প্রেম ও চাকরি

হাবিব আনিসুর রহমান
গল্প
Bengali
প্রেম ও চাকরি

অন্যদিনের মতো আজও ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো রঞ্জু। সামনের রাস্তার দিকে তাকালো, পুব থেকে পশ্চিমে সারি সারি দোকান। ফাস্টফুড থেকে শুরু করে বেকারি, মুদি, হোটেল, সেলুন আর টেইলারিং শপ। সকাল থেকেই এসব দোকানে কেনাবেচা শুরু হয়ে যায়। হঠাৎ রঞ্জুর চোখ গেল সামনের ফাস্টফুডের দোকানটির দিকে। ক’দিন ধরেই ডেকোরেশনের কাজ চলছিল। গতকাল দেখেছে দোকানের সামনে বড় একটা লাল-নীল রঙের ফ্রিজ। ভেতরে পেপসি, সেভেন-আপ, মিরিন্ডা, মাউন্টেন ডিউর ছোট-বড় বোতল সুন্দর করে সাজানো। বিশাল একটা সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে দোকানের ওপর। পুরো সাইনবোর্ডের সেভেনটি পারসেন্ট জায়গাজুড়ে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার অর্ধেক শরীরের ছবি। তবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত নয়, শুধু দুটো হাত, মুখ আর বুক, এটুকুই। বাম হাত দিয়ে সে পেপসির বোতল ধরে আছে। তার নগ্ন বগলের পাশে গলায় ঝুলে আছে প্রাচীন হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর লকেট লাগানো কণ্ঠহার। ছোট্ট বক্ষবন্ধনীর মতো এক টুকরো সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি, ওখান দিয়ে বুকের কিছু অংশ বের হয়ে এসেছে, প্রিয়াঙ্কা পেপসি খাচ্ছে। ইয়ার টু থাউজেন্ডের মিস ওয়ার্ল্ড, বলিউড কাঁপানো নায়িকা, এখন পেপসি কোলার মডেল!

সকালে উঠেই এ রকম একজন বিশ্বসুন্দরীর মুখ দেখতে পাওয়ায় রঞ্জু ভাবলো, কেমন যাবে আজকের দিনটা? তার দিন কেমন যাবে বোঝা না গেলেও ফাস্টফুডের দোকানটাতে বিক্রি বেড়ে যাবে, এটা নিশ্চিত বলা যায়।

