প্রতিবন্ধী নিক ভুইয়িচিচ কোটি মানুষের প্রেরণা

এইচ বি রিতা
প্রবন্ধ
Bengali
প্রতিবন্ধী নিক ভুইয়িচিচ কোটি মানুষের প্রেরণা

 

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা সামান্য থেকে জটিল ধরণের অনেক শারীরিক ত্রুটি বা অক্ষমতা নিয়ে জন্মান, কিংবা পরিণত বয়সে জীবনের কোন একটা সময়ে দুর্ঘটনা, বয়সজনিত বা রোগাক্রান্ত হয়ে নানান শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন।

 

ফিজিক্যাল ডিসএবিলিটি অর্থাৎ শারীরিক অক্ষমতা শরীরের এমন একটি অবস্থা যা কোনও ব্যক্তির গতিশীলতা, শারীরিক ক্ষমতা, মনোবল বা দক্ষতার উপর প্রভাব ফেলে। কোন ব্যক্তি যখন শারীরিক অক্ষমতায় ভোগেন, তখন সেটা মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। কারণ তারা তখন ব্যক্তি জীবনের ছোট-বড় ‌অনেক স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হন, সামাজিকযোগাযোগ থেকে কম বেশী বিচ্যুত হন। অনেক সময় অন্যদের দ্বারা তারা বুলিং বা অবহেলিত হন। অনেক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনেও তারা ব্যর্থ হন।

 

তবে, ইতিহাসে এমন অনেক বিশেষ ব্যক্তিদের উদাহরণ হয়েছে, যারা নিজ মনোবল এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবার পরিবেশের সাহায্য-সহযোগীতায় বিশ্বখ্যাত হয়ে সফলতা ও কৃতিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং তাঁদের সফল হবার পেছনের লড়াইয়ের গল্পগুলো কোটি কোটি ‌ত্রুটি বা বাধাগ্রস্ত মানুষ, অক্ষম ও প্রতিবন্ধীদের জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস।

 

৩ ডিসেম্বর প্রতিবন্ধী দিবস(International Day of Persons with Disabilities)। এই দিবসটিতে সামনে রেখে আজ শারীরিকত্রুটি ও অক্ষমতা নিয়ে ইতিহাসের সেরা সফল এমনই একজন ব্যক্তিকে তুলে ধরবো, যার নাম নিক ভুইয়িচিচ!

আজ তাঁর সফল ও সার্থক হওয়ার পিছনের লড়াইয়ের কথা বলবো।

 

নিক ভুইয়িচিচ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ১৯৮২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর যুগোস্লাভিয়া থেকে আসা সার্বিয়ান অভিবাসী, দুসাঙ্কা এবংবরিসলাভ ভুইয়িচিচ দম্পত্তির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও ভুইয়িচিচ অন্যথায় সুস্থ শিশু ছিল, কিন্তু তিনি বাহু ও পা ছাড়াইজন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পা ছিল না, কিন্তু দুটি ছোট পা’য়ে পাতা ছিল, যার একটিতে দুটি পায়ের আঙুল ছিল। ভুইয়িচিচেরদুই ভাই বোন, মিশেল এবং অ্যারন।

 

ভুইয়িচিচের আত্মজীবনী অনুসারে, অঙ্গবিহীন শিশু সন্তানটির জন্মের পর যখন নার্স তাকে, তাঁর মায়ের সামনে তুলে ধরেছিল, প্রথমেই ভুইয়িচিচের মা তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তিনি এবং তার স্বামী হাসপাতালের বাইরে গিয়ে অঙ্গবিহীন সন্তানকে দেখে বমি করতে শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন যে, “তাদের পুত্রের জন্য ঈশ্বরের কোন পরিকল্পনাআছে।“

মূলত, তার পায়ের আঙুল দুটো একসাথে লাগানো ছিল। পায়ের আঙুলগুলিকে আলাদা করার জন্য একটি অপারেশন করাহয়েছিল যাতে ভুইয়িচিচ সেগুলিকে হাতের আঙুল হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। এই আঙুলগুলোকে তিনি ‘চিকেন ড্রামস্টিক’ হিসাবে উল্লেখ করেন।

 

 

প্রাথমিক ভাবে, ভিক্টোরিয়া রাজ্যের আইন ভুইয়িচিচকে তাঁর শারীরিক অক্ষমতার কারণে মূলধারার স্কুলে ভর্তি হতে বাধা দেয়। তাঁর মানসিক কোন প্রতিবন্ধকতা ছিলনা বিধায় তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্কুলে পাঠাননি।

