প্রতিবন্ধীদের রোলমডেল ফ্রিদা কাহলো

এইচ বি রিতা
প্রবন্ধ
Bengali
প্রতিবন্ধীদের রোলমডেল ফ্রিদা কাহলো

কোন কোন সময় আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, কোন কিছুই ঠিক হচ্ছে বলে মনে হয় না। মনে হয় যেন, এই তো সব শেষ! সামনে কেবল ‌অন্ধকার, আর কোন আলো নেই; ভোর নেই। হয়তো এমনই কোন আঁধারকে অস্বীকৃতি জানাতে আন্তর্জাতিকভাবে বহু তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রশংসিত উপন্যাসের লেখক ওআর ম্যালিং বলেছেন,

“আপনি যখন সমস্ত কিছুর শেষ প্রান্তে চলে আসবেন, তখন আপনাকে অবশ্যই দুটি জিনিসের মধ্যে একটি বিশ্বাস করতে হবে; হয় আপনার দাঁড়ানোর জন্য মাটি থাকবে। অথবা আপনার উড়ে যেতে ডানা গজাবে।”

ফ্রিদা কাহলো, একজন মেক্সিকান নারী যার শৈশবে পোলিও এবং একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ড এবং শ্রোণীর ক্ষতি সহ একাধিক অক্ষমতা ছিল, অথচ তিনি হার মানেনি, বরং খুঁজে নিয়েছিল বেঁচে থাকার ভিন্ন এক পথ! আর সেটা ছিল রঙ তুলির আঁচড়ে জীবন ও বাস্তবতার চিত্র আঁকা।

একাধিক শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে লড়াই করে বিশ্ববাসীর কাছে শিল্পকলা জগতের লুব্ধক শিল্পী হিসাবে পরিচিত ফ্রিদা কাহলো, তাঁর পুরো নাম ম্যাগদালিনা কারম্যান ফ্রিদা কাহলো ই ক্যালদেরন।

রঙ তুলির আঁচড়ে স্বপ্নকে না এঁকে বাস্তবতাকে আঁকা ফ্রিদা কাহলো শুধুমাত্র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মেক্সিকান চিত্রশিল্পীদের একজনই নন — তিনি একজন অবিসংবাদিত নারীবাদী আইকন হিসেবেও বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত।

ফ্রিদা কাহলো ১৯০৭ সালে জুলাইয়ের ৬ তারিখে মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা, উইলহেলম ছিলেন একজন জার্মান ফটোগ্রাফার যিনি ১৮৯১ সালে মেক্সিকোতে চলে আসেন। সেখানে তিনি ফ্রিদার মা মাতিলদের সাথে দেখা করেন এবং বিয়ে করেন। মাতিলদে ছিলেন স্প্যানিশ এবং আমেরিকান ভারতীয় পটভূমি থেকে আগত একজন।

ফ্রিদার মা মাতিলদে খুব ধার্মিক মহিলা ছিলেন এবং ফ্রিদার লালন-পালনে কঠোর ছিলেন। ফ্রিদা তাঁর মা’কে দয়ালু, সক্রিয় এবং বুদ্ধিমান হিসাবে গণনা করলেও, একটা সময় তাকে নিষ্ঠুর এবং ধর্মান্ধভাবে ধার্মিক হিসাবেও বর্ণনা করেছিলেন।

ফ্রিদা ছিল তাঁর বাবার খুব ঘনিষ্ঠ। বাবাকে সাহায্য করতে ফ্রিদা তার ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে দিনের ‌অনেকটা সময় কাটাতো। শিল্পকলার স্বাদটা ফ্রিদা সেখান থেকেই পেয়েছিল, এমনকি পারিবারিক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু অঙ্কন পাঠও নিয়েছিল, তবে সে আসলে এর বেশি কিছু ভাবেনি। পরিবর্তে, ফ্রিদা বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান দ্বারা মুগ্ধ হয়েছিল এবং একদিন একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।