মাস্টার্স করার পর এক বছর বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে রঞ্জু, তাও আবার ইকনোমিক্সের মতো সাবজেক্টে। রঞ্জু বুঝে ফেলেছে জীবনের রঙ আসলে দু’রকমের, একটা হলো লাল অন্যটা ধূসর। লালটা সাফল্যের, ধূসরটা ব্যর্থতার। রঞ্জুর অবস্থানটা এখন কোথায়? দিন দিন ধূসর হয়ে যাচ্ছে কী তার ভাবনার দুনিয়াটা? একটামাত্র বছর অথচ চারপাশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, রঞ্জু গণ কেইস! কী আশ্চর্য! অথচ এতদিন মানুষের মুখে ভালো ছাত্রের খেতাব পেয়ে এসেছে সবসময়, প্রত্যেক বছরের রেজাল্টের পর প্রশংসা পেয়েছে ভুরি ভুরি। কিন্তু এই এক বছরে কোনো চাকরি না পাওয়ায় প্রশংসা পরিণত হলো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অপমানে। শেষ পর্যন্ত ওই এক কথা, কত জনের চাকরি হলো তোমার হলো না, আশ্চর্য ! অন্য মানুষের চেয়ে আশ্চর্য অনেক বেশি হয়েছে রঞ্জু নিজে। রিটেন পরীক্ষা এ পর্যন্তÍ যতগুলো দিয়েছে তাতে সে নিশ্চিত, চাকরি হওয়ার মতোই পরীক্ষা দিয়েছে এবং যখন তাকে ভাইভাতে ডেকেছে সেখানেও ভালো করেছে সে। ইন্টারভিউ বোর্ডে যারা ছিলেন তাদের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এদের অনেক টাকা আছে, এরাই বড় বড় ব্যাংকের মালিক। কিন্তু তাদের প্রশ্নের ধরণ দেখে মেজাজ বিগড়ে গেছে রঞ্জুর, ব্যাংকের চাকরির ভাইভা পরীক্ষায় কেউ জিজ্ঞাসা করে, শাহরুখ খানের ‘ওম শান্তি’ ছবিটা দেখেছেন? কী আশ্চর্য! সে ব্যাংকে চাকরি করবে তার সঙ্গে ‘ওম শান্তি’র সম্পর্কটা কী? শুধু ‘ওম শান্তি’ নয়, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দিপীকা পাড়–কোন এদের ডন বা চেন্নাই এক্সপ্রেস সবগুলোই দেখেছে রঞ্জু, কিন্তু হঠাৎ রেগে গিয়ে বলেছে, না স্যার আমি দেখিনি। ওই ইন্টারভিউর পর একজন হোমরা-চোমরা তাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, দেখুন, আমরা মোট ১০ জনকে নেব, আপনার নামটা ১১ নম্বরে আছে, কেউ একজন জয়েন না করলে আপনাকে ডাকা হবে। ওই ব্যাংকেও চাকরি হয়নি শেষ পর্যন্ত। এ বিষয়টা বন্ধুদের বলেছিল সে, বন্ধুরা হেসে বলেছে- শালা বেকুব কোথাকার, এই জ্ঞানটা তোর আজও হয়নি। আরে তোরে ডেকেছিল কত টাকা ঘুষ দিতে পারবি সেটা জানার জন্যে, এটা বুঝিস নি! রঞ্জু বলেছিল, এভাবে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া হয় নাকি? বন্ধুরা আবার হেসেছে, হ্যাঁ এভাবেই হয়, তুই যদি বলতিস স্যার, চাকরিটা আমার খুব জরুরি, এটা না হলে…. সঙ্গে সঙ্গে বলত, আচ্ছা কাল আসেন দেখি আপনার জন্য কী করতে পারি। রঞ্জু অবাক হয়ে বলেছে, এভাবে! বন্ধুরা বলেছিল, হ্যাঁ এভাবেই ডাকবে, এভাবেই বলবে। যারা টাকা দেবে তাদের হবে, যারা দেবে না তাদের হবে না। ঘুষ শব্দটি অনেকবার শুনেছে রঞ্জু। কিন্তু কীভাবে তা দেওয়া-নেওয়া হয় সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না।

ইদানিং নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগে রঞ্জুর। এভাবে যদি টাকা দিয়ে সে কোনো চাকরির সুযোগ পায় তাহলেও কি তার পক্ষে সম্ভব হবে! এক লাখ বা দু’লাখ যদি লাগে তাহলে সে কোথায় পাবে সেই টাকা। এই সংসারে তা অসম্ভব। বাবা অথবা মায়ের কাছে এসব বলা যাবে না। বললেও বাবা কিছু করতে পারবেন না। বাবার ডায়বেটিস। প্রতি মাসে ইনসুলিন, প্রতিদিন গ্লুকোজ চেক করার স্ট্রিপ, প্রেসারের ওষুধ। তারপর চোখে ছানি পড়েছে, অপারেশন করতে বলেছেন ডাক্তার সেই এক বছর আগে, হয়তো বাবা অপেক্ষা করে আছেন কবে ছেলের চাকরি হবে। মাকে টাকার কথা বললে মা নেতিবাচক কিছু বলবে না, হয়তো বলবে রুবির বিয়ের জন্য রাখা গহনা বিক্রি করে টাকা দিতে পারবে, আগে চাকরিটা হোক তারপর বিয়ের ব্যাপারটা দেখা যাবে।

