প্রবন্ধ নিয়ে

উৎপল মণ্ডল
প্রবন্ধ
Bengali
প্রবন্ধ নিয়ে

নিজের মনন-চিন্তন ও অনুভবকে সমকাল ও উত্তরকালের অন্যজনের কাছে পৌছে দেবার যে বাসনা সভ্যতার প্রাগৈতিহাসিক মনস্তত্ত্ব, সেখানেই নিহিত যাবতীয় শিল্পসৃষ্টির উৎস-রহস্য। বস্তুত, জীবজগতের এই বৈশিষ্টা শুধু মানুষেরই। আর তাই মানুষের চিন্তা ও অনুভব বারবার প্রকাশিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে কখনো রঙ-তুলি বা মাটি-পাথর বা সুর আর কখনো বর্ণ-শব্দ-বাক্যে। তবে বর্ণ-শব্দ-বাক্য দিয়ে যেকোনো ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি হলেও, প্রকাশভঙ্গির তারতম্যে সেগুলি আবার ভিন্ন-ভিন্ন সংরূপ হয়ে উঠেছে পরবর্তীকালে। যেমন উপন্যাসে, গল্পে কিংবা নাটকে লেখক অনেকটা পরোক্ষ, সেখানে মূলত চরিত্রে এবং তার ক্রিয়া-কলাপের মধ্যেই বক্তব্যের প্রকাশ। কিন্তু গীতিকবিতা ও প্রবন্ধ স্রষ্টার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এই দুইয়ের মধ্যে গীতিকাব্যে আবার স্রষ্টার প্রত্যক্ষতা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তা আভাস-ইঙ্গিত-ব্যঞ্জনা সহযোগে এক রহস্যময়তায় আবৃত। সেদিক থেকে স্রষ্টার মনন-চিন্তনের সরাসরি ও সাবলীল প্রকাশ শুধুমাত্র প্রবন্ধেই লক্ষণীয়। প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার প্রবন্ধও অল্পবিস্তর গীতিকবিতার লক্ষণাক্রান্ত হতেই পারে, বিশেষত ব্যাক্তিগত প্রবন্ধ; কিন্তু তার প্রকাশ কখনোই কবিতার মতো নয়। অর্থাৎ মনন-চিন্তনের বিষয়বস্তুতে আবেগের শতাংশ বেশি থাকলে বা তীব্র অনুভূতিলগ্ন চিন্তা হলে, প্রবন্ধ আল্পবিস্তর কাব্যগন্ধী হতে পারে। তবুও সে প্রবন্ধের আবেগ-মথিত চিন্তাও যুক্তিনিষ্ঠ ভাবেই প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ প্রবন্ধের বিষয় যাই হোক, প্রকাশভঙ্গির যুক্তিনিষ্ঠতাই বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে নিয়ে যায় প্রবন্ধকে ।
তাহলে প্রবন্ধের আঙ্গিককগত দিক থেকে দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ—১. স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রত্যক্ষতা ২.যুক্তি-শৃঙ্খলিত সাবলীলতা । অর্থাৎ প্রবন্ধের ক্ষেত্রে স্রষ্টা-সৃষ্টি এবং উপভোক্তা — এই ত্রিস্তরের যোগাযোগ প্রত্যক্ষ।-Compton’s pictured Encyclopedia-য় (Vol-4.) তাই দেখা যাচ্ছে —
” … unlike the novel or the short story or the drama, the essay does not aim primarily to create characters and through them to tell a story. It speaks directly to the readers, giving the author’s views on customs or happenings of people, on art, on books, or on life in general. It may teach, argue, persuade, arouse emotion, or merely amuse.” অবশ্য ব্যতিক্রম একেবারেই নেই যে তা নয়। কখনো কখনো বক্তব্য অনুযায়ী স্রষ্টা নিজেকে আড়াল করতে চান। যেমন- বঙ্কিমচন্দ্র ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ একজন কথককে হাজির করেছেন। এ আড়াল করা অন্যভাবেও হতে পারে। যেমন- লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তার নোটবই লিখেছিলেন উল্টো করে। বহুক্ষেত্রে আবার কথোপকথন ভঙ্গি বা কখনো বৈঠকী চালও লক্ষ্য করা যায়। যেমন দেখা যায় সৈয়দ মুজতবা আলী ও বিবেকানন্দের রচনায়। সেক্ষেত্রে মনে হয় স্রষ্টা কী বলছেন, আর কীভাবে বলছেন, ওতপ্রত ভাবে জড়িত। এই বিষয় ও বলার ধরন অনুসারে প্রবন্ধ- সাহিত্যে তাই শ্রেণি বিভাগও করা হয়, যেমন পাশ্চাত্যে তেমনি প্রাচ্যেও। তবে যেভাবেই বলা হোক — চিন্তার যুক্তি-শৃঙ্খলিত বিন্যাস প্রায় সর্বত্রই লক্ষণীয়।