অথচ, ডাক্তার না হয়ে ফ্রিদা আজ বিশ শতকের অন্যতম উজ্জ্বল এবং স্বতন্ত্র মেক্সিকান একজন চিত্রশিল্পী, যিনি আপোষহীন রঙ এবং উজ্জ্বল স্বভাবের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। চিত্রকর্মে তিনি পরিচয় বহন করা প্রতিকৃতি, মানবদেহ এবং মৃত্যুর মত থিম নিয়ে কাজ করে গেছেন। অনেকে তাঁর চিত্রকর্মের সাথে ব্যক্তিজীবনের সংযোগ খুঁজে পেলেও তিনি একটা সময় সেটাকে ‌অস্বীকারও করেছিলেন, এবং তিনি একজন পরাবাস্তববাদী হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছেন।

ফ্রিদার ‌স্বাচ্ছন্দময় স্বাভাবিক শৈশব বলতে জন্মের পরের কয়েকটা বছরই। তাঁর অক্ষমতার লড়াইয়ের শুরু সেই শৈশব থেকেই। ফ্রিদা পোলিওতে আক্রান্ত হয় ছয় বছর বয়সে, যার কারণে তাঁর দুটো পা সরু এবং ছোট হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনে ফ্রিদা লম্বা রঙিন স্কার্ট পরার জন্য সবার কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন- যা তিনি তার পা দুটো লুকানোর জন্য পরতেন।

পোলিওতে আক্রান্ত হবার কারণে, ফ্রিদাকে কয়েক মাস স্কুল ছুটি নিতে হয়েছিল। ‌অনেকটা সময় চিকিৎসার পর যখন সে ক্লাসে ফিরে যায়, তখন ক্লাসের অন্য বাচ্চারা তাঁর সাথে মিশতে চায়নি। তারা ফ্রিদার সরু ও ছোট পা নিয়ে বিদ্রুপাত্মক আচরণ করতে শুরু করে। কিন্তু শত প্রতিকূলতার মাঝেও ফ্রিদার একমাত্র ভরসা ও সাহস যোগানোর মানুষটা ছিল, তাঁর বাবা উইলহেলম। তিনি মেয়েকে ‌এই ‌অসুস্থ্যতা থেকে সেরে উঠতে সাহায্য করেন। মেয়েদের জন্য শারীরিক ব্যায়াম সেই সময়টাতে ‌অনুপযুক্ত মনে করা হলেও, উইলহেলম তার মেয়েকে বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। বাবার উৎসাহে ফ্রিদা স্বঘোষিত টমবয় হয়ে ওঠেন এবং তিনি সাঁতার, ফুটবল, বক্সিং এবং রেসলিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন।

ফ্রিদার বয়স যখন ১৮, প্রেমিকের সাথে একটি কাঠের বাসে করে ভ্রমণকালে তার জীবনের ভয়ানক দুর্ঘনাটি ঘটে।রাস্তার একটি গাড়ির সাথে তাদের বাসটির সংঘর্ষ হয় এবং একটি লোহার শিক তাঁর নিতম্বে ঢুকে, অন্য পাশ থেকে বেরিয়ে যায়। এই দুর্ঘটনায় ফ্রিদার মেরুদণ্ডের কলাম, কলারবোন, পাঁজর, পেলভিস, ডান পা’য়ের ১১টি জায়গা ভেঙে যায়। এবং তাঁর কাঁধটি স্থানচ্যুত হয়।

সেই দুর্ঘটনায় ফ্রিদা মরে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার হয়েছিলেন, তবে তাঁর মেরুদণ্ডের চিকিৎসায় তাঁর জীবনে ৩৫টি অপারেশন করাতে হয়েছিল, এবং দীর্ঘ নয় মাস ফ্রিদাকে হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয়েছিল। হাসপাতালের বিছানায় দীর্ঘদিন একা সময় কাটানো ফ্রিদা এক সময় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে ছুঁড়ে ফেলে, বাস্তবের রূপকে প্রতিকৃতি হিসাবে সাজাতে ব্যস্ত হন রঙ তুলির আঁচড়ে। ফ্রিদার দীর্ঘ পুনরুদ্ধারের পিছনের কারণ ছিল-তাঁর পেইন্টিং। বাবা-মা তাকে বানিয়ে দেন কাঠের ইজেল, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছবি আঁকার  মত সকল ব্যবস্থা করে দেন। বেশিরভাগ সময় তিনি ঘরের আয়নায় নিজেকে দেখে নিজের প্রতিকৃতি আঁকতেন। সেই থেকে শুরু তাঁর শিল্পী জীবনের পথ চলা। ফ্রিদা কাহলো, জীবনের শেষ দিনটি পযর্ন্ত শরীর ও মনের সাথে লড়াই করে একের পর এক এঁকে গেছেন তার জীবনের যন্ত্রনার  মহাকাব্য পরাবাস্তব ভঙ্গিমায়।

