পেইজ থ্রি

এইচ বি রিতা
আত্মজীবনী, প্রবন্ধ
Bengali
পেইজ থ্রি

ক্ষনস্থায়ী এ জীবন কত বিচিত্র বহু রঙে ভরপুর, সে রঙও আবার সময়ের সাথে মসৃনতা হারায়। গতকালের লাল টুকটুকা ফুটন্ত গোলাপটি, আজকের বিষাদে ভরা ধূসর গোধূলিলগ্ন ছুঁয়ে যায়। কখনো বা বেদনায় নুইয়ে পড়ে নীলপদ্ম। আজকাল তুচ্ছ অনেক আবেগে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। পুরনো দিন মনের আকাশ ছুঁয়ে অভিমানের বর্ণমালা সাজায় ছায়ানীড়ে। জানালার ফাঁকে জোৎস্নার আলো এসে দখল করে নেয় কফির কাপের টলটলে উষ্ণ জল। রোদ পানি আলোহীন বৃক্ষটিকে নেতিয়ে পড়তে দেখি।মনে প্রশ্ন জাগে, যে বৃক্ষটি বাগানটিকে ছায়া দিয়ে গেল এতগুলো বছর, তারও কি তবে ভালবাসা-যত্নের অভাব ছিল?

আজ থেকে বারো বছর আগে নিউ ইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহরে কোনও বাঙালি তরুণীর পক্ষে একা চারজনের সংসার টানা, সহজ ছিল না। আর্থিক সংঙ্কট বড় একটা ব্যপার ছিল, এখনো আছে। তারউপর, সেটা যদি হয় একক মা, তাহলে আরো সমস্যা।বিশ্বের যে কোন দেশেই আমরা থাকি না কেন, আমরা যত আধুনিকই হই না কেন, এখনো আমাদের বাঙালি সমাজে একজনএকক মা মানেই নানান প্রশ্ন। একক মা মানেই যেন ব্যর্থতা। মাথার ওপর বটবৃক্ষ অর্থাৎ পাশে একজন পুরুষ ছাড়া সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন যেন একেবারেই অসম্ভব। আমরা বুঝতে ব্যর্থ হই, প্রত্যেক নারীর জীবনে একজন পুরুষের ভূমিকা অপরিহার্য হলেও একজন পুরুষ ছাড়াও আমরা সাফল্য অর্জনের ক্ষমতা রাখি। সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে একজন মা-ই যথেষ্ট।

আমি ‘বাঙালি’ উল্লেখ করেছি কারণ বাঙালি নারীর অধিকার, স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠা, সাফল্য এবং অর্জন সম্পর্কে আমার অনেককিছু বলার আছে। আমরা বিদেশে আছি বলে আমাদের মধ্যে অনেকেই একক মা হিসাবে এগিয়ে যেতে পারছেন। সর্বোপরি, আমাদের এখানে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ রয়েছে এবং আমাদের এখানে সামাজিক সংঘাত অন্যের তুলনায় কিছুটা কম।এখানে আমরা স্বাধীনতার সাথে এগিয়ে যেতে পারি। তবে যারা এখনও বাংলাদেশে থাকেন তাদের পক্ষে একক মা হিসাবে বেঁচে থাকা পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, সংবেদনশীল সব ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জপূর্ণ।

তবে, একক মা হিসাবে বিরুপ দৃষ্টিভঙ্গিতে পড়া এবং আর্থিক সংকট সর্বত্র বিদ্যমান। বিশেষ করে, যারা ন্যূনতম মজুরিতে নিউইয়র্ক সিটিতে কাজ করেন তাদের ক্ষেত্রে একক মা হিসাবে একাধিক সদস্য নিয়ে পরিবার পরিচালনা করা খুব কঠিন। দেশ থেকে স্কুল-কলেজ পাস করে এ দেশে আসা ইমিগ্র্যান্টদের মধ্যে কম নারীই রয়েছেন যারা উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বিদেশে উন্নত চাকরি করছেন। আমি সেই কম সংখ্যকদের একজন। নিউইয়র্কের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে সরকারী চাকরি থাকায় আমাকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়নি। তবে, বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গিতে পড়তে হয়েছে এবং লড়াই করে গিয়েছি সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। আমি বলব, নিজেকে একটা প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বের করে আনা এবং ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার জন্য ভীষণ সাহসের ব্যাপার ছিল আর সেটা করতে আমার আত্মনির্ভরশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে কাজ করেছে।

