পুড়ছে হিজাব কাটছে চুল

মেহেরুন্নেছা
প্রবন্ধ
Bengali
পুড়ছে হিজাব কাটছে চুল

পারসিক সংস্কৃতির দেশ ইরানের মেয়েরা সমানে তাঁদের হিজাব পুড়িয়ে ফেলছেন, চুল কাটছেন। যেন তারা পুরুষতন্ত্রের কোলে থাকা ধর্মকে পুড়িয়ে-কেটে ধ্বংস করতে চান। কি ঘটেছে সেখানে? কেনো আজ ইরানের নারীরা এতোটা উত্তাল? কেনো আজ তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের ঝড় তুলছেন?

ঘটনাটি সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখের। ‘ঠিকভাবে হিজাব না পরার কারণে’ ইরানের ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল ইরানের নৈতিকতা বিষয়ক পুলিশ (মোরালিটি পুলিশ)। বলা চলে একটি অতীব হাস্যকর কারণে মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তিনি নাকি হিজাব দিয়ে তাঁর মাথার চুল পুরোপুরি ঢাকেন নি। তবে অভিযোগ রয়েছে, আমিনিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ভ্যানে তোলার সময় বেধড়ক মারধোর করা হয়। তাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

এরপরই ঘটে যায় মারাত্মক ঘটনাটি। পুলিশি হেপাজতে শুক্রবার আমিনির মৃত্যু হয়। ফুঁসে ওঠে ইরানের মেয়েরা। এ যেন শুধু মাহসা আমিনির মৃত্যু নয়; সমগ্র ইরানে বোরকা ও হিজাবের অন্ধকারে থাকা সকল নারী অবয়বগুলোর মৃত্যু! ইরানের সাধারণ মানুষও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আমিনির জানাজার সময়ে বিক্ষোভ করেছেন তাঁরা। ইরানের সর্বত্র বিস্ফোরন্মুখ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অবতারণা ঘটেছে। এতোদিন ইরানে পর্দার কুঠরিতে যে নারীদের বসবাস ছিল এরা যেন তারা নয়। পর্দার অন্তরালে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কেবল নারীদের শরীরখানাই আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, বিহঙ্গের মতো উড়তে চাওয়া নারীর কোমল মনটাকে নয়। ফলে আজ তাঁরা ঝাঁকেঝাঁকে নেমে এসেছে প্রতিবাদের ঝড়সম হয়ে। তাঁদের হিজাব পোড়ানো এবং চুল কেটে ছোট করার ভিডিও সারা বিশ্বে ভাইরাল। জগত দেখছে, ইরান ধর্মের নামে কতটা অবদমিত জীবন যাপনে নারীদের বাধ্য করে। সভ্যতার নাম দিয়ে কতটা অসভ্যতা পুরুষ এবং পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র নারীদের উপর চাপিয়ে দিতে পারে এ যেন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ!

ইরানের আইনে এটাই বলা আছে, সাত বছরের বেশি বয়সী নারীদের ধর্মীয় হেডস্কার্ফ (হিজাব) পরা বাধ্যতামূলক।

উল্লেখ্য, ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি গত ৫ জুলাই মেয়েদের জন্য নতুন পোশাক বিধি জারি করেছেন। মহিলারা কী কী পোশাক কীভাবে পরতে পারবেন সেই তালিকা দেওয়া হয়েছে সেখানে। এরপর থেকেই পোশাক বিধির অন্যথা হলেই জরিমানা, গ্রেপ্তার বা তীব্র তিরস্কারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে মেয়েদের। এই আইন নিয়ে ইরানের সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্ট মাসিহ আলিনেজাদ টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করে বলেছেন, ‘সাত বছর বয়স থেকে আমরা যদি হিজাব না পরি, তাহলে আমরা স্কুলে যেতে পারব না, চাকরি করতে পারব না। আমরা এইসব লিঙ্গবৈষম্যমূলক শাসনে বিরক্ত।’

যদিও পুলিশ নির্যাতন করে আমিনিকে মেরে ফেলেছে বলে অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই পোস্ট দিচ্ছেন ; তবে পুলিশ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। তারা বলছে, অন্য আটক নারীদের সঙ্গে অপেক্ষা করার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

ইরানের শরীয়া আইন মোতাবেক নারীরা লম্বা-ঢিলেঢালা পোশাক পরতে বাধ্য। সেইসাথে তাঁদের চুলও ঢেকে রাখতে হয়। এ আইন যারা অমান্য করে তাঁদের জীবনে নেমে আসে নানা দুর্ভোগ, যেমন পুলিশের জরিমানা, গ্রেপ্তার, তিরস্কার ইত্যাদি। কিন্তু ইদানীং ইরানের নারীরা পর্দার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলেন।

পাঠক, এবার আসুন, ইরানের রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে একটু পেছন ফিরে তাকাই। ইরানে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর। তার আগে পারস্যরা প্রধানত জরস্ট্রিয়ান ধর্মের অনুসারী ছিলেন। ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে সেখানে অভিজাত ও শহরের অধিবাসীরা সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে গ্রামের কৃষক মধ্যবিত্তরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, পারস্যদের অধিকাংশরাই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। আর এখন বর্তমানের ইরান শিয়া ইসলামের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত।

যখন থেকে ইরানে ধর্ম শেকড় গাঁড়তে শুরু করল তখন থেকেই সেখানে শুরু হলো নারীদের নিয়ে হোলিখেলা। এসবের সর্বশেষ বলি মাহসা আমিনি। তাঁর মৃত্যুতে এই যে প্রতীকী প্রতিবাদ চুল কাটা, হিজাব পোড়ানো ; এ শুধু ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ নয়। এটি সভ্যতার নামে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির অভিনব দাবী। তাঁদের স্লোগানে রয়েছে ‘অত্যাচারীর মৃত্যু হোক’, ‘নারী’, ‘জীবন’, ‘স্বাধীনতা’ ইত্যাদি।