ফ্রিদা তার জীবনে ৫৫টি স্ব-প্রতিকৃতি সহ মোট ১৪৩টি চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন। নিজের স্ব-প্রতিকৃতি নিয়ে আঁকা সম্পর্কে কাহলো বলেছিলেন,

“আমি নিজেকে আঁকতে পারি কারণ আমি প্রায়শই একা থাকি এবং আমি এমন একটি বিষয় যা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে ভাল জানি।”

তাঁর সাধারণ এবং আবেগপূর্ণ স্ব-প্রতিকৃতি প্রায়শই তাঁর জীবন থেকে তুলে নেয়া অভিজ্ঞতার কথা বলে, তাঁর শারীরিক এবং মানসিক ক্ষত, ব্যথা, অক্ষমতা, আঘাত এবং ভঙ্গুরতার বিষয়বস্তু সহ দুর্ঘটনা উভয়ই দেখায়।

ফ্রিদার সবচেয়ে বিখ্যাত পেইন্টিংগুলির মধ্যে একটি হল-‘দ্য ব্রোকেন কলাম’। এই চিত্রকর্মটিতে তাঁর মেরুদণ্ডকে ভূমিকম্পের ফাটলের মতো দেখা যায়। তাঁর আরেকটি চিত্রকর্ম ‘উইদাউট হোপ’। এই চিত্রকর্মটিতে জীবনের এমন একটি সময় দেখানো হয়েছে, যখন ফ্রিদা অসুস্থ্যতার সময় তাঁর ক্ষুধা হারিয়ে ফেলেছিল, এবং তাঁর ডাক্তার প্রতি দুই ঘণ্টায় একটি চর্বিযুক্ত তরল খাদ্য জোর করে তাঁকে খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।

১৯২৭ সালে যখন ফ্রিদার বয়স ছিল ২০, তখন তিনি বিখ্যাত মেক্সিকান চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরার কাজের ভক্ত হয়ে পড়েন। ২০ বছর বয়সের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অবশেষে দু’জনের প্রেমের সখ্যতা গড়ে উঠে। যার ফলে দিয়েগো তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছেড়ে দেন এবং ১৯২৯ সালে ফ্রিদাকে বিয়ে করেন।

ফ্রিদা এবং দিয়েগোর আকারের পার্থক্যের কারণে লোকেরা প্রায়শই এই দম্পতিকে “দ্যা এলিফ্যান্ট এবং দ্য ডোভ” বলে উল্লেখ করতেন। ফ্রিদা কাহলো এবং দিয়েগো রিভেরার ১০ বছরের দাম্পত্য জীবন নিয়েও রয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনা। তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত, অগোছালো ঝগড়া, একাধিক বিবাহ, এবং উভয়েরই বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। তারা ১৯৩৯ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ করেন। কিন্তু এক বছর পরে আবারও তারা  বিয়ে করেছিলেন। তবে তাদের সম্পর্কটা ঝামেলাপূর্ণই ছিল। ফ্রিদা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দিয়েগোর সাথে বিবাহিত ছিলেন।

ফ্রিদার জীবনে শারীরিক কষ্টের কোন সীমা ছিল না। বছর অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ফ্রিদার স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে এবং শেষের বছরগুলো হাসপাতালেই যাওয়া আসার মধ্যে থাকতেন ফ্রিদা। সে সময় তিনি ঘোরাফেরা করার জন্য প্রধানত হুইলচেয়ার বা ক্রাচ ব্যবহার করতেন। তবু তিনি আঁকা চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

