প্রিয় সুমন্তদার গল্প

সুদীপ ঘোষাল
ছোটগল্প
Bengali
প্রিয় সুমন্তদার গল্প

অসীম ও মাসির কথা
সুমনদা বললেন,আমরা চারজন বন্ধু চিনু, ভব,অসীম,তারকেশ্বর ও আমি দীঘা বেড়াতে গেলাম কলকাতার ধর্মতলা থেকে বাস ধরে।পৌঁছানোর পর বঙ্কিম আমাদের লজ খুঁজতে সাহায্য করল।তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে আমরা লজের কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে থাকা খাওয়ার সমস্ত ব্যাবস্থা করে নিলাম। পিনু,মিলু,বিশু ও আমি চারজনে একটি ঘর নিলাম। তারপরের দিন দীঘার দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখলাম।
রোশনি বলল,অমরাবতী লেকের সাথে ছোট একটি পার্ক ও একটি সর্প-উদ্যান আছে। নৌকা ভ্রমণের সুবিধাও আছেে।
সুমনদার বন্ধু মিলু বলল,জুনপুটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পরিচালিত মৎস্য দপ্তরের মৎস্যচাষ ও মৎস্য গবেষণাকেন্দ্র আছে।আমি জানি মন্দারমণি, কাঁথি থেকে ১২ কিমি দূরে অবস্থিত বালুকাভূমিটির নাম স্থানীয় মন্দার ফুলের নামানুসারে রাখা হয়েছে। লাল কাঁকড়া অধ্যুষিত জায়গাটি এখন অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশ যাপন কেন্দ্র।
তোতন বলল,তাজপুর,মন্দারমণি ও দীঘার নিকটে অপর একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরী হয়েছে। এখানে একটি সমুদ্রবন্দরের কাজ চলছে। উদয়পুর, নিউ দীঘার পাশে উড়িষ্যার বালেশ্বর জেলা ও বাংলার সীমানায় উদয়পুর সমুদ্রতট।শিবমন্দির, চন্দনেশ্বর, দীঘার ৬ কিমি পশ্চিমে এটি অবস্থিত। বিশুর পরামর্শমত আমরা ঘোরাঘুরি করলাম,দুপুুর অবধি।
দুদিন পরে আবার আমরা অজানা আকর্ষণে মন্দারমণি গেলাম। এখানে কমবয়সি ছেলেমেয়রা গাইডের কাজ করে আয় করে। পৌঁছানোমাত্রই একটি কমবয়সি মেয়ে এসে,আমাদের ঘর ভাড়া করার জন্য নিয়ে গেল একটা বাড়িতে।বাড়িটা ফাঁকা।মেয়েটি বলল,আমি মোবাইলে কথা বলে নেব ম্যানেজারের সঙ্গে।আপনার ঘরে মালপত্তর রেখে ঘুরতে চলুন। আমরা একটু ঘোরাঘুরি করলাম,এখানে ওখানে মেয়েটির সঙ্গে।বিশু বলল,তোমার নাম কি?
– আমার নাম হল হল রোশনি এখান থেকে দু কিলোমিটার দূরে একটা গ্রামে আমার বাড়ি।পিনু বলল,রোশনি, একদিন তোমার বাড়ি যাব।
রোশনিও আমাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু একটি মেয়ে যে আমাদের সঙ্গে আছে সেকথা জেনেও আমাদের মনে কোন প্রতিক্রিয়া হয় নি। রোশনি আমাদের অভিভাবিকার মত হয়ে গেল।
পিনুর কথায়, রোশনি সম্মতিসূচকভাবে ঘাড় নাড়িয়ে চলে গেল আড়ালে। বিশু বলল,মেয়েটা খুব ভাল। ওর কথাবার্তাও খুব সুন্দর।
আমি বললাম,কিরকম লাগছে তোকে বিশু? প্রেমে পড়ে গেলি নাকি? প্রেমে পড়লে এরকম কথা বলে ছেলেরা।তোর কি সেরকম কিছু হল?
তোতন বলল,হতেও পারে। অসম্ভব কিছু নয়।আমাদের তো এটা প্রেম করার বয়স। তারপর সবাই আমরা হেসে উঠলাম ওর কথা শুনে।
তারপর ঘোরাঘুরি শেষে লাল কাঁকড়া দিয়ে ডিনার সেরে ভাড়া ঘরে এসে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। বিকেল হল।চা, বিস্কুট খেলাম।রাতের খাবারও পেলাম।সাদা আ্যপ্রনে ঢাকা একজন লোক এসে বলল,আপনারা শুয়ে পড়ুন।আমি বাইরের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। তারপর রাত এগারোটা নাগাদ আমরা সকলে ঘুমিয়ে পড়লাম।প্রায়
রাত দুটোর সময় পিনুর চিৎকারে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে।পিনু বলল, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এখানে।মিলু বলল,হ্যাঁ,ঠিক কথা, একটা মেয়ে দেখলাম পিনুর খাটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
বিশু বলল,মেয়েটা কেমন দেখতে?
পিনু বলল,আমরা যে মেয়েটাকে গতকাল দিনের আলোয় বালির চরে দেখেছিলাম,সারাদিন আমাদের সঙ্গে ছিল, এটা সেই মেয়ে রোশনিই ছিল।তোতন বলল, ম্যানেজারকে,কি করে রোশনি ঢুকল ঘরে। দরজা তো বন্ধ ছিল।
ম্যানেজার বলল,বসুন আপনারা।দরজা বন্ধ থাকলেও ঢুকতে পারে রোশনি। মেয়েটি এখানে রোজ আসে। আপনাদের মত রোশনিও বেড়াতে এসেছিল বর্ধমান থেকে ওর বন্ধুদের সঙ্গে।পরের দিন বালুচরে দুটো লাশ পাওয়া যায়। বদউদ্দেশ্য নিয়ে কেউ বেড়াতে এলে ও তাদের হত্যাকরে প্রতিশোধ নেয়।
কাহিনী শুনে আমাদের আর ঘুম হলো না। নিজেরা ঘরে গিয়ে আলোচনা করলাম, আর এখানে না থাকাই ভালো।তোতন বলল,ভালোয় ভালোয় বাড়ি চলে যাওয়াই ভাল।
মন্দারমণিতে তখন মন্দার ফুলের গন্ধ বাতাসজুড়ে।রাতে বেশ লাগছিল।চাঁদের আলো আর ফুলের সৌরভ একাকার হয়ে গেছিল সে রাতে, রোশনির দীর্ঘশ্বাসে।

পরেরদিন আমরা ব্যাগগুছিয়ে ম্যানেজারের ঘরে গেলাম।গতরাতের ঘর তো নয় এটা , এঘরটা তো মাকড়সার জালে ভর্তি।রোশনিই আমাদের এই বাড়িতে এনেছে।রোশনি বাড়িতে ঢোকে নি কিন্তু ঘরের সব দরজা খোলা।পিনু বলল,অবাক কান্ড।
রাতে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা হয়েছিল টাকাপয়সার ব্যাপারে।আর কোন লোককে আমরা এ বাড়িতে দেখি নি।
আমরা বাইরে এসে কয়েকজনকে দেখতে পেলাম চায়ের দোকানে।আমি বললাম, কাকু এই বাড়িতে আমরা দুদিন ছিলাম।ভাড়ার টাকা বা খাওয়ার মূল্য নেওয়ার লোক এ বাড়িতে নেই।কি করি বলুন তো?
লোকটি বলল,ওটা ভূতের বাড়ি।প্রাণে বেঁচে গেছেন, ভূতের খাবার খেয়েছেন,ভূতের সঙ্গে গল্প করেছেন। এখন বাড়ি যান।ও বাড়িতে পাশের গ্রামের মৃত রোশনির আত্মা পাহারা দেয়। ম্যানেজার ছিল, ওর ছেলে বন্ধু। রোশনি মরে যাওয়ার পর ওর বন্ধু ম্যানেজারও আত্মহত্যা করে, গলায় দড়ি দিয়ে। তারপর থেকে ও এই বাড়িতেই থাকে।ওরা বেড়াতে এসেছিল এ বাড়িতেই।কতযুগের পুরোনো এ বাড়ি তা কেউ জানে না। তবে যারা সভ্য, ভ্রমণপিপাসু বা ভদ্রলোকদের কোন অসুবিধা হয় নি আজ পর্যন্ত। কোন খারাপ কাজ এ বাড়িতে হলে তার আর রক্ষা নেই।এরকম কত ঘটনা যে আছে তা বলে শেষ হবে না। যান, তাড়াতাড়ি যান,এই তো বাস এসে গেছে, চেপে পড়ুন। আমরা চায়ের দাম দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম কম্পিত হৃদয়ে।