এখন প্রশ্ন হলো এই অত্যাচারী কে? পুরুষতন্ত্রের কবলে থাকা ধর্ম? নাকি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে যে রাষ্ট্র সে? এই প্রশ্নের উত্তর পাঠকের চিন্তা ও বিবেচনাপ্রসূত বিবেকের গভীরতার উপর ছেড়ে দিলাম।

বলা হয়ে থাকে, অনেক নারী স্বেচ্ছায় হিজাব পরতে ভালোবাসেন, নিজেকে অবগুণ্ঠনে রাখতে চান। এক্ষেত্রে যে প্রসঙ্গটা সম্মুখে চলে আসে তা হলো, নারী কতটা নিজের শরীরকে আড়াল করবে? এর কি কোনো নির্দিষ্ট সূচক আছে? সাধারণভাবে বলা যায়, লজ্জা নিবারন ও নিজেদের শালীনভাবে উপস্থাপনই সভ্যতার পরিচায়ক। কিন্তু পুরুষতন্ত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে অন্দরমহলে পুরতে পুরতে, নারীর শরীরকে ঢাকতে ঢাকতে, সীমা লঙ্ঘন করে পোশাকের বহর বর্ধন করতে করতে কিম্ভূতকিমাকার আলখাল্লায় পরিণত করেছে। নারীর পরিধেয় পোশাক নিয়ে এখানেই গোল বেঁধেছে প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে প্রগতিশীলদের। নারীর পোশাক দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পুরুষের চাওয়া সীমাহীন। তারা বুঝে উঠতে পারছেনা পর্দা নিয়ে নারীকে কোন পর্যায়ে যাওয়ার পর বলা হবে, ওগো নারী, এবার তুমি থামতে পারো! ধর্মের অন্ধত্ব এবং পুরুষতন্ত্র ভুলে গেছে, পর্দা দিয়ে নারীর শরীর ঢাকার চেয়ে পুরুষের দৃষ্টি স্বাভাবিক ও কলুষমুক্ত করাটাই অধিকতম জরুরি। পুরুষের চোখ ঢাকার সময় এখন এসে গেছে। কারণ, নারীকে অবগুণ্ঠনে রেখেও পুরুষের স্বস্তি নেই। এরপরেও তারা নারীকে বেধড়ক মারধোর করে, পিটিয়ে মেরে ফেলে।

নারী কি পোশাক বেছে নেবে সেই স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার নারী রাখে। আদি মানব-মানবীর কোনো পোশাক ছিলনা।তারপর জৈবিক কারণেই তারা গাছের পাতায় লজ্জা ঢাকতে শিখলো। তারও বহুপরে মানব সভ্যতায় এলো পোশাক। সর্বশেষ পৃথিবীতে এলো পোশাকের নান্দনিকতা ও বৈচিত্র্যময়তা। পোশাকের এই শৈল্পিকতাকে ধর্মের হাত ধরে সর্বশেষ গ্রাস করলো বোরকা ও হিজাব। এই যে আদিম নগ্নতা হতে শুরু করে আজকের ঝলমলে পোশাক…. এই দীর্ঘ বিবর্তনে নারীর প্রতি সহিংসতা আদৌ কি কোনো কালে কমেছে? বোরকা ও হিজাব পরলেই কি নারী সহিংসতা থেকে রেহাই পায়? মোটেও না! আমরা দেখেছি, কিভাবে বোরকা পরেও নারী ধর্ষিত হয়, হিজাব পরেও নারী নিপীড়নের শিকার হয়। এরপরেও কি বলবেন, নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ তার পরিধেয় পোশাক?
এরপরেও কি আপনারা ধরে নেবেন, নারী অন্দরমহলে থাকলেই সমাজ সুস্থির থাকবে? শুনুন, ইতিহাস কিন্তু তা বলে না! ইতিহাস বলে, সমস্যা নিহিত পুরুষের উগ্র ও লোলুপ দৃষ্টিতে, সমস্যা নিহিত পুরুষের হায়েনার মতো মনোভাবে, সমস্যা পুরুষের যৌন অক্ষমতায়, সমস্যা পুরুষের অশিক্ষা ও বোধহীনতায়, সমস্যা পুরুষের কুরুচিপূর্ণতা ও বিকৃত মানসিকতায়, সমস্যা পুরুষের সঠিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে।

একথা ঠিক যে, স্বল্প বসনের উন্মাদনা কিংবা হিজাব-বোরকার উন্মাদনা কোনোটাই সভ্য ও রুচিশীলতায় ইতিবাচক নয়। এসবে পৃথিবীতে নারীর মুক্তি মিলবেনা। কেবল সহজ-স্বাভাবিক-রুচিশীল পোশাক, বোধ-জ্ঞান-প্রগতিশীলতা এবং মুক্ত চিন্তা আনতে পারে নারী মুক্তি। রাষ্ট্র ও সমাজকে পুরুষের ভেতর সেই জ্ঞানের বীজ প্রোথিত করতে হবে যা তাকে একজন নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে সহায়তা করবে, নারীর প্রতি তাঁর জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটাবে। মানব জাতিকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে নারী-পুরুষের এমন সহাস্য নান্দনিক ভাবনাই তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবে।

মেহেরুন্নেছা। গল্পকার ও শিক্ষক। জন্ম ও বাস বাংলাদেশ। পেশাগত জীবনে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