পাস করার পর থেকে রঞ্জু অনলাইনে সিভি ড্রপ করেছে অনেক। ওরা মোবাইল ফোনে রিটেন পরীক্ষার ডেট জানিয়েছে, বলেছে মেইল চেক করে দেখুন অ্যাডমিট কার্ড পাঠানো হয়েছে। রঞ্জু রিটেন পরীক্ষা দেওয়ার পর ভাইভাতে ডেকেছে, তারপর আর খোঁজ নেই। রঞ্জুর এসব ব্যাপারে রিনি ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলেছে- আশ্চর্য! কত মানুষের চাকরি হলো শুধু তোমার হলো না। বন্ধুরা বলেছে, টাকা ধার করে ঘুষ দে, তারপর বেতন পেলে কিস্তিতে শোধ করে দিস। রঞ্জু ভেবেছে এ কথাটা কিন্তু মন্দ নয়। মাস তিনেক আগে রিনি ফোন করে জানিয়েছে- রঞ্জু, তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ, বাবার কী হয়েছে আল্লাহ জানে, আমার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে পাগলের মতো করছেন। রঞ্জু বলেছিল, বুঝতে পারব না কেন, আমি কী করতে পারি বলো? রেগে গিয়ে রিনি বলেছে- শোনো, তোমার কাছ থেকে অমি একটাই ফোন আশা করি, তুমি শুধু বলবে আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। রঞ্জুও বলেছে- ঠিক আছে রিনি, চাকরি না হলে আমিও আর তোমাকে ফোন দিচ্ছি না। তিন বছরের সম্পর্ক অথচ চাকরি না পাওয়ার কারণে সেটাও যায় যায় অবস্থা।

কী করতে পারে রঞ্জু। ব্যবসা করতে গেলে হাজার নয়, লাখ টাকা লাগবে, চাকরি পেতে গেলেও টাকার দরকার। মাত্র একটা বছর, এর মধ্যেই চারপাশের সবাই অধৈর্য হয়ে পড়েছে, মন খারাপ হয়ে যায় রঞ্জুর। সমাজ-সংসারের বাস্তবতা আর প্রেম-ভালোবাসার কল্পনা দুটি বিপরীত জিনিস। ইকোনমিক্সে মাস্টার্স করা যুবক ঘরে বসে থাকবে চাকরিহীন, এমনটাতো হয় না। তাহলে সব দোষ তার, অন্য ছেলেদের কীভাবে হয়? রিনির কথার পেছনে যুক্তি তো আছেই।

রঞ্জু বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলে মা বলল- রঞ্জু, নাশতা করে নে বাবা। রুবি বলল- ভাইয়া, বাইরে গেলে আমার জন্য দুটো ভালো বলপয়েন্ট এনো। রঞ্জু মাথা নাড়লো, অর্থাৎ আনবে। দেখতে না পেয়ে রুবি আবার বলল, ভাইয়া শুনেছো? হ্যাঁ শুনেছি, আনবো চিন্তা করিস না। হঠাৎ ফোন এলো রঞ্জুর, সে আবার বারান্দায় গিয়ে বলল- হ্যালো। বিপাশা হাসান ফোন করেছে- শোন্ রঞ্জু, তোর রিনির মতিগতি তো বুঝতে পারছি না, কোনদিন শুনবি ও উড়ে গেছে।

– মানে! জানতে চায় রঞ্জু।

– মানে খুব সোজা, হঠাৎ দেখবি ও বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়েছে। রঞ্জু বলেছে- ধুর, ও বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। – তুই একটা হাঁদারাম, তোর সঙ্গে রিনির দেখা হয়নি কতদিন?

– মাস তিনেক তো হবেই।

– শোন্, এনসিএম ব্যাংকে নতুন চাকরি হওয়া এক ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়ে যেতে পারে, খোঁজ নিয়ে দেখিস? রঞ্জু তুচ্ছ করে বলেছে- ধুর, বিয়ে করবে রিনি, কী যে বলিস না। বিপাশা হঠাৎ ফোন বন্ধ করে দিলে বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো রঞ্জু, বুকের গভীরে কোথাও কিছু হচ্ছে কি? হ্যাঁ হচ্ছেই তো।