তোতনের বন্ধু অসীমের মাসি ফুটপাতের এক কোণে কোনোরকমে থাকে। তার কোনো ছেলেমেয়ে নেই।একদিন ফুটপাতে কুড়িয়ে পেলো একটা শিশুকে।তাকে ভগবানের দান মনে করে মানুষ করতে লাগলো।তারপর মাসি আরও চারজন অনাথ শিশুর খোঁজ পেলো। মাসি ভিখারী হতে পারে কিন্তু তার পড়াশোনার যোগ্যতা, বুদ্ধি ভালোই ছিলো। শিক্ষিতা রুচিশীল মাসি কি করে ভিখারী হলো, সে ঘটনা পুরো বলতে গেলে ইতিহাস হয়ে যাবে। যাইহোক স্বাধীনচেতা মাসি স্বামীর ঘর ছেড়ে ফুটপাতে আশ্রয় নিয়েছিলো বাধ্য হয়ে। মাসি এবার পাঁচ শিশুকে নিয়ে সরকারী অফিসে হানা দিতে শুরু করলো। একদিন এক সরকারী আধিকারিক বললেন,মাসি আপনার কোনো পরিচিতি নেই।আপনার অনাথ আশ্রমের কোনো জমি নেই। কি করে আপনি অনাথ আশ্রয় গড়ে তুলবেন।আপনার অর্থবল,জনবল কিছুই নেই।মাসি বললো,কিন্তু আমার একটা জিনিস আছে, তা হলো ইচ্ছাশক্তি। আমি আশ্রম গড়ে তুলবোই।আপনি দেখে নেবেন। আমার সে মনোবল আছে।পাঁচ শিশুকে নিয়ে মাসির পথ চলা শুরু হলো। তিনি ভিক্ষা করে অই শিশুদের পরিচর্যার ব্যবস্থা করলেন।পাঁচ শিশুকে দেখে একদিন সুমনবাবুর মায়া হলো। তিনি মাসিকে বললেন, আপনার শিশুদের থাকার জন্য আমি ঘর তৈরি করে দেবো। আমি জায়গা দেবো। আমার যতটা সাহায্য করা প্রয়োজন আমি করবো। আইনের ঝামেলা আমি দেখাশোনা করবো।
মাসি জোড় হাতে সুমনদাকে নমস্কার জানালো। কেতুগ্রামের ফাঁকা জমিতে ঘর তৈরি হলো প্রথমে দুটি। তারপর শুরু হলো মাসির বিজয় যাত্রা। তারপর সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য আসতে লাগলো। তৈরি হতে লাগলো আরও ঘর। বাউন্ডারি হলো। আর অনাথ শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকলো। প্রথমে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে রান্না করা মাসি আজ গ্যাস ওভেনে রান্না করে নিজের শিশুদের জন্য।মাসিকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি। কিন্তু বাদ সাধলো আর এক বিপদ। একদিন আশ্রম থেকে তিনটি শিশু চুরি হয়ে গেলো। মাসি পাগলের মত খুঁজতে শুরু করলেন শিশুদের। এক রাখালের কাছে খবর পেলেন, এক পাষন্ড তিন শিশুকে হাত পা বেঁধে রেখেছে চিলেকোঠার ঘরে। রাখালকে নিয়ে মাসি থানায় গেলেন। পুলিশের সাহায্যে ধরা পড়লো বিরাট শিশু পাচারকারী দল।রাখাল অই মালিকের কাছেই কাজ করতো। তিনজন শিশুকে কাঁদতে দেখে রাখালের সন্দেহ হয়। তারপর মাসি জিজ্ঞেস করাতে সব ছবি পরিষ্কার হয়ে যায়।রাখালকে মাসি অনাথ আশ্রমের এক অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করলেন। এইভাবে মাসি এলাকার মানুষের কাছে মা বলে পরিচিত হলেন। তিনি এবার আর একটি আশ্রম গড়ে তুললেন শালারে। এইভাবে মাসির পাঁচ পাঁচটা আশ্রম চলছে সুন্দর পরিবেশে মানুষের সহায়তায়।

ভবরঞ্জন ও চিনুর কথা

সুমনদার বন্ধু চিনুর বাড়ির সামনে একটা পুকুর ছিল । ওরে যাস না ওদিকে, পুকুর আছে ডুবে যাবি
— না মা, কিছু হবে না

ছোট থেকে চিনু দুরন্ত, একরোখা ছেলে। ভয় কাকে বলে সে জানে না। এই নিয়ে তার পরিবারের চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এইভাবে প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে যায় মানুষ । কত কি শেখার আছে প্রকৃতির কাছে। কিন্তু কজনে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু চিনু সেই শিক্ষা নিয়েছিল। গ্রামের সকলে তাকে একটা আলাদা চোখে দেখত।বেশ সম্ভ্রমের চোখে। পরিবারের সকলে জানে না, কি করে চিনু শিক্ষা পেল। প্রথাগত শিক্ষা সে পায় নি। তবু বাড়িতে দাদুর কাছে লেখাপড়া শিখেছে। বই পড়া শিখেছে। চিনু বলত, দাদু কি করে তুমি বই পড়। আমি পারি না কেন? দাদু বলতেন, নিশ্চয় পারবি। মনে মনে বানান করে পড়বি। দেখবি খুব তাড়াতাড়ি বইপড়া শিখে যাবি।
হয়েছিল তাই। দুমাসের মধ্যে চিনু গড়গড় করে বই পড়ত।কোনো উচ্চারণ ভুল থাকত না।
দুপুরবেলা হলেই চিনু বন্ধুদের নিয়ে কদতলা, বেলতলা, আমতলা, জামতলা দৌড়ে বেড়াত। কাঁচা কদ কড়মড় করে চিবিয়ে খেত। লাঠিখেলা,কবাডি সব খেলাতেই তার অদম্য উৎসাহ। গ্রামের লোকের উপকারে তার দল আগে যায়।

এই দাপুটে ছেলে চিনু একদিন এক সাধুর সঙ্গে ঘরছাড়া হল। বাড়ির সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু চিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

একদিন গ্রামের একজন গিয়ে দেখল, সাধুর আশ্রমে সবুজ গাছ যত্নের, কাজ করছে চিনু….

আজ সুপার মার্কেটের পুরো গাছগাছালির আড়াল ঘিরে শুরু হয়েছে পৌষ পিঠের মেলা। এই মেলার সামনের পাড়ায় বস্তি এলাকায় কিছু গরীব সংসারের আবাস। তারা সুপার মার্কেটের সামনে থাকে এই নিয়ে তাদের গর্বের শেষ নেই। কারণ এই মার্কেট জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় মেলা,সার্কাস আর বাজার। আর সেখানে কাজ করে তাদের ভালমন্দ খাবার জুটে যায়। শুধু বর্ষাকালে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। তখন ঝড়ে ডালপালা ভাঙ্গে আর সেই ডালপালা নিয়ে এসে তারা বাড়িতে ফুটিয়ে নেয় দুমুঠো চাল। পুকুরের গেঁড়ি, গুগুলি তখন তাদের একমাত্র ভরসা।

আজ পৌষ পিঠের মেলা। দুটি বছর দশেকের শিশু চলে এসেছে মেলায়। তাদের টাকা পয়সা নেই। ঘুরে বেড়ায় উল্লাসে। তারপর বেলা বাড়ে আর তাদের খিদে বাড়ে সমানুপাতিক হারে। খিদে নেই ওদের যারা ঘুরে ঘুরে পিঠে খায়। ফেলে দেয় অর্ধভুক্ত পিঠের শালপাতার থালা। ডাষ্টবিন ভরে যায় খাবারসহ শালপাতায়।

শিশু দুটি অবাক চোখে ডাস্টবিনের দিকে এগোয়। দেখে গোটা গোটা পিঠে। তুলে নেয় হাতে। দোকানদার চিৎকার করে বলে, পালা পালা। যত সব ভিখারীর দল।
পাশে আলো মুখে একজন মহিলা এগিয়ে আসে। সে বলে, তোদের বাড়ি কোথায়। শিশু দুটি দেখিয়ে দেয় তাদের পাড়া। মহিলা বলে, আমাকে তোদের বাড়ি নিয়ে যাবি?
শিশু দুটি হাত ধরে নিয়ে আসে তাকে। পথে হাঁটতে হাঁটতে মহিলাটি বল, আমি তোদের দিদি। আমাকে দিদি বলে ডাকবি।
বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শিশু দুটি বলে, মা মা দেখ দিদি এসেছে আমাদের বাড়ি। মা তো অবাক। তারপর জানতে পারে সব। পেতে দেয় তালপাতার চটাই। একগ্লাস জল খেয়ে দিদি ব্যাগ থেকে বের করে পিঠের প্যাকেট। সকলে একসাথে বসে খায়।