ফ্রিদার সংক্ষিপ্ত জীবনের শেষের দিকে ১৯৫৩ সালে, মেক্সিকোতে তার প্রথম একক গ্যালারি খোলার ব্যবস্থা করেন। সে সময়টা তিনি ডাক্তারের নির্দেশনায় বিছানায় বিশ্রামে ছিলেন। উঠ-বসা করা সম্ভব ছিল না। সবাই ভেবেছিলেন ফ্রিদা নিজ চোখে এই গ্যালারী দেখে যেতে পারবেন না। কিন্তু সেদিন ফ্রিদা একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্যালারিতে পৌঁছেছিলেন এবং আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাকে যেন একটি স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসা হয় এবং একটি বিছানায় নেয়া হয়। এভাবেই তিনি গ্যালারির আনন্দ উপভোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ফ্রিদার গ্যালারি খোলার মাত্র কয়েক মাস পরেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। গ্যাংগ্রিনের কারণে তাঁর ডান পা শেষ পর্যন্ত হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়। ফ্রিদা হতাশাগ্রস্ত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ব্যথানাশক ওষুধেও আর তেমন কাজ করছিল না। তাঁর শেষ দিনগুলিতে, ফ্রিদা ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় শয্যাশায়ী ছিলেন। তা সত্ত্বেও, তিনি গুয়াতেমালায় সিআইএ আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং বক্তৃতা করেছিলেন। পরে তাঁর অসুস্থতা বেড়ে যায় এবং সেই রাতে তার প্রচন্ড জ্বর হয়। সাথে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। ১৯৫৪ সালের ১৩  জুলাই, তাঁর জন্মদিনের ঠিক সপ্তাহ খানেক পরে ফ্রিদা মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান। তিনি পালমোনারি এমবোলিজমের কারণে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন যে, তিনি আত্মহত্যা বা অতিরিক্ত মাত্রায় অসুধ সেবনের কারণেও মারা যেতে পারেন।

ফ্রিদার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন,

“আমি আশা করি প্রস্থানটি আনন্দদায়ক হবে – এবং আমি আশা করি আর ফিরে আসবো না – ফ্রিদা”।

মৃত্যুর পর আমরা মানুষ চিনতে শুরু করি। ফ্রিদার বেলাও তাই হয়েছে, মৃত্যুর কয়েক দশক পরে তাঁর খ্যাতি বেড়েছে। ফ্রিদা কাহলো তার জীবদ্দশায় একজন সফল মানুষ ছিলেন।  কিন্তু সেই সময়ে তাঁর কাজ প্রায়ই “ডিয়েগো রিভেরার স্ত্রী” বলে বিবেচনা করা হতো।

ফ্রিদার মৃত্যুর কয়েক বছর পরেই তাঁর কাজ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হতে শুরু করে। ১৯৭০ এর দশকে তার খ্যাতি বৃদ্ধি পেতে থাকে, যাকে ২১ শতকের কিছু সমালোচক “ফ্রিডাম্যানিয়া” বলে অভিহিত করেছিলেন।  ধীরে ধীরে তাঁর কাজের মূল্য বাড়তে থাকে। ২০১৬ সালে তার বিখ্যাত “টু নুডস্ ইন এ ফরেস্ট” ৮ মিলিয়নে বিক্রি হয়।

বাস দুর্ঘটনা, ব্যথা, লড়াই, হতাজনক বিবাহ, প্রেমের সম্পর্ক, অত্যধিক মদ্যপান এবং অসুধের ব্যবহার সহ তাঁর  জীবন, বহু বই এবং চলচ্চিত্রকে অনুপ্রাণিত করেছে; বিশেষ করে সালমা হায়েক অভিনীত ২০০২ সালের জীবনীমূলক চলচ্চিত্র ‘ফ্রিদা’।