শাহবাগে বাস থেকে নেমে আজিমপুরে দিকে হাঁটতে লাগলো রঞ্জু। টিএসসি পার হওয়ার সময় সে কিছু জায়গার দিকে তাকালো। যেখানে রঞ্জু গত তিন বছরে বহুবার বসেছে রিনির পাশে। সবকিছুই ঠিক আছে শুধু এই সময়টাতে রিনি তার পাশে নেই, একটা মৌন যুদ্ধ শুরু করেছে সে, এখন রঞ্জুর ভেতরটাকে তোলপাড় করে দিচ্ছে। এখন যদি বন্ধুরা রঞ্জুকে দেখে তাহলে বাইরে থেকে বুঝতে পারবে না ওর ভেতরে কী হচ্ছে অথবা কেমন আছে সে। এ ধরনের সম্পর্কের বেলায় মেয়েরা যত তাড়াতাড়ি একে-ওকে বলতে পারে বা কাঁদতে পারে, ছেলেরা তা পারে না মোটেও। আসলে রঞ্জুর সবটুকু কষ্ট তার বুকের গভীরে।

আজিমপুর কলোনিতে রিনিদের বিল্ডিংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রঞ্জু। তখন বিকেল গড়াচ্ছে। হয়তো পশ্চিম দিকে ডুবে যাচ্ছে সূর্যটা, কিন্তু রঞ্জু তা দেখতে পাচ্ছে না। সে দেখলো বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তাটুকু ছিমছাম আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দেখলো লাল আর হলুদ রঙের আলপনা আঁকা হয়েছে রাস্তার ওপর। রঞ্জু বাড়ির নম্বরটা দেখলো ভালো করে, হ্যাঁ ইংরেজিতে পাঁচ আর শূন্য মানে ফিফটি, নম্বর তো ঠিকই আছে। বাসাগুলো একই রকম, নম্বর ছাড়া চেনা খুব কঠিন। রিনিদের নম্বরটা ফিফটি-এইচ অর্থাৎ চারতলার ডান দিকের বাসাটা। সিঁড়িতে ওঠার মুখে সেই একই রঙের আলপনা, সিঁড়ি লেপ্টে উঠে গেছে  ওপরে। বিয়ে হলো নাকি কারও, রঞ্জু সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠে। চারতলার ডানদিকের বাসাটা এইচ। রঞ্জু ওপরে উঠলেও তার চোখ আছে আলপনার দিকে। এই আলপনা যে বাসার দরজায় গিয়ে শেষ হবে সেই বাসাতেই কিছু একটা অনুষ্ঠান হয়েছে অথবা হবে। রঙ দেখে রঞ্জু, হবে, নাকি হয়ে গেছে। সিঁড়ি ভাঙছে আর এবিসিডিইএফ- এভাবে ডানে-বামে বাসার নম্বরগুলো দেখছে রঞ্জু। সব শেষে চারতলার বাম দিকে জি ডানদিকে এইচ। কী আশ্চর্য ! রিনিদের বাসার দরোজায় এসে থেমে গেছে আলপনা, তাহলে রিনি। রিনির মুখ ভেসে উঠলো রঞ্জুর চোখের সামনে। বিয়ে হয়ে গেল নাকি তার। বুকের ভেতরটা এমন করছে কেন? শক্ত হয়ে দাঁড়ায় রঞ্জু। নাহ, কী সব ফালতু ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে বোকার মতো। কিসের বিয়ে, কার বিয়ে ? রিনি তার ভালোবাসা, এভাবে তুচ্ছ ঘটনায় ভালোবাসা হারিয়ে যেতে পারে। রিনি কখনও অন্যের হাত ধরতে পারে না, অসম্ভব। ফিফটি-এইচ নম্বর বাসার সামনে দাঁড়ানো রঞ্জু দেখলো সিঁড়ির পাশের ভাঙা গ্লাসের ভেতরে দিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে ঝিরঝির বাতাস ভেসে আসছে। বুক ভরে বাতাস টেনে নিল সে।  রঞ্জু কলিংবেল টিপলো। অপেক্ষা করছে রঞ্জু, নিশ্চয়ই রিনি দরোজা খুলে একটা নির্মল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলবে, ও রঞ্জু তুমি এসেছো, এসো ভেতরে এসো। কখন দরোজা খুলেছে রিনির মা… ও রঞ্জু, এসো বাবা, এসো।

– না আন্টি, আমি বসবো না, রিনি আছে?