দিদি বলে শিশু দুটির মা কে, আমার ছেলেপুলে হয় নি। তোমার বাচ্চাদের দেখে চলে এলাম তোমাকে দেখতে। জানো ভগবান, সকলকে সবকিছু দেয় না। তোমাকে যেমন টাকা পয়সা দেয় নি আর আমাকে আবার সন্তান দেয় নি।
তারপর শিশু দুটির পিঠে খাওয়ার পরে কি নাচ। আনন্দে নাচতে নাচতে তারা দিদির সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।

দিদি নতুন করে বাঁচার রসদ পেয়ে যায়। দিদির চোখে ভেসে ওঠে বস্তির সকল শিশুর পেট ভরে খাওয়ার পরে আনন্দের নাচ।

অনুপের কথা

দুপুর হলেই অনুপ ছিপ হাতে চলে যায় কলাবাগানের পুকুর পাড়ে। সেখানে ঘাস জঙ্গল পরিষ্কার করে রাখাই আছে। স্নান করার সময় চারকাঠি পুঁতে রেখে যায়। দুপুরে একটা চট আর ছাতা হাতে চলে আসে পাড়ে। তারপর বাগিয়ে বসে অনুপ। ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। ঠিক দুটো বাজলেই জগা রাঁধুনির বৌ চান করতে আসে পুকুরে। জগা পাড়ার যত ভোজকাজে সুন্দর রান্না করত। একদিন অতিরিক্ত মদ্যপান করে রান্না করছিল নেশায় চুর হয়ে। কখন যে উনুনের আগুন পিঠ বেয়ে ঘাড়ে উঠেছিল কেউ জানতে পারে নি। তার উপর শীতকাল। আগুনের তপ্ত আঁচ টের পেয়েছিল অনেক পরে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায় নি। তারপর থেকে বৌটা বিধবা। পাঁচ বছর হয়ে গেল। দুঃখের আঁচ এখন নিবু নিবু। ঘর করেছিল চারমাস।
অনুপ সব জানে। এতক্ষণ বৌটাকে দেখে তার সবকথা মনে পড়ছে। বৌটা চান করে বেশ খোলামেলা হয়ে। অনুপের আড়চোখে দেখাটা বৌটার গা সওয়া হয়ে গেছে। সে সোজাসুজি অনুপের দিকে তাকায়। কিন্তু অনুপের একটু লজ্জা পায়। যতই হোক পাড়ার বৌ। এতটা নির্লজ্জ সে হতে পারে না। আড়চোখে দেখেই তার সুখ। কেমন সুন্দর বুক দুখানা। অনুপ ভাবে, একবার যদি ওর চরণ দুখানি পাই নিজের করে, তাহলে আদরে ভরিয়ে দেব। ওর নামটা জানা হয় নি। একদিন ওর নাম জানব। অনুপ ভাবে, ও কি কখনও আমার হবে?

তারপর স্নান সেরে বৌটি চলে যায় মনটি ফেলে রেখে অনুপের কাছে। সারাদিনের ভাল থাকার রসদ পেয়ে যায় পাঁচ মিনিটের মানসিক অবগাহনে। শরীর মন প্রেমময় সুরে বাজতে থাকে পরবর্তী মিলনের অপেক্ষায়। বৌটি জানে অনুপ অবিবাহিত। সেও তাকে চায় একথা সে বুঝতে পেরেছে তার চোখের চাউনিতে।
তারপর রাত যায়। কোকিল ডাকে। মন উড়ু উড়ু দুপুরের অপেক্ষায়। রান্নাবান্না সেরে ঠিক দুটোর সময় চলে যায় পুকুরে। ফাঁকা দুপুরে, ফাঁকা পুকুরে শুধু ছিপ ফেলে তাকিয়ে থাকে মনের মাণিক।

অনুপ আজও কথা বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল প্রাণের টানে। সে ভাবে, কাল দেখা যাবে।

এইভাবে কেটে যায় মাসের পর মাস। কোনো কথাই হয় না তাদের মধ্যে। শুধু মন দেওয়া নেওয়ার পালা।

তারপর এক গ্রীষ্মের দুপুরে অনুপ স্নান করতে যায়। আজ মাছ ধরা বাদ দিয়ে অন্য কাজে মেতে যায় সে। ঠিক সেই সময়ে আসে বিধবা বৌটি। ঘাটে নামতে ইতস্তত করে সে। অনুপ ডাকে এস। এস। তোমার নাম কি?
—– বীণা

—- আমি বাজাতে পারি।

—–; সবাই বলে। পরে ছন্দপতন হবে না ত?
-*- একবার শুনেই দেখ।

বীণা নেমে যায় গভীরে। অনুপ আজ সফল। তার মনজালে ধরা পরে বড় মাছ। কি ছটফটানি তার। বাগে আনতে কম বেগ পেতে হয় নি। দুজনের যুগ যুগ চেনা হৃদয়ে সোহাগ উথলে ওঠে ফুটন্ত ডালিয়ার মত। অনুপ ডালিয়ার আঘ্রানে ভরিয়ে তোলে জলকেলির খেলা। বীণা নবজন্ম পায় সোহাগের ছোঁয়ায়।

বীণা কেঁপে ওঠে কামনার শীতে, বল, তুমি মিশে থেক আমার শিহরিত শিরায়। রক্তের মত প্রবিষ্ট হও হৃদয় প্রকোষ্ঠে। আমি শত খরার শুকনো জমি।

—- কেন তুম তো মাঝে মাঝে আসো পুকুরে। সাধ মিটিয়ে নিও।

— আসি, কিন্তু ভিখারীর আবেদন নিয়ে। মনের মহারাজ আজ পেয়েছি।

বলেই বধু তাড়াতাড়ি বাড়ির পথে এগোয়। কারণ কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে। বদনাম হবে।

উপোসী ছারপোকার মত অনুপের অনুভূতি। একটু আগেই সুখে নিমজ্জিত মন এখন আরাম চায় নিদ্রার। সে বকুলের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে।

অনুপ দুপুর গড়িয়ে ঠিক যখন গৃহস্থরা একটু ভাতঘুমে ব্যস্ত থাকে ঠিক সেই সময়ে আবার ছিপ হাতে বেরোয়। আর বিধবা বৌটি সেই সময়, চিনে নেয় অনুভবে,অভ্যাসে। দেহের রসায়ন যেজন জানে সেজন প্রকৃত রসিক। সেই রসিক নাগরের পাল্লায় পড়ে বধু কাম মাতাল। অনুপ পুরোপুরি তার মর্যাদা ভরিয়ে রাখে কানায় কানায়।

তবু এক দুপুরে পরিবারের আবেদন মিটিয়ে সে আসে পুকুরে। ননদের সন্দেহ হয়, এখন সে কোথায় চলেছে। পিছু পিছু গিয়ে লুকিয়ে থাকে শরবনে। দেখে বৌদির মাতলামি। সে ভাবে,বৌদি এত অসভ্য? এ তো অসতী। লোকজন জড়ো করে বিচার করে মেছেল প্রেমিকের। বিচারে ঠিক হয়, দুজনকে বিয়ে করে সংসারী হতে হবে। পঞ্চায়েত থেকে বর্তমানে লিখিত করে তারা বিয়ে করে। আর তাদের মিলনে কোনো বাধা থাকল না।

তারপর তারা আকাশের উন্মুক্ত প্রান্তরে হারিয়ে গেল স্বাধীনভাবে।

রমেনের কথা

রমেনবাবু বললেন,একবার তোর ছেলে নরেনের কথা ভাবলি না। বউ মরার বছর না ঘুরতেই আবার বিয়ে করলি।

নরেনের বাবা বলল, কি করবো বল। নকল সাধু হয়ে লোক ঠকাতে পারবো না। তাই আবার বিয়ে করলাম।

– কিন্তু তোর দ্বিতীয় স্ত্রী নরেনকে সহ্য করতে পারবে না। নরেনকে চিরদিন অত্যাচার সহ্য করতে হবে, সৎমায়ের ব্যাবহারে,ঘৃণায়। তার কথা আমি জানি। আমাদের পাড়ার বখাটে মেয়ে, তোর বর্তমান স্ত্রী । চিরকালের অসভ্য, কলহপরায়ণ।