১৯৭০ এর দশকে নারীবাদের উত্থানের ফলে, মৃত ফ্রিদা হয়ে উঠেন একজন নারীবাদী আইকন। গভীরভাবে ব্যক্তিগত ও নারী অভিজ্ঞতার অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশের জন্য ফ্রিদার কাজ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি তার প্রাকৃতিক ভ্রু এবং অন্যান্য মুখের চুল ক্যাপচার করার জন্যও প্রশংসিত হয়েছেন যা লিঙ্গ ভূমিকা এবং শারীরিক-ইতিবাচকতা সম্পর্কে অনেক কথা বলে। যৌনতার সাথে তার খোলামেলা, উভকামী এবং তার লিঙ্গ-নিরপেক্ষ পোষাক মাঝে মাঝে তাকে LGBTQI সম্প্রদায়ের একটি আইকনিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে প্রকাশ করে। মেক্সিকান শিকড়ের প্রতি তার তীব্র গর্ব তাকে তার সংস্কৃতিতে অনেকের জন্য গর্বের উৎস করে তুলেছে।

একটি সময়ে যখন লিঙ্গ সামঞ্জস্য প্রত্যাশিত ছিল, ফ্রিদা তার শিল্প, প্রেম এবং জীবনে লিঙ্গ প্রকাশের একটি বৈচিত্র্যময় বর্ণালী অন্বেষণ করেছিলেন। সমাজের সর্বদা সমালোচক, কমিউনিজম এবং রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা বিতর্কের জন্য পণ্ডিত এবং কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত একটি বাড়ি রাখতে ভয় পাননি ফ্রিদা। ফ্রিদা কাহলো বিশ শতকের অন্যতম উজ্জ্বল এবং স্বতন্ত্র শিল্পী। তাঁর জীবনীতে ব্যক্তিগত নাটক, শারীরিক যন্ত্রণা, রাজনীতির প্রতি অনুরাগ, দুর্দান্ত ভালবাসা এবং চিত্রকলার অন্তহীন শৃঙ্খলা অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার জন্য এই অসাধারণ নারী এখনো সকলের কাছে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র রুপে বেঁচে আছেন।

ফ্রিদার শিল্পকর্ম অর্থই তাঁর অত্মপ্রতিকৃতি যা আজ জগত বিখ্যাত। শারীরিক প্রতিকূলতা এবং যন্ত্রণার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে যন্ত্রণার সম্মুখীন করার গ্রাফিক চিত্রগুলি ফ্রিদার একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি। “দ্য ব্রোকেন কলাম” তাঁর এমনই একটি শিল্পকর্ম। ১৯৪৪ সালে আঁকা “দ্য ব্রোকেন কলাম” ফ্রিদার মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের কিছুদিন পরে তৈরি করা একটি শিল্পকর্ম।এটি তাঁর দুর্ঘটনার ফলে শারীরিক সঙ্কট ও সমাধানের জন্য তার জীবদ্দশায় সহ্য করে যাওয়া অসংখ্য চিকিৎসা পদ্ধতির একটি চিত্র মাত্র। অপারেশনটি তাকে শয্যাশায়ী করেছিল এবং একটি ধাতব কাঁচুলিতে তাঁর শরীর ঘিরে রেখেছিল, যা তাঁর তীব্র এবং ক্রমাগত ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করেছিল।

“দ্য ব্রোকেন কলাম” চিত্রকর্মে ফ্রিদা নিজেকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন-ভগ্নপ্রায় ভূদৃশ্যের বিরুদ্ধে এবং সম্পূর্ণ একটি শুষ্ক, ফাটলযুক্ত ল্যান্ডস্কেপের মাঝখানে দাড় করিয়েছেন, যেটি শিল্পীর মতোই অনেক উত্থান-পতন, যন্ত্রণা ও ট্রমা সহ্য করেছে বলে মনে হচ্ছে। এই চিত্রকর্মে ফ্রিদার নগ্ন ধড়ের মাঝ বরাবর একটি লম্বা ফাঁটা আয়নিক পাথরের স্তম্ভ রয়েছে যা দর্শককে তাঁর মেরুদণ্ডের ফাটল হিসাবে দেখানো হয়েছে।