যাইহোক, ভুইয়িচিচ সেই আইনগুলি পরিবর্তিত হওয়ার পরে মূলধারার একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তিনিই ছিলেন প্রথম শারীরিকভাবে অক্ষম ছাত্রদের একজন। শৈশবে একটি স্বাভাবিক শিশুর মত হাতের আঙুল দিয়ে লিখতে না শিখে ভুইয়িচিচকে শিখতে হয়েছিল বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ারটি কীভাবে চালানো হয়। এভাবেই তিনি স্কুল যাত্রা শুরু করেন। তবে তার হাত-পায় না থাকায় তাকে স্কুলে বুলিং এর শিকারও হতে হয়।

যার কারণে এক সময় ভুইয়িচিচ গুরুতর বিষণ্নতায় পড়ে যান। আট বছর বয়সী ভুইয়িচিচ একটা সময় আত্মহত্যার চিন্তা করতে থাকেন এবং নিজের অক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক নানান যন্ত্রণায় ব্যথিত ভুইয়িচিচ দশ বছর বয়সে তার বাথটাবে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ভুইয়িচিচ তার মিউজিক ভিডিও গুলোতে বলেছেন যে, ‘ঈশ্বর তার জীবনের জন্য একটি পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এই কারণে তিনি নিজেকে ডুবিয়ে দিতে পারেননি।’

 

 

ভুইয়িচিচ খুব কঠিনভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। প্রার্থনায় তিনি নিজের হাত এবং পা ফিরে পেতে চাইতেন। তিনি ঈশ্বরকে বলতেন, ‘যদি ঈশ্বর তার প্রার্থনার উত্তর না দেন, তবে তিনি আর কোন দিন ঈশ্বরের প্রশংসা করবেন না।’

তবে, সতেরো বছর বয়সে তাঁর বিশ্বাসে একটি ভিন্ন মোড় আসে যখন তাঁর মা তাকে একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে একাধিক অক্ষমতা নিয়ে লড়াই করা একজন ব্যক্তিকে দেখিয়েছিলেন। ভুইয়িচিচ তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনিই কেবল এই সংগ্রামে একমাত্র ব্যক্তি নন, পৃথিবীতে আরো এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোন না কোন অক্ষমতা নিয়েই জন্ম গ্রহণ করেন এবং প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, হেরে না গিয়ে বরং লড়াই করাই হবে তাঁর জন্য সঠিক কাজ, কেননা তাঁর সাফল্য ও কৃতিত্ব অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

 

একই বয়সে ভুইয়িচিচকে পাবলিক স্পিকার হবার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁর স্কুলের দারোয়ান, যা তাঁর জীবনকে চিরতরে পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

একদিন স্কুলের দারোয়ান ভুইয়িচিচকে বলেছিলেন যে, “আপনি একজন দারুণ স্পিকার হতে যাচ্ছেন।” দারোয়ান তাঁর মধ্যেএমন কিছু দেখেছিলেন যা ভুইয়িচিচ হয়তো নিজেও দেখতে পাননি।

এরপর, ভুইয়িচিচ ছয়জন ছাত্র শ্রোতার সামনে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই সংগ্রামে তিনিএকা নন। এরপরই ভুইয়িচিচ অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পাবলিক স্পিকিংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

 

সময়ের সাথে ভুইয়িচিচ বুঝতে পেরেছিলেন কিভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়াই পূর্ণ জীবন যাপন করা যায় এবং নিত্যনৈমিত্তিক অনেক কিছুই ভিন্ন উপায়ে শিখে নিয়ে, তার প্রয়োগ করা যায়।

ভুইয়িচিচ তার বাম পায়ের দুটি আঙুলে একটি বিশেষ গ্রিপ দিয়ে লিখেন, যা তার বুড়ো আঙুলের উপর কিছুটা পড়ে যায়। তিনি ‘হিল এন্ড টো’ পদ্ধতি ব্যবহার করে কম্পিউটার কিবোর্ডে প্রতি মিনিটে ৪৫টি শব্দ পর্যন্ত টাইপ করতে পারেন। তিনি গলফ, সাঁতারকাটা, এমনকি স্কাই-ডাইভিং-এ অংশগ্রহণের পাশাপাশি টেনিস বল ছুঁড়তে, ড্রাম প্যাডেল বাজানো, পানির গ্লাস হাতে নেয়া, চুলআঁচড়ানো, দাঁত ব্রাশ করা, ফোনের উত্তর দেওয়া এবং শেভ করাসহ সবই করতে পারেন।

 

 

ভুইয়িচিচ ২১ বছর বয়সে গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি থেকে পায়ের পাতার দুই আঙুল দিয়ে ফাইনান্সিয়াল প্লানিং ও অ্যাকাউন্টিং ডবলমেজর নিয়ে ‘ব্যাচেলর অফ কমার্স’ এর উপর গ্রাজুয়েশান করেছেন।