এই কথা বলে রমেনবাবু চলে গেলেন।
ছেলে নরেন কলেজ থেকে এসে বললো,বাবা পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। আমি কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হবো।

বাবা চুপ করে আছেন। সৎমা, রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, একটা টাকাও পাবি না। আমাদের ভবিষ্যৎ আছে।তোকে আর পড়তে হবে না। নিজেরটা নিজে দেখে নে। তোর খাবার জোগাড় করতে পারবো না। যা বেরো এখান থেকে। মরেও না আপদ।তারপর স্বামীর সামনেই অকথ্য গালাগালি শুরু করলো। স্বামী আসামির মতো চুপসে গেলো ভার্যার ভয়ে।
ছেলে বাবাকে আবার বললো তার স্বপ্নের কথা।
বাবা সমস্ত কথা শুনলো।তবু উত্তর নেই। দ্বিতীয় ভার্যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে অযোগ্য বাবা। তার বাবা চুপ করে মাথা নিচু করে রইলো। নরেন বেরিয়ে গেলে সৎমা বললো, বুঝলে বাঁচলাম আমরা। পরের ছেলে থাকলেই ঝামেলা।

নরেনের মনে পড়ল তার মৃত মায়ের কথা। মা বলতেন, কখনও লড়াই করা ছাড়বি না। লড়াই করে বেঁচে থাকাই তো জীবন। সৎমার এই অপমান সে ভুলে গেল। সে দেখল এক আকাশ আলো। শুধু আলো আর আলো। জীবনে অনেক পথ খোলা। সে ছুটতে ছুটতে চলে গেল আলোর দেশে,যেখানে ঘৃণা নেই। এই খবরটা ছড়াতে সময় বেশি লাগলো না।সবাই জানল নরেন বাড়ি ছেড়ে চলে গেল চিরদিনের মত।

সৎমার কানে খবরটা গেলো।সে বলল,আপদ বিদেয় হয়েচে। তার বদনে তখন গোপন গর্বে গোবরের হাসি…

 

আবার ভ্রমণের কথা

সবাই তো দার্জিলিং,পুরী কিংবা দিঘা যায়। চল না নির্জন কোনো এক জায়গায়। যেখানে মানুষের ভিড় নেই। শান্ত সবুজের পরশ আছে। বললো দীপ।, অংশু বললো,চল যাওয়া যাক। কিন্তু সমমনস্ক আমরা দুজনে যাবো। কেনাকাটা করার লোকের সংখ্যা বেশি। তারপর আসল কাজ, ঘোরা, দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দীপ বললো,ঠিক বলেছিস। তাহলে ঝালং ওঝান্ডি ঘুরে আসি চল। অংশু রাজী হলো।

তারপর সামান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওরা বোলপুর থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে চলে এলো নির্দিষ্ট জায়গায়। একটা হোটেলে উঠে মালপত্তর রেখে দিলো ওরা। কিছু হাল্কা খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে পরলো বাইরে।

সুন্দর সবুজ পাহাড় দেখে মন জুড়িয়ে গেলো বল দীপ, অংশু বললো। দীপ দেখলো,সমান্তরাল পাহাড়ের শ্রেণী দিগন্ত ঘিরে রেখেছে। পাহারা দিচ্ছে সুন্দর বাগান।

মানুষের ভিড় খুব কম। তার ফলে নোংরা আবর্জনা কম। দীপ বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখতে পেলো। পাহাড়ি, লোকাল মেয়ে। খুব সাহস। ভাঙ্গা বাংলায় বললো,এ বাবু। বেশি ভেতরে যাস লাই। লাফা জোঁক আছে। রক্ত চুষে লেবে। দীপ বললো,তাহলে তুমি এলে কেনো। তোমার ভয় করে না। মেয়েটি খিল খিল করে হেসে উঠলো। বললো,ভয় কি রে।আমাকেই সবাই ভয় করে। তারপর কোমর থেকে একটা ধারালো কুকরি বের করে দেখালো। বললো,এর ডগায় বিষ মেশানো আছে রে বাবু। একটু ছিঁড়ে দিলেই কাম ফতে।

দীপের মনে আছে একবার কোম্পানী ওকে ডমিনিকান রিওপাবলিক পাঠিয়েছিলো। কাজ সেরে ও গিয়েছিলো হিস্প্যানিওলা দ্বীপ। ওখানে নিয়ে যাবার জন্য লঞ্চ আছে। লঞ্চ তো নয়, ছোটোখাটো জাহাজ। ভূগোলে পড়েছিলো ও দ্বীপের দখলাতি নিয়ে স্পেন আর ফরাসীদের মধ্য লড়াই। কলহ হবে না কেন। গাইড ওদের বলেছিলো,এখানে মাটি খুব উর্বর
সাধারণত সামুদ্রিক মাটিতে দুর্লভ। তারপর যোগাযোগ ব্যাবস্থা সবই ভালো।

মানুষে মানুষে মিল দেখলেই ভারতবর্ষের কথা মনে পরে। কৃষিনির্ভর দেশ। পাশ্চাত্য দেশের রাস্তাঘাট, টেলি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক,বিলাসবহুল রিসর্ট দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেছিলো দীপের। তবু ভারতবর্ষ, এক মন আনচান করার মোহময় দেশ। আনন্দময় দেশ।সেখানেও একটা সাহসী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো।

আবার পাহাড়ি মেয়েটার কথায় চেতনা ফিরে এলো দীপের। বললো কি দেখছিস হাঁ করে বাবু। আমাকে না ওই পাহাড়কে। দীপ বললো,দুটোই।
মমে মনে ভাবলো,তোমার পাহাড় তো বাস্তবের পাহাড়কে হার মানিয়েছে। সাহস হলো না বলতে। কুকরি আছে। সাবধান। দীপ ভাবলো,মেয়েরা এখানকার সব চেনে। গাইড হিসাবে একেই নিতে হবে। অবশ্য মেয়েটি রাজী হলে তবেই।

দীপ বললো,আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবি তোদের পাহাড়। আমার একটা বন্ধু আছে।
মেয়েটি বললো,আমার একদিনের মজুরি দিবি,তাহলে সব দেখাবো।

দেবো,দেবো নিশ্চয় দেবো।

আগে দে। গতবার এক হারামি পয়সা না দিয়ে পালিয়েছে।

দীপ একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে ওর হাতে দিলো। মেয়েটা হাসিমুখে একটা নমস্কার করলো। বললো,তু খুব ভালো। চ আমার সঙ্গে আয়।

দীপ আর অংশু ওর সঙ্গে গিয়ে দেখলো ওদের কাঠের বাড়ি। বুড়ো বাপ মেয়েটার রোজগারে খায়। খুব গরীব। এই গরীব মানুষগুলো ভারতের প্রাণ। বললো অংশু।বললো,এদের লাখ টাকা দিয়েও দেশ ছাড়াতে পারবি না। ওরা দেশকে হৃদয়ের এক অংশ মনে করে। দীপ বললো,এটা তোর পাকামির কথা। ভুগে মরবে তবু দেশ ছাড়বে না। তিন হাঁটুর এক মানুষকে দীপ বললো,আমার সঙ্গে যাবে। তোমার কোনো অভাব থাকবে না। লোকটি দুই হাঁটুর মাঝখান থেকে নেড়া মাথা তুলে বললো,তোর পয়সা তু রাখ,আমাকে আমার জাগায় থাকতে দে। মায়ের কোল ছেড়ে যাবো একবারে শ্যাষ দিনে। অংশু বললো,বেশি ঘাঁটাস না বোকাচোদা। ঝাড় খাবি।

মেয়েটা এবার সব জোগাড় করে ছাগলের দুধ দিয়ে চা বানিয়ে দিলো। দীপ আর অংশু খেলো
তারপর মেয়েটা ঝান্ডি পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে আনলো। ঝালং এ ওরা বাস করে। খুব দূরে দূরে দুএকটি বাড়ি। ছবির মতো কোন শিল্পী এঁকেছেন কেউ জানে না। বললো অংশু।

সব ঘোরানোর পরে মেয়েটা বললো,রাতে কখন আসবি। বলে দে। আমার কাছে সোজা কতা। শরীল লিতে গেলে আরও টাকা লাগবে।

দীপ বললো,তার মানে। সে আবার কি। তু আমাদের সব দেখালি, পয়সা নিলি। তোর পরিশ্রমের হক্কের পাওনা। মনে রাখবি। তুই খুব ভালো। যা বাড়ি যা। শরীর চাই না। যা।

মেয়েটার চোখে জল। বলে সবাই আমার রূপ দেখে, মন দেখে না। তোর ভালো হবে।

এই বলে চলে গেলো। সেই রাতে দীপ ঘুমোতে পারলো না। শুধু পাহাড়ের ছবি জুড়ে সবুজ বরণ সাজ। মন পাগল করা সরলতা।

অংশু বললো,তুই প্রেমে পড়েছিস নাকি?কালকে রাতে ঘুমিয়েছিস তো?