তাঁর সম্পূর্ণ ধড় ফ্যাব্রিক দিয়ে রেখাযুক্ত একটি ধাতব কাঁচুলি বেল্টে আবদ্ধ, যা তাঁর পিঠের জন্য চাপ এবং সমর্থন প্রদান করছে। এগুলো তাঁর শরীরকে ভেঙে পড়া থেকে রোধ করতে সাহায্য করছে, ধর থেকে নিচের দিকে শরীরের মাঝখানে চলমান চিত্রটি তাই ইঙ্গিত দেয়। এবং পতনের বিন্দুতে ভাঙ্গা আয়নিক কলাম স্তম্ভটি তাঁর মেরুদণ্ডের কলামকে প্রতিস্থাপন করেছে। ফ্রিদার মাথার চিত্রটি যদিও ঠিক, তবে তাঁর গাল গড়িয়ে অশ্রুদানা ঝরছে, যা সম্ভবত তাঁর ব্যথার চিহ্নকে নয়, বরং ব্যক্তিত্বকে প্রতিফলিত করছে। কারণ ফ্রিদা দর্শকদের কাছে যে মনোভাব উপস্থাপন করেছেন এবং সর্বদা নিজের জীবনকে দেখিয়েছেন, তা ছিল দৃঢ় এবং প্রতিবাদী। তার শরীরে ছিদ্র করে গেঁথে রাখা পিনগুলো তার ক্রমাগত মুখোমুখি হওয়া ব্যথার প্রতীক। আয়নিক কলাম স্তম্ভ বরাবর বাম স্তনে লেগে থাকা সবচেয়ে বড় পিনটি ১৯২৫ সালে দুর্ঘটনার ফলে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় ক্ষতিকে চিহ্নিত করে, যা তাঁর একাকিত্বের অনুভূতি ও মানসিক ব্যথাকে তুলে ধরে।

ব্যথা এবং কষ্ট ফ্রিদার চিত্রকলার একটি ধ্রুবক বিষয়। ফ্রিদা প্রায়শই তার কাজগুলিতে নিজেকে চিত্রিত করতেন, কারণ তিনি নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন বলে দাবী করতেন। “দ্য ব্রোকেন কলাম” চিত্রকর্মের শৈলী খুবই অনন্য। তিনি একটি সহজ এবং পরিষ্কার ইমেজ নির্মাণের জন্য দৃঢ়ভাবে প্রতিটি রঙ তুলির আঁচড়ের ব্যবহার করেছেন। “দ্য ব্রোকেন কলাম” এ ফ্রিদা তার যন্ত্রণা এবং কষ্টকে সবচেয়ে সহজবোধ্য এবং ভয়ঙ্কর উপায়ে প্রকাশ করেছেন।

আমরা সবাই সুস্থতা নিয়ে জন্মাই না কিংবা জীবন যাপন করিনা। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা সামান্য থেকে জটিল ধরণের অনেক শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে জন্মান, কিংবা জীবনের কোন একটা সময়ে দুর্ঘটনা, সার্জারি বা চিকিৎসা, বয়সজনিত সমস্যা বা রোগাক্রান্ত হয়ে নানান শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন।

আমেরিকান বিলোপবাদী এবং রাজনৈতিক কর্মী হ্যারিয়েট টাবম্যান মৃগীরোগী ছিলেন, অভিনয়শিল্পী সেলেনা গোমেজ লুপাসের সাথে বাস করছেন, ব্যবসায়ী নেতা এবং শার্ক ট্যাঙ্ক সুপারস্টার বারবারা করকোরান ডিসলেক্সিক এবং জিমন্যাস্ট সিমোন বাইলসের এডিএইচডি আছে। কাহলোর মতো তাঁরা প্রত্যেকেই সাফল্যের জন্য ইতিবাচক রোল মডেল।

ল্যাটিনো এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজ অক্ষমতা বা দুর্বলাগুলো সাধারণত সমাজের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে লুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ফ্রিদা কাহলো তাঁর শিল্পে নিজেকে চিত্রিত করেছেন। আর এ কারণেই ফ্রিদা কাহলো আজ একজন বিশ্ববিখ্যাত স্ব-প্রতিকৃতি চিত্রশিল্পী এবং আজ তিনি শিল্পী, অক্ষম, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং উভকামী মহিলাদের জন্য একটি রোল মডেল হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