প্রকাশভঙ্গিতে যুক্তি-শৃঙ্খলিত সাবলীলতার প্রসঙ্গে এসে পড়ে গদ্যরীতির কথা। বিশেষত, বাংলা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে তো বটেই। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক ড. অধীর দের আধুনিক বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের ধারা” (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন “… প্রবন্ধের আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে বলা যায় যে, সাধারণত: কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তি অবলম্বন করিয়া লেখক যখন কোন ভাব বা বিষয় যুক্তিযুক্ত ও সংযতভাবে বা পরিপাটিরূপে গ্রন্থন করেন এবং প্রধানতঃ সরস গদ্যরীতিতে ও দীর্ঘ বা অনতিদীর্ঘ পরিসরে তাহার প্রকাশভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত করেন, তখনই তাহাকে প্রবন্ধ নামে অভিহিত করা যাইতে পারে।”
লক্ষণীয় তিনি ‘কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তি অবলম্বন’ বলার পরেই বলেছেন “যুক্তিযুক্ত ও সংযতভাবে’ অর্থাৎ কল্পনার কথা হয়তো বলেছেন মন্ময় বা আত্মগৌরবী প্রবন্ধের কথা ভেবেই, কিন্তু সে কল্পনা যে কবিতা কল্পনালতা’ হবেনা তা বোঝা যায় ” যুক্তিযুক্ত” শব্দের ব্যবহারে। কল্পনা তো থাকতেই হবে। বিজ্ঞানের প্রায় সব বিষয়ই এতই কাল্পনিক যে তা বাস্তবে বা অভিজ্ঞতায় আনা প্রায় অসম্ভব। তবু বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত সর্বদাই যুক্তিযুক্ত। এখানেই অন্য সাহিত্য সংরূপের সঙ্গে প্রবন্ধের মূল স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবং এই স্বাতন্ত্র অবশ্যই প্রকাশকেন্দ্রিক, যেখানে যুক্তিনিষ্ঠাই বড়ো কথা। আর গদ্যরীতিতে’কথাটি বলেছেন হয়তো সাধারণভাবে বাংলা প্রবন্ধ বলতে যা বোঝায়, তার উৎস ও বিকাশের কথা ভেবেই। কেননা বাংলা প্রবন্ধ হিসেবে আমরা যাকে চিনি—যদিও তা প্রথম অবস্থায় প্রস্তাব’, ‘সন্দর্ভ’ প্রভৃতি শব্দে চিহ্নিত হতো, তার জন্ম ও সাবালকত্ব প্রাপ্তি বাংলা গদ্যের জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই। আর একথাও ঠিকই যে, প্রবন্ধ বলতে একঝটিকায় আমাদের মানসলোকে যা অবলোকন করি, তা আসলে গদ্যের প্রচলিত সিনট্যাক্সেই রচিত। এখানেই আমাদের মুল প্রশ্ন। তাহলে মহাভারতের অষ্টাদশ পর্বকে প্রবন্ধ বলছেন কেন স্বয়ং রচয়িতা? অথবা চৈতন্যচরিতামৃতের কিছু অংশ কিংবা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’বা রামানুজের গাণিতিক চিন্তা? এদিক থেকে ভাবলে আমাদের পৌঁছতে হবে বিষয়ের দিকে।
বিষয়গত দিক দিয়েও ভাববার আছে। মনন-চিন্তনের একটি অন্যদিক– অন্য বিষয় (যা কল্পনা হলেও আবেগের শতাংশ কম) যখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়, অথবা তার উল্টো দিক– ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা যখন মনন-চিন্তনকে পুষ্টি যোগায়, তখন তার প্রকাশ যেভাবেই হোক, তা তো আসলে প্রবন্ধই ! স্টিফেন হকিং এর ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অব্‌ টাইম’ কিংবা অমর্ত্য সেনের লেখালেখি যে প্রবন্ধ তা আমাদের চিন্তাই করতে হয় না। তাহলে আর্যভট্ট বা ভাস্করাচার্যের গাণিতিক তত্ত্ব, রামানুজের গাণিতিক তত্ত্ব বা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র কিংবা বটেশরের জ্যোর্তিবিদ্যা