আমাদের সমাজে এখনো অনেক নারীরা আত্মনির্ভরশীল নন বলে পরিবার বা ব্যক্তিজীবনে নিজ মতামত বা সিদ্ধান্ত নিতে হিমসিম খান। বিশেষ করে ডিভোর্সের বেলায় কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে ‌অনেকেই সাহস পান না। তাই পরিবারে অন্যায়কে মেনে নিয়েই তাদের চলতে হয়। এর আরো অনান্য কারণগুলোর মধ্যে থাকতে পারে পরিবার, সমাজ, সাংস্কৃতিক নীতি-নিয়ম, বিশ্বাসভঙ্গের ভয়, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, পারিবারিক মূল্যবোধ। তবে, একটা মানুষের আত্মবিশ্বাস‌ অবশ্যই তার শিশুকাল থেকে পরিবারের মাধ্যমেই বৃদ্ধি পায়।

যেহেতু সমাজ বলতে, এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে এবং মানুষের ক্ষেত্রে, একাধিক ব্যক্তি একত্র হয়ে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ম-কানুন তৈরি করে একত্র বসবাসের একটি অবস্থাকে বুঝায়। তার মানে হল এই সমাজের অংশ বলতে আমি, আপনি এবং আমরা সবাই।  এই সমাজ গঠনে আমাদের ঐক্য, চিন্তা-মননশীলতা, দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার-বিবেচনাবোধ, সহনশীলতা এবং সভ্যতা বৃদ্ধি এবং গঠনে পরিবার বড় একটা ভূমিকা রাখে বলে মনে করি। কেননা, পরিবার থেকে আমরা ভাবতে ও শিখতে শুরু করি।

মানব জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই পৃথিবীতে কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক ব্যবস্থা চালু ছিল। পরিবার ছাড়া মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না, বিশেষ করে আমাদের বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে পরিবারের ভিত খুব পোক্ত। ব্যক্তিজীবন ও সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতিতে পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। আবার, পারিবারিক জীবন যদি বিপর্যস্ত ও নড়বড়ে হয়, তাহলে আমাদের ব্যক্তি-সমাজ জীবনে নানা অশান্তি ও উপদ্রব সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, একটি সমাজ গঠনে ইতিবাচক পরিবার এবং একটি স্বাস্থ্যকর চিন্তাভাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিবারের কথা আসলেই নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ে যায়। আমার পরিবারটি আসলে দেখতে কেমন ছিল? মন্দ ছিল না।আনন্দময় পরিবারই ছিল আমার। তবে কিছু কিছু পারিবারিক নিয়ম-নীতি এবং বিশ্বাস তখন কোন প্রশ্নের জন্ম না দিলেও আজ দেয়।

কলাপাতায় সংসার পাতার সময় বয়স ছিল আঠারোর নীচে। টেলিফোনে সব হলেও আমেরিকার মাটিতে উড়াল দিতে ভিসা-বিমান দুটোই লেগেছে। এত তাড়াতাড়ি উড়ার শখ জাগলো কেন? সেটা অন্য এক গল্প! এটা নিয়ে পরে একটা আলোচনা হতে পারে আবার নাও হতে পারে।

আমাদের সমাজে বিবাহ মানেই নারীর পিতামাতার থেকে বিচ্ছেদ। স্বামী, শাশুড়ি এবং তাদের বাড়ি একটি মহিলার আসল আবাস হয়ে ওঠে। বিয়ের সময় প্রত্যেক মেয়েকে বলা হয়, ‘তোমার স্বামীর বাধ্য হও এবং আমরা তোমার কেউ নই, স্বামীরবাড়ির লোকেরাই এখন তোমার আপনজন।’ আমাকে একই কথা বলা হয়েছিল। আর তাই সংসার জীবনে সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পিতামাতাকে কখনও কিছু বলা হয়নি আমার। বলার অপেক্ষা রাখে না, বলা যায় সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।

যদিও পারিবারিক, সামাজিক সচেতনতা আজ সময়ের সাথে কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ছোটকালে আমি একটি ভিন্ন চিত্র দেখেছি।আজ আমাদের পরিবারের বাচ্চাদের নির্দ্বিধায় কথা বলার অধিকার এবং সুযোগ রয়েছে, তবে আমার শিশুকালে সেই সুযোগটি ছিল না। ভাববেন না যে আমাদের সমাজে এখন নারীরা তাদের সম্পূর্ণ অধিকার বা স্বাধীনতা বহন করছে। একদমই না। বলা যায় সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে।