চারদিন ওখানে থাকার পর ওরা আবার কলকাতা ফিরে এলো। দীপ বোলপুরে কাজ করে। কলকাতায় মেয়ে আর মেয়ের মা থাকে। মেয়ের মা বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। ভালোবাসা কাকে বলে জানে না সে। দীপ ভাবে, হয়তো জিজ্ঞেস কর বে, ঘুরতে গেছিলে কেমন লাগলো। কিছু না। মেয়েটা এসে বললো,বাপি আমাদের এখানে একটা কাকু আসে মাঝে মাঝে। কে হয় আমাদের। দীপ সব জানে। ও বললো,আমাদের বাড়ি আসে মানেই আমাদের লোক। তোমার মায়ের বন্ধু। তুমি ভালো করে পড়বে। ওসব তোমাকে দেখতে হবে না মামণি।

দুদিন কলকাতা থেকে দীপ চলে গেলো বোলপুর কাজের জায়গায়। সারাদিন কাজ আর কাজ। বাড়ি ফিরে ও স্নান করে। মন আর শরীর দুটোই ফ্রেশ হয়। তারপর লেখা নিয়ে বসে। পড়াশুনা করে রাত বারোটা অবধি কোনো কোনো দিন। দীপ ভাবে, গ্রামে ও বড়ো হয়েছে। তুলি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ে। দীপ তখন বারো ক্লাসে। একই স্কুলে পড়তো দুজনে। সাইকেলগুলো একটা ঘরে রাখতে হতো। দীপ সুযোগ বুঝে তুলিকে ডেকেছিলো। সেই ডাকে কি ভীষণ সারা তুলি যে দিয়েছিলে তা আজও মনে আছে দীপের। কেউ ছিলো না। টিফিনে মিড ডে মিল খেতে ব্যস্ত সবাই। তুলি তার তুলতুলে শরীরে শরীর ঘষে শিহরণ তুলেছিলো সারা শরীর জুড়ে
।দীপ ভাবে,যদি তুলির সঙ্গে নদীর ধারে কুটির বেঁধে বাস করতো তাকে বিয়ে করে তাহলে এক টুকরো আকাশের মালিক হতে পারতো। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। মেয়ে আছে। মেয়ের জন্য ত্যাগ স্বীকার তাকে করতেই হবে। মেয়ের মা তাকে ভালোবাসে না। তার কাছে কোনোদিন শোয় না। তাহলে মেয়েটা কার? কার সুখ আমি বয়ে নিয়ে বেড়াই নিশিদিন। দীপ ভাবে ছি ছি কি ভাবছে এসব। মেয়ের অকল্যাণ হবে না।

তারপর সুখেদুখে কেটে গেলো কুড়ি বছর। মেয়ের মা মারা গেছে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। কোলকাতার বাড়িতে এখন জামাই আর মেয়ে থাকে। আর দীপ রিটায়ার্ড হওয়ার পরে বোলপুরেই থাকে।

একদিন দীপ শান্তিনিকাতনে ঘুরতে গেছে হেঁটে। এসময় হাঁটাহাঁটি শরীরের পক্ষে খুব ভালো। বয়স হয়েছে তো। দীপ হঠাৎ দেখলো একজন বিধবা মহিলা তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। দীপ বিব্রত বোধ করছে। তিনি এসেই বললেন,এই যে আপনাকে বলছি,আপনি দীপ না? দীপ অবাক। আমার নাম জানেন কে আপনি?

——আমি তুলি, তোমার তুলি।

——তোমার তুলি! ও আমার হারিয়ে যাওয়া তুলি।
—- হ্যাঁ আমার এখানেই বিয়ে হয়েছিলো। ছেলেপিলে নেই। স্বামী মারা গেছেন। বাড়িতে আমি একা। তুমি কোথায় থাকো?

—–;আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি।

—–ও কোলকাতায় থাকো না।

——না ওখানে মেয়ে থাকে। তার মা মরে গেছে অনেক আগেই।

——তা হলে এখন আমরা আবার আগের মতো হয়ে গেছি,সময়ের বিচারে।

—–কেন,আশীর্বাদ বলা যায় না?

——বলতে ভয় হয়। পোড়া কপাল আমার।

——সময় তো আশীর্বাদই করে,মানুষ তার যথাযথ সদব্যবহার করতে পারে না।

দীপ তুলিকে নিয়ে এখন কোথাও যেতে পারবে না। কারণ তুলি বিধবা । প্রথমে সঠিক একটা পরিচিতি বানাতেই হবে। তা না হলে মানুষ বিভিন্ন রকমের কথা বলবে। তাই একটা ভালো দিন দেখে ওরা বিদ্যাসাগরের ছবিতে প্রণাম জা নিয়ে কঙ্কালিতলায় বিয়েটা সেরে নিলো। তারপর নতুন একটা ঘর দেখে কীর্ণাহার শহরে ঘর ভাড়া করলো। সবাই নতুন বুড়োবুড়িকে বেশ হাসিমুখে বরণ করে নিলো।পূর্বকথা ওরা কেউ জানলো না। তুলির বাড়িটা বিক্রি করে অনেক টাকা পেয়েছে। ওরা ঠিক করলো,আর বাড়ি করবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তো আপন বাড়িতে ফিরতে হবে। তাই তার আগে ভারতবর্ষের সমস্ত জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখবে। আর দীপ তার কলমে ফুটিয়ে তুলবে ভারতবর্ষের রূপ।

বাইরের ডাকে সাড়া দেবার আগে দীপ মেয়েকে মোবাইলে সব কথা জানালো। মেয়ে বাবার খুশিতে সুখী হলো। এবার দীপও তুলি বেরিয়ে পরলো আনন্দের সন্ধানে। ওরা চলে গেলো হিমালয়। কেদারনাথ,বদ্রিনারায়ণের পট খুলবে তৃতীয়ার দিন থেকে সাত দিনের মধ্যে।

হিমালয়ের পথে পথে কেদার, বদ্রি, উখিমঠ,তিঙ্গনাথ,চোপতা সব ঘোরা হলো দুজনের। পরের দিন সকালে হরিদ্বার থেকে গাড়িতে রওনা হয়ে পথে পথে দেবপ্রয়াগ। ভাগীরথী এবং অলকানন্দ বেশ কিছুটা পথ আলাদা ভাবে গিয়ে গঙ্গা নামে বয়ে চলেছে। বাণীপ্রসাদ গাইড। সে সব বুঝিয়ে চিনিয়ে দিচ্ছে।দীপ আর তুলি দুজনেই খাতা, পেন বের করে সব টুকে রাখছে। লেখার সময় কাজে আসবে,বললো তুলি। বাণীপ্রসাদজী বলে চলেছেন,আমাদের বাস কর্ণপ্রয়াগে চলে এসেছে। গাড়োয়ালে অলকানন্দার সঙ্গে কুমায়ুন থেকে বয়ে আসা পিন্ডার নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। রাতে পিপলকোটি হোটেলে আশ্রয় নিলো সবাই। মোট তিরিশজন যাত্রী আছে । কেউ গুজরাটি।কেউ মারাঠি কেউবা বিদেশী টুরিষ্ট। সারা পৃথিবীর মিলনমেলা। বাইরে বেরোলে মন বড়ো হয় বলো,বললো তুলি। দীপ বললো,এদের মাঝে এসে আর কোনো দুঃখ আমাদের কাহিল করতে পারবে না। জীবন শুধু সংসারে আবদ্ধ রাখলে হবে না। তুলি মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর রাত কেটে গেলো । প্রভাতের আলোতে তুলি আর দীপ বন্দনা করলো জগদীশ্বরের। তারপর প্রাতরাশ সেরে ওরা বেরিয়ে পরলো যোশীমঠ হয়ে বিষ্ঞুপ্রয়াগ। তুলি বললো,এখানেই নারদমুনি ভগবানের বরে তাঁর অভিশপ্ত মানবজীবন থেকে মুক্তি পান।
গাইড এবার বললেন,আমরা বদ্রি নাথে এসে পরেছি।