বিষয়ক রচনা, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির নোটবই’ কেন প্রবন্ধ পর্যায়ভুক্ত হবে না? তাই শুধু ফর্ম (form) নয়, বিষয়ও (content) ভাবা দরকার। আর ফর্ম (form) গত দিক থেকে গদা না পদ্য এর থেকেও বোধ হয় বেশি গুরুত্বের দাবিদার যুক্তিনিষ্ঠতা, যা প্রবন্ধকে নিয়ে যায় বিজ্ঞান মনস্কতার দিকে। এই কারণেই বোধ হয় মহাভারতের অষ্টাদশ পর্ব, কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃতের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা গীতা’ ছন্দে লেখা হলেও তাঁর ভাষায় কবিতাসুলভ আবেগের চেয়ে মননের প্রাধান্য। একই কারণেই লালিদাসের শ্লোকের ভাষা আর আর্যভট্ট বা রামানুজের শ্লোকের ভাষা এক নয়। ভারতের ‘নাট্যশাস্ত্র’ কিংবা উজ্জ্বল নীলমণি’র ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। আসলে ব্যাকরণগত ভাবে যাকে আমরা গদ্য ভাষা বলি তার জন্ম তখনও হয়নি বলেই, তাঁরা তাঁদের মননকে—তা সে গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা, ধর্ম, দর্শন, তত্ত্ব যাই হোক না কেন, ধরে রেখেছিলেন শ্লোক আকারে।
তাহলে, তত্ত্বগত ভাবে দেখতে গেলে প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর পরিধি প্রায় সীমাহীন। সভ্যতা-সংস্কৃতির যাবতীয় দিকই প্রবন্ধের বিষয়। সাম্প্রতিককালে, আরেকটু স্পষ্ট করে বলতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে উত্তরাধুনিক চিন্তা-ভাবনা বিকাশের সময় থেকে অন্যান্য সাহিত্য সংরূপ গুলিরও ক্ষেত্রসীমা বেড়ে যেতে থাকে। চিত্র-ভাস্কর্য-বিজ্ঞান হয়ে ওঠে গল্প-উপন্যাস ও নাটকের বিষয়। এমনকি একান্ত বিজ্ঞানের বিষয় নিয়েও রচিত হয় কবিতা। ঠিক তার উল্টোটাও ঘটে। মননশীলতার ক্ষেত্রেও ঢুকে পড়ে আবেগ মথিত ভাষা। এই যে সবার ক্ষেত্রসীমার ভাঙন এবং ক্রমাগত পরিবর্তন, এর দুটি কারণ অনুভব করা যায়—১. দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালের যুগপ্রবণতাই হল দ্রুত গতিতে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গ্রহণ-বর্জন। সেটা শুধু সাহিত্য-শিল্পের জগতেই নয়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও | না হলে হাইব্রিড শস্যের জন্মই হতো না এভাবে। দেখিনা— এটার সঙ্গে ওটা মিলিয়ে কি দাঁড়ায়! – এই মানসিকতা। আর ২, প্রথমটির পরিপুরক এটি, যাকে আবার উত্তরাধুনিকতার বৈশিষ্ট্যও বলা হচ্ছে—প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, প্রচলিত ছক ভাঙা। এরই ফলে যেমন প্রত্যেক সাহিত্য সংৰূপেরই বিষয় এবং আঙ্গিক বদলে যেতে থাকে, তেমনি জন্ম নেয় আন্তর্বিদ্যক সমালোচনা (ইন্টারডিসিপ্লিনারি ক্রিটিসিজম)।
তবে প্রবন্ধের ক্ষেত্রে বিষয়টি সাম্প্রতিক প্রবণতা নয়, অনেক পুরোনো। উত্তরাধুনিক চিন্তা-বিকাশের কালে এই প্রবণতাজনিত কারণে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায় প্রবন্ধে, তা বিষয়গত দিক থেকে নয়, প্রকাশগত দিক থেকে তা হয়ে উঠেছে আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিষয়বস্তু চিরকালই সংস্কৃতির অঙ্গীভূত সমস্ত কিছুই।সামগ্রিকভাবে আমি তাই প্রবন্ধের সংজ্ঞা স্বরূপ ভেবেছি —
আবহমান সভ্যতার মননে সংস্কৃতির যাবতীয় দিক সংক্রান্ত যে চিন্তাভাবনা, তা যখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে অর্থাৎ শৃঙ্খলিত যুক্তির বিন্যাসে ধরা পড়ে বর্ণ-শব্দ-বাক্য সহযোগে, তখন সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রবন্ধের বিচরণভূমি, সে বিচরণ ছন্দের তালেই হোক বা আড্ডার মেজাজেই হোক। |
