদ দিন, আবার গল্পের বিষয়ে আসি। নারী-পুরুষের আলাপ-পরিচয়। তারপর ‘দৈহিক আত্মীয়তা’। তারপর ধর্ষণ এবং নারীবাদের ঝাণ্ডা। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে আমার দু’একটা প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, নারী পুরুষ দুজনেই শিক্ষা-দীক্ষা, পদ-পদবীতে সমান। দুজনের সম্মতিতেই আলাপ-আলোচনা, চা-কফি এবং পরিণতি দৈহিক আত্মীয়তা। কথিত নারীবাদ, যাকে আমি ভয়ে ভয়ে ‘ঝাড়িবাদ’ বলি। ভয়ে ভয়ে এ কারণেই, কখন আবার তেড়ে এসে ঝেড়ে দেয়। আচ্ছা, বুদ্ধিতে যোগ্যতায় যদি দুজনেই সমান হয়, তবে একজন আরেকজনকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ‘ইয়ে’ করে কীভাবে? ধর্ষণ শব্দটার সাথে জবরদস্তির যোগসূত্রটা অবশ্যম্ভাবী। পরস্পরের ফ্ল্যাটে যাতায়াত, চা-কফি, লং আর রং ড্রাইভের সাথে এই যোগসূত্রটা প্রতিষ্ঠিত হয় না। হওয়াটা সম্ভব নয়। তাহলে ধর্ষণ? কথিত নারীবাদী বা ‘ঝাড়িবাদী’দের মতে, হালের সভ্যকালে নারী-পুরুষ উভয়েই সমান, তাহলে ‘দৈহিক আত্মীয়তা’ যদি দোষের হয় তবে সে দোষে দুষ্ট দুজনেই। নয় কি? তাই যদি না হয়, তবে ‘ঝাড়ি’ থুরি তাদের ‘নারীবাদ’টাই মিথ্যা হয়ে দাঁড়ায়।

এ বিষয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়ের পর্যবেক্ষণের কথা বলি। যার সংক্ষিপ্ত রূপ হলো, ‘যদি প্রাপ্তবয়ষ্ক বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো নারী পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে ভুলিয়ে বা ছলনা করে ধর্ষণের অভিযোগ করেন, তবে তাকে ধর্ষণ হিসাবে গণ্য করা যাবে না।’ তারপরেও যদি সো-কল্ড নারীবাদীরা ঝাণ্ডাবাজি করেন, তবে তাদের ‘নারীবাদে’র না পড়া মূল তত্ত্বটা অবশ্য পড়া উচিত।

পুরুষতন্ত্রের জপ করা হয় কথায় কথায়। এখন আসি পুরুষতন্ত্রের আলাপে। আচ্ছা উপরের গল্পটা যদি উল্টো হতো। ওই পুরুষকে যদি সেই নারী ছেড়ে চলে যেতেন। তাহলে কী হতো? ওই পুরুষ কি ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়াতে পারতেন এই বলে যে, তাকে বলাৎকার করা হয়েছে? আইন কি তার কথা শুনতো? থানা-পুলিশ তো তাকে তামাশার পাত্রে পরিণত করতো। মানুষের কাছে সে হতো ক্লাউনসম। তার পক্ষে কেউ ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়াতো না। তাদের ভয় রয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে ‘ঝাড়িতন্ত্রে’র হাতে নিগৃহিত হবার। এ কারণেই লিখার শিরোনামটা ‘পুরুষতন্ত্র বনাম ঝাড়িতন্ত্র ও আপেক্ষিক নারীবাদ’।

এই যে সবাই রুদ্রনীল ঘোষের কবিতা ও আবৃত্তি শেয়ার করছেন, তাতে কি দেখেছেন, পুরুষতন্ত্রের অবস্থা। ‘করোনার মাছ কাচি, বউয়ের শাড়ি ধুই, মাঝে মাঝে করি আমি রান্না’, শুনেছেন এটুকু। দেখুনতো এখন পর্যন্ত যত জোক’স তৈরি হয়েছে, তা সবই পুরুষের ওপর স্ত্রীর অত্যাচারকে ঘিরে। এমনকী ‘নারীবাদী’রাও কল্পিত গোঁফে তা দিয়ে তা উপভোগ করেছেন। যেনো তাদের প্রভাবের কথা জানিয়ে দিয়েছে এসব জোক’স। বাড়িতে বাড়িতে নারীদের উচ্চকণ্ঠের বিপরীতে পুরুষের মিনমিনে আওয়াজটাই স্বাভাবিক বিষয়। আর এর ব্যতিক্রম ঘটলেই সে আওয়াজ পৌঁছে যায় বাড়ির বহিরাঙ্গনে। ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। আমিও দাঁড়াই। কিন্তু সে দাঁড়ানোটা ভিন্ন। আমি নারীর ওপর পুরুষের অত্যাচার হিসেবে দাঁড়াই না। দাঁড়াই মানুষের ওপর অত্যাচার হিসেবে। একজন নারী গৃহকর্মীর ওপর গৃহকত্রীর অত্যাচারের বিপক্ষে যেমন দাঁড়াই। দাঁড়াই একজন কর্মীর ওপর মালিকের অত্যাচারের প্রতিবাদে। তেমনি দাঁড়াই নারীর প্রতি হওয়া অত্যাচারের বিপক্ষে। কারণ, আমি নারীকে মানুষ হিসেবে জানি।