সতেরো বছর বয়সে, তিনি তার প্রার্থনা গ্রুপে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন এবং পরে তার ২০০৫ সালে অলাভজনক সংস্থা, ‘লাইফ উইদ আউট লিম্বস’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৭ সালে তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রেরণাদায়ক স্পীকিং কোম্পানি “অ্যাটিটিউড ইজঅল্টিটিউড” প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালে তিনি ‘মেথড ফেস্ট ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে’ এ শর্ট ফিল্মে অভিনয়ের জন্যএকটি সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। ভুইয়িচিচ শর্ট ফিল্ম দ্য বাটারফ্লাই সার্কাসে অভিনয় করেছেন।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সময়, তিনি কুইন্সল্যান্ডের ম্যাকগ্রেগর রাজ্যের অধিনায়ক নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় দাতব্য সংস্থা এবংপ্রতিবন্ধী প্রচারণার জন্য তহবিল সংগ্রহের ইভেন্টগুলিতে ছাত্র পরিষদের সাথে কাজ করেন। ভুইয়িচিচ ষাটটিরও বেশি দেশে ভ্রমণকরেছেন এবং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। অঙ্গবিহীন ত্রুটি ও অক্ষমতা নিয়ে লড়াই করা মানুষের জন্যতিনি তিন হাজারের বেশি বক্তৃতা দিয়েছেন।

 

২০১০ সালে ভুইয়িচিচের প্রথম বই, ‘লাইফ উইদআউট লিমিটস: ইন্সপায়ারেশন ফর রিডিকিউলাসলি গুড লাইফ’ রেন্ডম হাউসদ্বারা প্রকাশিত হয়, যা ৩২টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।

ভুইয়িচিচের অনন্য প্রকাশিত বইগুলো হল- ইউর লাইফ উইদআউট লিমিটস(২০১২), লিমিটলেস: ডিডোশন ফর এরিডিকিউলাসলি গুড লাইফ(২০১৩), আনস্টোপেবল:দ্য ইনক্রেডিবল পওয়ার অফ ফেইথ ইন একশন(২০১৩), দ্য পাওয়ার অফইনক্রেডিবল ফেইথ(২০১৪), স্ট্যান্ড স্ট্রং(২০১৫), লাভ উইদআউট লিমিটস(২০১৬), বি দ্য হ্যান্ড এন্ড ফিট(2018).

 

ভুইয়িচিচ হয়তো কখনই ভাবেননি যে, তাঁর জীবনেও বসন্তের হিমেল হাওয়া দোলা দিয়ে যাবে এবং একদিন তিনিও কারো প্রেমে পড়বেন কিংবা কেউ তাঁর প্রেমে পড়বে। তিনি হয়তো ভাবেন নি, হাত-পায়ের অনুপস্থিতিতেও তিনি একটি পরিপাটি সংসার সাঁজাতে পারবেন।

ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক নিয়ে আমেরিকায় চলে যাওয়ার পর একজন প্রেরণাদায়ক বক্তা এবং প্রচারক হিসেবে ভুইয়িচিচ তাঁরকর্মজীবন শুরু করতে, ডালাসে একটি প্রেরণামূলক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁর প্রেমে পড়ে যান নার্সিং ছাত্রী ক্যানেইমিয়েহারা। ২০১১ সালের আগষ্টে ভুইয়িচিচ ক্যানেইকে প্রস্তাব দেন এবং তার পরের বছর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০১৩ সালেএই দম্পতি তাদের প্রথম ছেলে কিয়োশিকে স্বাগত জানান। ২০১৫ সালে তাদের দ্বিতীয় পুত্র ডেজান জন্মগ্রহণ করে, তারও দুইবছর পর যমজ কন্যা, এলি লরেল এবং অলিভিয়া লেই এর জন্ম হয়। আজ ভুইয়িচিচ ৪ সন্তানের জনক।

ক্যানেইর মতে, তিনি ভুইয়িচিচের শারীরিক অক্ষমতার প্রতি খুব বেশি মনোযোগ দেননি এবং পরিবর্তে, তার ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

 

নিক ভুইয়িচিচের সাফল্যের গল্পটি আমাদের শেখায় যে, ব্যাপার না আমরা কতটা সক্ষমতা বা অক্ষমতা নিয়ে জন্মেছি, ব্যাপার হলো-জন্মের পর আমরা কি বা কে হতে পেরেছি। ইতিবাচক মনোভাবের সাথে যে কোনো কিছুই সম্ভব। আমাদের কখনোই আশা হারানো উচিত নয় এবং নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখা আমাদের সাফল্য বয়ে আনতে পারে।

ভুইয়িচিচ আমাদের জানিয়ে যান, থমকে গিয়ে পিছনে না তাকিয়ে, বরং আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার। এবং লড়াই না করেই হেরে যেতে নেই, বরং আমাদের লড়াই করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে হবে।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