‘সংস্কৃতির যাবতীয় দিক সংক্রান্ত’, বলছি এজন্যই যে, সংস্কৃতি ব্যাপারটিই জীবনের বহুকৌণিক সমগ্রতার সঙ্গে অন্বিত। জীবনের এই সমগ্রতা যেমন কালগত, তেমনি সমষ্টিগত। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘শিল্প-সংস্কৃতি-ইতিহাস’ গ্রন্থে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে উন্নত জীবনের এই সমগ্রতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আরো স্পষ্ট ও সরলভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন নীলিমা ইব্রাহিম (বাঙালির সংস্কৃতি চিন্তা, ঢাকা)- “কোন একটি জাতি বা মানবগোষ্ঠীর দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় কাজকর্ম থেকে শুরু করে তার চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশের সম্মিলিত রূপায়ণই এই জাতি বা গোষ্ঠীর সংস্কৃতি নামে সাধারণত অভিহিত হয়ে থাকে।”
বাংলা প্রবন্ধের শৈশব থেকে শুরু করে গোটা বিশ শতক পর্যন্ত লক্ষ করলে দেখা যায় বাঙালি সংস্কৃতির সমস্ত দিকই হয়ে উঠেছে প্রবন্ধের বিষয়। সাধারণভাবে বাংলা প্রবন্ধের বিকাশ লক্ষ করা যায় গদ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এবং তা অবশ্যই নবজাগরণ পর্বে। উনিশ শতকের প্রথম পর্বে যুক্তি-বুদ্ধির প্রেক্ষিতে বাঙালি চেতনায় যখন আলোড়ন সৃষ্টি হয় তখন শুরু হয় সমস্ত কিছুকে নতুন করে বিচার করার প্রবণতা। তাই আবহমান কালের বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক— সে সংস্কারের পক্ষেই হোক আর বিপক্ষেই হোক, ধরা পড়ে গদ্য রচনায়। রামমোহনের সংস্কারপন্থী ধারা বা রাধাকান্ত দেবের বিরোধী ধারা কিংবা ডিরোজিও পন্থীদের বিপ্লবাত্মক ধারা সকলেই নবজাগরণের প্রেক্ষিতে তাদের মতামতকে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গদ্যের আশ্রয় নেন। কেননা মানুষের কাছে পৌছাতে গেলে গদ্যই অপেক্ষাকৃত সহজ। তাই প্রাথমিক পর্বে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন, গৌরীকান্ত ভট্টাচার্য, অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ অনেক প্রাবন্ধিক সামাজিক সংস্কার-বিশ্বাস, ঈশ্বরের অস্তিত্ব-নাস্তিক্য, ইতিহাস, পুরাণ, সমাজ, দর্শন সমস্তকিছু নিয়েই প্রবন্ধ রচনা করেন। আর অক্ষয়কুমার দত্ত বিজ্ঞান বিষয়ক যে সমস্ত প্রবন্ধ রচনা করতে থাকেন তা পড়ে বিশিষ্ট অধ্যাপক জন অ্যান্ডারসন বলেছিলেন—’Akshaya Kumar is Indianising European Science’ | আবার রামদাস সেন-এর অধিকাংশ প্রবন্ধই পরাতত্ত্ব বিষয়ক। ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের একনিষ্ঠ চর্চা লক্ষ করা যায় দীননাথ বসুর প্রবন্ধে। অর্থাৎ উনিশ শতক থেকেই বাঙালি প্রাবন্ধিকদের চিন্তাভাবনা শুধু সাহিত্য বা সমাজকেন্দ্রিক নয়, বহুমুখী।
রবীন্দ্রপর্বে এসে এই প্রবণতা আরো বিচিত্র পথগামী হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্যতত্ত্ব, শিল্প— সমস্ত দিকই অবলম্বন করেছেন তাঁর প্রবন্ধে। এই পর্বের বহু প্রাবন্ধিক তাদের নিজস্ব প্রবণতা অনুযায়ী বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে গ্রহণ করেছেন প্রবন্ধের বিষয় হিসেবে। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদীশচন্দ্র বসু(বিজ্ঞান), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু (শিল্প), ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী (সঙ্গীত), রোকেয়া (নারী), সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (ভাষা-সংস্কৃতি), অম্লান দত্ত (মূলত অর্থনীতি) এছাড়া হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, প্রমথ চৌধুরী, রাজশেখর বসু, এস, ওয়াজেদ আলি, গোপাল হালদার, অন্নদাশঙ্কর রায়, রেজাউল করীম, হুমায়ুন কবির, কাজী মোতাহার হোসেন, নীরেন্দ্রনাথ রায়, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, কাজী আবদুল ওদুদ, বিনয় ঘোষ প্রমুখ আরো বহু প্রাবন্ধিক বহু বিচিত্র বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বাংলা প্রবন্ধাকে দু’ভাগে রেখে আলোচনা করতে হবে। কেননা মাঝখানের কাঁটিাতার বাঙালি প্রাবন্ধিকদের অবস্থানকে নতুনভাবে চিহ্নিত করে দেয়। ভারতের মুলত পশ্চিমবঙ্গের প্রবন্ধ সাহিত্য এই পর্বে আরো বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। এর আগের পর্বে অর্থাৎ সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী কালে যাঁরা প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। এই পর্বে তাঁরা তো রইলেনই, আরও বহু প্রাবন্ধিক উঠে এলেন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে। যেমন— ঋত্বিক ঘটক, বাদল সরকার, উৎপল দত্ত, সত্যজিৎ রায় আবার আবু সয়ীদ আইয়ুব, সৈয়দ মুজতবা আলি, সমর সেন, অশোক মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, তেমনি আবার হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অসীম রায়, শিবনারায়ণ রায়, সরোজ আচার্য, অশীন দাশগুপ্ত তেমনি আবার হীতেশরঞ্জন সান্যাল বা অর্মত্য সেন তেমনি আবার রাজেশ্বর মিত্র, নারায়ণ চৌধুরী, দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায় অথবা সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সমরজিৎ কর, পথিক গুহ প্রমুখ। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দেখা যায় একের সঙ্গে অন্যে মিলিত হয়ে তৈরী করেছে একটি নতুন বিষয়— নতুন শাখা। ফলত এই পর্বের বহু প্রবন্ধেরই শ্রেণীবিভাগ করা খুব শক্ত। সেখানে সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্র এমনকি শিল্প—সব একের সঙ্গে অন্যে মিলিত হয়ে নতুন নতুন প্রবন্ধের সৃষ্টি হয়ে চলেছে।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশভাগ জনিত কারণে বাঙালি প্রাবন্ধিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে বসে লিখেছেন। এবং বাহান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম— নানান মতবিরোধ তাঁদের মনন-চিন্তনকে যেমন করেছে ক্ষত-বিক্ষত তেমনি জাগিয়েছে আত্মজিজ্ঞাসা। কাজী মোতাহার হোসেন, ড. এনামুল হক, আবুল ফজল, কাজী দীনমহম্মদ, মুহম্মদ আবদুল হাই, আহমদ রফিক, হাসান জামান, বদরউদ্দীন উমর, আবুল কাসেম, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম প্রমুখ বহু চিন্তাবিদ এই পর্বে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যদিও বিষয় বৈচিত্র কম। ১৯৪৮-৬৮ পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যের মৌলিক চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন বিখ্যাত প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মহাশয়। তার মতে এই সময়ে প্রকাশিত বইগুলি থেকে প্রকাশকের নাম বা চিহ্ন তুলে দিলেও ভাবীকালের সমাজ বিজ্ঞানীদের চিনতে অসুবিধে হবে না এগুলি কোথায় এবং কোন সময়ে লেখা। আসলে এই সময় বিষয়ের এই একমুখিনতাই স্বাভাবিক। এমনটা না হলেই বরং চিন্তার কারণ হতো, কেন এমনটা হল না?