সত্যযুগে শ্রীবিষ্ঞু এখানে পদার্পণ করেছিলেন। বিশাল কষ্টিপাথরের মূর্তি। দীপ বললো,চলো এবার দুপুরের খাবার খাওয়া যাক। তারপর বিকালের দিকে পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষের শেষ গ্রাম মানাগ্রাম। মানাগ্রাম খুব ভালো লেগে গেলো তুলি ও দীপের। ওরা গাইডকে হোটেল ও খাওয়া খরচাবাবদ সমস্ত টাকা মিটিয়ে দিয়ে বললো,ভাই আমরা এখানেই থাকবো। আর কোথাও যাবো না। গাইড বললো,আপলোগকো বালবাচ্চা কিদার হ্যায়। দীপ বললো,হাম অর মেরে জানানা। অর কোই নেহি। গাইড বললো,হম আপকো লেড়কা মাফিক,আপ্লোগোকা খেয়াল রাখুঙ্গা। দীপ ওর কথা শুনে আরও পাঁচশো টাকা বখশিস দিলো। সে বললো,বাপকা দিয়া হুয়া আশীর্বাদ এহি রুপাইয়া। হম খরচা নহি করেঙ্গে। মেরা সাথ সাথ রহেগা। চোখের জলে বিদায়ের পালা শেষ হলো। তুলি আর দীপ মানাগ্রামে একটা ঘর নিলো। সামনেই বদ্রিনাথ। সকালে পুজো দেয়,প্রার্থনা করে। রান্না করার সবকিছু জোগাড় হয়েছে। কোনো অসুবিধা নাই। সামনে শ্মশান আছে। গাড়ি করে নিয়ে যায় এরা। কিছুটা দূরে সরস্বতি নদী পাহাড়ের ফাটল থেকে অলকানন্দা নাম নিয়ে বদ্রিনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। মন খারাপ হলেই ওরা দুজনে সেখানে বসে। তুলি বলে, প্রকৃতির ভাষা পড়তে পারলে কোনো দুঃখ থাকে না। মানা গ্রামের কিছুটা দূরে চিনের বর্ডার।
এগ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যেক পরিবারের কেউ না কেউ ভারতীয় সেনা বিভাগের কাজে যুক্ত।

ওখানে থাকাকালীন সকলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেলো তুলি আর দীপের। ভাষা ওদের বাধা হয়নি। অল্প হিন্দী ভাষা এরা জানে। আবার ওদের কেউ কেউ বাংলা জানে।

হঠাৎ একদিন সেই গাইড এসে হাজির। সে বললো,মা কিছু বাংলা হামি জানি। হামি এখানে টুরিষ্ট আনলে একবার দেখা করে যাবে। তুলি বললো,নিশ্চয় আসবে বাবা।

দীপ ভালো মিষ্টি এনে পাতানো ছেলেকে খাওয়ালো।
তুলি এক নতুন বৌয়ের কাছে যায়। তার স্বামী বিয়ের পরে যুদ্ধে চলে গেছে। খুব চিন্তা। তুলি সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু একদিন খবর আসে তার স্বামী যুদ্ধে নিহত। কি মর্মান্তিক ভাষায় বর্ণনা কর যায় না, বললো দীপ। ওর শ্বাশুড়ি বললো,অপয়া মেয়েটা আমার ছেলেকে খেলো। ওকে ঘরে রাখবো না। শেষে তুলি তাকে তুলে আনলো মেয়ের পরিচয়ে। সে তাদের মেয়ে হয়ে আছে। খুব কম বয়স মেয়েটার। সতেরো বছরের রূপবতী মেয়ে। সবার লক্ষ্য তার দিকে। দীপ বললো,এর বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মেয়েটার বাবা মা বললো,আপলোগ ব্যাবস্থা করে দিন। আমরা গরীব আদমী। তুলি বললো,ঠিক আছে, তাই হবে।

আবার একমাস পরে গাইড ছেলেটি এলে তুলি বললো, তোমার বিয়ে হয়নি? ছেলেটি বললো কে দেবে আমাকে লড়কী বলেন। দীপ বললো,তোমার মতো আমার একটা মেয়ে আছে। করবে বিয়ে। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিলো। স্বামী মারা গেছে।

গাইড বললো,করবো সাদী।

তারপর মেয়েটিকে দেখে গাইডের খুব পছন্দ। একদিন বাবা মা কে দেখিয়ে নিয়ে গেলো
গ্রামের সবাই উপস্থিত থেকে ওদের বিয়ে দিয়ে দিলো।

আটদিন পরে যখন ওরা এলো খুব ভালো লাগছিলো তুলির। কি সুন্দর মানিয়েছে। ঠিক যেনো হরগৌরী। গ্রামের লোক সবাই ধন্য ধন্য করলো তুলি ও দীপের নামে। গ্রামের প্রিয়জন হয়ে গেলো ওরা। কিন্তু ওরা বাঁধা জীবনে আর থাকবে না।

কাউকে কিছু না জানিয়ে সমস্ত মায়া ছেড়ে তার আবার চললো অজানার সন্ধানে, পথে পথে…

এবার ওরা গেলো পুরী। জগন্নাথ দেবের দর্শন সেরে সমুদ্রের কাছে একটা ঘর ভাড়া করলো।
পরিচয় হলো শিবরূপের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। সমীর বলে একটি ছেলে একদিন বললো,দীপ দা একদিন আমার বাড়ি চলুন। দীপ বললো যাবো। তুলিকে দীপ বলছে, বুঝলে আজ সমীর বলে একটি ছেলের সাথে পরিচয় হলো। সে অনেক কথা বললো।তার কাছে শোনা কথা তোমাকে বলি শোনো।
সমীর সমুদ্রের কাছাকাছি একটি গ্রামে বাস করে । তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ।স্ত্রী রমা খুব কাজের মহিলা । কাজের ফাঁকে গাছ লাগায় ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে । সমীর গ্রামে গিয়ে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগায়।আবার সময় পেলেই বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে অনেক অজানা তথ্য গ্রামবাসীদের শোনায়।
——- পরিবেশ বলতে কি বোঝায় গো অমর দা?একজন গ্রামবাসী জিজ্ঞাসা করলেন ।

—–সবুজ গাছপালা,জীবজন্তু,মানুষ নিয়েই পরিবেশ। আমাদের পৃথিবীর নানা দিকে বরফের পাহাড় আছে ।অতিরিক্ত গরমে এই বরফ গলে সমুদ্রের জল স্তর বাড়িয়ে দেবে ।ফলে সুনামী , বন্যায় পৃথিবীর সবকিছু সলিল সমাধি হয়ে যাবে । সবুজ পরিবেশ আমাদের বাঁচাতে পারে একমাত্র।

——তাহলে এর থেকে বাঁচার উপায় কি?
—-মানুষকে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে ।
——কি পদ্ধতি বলুন দাদা । কি করতে হবে আমাদের,সাধ্যমত করবো।
——এই যে পাখি ওপশুরা মল ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে তার সঙ্গে গাছের বীজ থাকে ।এই বীজ গুলি থেকে বিভিন্ন গাছের চারা বেরোয় । বাবলা,গুয়ে বাবলা,নিম, বট,প্রভৃতি চারা প্রকৃতির বুকে অযাচিত ভাবেই বেড়ে ওঠে ।শিমূল গাছের বীজ উড়ে চলে আসে । একে আমরা বুড়ির সুতো বলি । তারপর বর্ষাকালে জল পেয়ে বেড়ে ওঠে ।
—–তাহলে আমাদের কাজ কি?
——-আমাদের কাজ হলও ওই চারা গুলি বড় করা ।তার জন্য আমাদের বাঁশের খাঁচা বানিয়ে ঢাকা দিতে হবে । পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ যদি এই নিয়মে মেনে গাছ লাগায় তবেই একমাত্র বিশ্ব উষ্ণায়নের কোপ থেকে রক্ষা পাবে ।

কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষের চেতনা এখনও হয়নি । গাছ কাটা এখনও অব্যাহত আছে ।তাইতো এত গরম ।বৃষ্টির দেখা নেই ।

অমর খুবই চিন্তার মধ্যে আছে । রাতে তার ঘুম হয়না । বর্ষাকাল চলছে ।সমুদ্র ফুলে উঠেছে আক্রোশে ।কি হয় ,কি হয় ।খুব ভয় ।
সমীর ভাবে,মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে বেইমানি করেছে । এর প্রতিশোধ প্রকৃতি নেবেই । তারপর অন্য কথা ।