নারীবাদটা আপেক্ষিক কেনো, কথাটা বলা জরুরি। সারাবিশ্বের নারীবাদের সাথে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদের বেসিক পার্থক্য রয়েছে। আপনারা দেখেন তো বিশ্বের কতগুলো লিভ টুগেদার করা জুটির নারী অংশ ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে। তেমন উদাহরণ দিতে পারবেন না। ‘ঝাড়িতন্ত্রে’র ‘ঝাড়িবাদী’রা অবশ্য ‘মিটু’র কথা বলবেন। ‘মিটু’র শিকার কারা, হিসাব করে মিলিয়ে দেখুন, বেশিরভাগই উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী। এদের অধিকাংশের ক্যারিয়ার কিংবা বয়স পড়তির দিকে। নিজেদের আলোচনায় রাখতেই মূলত এসব প্রচারণা। তাদের যদি প্রশ্ন করেন, ক্যারিয়ার যখন তুঙ্গে, মিডিয়া থেকে আইন সবই আপনাদের পক্ষে তখন ‘মিটু’ কোথায় ছিলো? বেশিরভাগেরই আওয়াজ পাবেন না, যা পাবেন তাও ফাঁকা।

এসব ‘মিটু’ওয়ালি আর ‘ঝাড়িবাদী’র তুলনায় আমি প্রকৃত নারীবাদী ভাবি আমাদের সাধারণ নারীদের। আমাদের পোশাক ও গৃহকর্মী, দিনমজুর, বস্তিবাসী কিংবা গ্রামীণ নারীরা। যারা মাঠে পুরুষের সাথে সমানতালে কাজ করে। আমার বাসায় কাজ করেন যে নারী, তাকে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম তার জীবন সম্পর্কে। কোনো সাত-পাঁচ নেই, সোজা বললেন, ‘আগের মরদরে তালাক দিছি, মদ-গাঞ্জা খাইয়া মাইরধোর করতো। অহনের জন্ ভালা। কাজ-কাইম করে।’ কী আশ্চর্য সরল স্বীকারোক্তি। ‘ঝাড়িবাদী’দের মতন কথার প্যাঁচ নেই, নেই কোনো অভিযোগ। পছন্দ হয়নি, পোষায়নি তালাক দিয়েছি, একেবারে সোজা কথা। আর আমাদের ‘ঝাড়িবাদী’রা এমন অবস্থায় করতো ‘ঝাণ্ডাবাজি’। প্রকৃত নারীবাদী’রা যদি এদের কীর্তি-কাণ্ড জানতেন তাহলে এদের কপালে জুটতো ‘আন্ডাবাজি’ তাও পচা।

নারীবাদ হলো মুক্তির মন্ত্র। আমি নারীবাদ আর ক্রীতদাসবাদে কোনো পার্থক্য দেখি না। দুটোই মুক্তির কথা বলে। মানুষের মুক্তি। পাওলো ফ্রেইরির, মানসিক মুক্তি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার কথিত নারী বা ‘ঝাড়িবাদ’ পুরুষের সমকক্ষ হবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের মানুষ হবার দরকার নেই, পুরুষ হলেই চলে। অথচ তারা ভুলে যায়, অনেক পুরুষই মানুষ নন। সেই সব পুরুষেরাই, মানুষের ওপর অত্যাচার করে। হতে পারে তা স্ত্রী বা প্রেমিকার ওপর অথবা তরুণ গৃহকর্মীর প্রতি। ধর্ষকামী হতে হলে পুরুষ হতে হবে এমন কথা নেই, নারীও হতে পারে। ইউরোপে অসংখ্য স্কুল শিক্ষিকার চাকরি চলে গেছে বালক ছাত্রদের যৌনতায় বাধ্য করার জন্য। দক্ষিণ এশিয়ার নারী তথা ‘ঝাড়িবাদ’ নারীবাদের এসব মূল তত্ত্ব থেকে অনেক দূরে। এজন্যেই এদের ‘ঝাড়িবাদী’ বলে ডাকা। এদের কাজ কাউকে ‘ঝেড়ে’ দেয়া। এদের আস্ফালন হলো কলতলার ঝগড়ার মতন। অশ্রাব্য এবং অসভ্য।

কাকন রেজা। লেখক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। জন্ম ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৬ মার্চ, বাংলাদেশে, ঢাকার উত্তর শাহজাহানপুরে। তারুণ্যের দিনগুলো পাড়ি দিয়েছেন লেখকের নিজ জেলাশহর শেরপুরে। তাঁর বাবা মরহুম আব্দুর রেজ্জাক ছিলেন, একাধারে লেখক, সাংবাদিক ও রাজনীতিক। মা জাহানারা রেজ্জাক এক সময়ে ছিলেন...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