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের পরপরই প্রবন্ধের মূল বিষয় হিসেবে দেখা যায় আত্মানুসন্ধানের এক অন্যমাত্রা। ১৯৭২-এ প্রকাশিত “হে স্বদেশ’ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত মহম্মদ এনামুল হকের বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও সভ্যতার লক্ষ্য প্রবন্ধের কিছুটা অংশ তুলে ধরলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে—“হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সর্বধর্মাবলম্বী নির্বিশেষে আমরা ‘বাঙলাদেশের বাঙালি’। এই বাঙলাদেশের বাঙালি হিসাবেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে, মরতে হবে এবং বিশ্বের দরবারে পরিচয় দিতে হবে। সুতরাং, এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, আমাদের নতুন রাষ্ট্রের নতুন সংস্কৃতি ও সভ্যতার একমাত্র বাঙালিয়ানা ছাড়া আর কোন লক্ষণ হতেই পারেনা। আমাদের সাহিত্য, সঙ্গীত, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, নৃত্য, চিত্র, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা, সর্বোপরি জীবনযাপন পদ্ধতি প্রভৃতি সংস্কৃতি ও সভ্যতার সর্বক্ষেত্রে এখন থেকে এ বাঙালিয়ানাই ফুটে উঠবে—এর জন্যই জাতি অধীরভাবে প্রতীক্ষিত।”
পরবর্তীকালে যে সমস্ত প্রবন্ধ রচিত হয়েছে (সময়গত দিক থেকে) অর্থাৎ যাঁরা আগে লিখেছেন এখনও লিখছেন কিংবা পরবর্তীকালে নতুন করে যে সমস্ত প্রাবন্ধিক উঠে এলেন তাদের রচনা তাই হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময়। আকবর আলি (বিজ্ঞান বিষয়ক), মোবাশ্বের আলি(শিল্প), জিয়া হায়দার, কবীর চৌধুরী, সেলিম আলাদীন (নাট্যবিষয়ক), সনজীদা খাতুন, আলতাফ হোসেন (সংগীত বিষয়ক), ময়হারুল ইসলাম(লোকসংস্কৃতি), বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (চিত্র বিষয়ক) এছাড়াও আরো বহু প্রাবন্ধিক — আহমদ শরীফ, আবদুল হক, মুনীর চৌধুরী, মুস্তাফা নুরুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফা, আবুল কাসেম, ফজলুল হক প্রমুখ বহু প্রাবন্ধিকের রচনায় বারবার উঠে আসে বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় বহু দিক।
তাই বলছিলাম, আমাদের বহুমাত্রিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে, সাহিত্যের যদি কোন শাখা সামগ্রিক ভাবে ধরতে পারে, তাহলে তা অবশ্যই প্রবন্ধশাখা ।

উৎপল মণ্ডল, পিএইচডি। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বীরভূম। পেশাগত জীবনে তিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