আমাদের একটি যৌথ পরিবার ছিল। আমি দেখেছি আমার স্বামীহারা বাক প্রতিবন্ধি ফুপু তার চার ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়েআমাদের সাথে বাস করছেন। সম্ভবত প্রতিবন্ধিতার কারণেই তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন। তারপরে আমার বাবা তার বোন এবং তার বাচ্চাদের ভার নিয়েছিলেন। আমার দাদী তখন বেঁচে ছিলেন। দাদীকে দেখেছি মেয়ের তখনকার পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে কত দুঃশ্চিন্তায় থাকতেন।

আমি যখন মিডল স্কুল শুরু করি, তখন আমার বড় বোন দুটি সন্তান নিয়ে বিধবা হন। তিনিও এক সময় আমাদেরপরিবারের অংশ হয়ে যান। শেষ অবধি আমার নানীও আমাদের পরিবারে যোগ দেন। কারণ নানীর সম্পদ বলতে দুই মেয়ে ছিল। আমার মা এবং ছোট খালা। আমার মা ছাড়া তাকে দেখার কেউ ছিল না। আমার মা ছিলেন সচ্ছল পরিবারের বউ, খালা ছিলেন অসচ্ছল পরিবারের অংশ।

আমাদের পরিবারে অনেক কাজের লোক ছিল আমাদের দেখাশোনা করার জন্য। বাবার ব্যবসা, ফুলের বাগান এবং গবাদি পশু যত্নের কারণে আমাদের পরিবারে অনেক কর্মচারীও ছিল। সব মিলিয়ে, যৌথ পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি।বর্তমানে এর সংখ্যা আরও বেশি। ছোটবেলা দেখেছি আমাদের পরিবারে সবাই এক সাথে বসে খাওয়া দাওয়া করতো। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতো। একে অন্যের বিপদে বিচলিত হতো যা এখন অনেক পরিবারে দেখা যায় না। বলা যায় যৌথ পরিবার এখন সময়ের দাবীতে অনেকটাই বিলুপ্ত।

আমাদের বাড়ির কাজের লোকদের জন্য সমপরিমান খাদ্য, চিকিৎসা, যত্ন, বাসস্থান সরবরাহ করা হতো। তবে, একটা বিষয় আমার কখনোই ভাল লাগতো না, তা হল, তারা কখনোই আমাদের পাশে বসে খেতো না। উন্নত কাপড় পরিধান করলেও আমাদের মত একই রকমের কাপড় তারা কখনো পরিধান করার অনুমতি পেতো না। তাদের কাপড় থাকতো ভিন্ন রঙের ও ডিজাইনের। তারা সব সময় রান্না ঘরে কিংবা নিজ ঘরে বসে খেতেন।

আমি যখন এখনো দেশে যাই, কাজের মানুষগুলোর পাশে বসি, কথা বলি, খাই তখন আমার আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের কারোকারো চোখে বিস্ময় জাগতে দেখি। কাজের মানুষগুলো সারাদিন পরিশ্রম করেন অন্যের বাড়িতে। বিনিময়ে বেতনসহ সকল প্রকার যত্ন পেলেও, কোন না কোন ভাবেএই যে পৃথকীকরণ এবং শ্রেণি বৈষম্য, এটা আমাকে খুব পীড়া দেয়।

এই পৃথকীকরণ ও বৈষম্য শুধু আমার পরিবারেই নয়, বাংলাদেশের প্রতিটা পরিবারে আছে। বরং এমনও কিছু পরিবার আছে যেখানে কাজের মানুষদের মারা হয়, পুড়িয়ে দেয়া হয়, পর্যাপ্ত খাদ্য-চিকিৎসা এবং যথেষ্ট পারিশ্রমিক দেয়া হয়না। সে তুলনায় বলা যায়, আমার পরিবার অনেকটাই প্রশংসা পাবার মত।