একদিন বর্ষাকালে রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছে কিন্তু জেগে আছে অমর আর সমুদ্রের বিষাক্ত ফণা । মাঝ রাতে সু না মীর একটা বড় ঢেউ এসে গ্রামের সবাই কে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ধ্বংসের পথে । এখন সেই গ্রাম শ্মশানের মত ফাঁকা ।
প্রকৃতি এখনও সুযোগ দিয়ে চলেছে বারে বারে । সাবধান হলে বাঁচবে । তা না হলে ধ্বংস অনিবার্য ।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তুলি বললো,শত সহস্র অমরকে এগিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর রক্ষাকর্তা হয়ে ।তবেইবাঁচবে আমাদের পৃথিবী।

দীপ বললো, বন্যার জলে সব কিছু সম্প্ত্তি ভেসে গেলেও অমর কিন্তু লড়াই করে বেঁচে আছে। সাঁতার কেটে শিশুপুত্রকে নিয়ে নিজেদের জীবন কোনোরকমে বাঁচিয়েছে।
তারপর দীপ ও তুলি গেলো অমরের বাড়ি। অমরের স্ত্রী তুলির সঙ্গে গল্প করছে। দীপ অমরকে কাছে পেয়ে বলতে শুরু করলো ছোটোবেলার কথা। দীপ বলছে,

আমরা ছোটোবেলায় মোবাইল পাই নি। কিন্তু আমরা যেসব আনন্দের অংশিদার ছিলাম সেসব আনন্দ এখনকার ছেলেরা আর পায় না। ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে ভুলোলাগা বামুন।
ঠিক বলেছেন দাদা,আপনি বলুন। আমি শুনছি।

দীপ আবার বলতে শুরু করলো,জানো,
তিনি ঝোলা হাতে মাথায় গামছা জড়িয়ে আসতেন শিল্পকর্ম দেখিয়ে রোজগার করতে। তিনি আমাদের বাড়িতে এসে শুরু করতেন নিজের কথা বা শিল্পকর্ম। নাটকের অভিনয়ের ভঙ্গিমায় বলতেন, আর বলো না বাবা। তোমাদের গ্রামে আসতে গিয়ে চলে গেলাম ভুলকুড়ি ভুল করে। তারপর মেলে, কোপা, বিল্বেশ্বর, চুরপুনি, সুড্ডো ঘুরে কোমডাঙ্গা। তারপর কেতুগ্রাম, কেউগুঁড়ি হয়ে গুড়ি গুড়ি পায়ে হেঁটে পোশলা, নঁগা, খাটুন্দি, পাঁচুন্দি হয়ে তৈপুর, পাড়গাঁ, বাকলসা, পাঁচুন্দি, মুরুন্দি, সেরান্দি,খাটুন্দি পার করে কাঁদরের গাবায় গাবায় হেঁটে এই তোমাদের গ্রামে।

আমরা জিজ্ঞেস করতাম, এতটা পথ হাঁটলে কি করে দাদু। তিনি বলতেন, সব ভূতের কারসাজি। তেনারা ভুলো লাগিয়ে দেন। ভর করে দেহে। তাই এতটা পথ হাঁটতে পারি। তারপর চালটা, কলাটা, মুলোটা দিতেন তার ঝোলায় আমার মা বা পিসি।
অমর আবার কবি। তাই আমার বাতেলা শুনতে ভালেবাসে।
কবিকে বললাম, তুমি তো জানো আমি

রূপসী বাংলার রূপে ছুটে যাই। কিন্তু আমার চেনা পৃথিবীর সবটা হয়ে যায়
অচেনা বলয়,মাকড়সার জালের মতো জটিল । সবাই এত অচেনা অজানা রহস্য ময় ।বুকটা ধকধক করছে,হয়তো মরে যাবো, যাবো সুন্দরের কাছে,চিন্তার সুতো ছিঁড়ে কবির ফোন এলো । এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে, অভয়বাণী মিলেমিশে সৃষ্টি করলো আশা ।আর আমি একা নই,কবির ছায়া তাঁর মায়া আমাকে পথ দেখায়…

অমর বলে,দীপদা, আপনিও কবি। কি সুন্দর কথা বলেন।

দীপ বলে দেখো বিদেশের লোকরা
নেচে নেচে খোল করতাল বাজিয়ে আমাদের মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের নামগান করে। এই হলো ভারতবর্ষ।
অমর বলে,ঠিক,আমরা তার সম্মান রাখতে পারছি কই? দীপ বললো,
শোন আমাদের পুজোবেলার কথা।
পুজো আসার আগে থেকেই বাড়িতে মা ও বাবা নানারকম মিষ্টান্ন তৈরি করতে শুরু করতেন। গুড়ের নারকোল খন্ড, চিনি মিশ্রিত নারকোল খন্ড, সিড়ির নাড়ু, গাঠিয়া প্রভৃতি। গুড়ের মিষ্টির ব্যতিক্রমি গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করতো। আমরা স্বতঃস্ফুর্ত অনুভূতিতে বুঝে যেতাম পুজোর দেরি নেই। পুজোর কটা দিন শুধু খাওয়া আর খাওয়া। বাড়িতে যারা যাওয়া আসা করতেন তারাও পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে যেতেন চিড়ি,মুড়কি, মিষ্টি মায়ের অনুরোধে ও ভালোবাসায়।

এখন গুড়ের মিষ্টি, ছানার মিষ্টির তুলনায় ব্রাত্য। কিনলে সবই পাওয়া যায়, ভালোবাসা মাখানো তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?
আমি বহু জায়গায় ঘুরে ঘুরে বাস করি রেল স্টেশনের ধারেই আমার তখন বাসস্থান । অই পাড়ায় আমি পনেরো বছর ছিলাম । সকালের দৃশ্য বড়ো মনোহর । শহরের মহিলা পুরুষ সকলেই একসাথে প্রাতঃভ্রমণে ব্যস্ত । সবুজের নির্মল হাওয়ায় মন হারিয়ে যায় সুন্দর হাওয়ায় । তারপর সারাদিন স্টেশনের ব্যস্ততার সময় । ঠিক গোধূলির আলোয় আবার মানুষের মন হারানোর পালা । চুপিচুপি অন্ধকার রূপের আদরে আশাতীত ভালোলাগার পসরা সাজায় প্ল্যাটফর্ম ।হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে আলোকের গোপন ঈশারা,তোমার অন্ধকার ভোগের শেষে । অন্ধকারের মূল্য অসাধারণ । আলোর স্পর্শে ভালোলাগার কারণ এই আঁধার ।
আঁধার কালো, কালো সুন্দর, অকৃত্রিম আনন্দের সাজি সাজায় কালো । এইসব চিন্তা করতে করতে রাত নামে । আলো জ্বালিয়ে বুড়োদের তাসখেলার আসর শেষ হয়। সমস্ত প্রবীণ অভিমান তারা ঝেরে ফেলে ঝরঝরে নবীন মনে বাড়ি ফেরেন তারা ।গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি দীপ।বৌমা বললো,আজ রাতে আপনারা আমাদের বাড়িতে থাকুন। আজ যেতে দেবো না।তুলি আর দীপ এদের নিয়ে বেশ সুখে আছে। ঈশ্বর দর্শন ওদের মানুষের মাঝেই হয়ে গেছে।রাত জেগে ওরা ঠিক করেছে, আগামীকাল ওরা আবার অন্যস্থানে ঘুরতে যাবে। কিন্তু ওরা অন্য কাউকে তাদের গোপন কথা বলে না।দশদিন অমর দীপদার দেখা পায় নি। তাই একবার ওদের বাসা বাড়িতে দেখা করতে গেলো। বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলো,দীপ দাদা কোথায় গেছে।

বাড়িওয়ালা বললো,বড় ভালো মানুষ পেয়েছিলাম গো। আমাকে এক মাসের পয়সা বেশি দিয়ে চলে গেছে।