সে সময়য়ের পরিবারগুলোতে ছেলে এবং মেয়ে সন্তানদের মধ্যে স্বাধীনতা, বিভিন্ন সুযোগ ভোগ করা নিয়েও একটা বিরাট পার্থক্য ছিল। এর ব্যাতিক্রম ছিল না আমার পরিবারেও। ছেলেরা একা বাইরে যেতে পারতো, সিনেমা হলে যেতে পারতো, প্রমের সম্পর্কে জড়াতে পারতো, বাড়ির ছাদে বসে বিকেলের আকাশ দেখতে পারতো। কিন্তু মেয়েদের বেলায় এসবের অনুমতি ছিল না। ছেলে-মেয়ের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্কে আমার পরিবারে কোন সমস্যা ছিল না, আমি নিজেও ছেলে-মেয়ে উভয় বন্ধুদের সাথেমিশেছি। তবে বেশীর ভাগ পরিবারগুলোতেই এই নিয়মগুলো নির্ধারিত ছিল। যদিও সময়ের সাথে এখন অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে, তবে একই নিয়ম এখনো আমাদের বহু পরিবারে বিদ্যমান রয়েছে।

পরিবার অধিকারের কথা যদি বলি, তবে শিশু বয়সে মা-বাবার অধীনে থাকা আমাদের কোন অধিকারই ছিল না। মূলত কোন পরিবারই তখন শিশু অধিকারের সংজ্ঞাই জানতেন না। শিশুদেরও যে পরিবারে মত-অনুভূতি প্রকাশের বা সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে, তা সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই ছিল না। শিশুর যত্ন বলতে তারা বুঝতেন খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা দেয়া এবং উন্নত পড়াশুনার জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা করা। একটা শিশুকে সব সময়ই জোরপূর্বক পড়াশুনায় বাধ্য করা হতো। একটা শিশু কতটুকু ধারণ করার ক্ষমতা রাখে বা তার দুর্বলতা কোন বিষয়ে, তা বিবেচ্য ছিল না। আমরা এভাবেই মুখস্ত বিদ্যায় স্কুলে পড়াশুনা সম্পন্ন করেছি। সৃজনশীল কোন শিক্ষা পদ্ধতি তখন ছিলনা, তবে বর্তমানে আছে।

পরিবারে স্বাধীনতা-অধিকারের বেলায় নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতায় বেড়ে উঠা মেয়ে শিশুগুলো যখন পরবর্তিতে নতুন জীবনে প্রবেশ করে, তখন তারা নিজ স্বাধীনতা এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হিমসিম খায়। কিংবা বলা যায়, নিজ স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ে তারা ভীত হয়। কারণ ছোট থেকেই তারা নিজের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারেনি।

এরপর আসে সেই মেয়েটির সংসার জীবনের সংগ্রাম। পরিবারের সদস্যদের কথা অনুযায়ী তাদের স্বামী এবং শ্বশুর-শাশুড়ির অনুগত হয়ে যেতে হয়। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয় তারা। সব সময় তাদের চিন্তা থাকে, নতুন পরিবার সুখী করার। পরিবারের সদস্যদের যত্ন করা হয়ে উঠে তাদের প্রধান দায়িত্ব। পরিবারে যে কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে স্বামীই প্রধান হন।

একটা সময় মা দাদীদের দেখেছি, পরিবারের তাদের ভূমিকা বলতে ছিল-রান্না করা, বাড়ি-ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, সন্তান জন্মদেয়া এবং লালন-পালন করা, স্বামীর কথা মত চলা, শ্বশুরবাড়ির তদারকি করা। মত প্রকাশের অধিকার, শিক্ষা বা কর্ম অধিকার, ভোগ অধিকার, নিজ ইচ্ছা-আকাঙক্ষা, সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তাদের ছিল না, বলা যায় তারা এসব সম্পর্কে জানতেনই না। কিংবা জানলেও তারা সেগুলি নিয়ে ভাবতেন না। নারীর পড়াশুনা এবং চাকরির কথা তখন ভাবাই যেত না।এবং এই না ভাবাটাই ছিল স্বাভাবিক। আজও যখন আমার মাকে প্রশ্ন করি, ‘মা! সংসার জগতের বাইরেও যে তোমার নিজস্ব একটা জগৎ ছিল, তা কি কখনো ভেবেছো? মা তখন বলেন, ‘আমি তো সংসার জগতেই ভাল ছিলাম। কোন অভিযোগ তো ছিল না!’