অমর বললো কোথায় গেছেন বলতে পারবেন।

—–না, বাবা। ওরা বললো আমাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। সব সাধু লোক গো। সংসারে কে যে কোন রূপে থাকে চেনা যায় না বাবা। এই বলে হাতটা কপালে ঠেকালেন।
অমর মাথা নীচু করে বাড়ি ফিরে চললো।সে ভাবে, দিবারাতি নিজেকে ঠকিয়ে কোন ঠিকানায় ঠাঁই হবে আমি সর্বস্য মানুষের ।নিজেকে নিজের প্রশ্ন কুরে কুরে কবর দেয় আমার অন্তরের গোপন স্বপ্ন । জানি রাত শেষ হলেই ভোরের পাখিদের আনাগোনা আরম্ভ হয় খোলা আকাশে । আমার টোনা মাসিকে টোন কেটে অনেকে অভিশাপ দিতো । আমি দেখেছি ধৈর্য্য কাকে বলে । আজ কালের কাঠগোড়ায় তিনি রাজলক্ষ্মী প্রমাণিত হয়েছেন । কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খান না । তাই তাঁর বিচারের আশায় দিন গোনে শিশুর শব, সব অবিচার ,অনাচার কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবে আগামী পৃথিবীর ভাবি শিশু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি। অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের প্রদীপ শিখা জ্বালিয়ে । সাবধান খুনীর দল ,একবার হলেও অন্তত নিজের সন্তানের জন্য শান্ত পৃথিবী রেখে যা । ঋতু পরিবর্তন কিন্তু তোর হত্যালীলায় বন্ধ হবে না নির্বোধ ।শান্ত হোক হত্যার শাণিত তরবারি ।নেমে আসুক শান্তির অবিরল ধারা। রক্ত রঙের রাত শেষে আলো রঙের নতুন পৃথিবী আগামী অঙ্কুরের অপেক্ষায়। তারপর সংসারের টানা পোড়েন।রাগ,হিংসা,ক্রোধের সংমিশ্রণে সংসার স্রোতে ভাসতে ভাসতে জীবন প্রবাহ এগিয়ে চলে। হয়তো এর ফলেই দাদুর শেষজীবনে সেবার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। আমি নিয়ম করে দাদুকে গীতাপাঠ করে শোনাতাম। দাদু কত গল্প বলতেন। কোনোদিন হা পিত্যেশ করতে দেখিনি। আমার সময় কাটতো দাদুর কাছেই বেশি। পড়াশোনার ফাঁকে চলতো গীতাপাঠ। আমি জিজ্ঞেস করতাম,দাদু মরণের পরে আমরা কোথায় যাই? দাদু বলতরন,জানি না ভাই। তবে।।মরণের পরে যদি যোগাযোগ করা যায়,তাহলে আমি তোকে নিশ্চয় জানাবো। দাদু বলতেন, আমি যখন শেষ বিছানায় শোবো,তখন আমি ঈশারা করবো হাত নেড়ে। তখন তুই গীতার কর্মযোগ অধ্যায় পড়ে শোনাবি। তোর মঙ্গল হবে। আমিও শান্তিতে যেতে পারবো। হয়েছিলো তাই। কর্মযোগ পাঠ করা শেষ হতেই দাদুর হাত মাটিতে ধপাস করে পরে গেলো। দাদু ওপাড়ে চলে গেলেন হেলতে দুলতে চারজনের কাঁধে চেপে। মাথাটা দুই বাঁশের ফাঁক গলে বেরিয়ে ঝুলছিলো। আমি বলে উঠলাম, ওগো দাঁড়াও দাদুর লাগবে। মাথাটা ঠিক কর বালিশে দি। কেঁধো বললেন,মরে গেয়েচে। ছেড়ে দে। আমি বললাম, না ঠিক করো। তারপর ঠিক করলো দাদাভাই,দাদুর মাথাটা বালিশে দিয়ে।
আমি ভাবতে শুরু করলাম,মৃত্যু কি জীবনের আনন্দ কেড়ে নিতে পারে? পারে না।
সব কিছুর মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি। সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই। তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে। সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ।
সত্য শিব সুন্দরের আলো আমার দেশ থেকেই সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক।
আমি বললাম, এক নাগাড়ে বকে গেলি অনেকক্ষণ। বন্ধু বললো, তুমি আরও কিছু বলো। সেই জন্যই তোমার কাছে আসা। আমি আবার বলতে শুরু করলাম,আমার কথা আমার গোপন কথা। আমার অনুভবের কথা। কবি বন্ধু আমার কথা শুনতে ভালোবাসে। সে সংসারী। তবু সব কিছু সামলে তার কবিতা ত লিখে চলে। আমি বন্ধুকে বলতে শুরু করলাম শরত জীবনের কথা। শিউলি শরতের ঘ্রাণে শিহরিত শরীর। শিউলি নামের শিউলি কুড়োনো মেয়েটি আমার শৈশব ফিরিয়ে দেয়।মনে পড়ে পিসির বাড়ির শিউলি গাছটার তলায় অপেক্ষা করতো ঝরা ফুলের দল। সে জানত ফুল ঝরে গেলেও তার কদর হয় ভাবি প্রজন্মের হাতে । সে আমাদের ফুল জীবনের পাঠ শেখায়। মানুষও একদিন ফুলের মত ঝরে যায়। । শুধু সুন্দর হৃদয় ফুলের কদর হয়। শিমূল ফুলের মত রূপ সর্বস্ব মানুষের নয়। শরত আমাদের তাই শিউলি উপহার দেয় শিমূল নয়। শিউলি ফুল তোলার পরে আমাকে দিত। শরতের মেঘ। হঠাৎ বৃষ্টি।।
আমার মনে পড়লো মাধবী আমাকে বৃষ্টির একটা বর্ণনা লিখে পাঠিয়েছিলো। সে বলেছিলো, তুমি তো লেখালেখি করো। আমার লেখাটা পড়ো। সে লিখেছিলো, বর্ষার কথা। ঝরে চলেছে অবিশ্রান্ত। রাস্তায় বর্ষাতি ঢাকা প্রেমঋতুর আনন্দ বরিষণ বাড়িয়ে চলেছে উদ্দাম বৃষ্টির গতি । আনন্দে সে ভাসিয়ে চলেছে খাল বিল নদীর প্রসারিত কামদেশ। এখন ভাসাতে ব্যস্ত । তার সময় মাত্র দুই মাস । তারপর তাকে ময়দান ছাড়তে হবে । তাই সে নিজেকে উজার করে ঢেলে সাজাতে চায় ভিজাতে চায় শুকিয়ে যাওয়া ফুরিয়ে যাওয়া হৃদয় ।মাঝে মাঝে খেয়ালের বশে এত বেশি উচ্ছল হয় বর্ষাহৃদয় যে নদীর ধারা উপচে পড়ে ঘটায় অনর্থ । বন্যারাণী আবেগের ধারায় ভাসিয়ে দেয় গ্রাম শহরের সভ্যতা । মানুষের প্রতি রাগ যেনো ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে । মানুষ তবু শিক্ষা পায় কি ?কিছু অর্বাচিন গাছ কেটে সাহারাকে ডেকে আনতে চায় । কিছু মানুষ প্রকৃতির গতি হাতের মুঠোয় বন্দী করতে চায় । ফল হয় বিপরীত ।
অমর পৃথিবীর মানুষকে বলতে চায় তার অন্তরের কথা। এসো বন্ধু আমরা সবাই বর্ষাহৃদয়ে ভিজি। যতদিন বাঁচি ভিজি,আনন্দ করি,বৃষ্টির সাথে খেলা করি। তারপর আমরা সকলে মিলিত হবো শেষ সম্মেলনে ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে। সেখানে কি খুঁজে পাবো এই বৃষ্টিহৃদয়?এইসব ভাবতে ভাবতে সে পথের সন্ধান পেলো। পথ চলাই জীবন। এখনও তাকে চলতে হবে অনেক অজানা আকাশের পথ। তারপর শুরু হবে সোনার ধানের মরশুমে নতুন ভোর…সুমন্তদা,তোতন ও আরও সব সঙ্গিসাথীরা চলেছেন জীবনের অজানা পথে পথে।সেখানে আরও কত অজানা তথ্য ভবিষ্যতের জন্য জমা আছে কেউ জানে না।

 

সুদীপ ঘোষাল। গল্পকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমব্ঙ্গরাজ্যের কেতুগ্রামের পুরুলিয়া গ্রামে। প্রকাশিত বই: 'মিলনের পথে' (উপন্যাস)। এছাড়াও কয়েকটি গল্প ও কবিতার বই আছে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

সুমন্তদা ও সাইকোভেগাসের গল্প

সুমন্তদা ও সাইকোভেগাসের গল্প

গোয়েন্দা সুমন বাবু শুধু গোয়েন্দা নন। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী,গোয়েন্দা বিচক্ষণ ব্যক্তি।তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আপডেট সংবাদ…..

এই আমি

এই আমি

ছোটবেলায় একবার রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা হয়েছিল। মেলা-বান্নিতে ধবধবে শঙ্খসাদা তুলার দাড়িগোঁফে আবৃত মাথাঝুলানি রবীন্দ্রনাথ বিক্রি…..

নতুন বউ

নতুন বউ

  ঘটনাটি আমার কর্মজীবনের, নব্বই দশকের প্রথম দিককার।আমি সাইট সুপারভাইসারের পদে বোকারোর এক কারখানায় চাকুরিরত।আমার…..