হ্যাঁ। আমাদের মা-দাদীদের আমলে শুধুমাত্র খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, পেলেই তারা খুশী থাকতেন। তাই হয়তো এখনো সমাজের মানুষের মুখে শুনি, নারী যত কম বুঝে, ততই মঙ্গল। জেনারেশন গ্যাপ-অনেক পরিবর্তন ঘটায়। আমাদের মা-দাদীরা যতটুকুতে সন্তুষ্ট থাকতেন, আমরা তাতে সন্তুষ্ট ছিলাম না, তার থেকে আরো কিছুটা বেশি দাবি করেছি। আমাদের সন্তানদের দাবিও অনুরুপ আমাদের থেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে  এবং যাচ্ছে। আর তাই লিভ-টুগেদার বিষয়টিও আমরা এড়াতে পারছি না।

আমাদের সময়কালে বিয়ের আগে এক সাথে বসবাস করা অকল্পনীয় ছিল। আজ এক সাথে বসবাস না করে বিয়ে করা; অনেকটা অকল্পনীয়। বিয়ের আগে একসাথে বসবাস করা একটি বিরাট বিতর্কিত বিষয় হলেও আজকাল এর প্রবণতা আগের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু সুইডেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রেমিক-প্রেমিকারা বিবাহ ছাড়াই দম্পতি হিসাবে বেঁচে থাকার বিষয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছেন এবং অনুসরণ করছেন। এতে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। এই প্রবণতাটি অতীতে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হলেও নতুন প্রজন্মের কাছে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সম্পর্কটা পরীক্ষা করে নিতে একসাথে থাকা, সাধারণ একটা বিষয় হয়ে উঠেছে। আজ এই প্রবনতা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয়।

সময়ের সাথে পরিবর্তন এভাবেই আসে। তবে এই পরিবর্তনগুলো কেবল শহর এবং উচ্চ শিক্ষিত মহলগুলোতেই বিদ্যমান।বর্তমানেও মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলোতে বিয়ের পর একটা মেয়েকে পড়াশুনা এবং চাকরি করতে দেয়া হয়না। কারণ স্বামী এবং তার পরিবার ভাবেন, মেয়েদের বেশী সাফল্য অর্জনে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। অনেক পরিবারে ভাবা হয়, শিক্ষাএবং চাকরির কারণেই ডিভোর্সের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এই একুশ শতাব্দীর শূন্য দশকে দাঁড়িয়েও অনেক মেয়েরা বিয়ের পর পড়াশুনা সম্পন্ন করতে পারেন না। যদিও করে, চাকরি করার চিন্তাও তারা করতে পারেন না।

তুলনামূলকভাবে যদিও বাংলাদেশে নারীরা বর্তমানে শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছেন। তবে গ্রামীণ সমাজে এখনো মেয়েরা লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে এবং শিখছে ঘর-সংসারের কাজ। এখনো অনেক পরিবারে বিয়ের পর নারীদের দায়িত্ব বলতে পরিবারের যত্ন, স্বামীর কথা শুনা, শ্বশুরপক্ষের যত্ন ও সন্তান পালন করাতেই সীমাবদ্ধ। এখনো অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম নারীদেরও বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা হরণ করা হয়।

যুগের সাথে যদিও নারীর শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, নারী উপার্জন করতে শিখেছে, কিন্তু নারীরা কি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন? কিংবা অধিকার অর্জন করতে পেরেছে? নারীর স্বাধীনতা বা অধিকার বলতেই যদি আমরা বুঝে থাকি যে, স্বামী এক গালে থাপ্পড় দিলে তাকে পাল্টা অন্য গালে থাপ্পড় দেয়া বা মধ্যরাতে পুরুষের মত মদ্যপ হয়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলা, তবে বলব, আমাদের নিজ স্বাধীনতা ও অধিকারের সংজ্ঞা বুঝতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

যাইহোক, বলছিলাম পরিবারের কথা।আমি যে পরিবারে বড় হয়েছি তাতে আমি খুশিই ছিলাম। সম্ভবত তখন আমি শিশু বা কিশোরী হওয়ার কারণে, কিংবা বলা যায় তখন পুরো বিশ্বকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলাম বলে আমি যা পেয়েছিলাম তাই উপভোগযোগ্য মনে হয়েছিল।

আজ প্রায় মধ্য বয়সে এসে মৃত্যুর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমি আকাশে জীবনের ছবি আঁকতে চেষ্টা করি। আমার আত্ম জীবনী লেখার সাহস নেই, কারণ এতে অনেকগুলি অযাচিত দৃশ্য চিত্রিত হবে, যা বেদনাদায়ক। কেননা, কিছু সত্য পারিবারিক বিশ্বাস, সভ্যতা এবং সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও, বলতে হয়। লিখতে হয়।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ,…..