– না বাবা, ওরা তো নেই, একটু আগেই ও আর মঈন বের হয়ে গেল। রঞ্জু দক্ষিণ দিক থেকে ভেসে আসা বাতাস বুক ভরে টেনে নিল আবার, যেন সে সব কিছুই জানে এমন একটা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল- বের হয়ে গেল, ঠিক আছে আন্টি, আসি।

– চলে যাবে বাবা, কী করবো বলো বাবা, খুব তাড়াতাড়ি বিয়েটা হয়ে গেল, তোমার আঙ্কেল তো অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন।

– ঠিক আছে আন্টি, ঠিক আছে, আমি সবকিছুই জানি, রিনির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ও আমাকে সবকিছুই বলেছে।

– ও! তাহলে সবকিছু খুলে বলেছে রিনি?

– হ্যাঁ আন্টি বলেছে, বলবে না, এটা কী করে ভাবলেন, আশ্চর্য!

– বসো বাবা, একটু চা করি, খাও।

– না আন্টি, আমি তো ভীষণ ব্যস্ত, রিনির জন্যে একটা গিফট এনেছিলাম, ভেবেছিলাম এটা তার হাতেই দেব, হলো না। আসি আন্টি।

– গিফট, গিফট।

– হ্যাঁ আন্টি, ও থাকলে দিতাম।

– তোমার খবর কী বাবা?

– আন্টি, খবর আর কী বলবো বলুন, আমি একজন সৌভাগ্যবান মানুষ, জীবনে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে, যেগুলো সম্পূর্ণ নিয়তিনির্ভর, মানে পুরোটা ভাগ্য।

– কী ব্যাপার বাবা?

– একটা বিদেশি ব্যাংকে আমি দুটো রিটেন আর ভাইভা পরীক্ষা দিয়েছিলাম, আজ দুপুরে ওরা ফোন করে জানালো, চাকরিটা আমার হয়ে গেছে।

– কোন ব্যাংকে বাবা?

– এইচবিএস ব্যাংকে, জানেন আন্টি বেতন অনেক টাকা, বিদেশি ব্যাংক তো, বেতন যেমন বেশি, সুযোগ-সুবিধাও তেমন। রিনির মা অপলক তাকিয়ে আছেন রঞ্জুর দিকে, কোনো কথা বলছেন না। রঞ্জু আসি বলে নিচে নামতে লাগলো, কিন্তু দরোজা বন্ধ করার কোনো শব্দ তার কানে এলো না।

কলোনি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে চারপাশে তাকালো রঞ্জু। রাস্তায় কোলাহল, রিকশা, বাস, প্রাইভেট গাড়ি যে যার মতো সামনে ছুটছে, কোনো দিকে খেয়াল নেই, সবাই ব্যস্ত। রঞ্জু এসএম হল পার হয়ে সোজা টিএসসির দিকে হাঁটতে শুরু করল। যেখানে বসে সে আর রিনি ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছে। সন্ধ্যার পর রিকশায় চড়ে বড় গাছগুলোর নিচ দিয়ে চলে গেছে অন্য পৃথিবীতে, যেখানে তারা চুমু খেয়েছে একজন আরেকজনকে, রিকশার ভেতরেই রিনি তাকে তার বুকে হাত রাখার অধিকার দিয়েছে রঞ্জুকে। কত কথা মনে পড়তে লাগলো তার। রঞ্জু সেই জায়গায় বসলো। চা খেয়ে একটা সিগারেট ধরালো। খুব জোরে একটা টান দিয়ে ভুরভুর করে ধোঁয়া ছেড়ে দিল বাতাসে। আহ্ কী শান্তি। রিনিদের বাসা থেকে ফিরে আসার পর মনে হলো রঞ্জু তার নিজের জীবনের একটা অধ্যায় শেষ করে অন্য অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছে, এখন কেমন একটা সাহস সাহস ভাব বুকের মধ্যে। হঠাৎ মনে হলো, রিনিদের বাসার দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে তার মুখ দিয়ে কী সব কথা বের হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও রঞ্জু এসবের কিছুই জানতো না। বড় একটা বিদেশি ব্যাংক। চাকরিতে জয়েন করবে। সে সবকিছুই জেনেশুনে এসেছে রিনিকে একটা গিফট দিতে। একটু আগে সে যা কিছু বলে এসেছে তার সবটাই হঠাৎ আকস্মিক, যার কোনো মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যা থাকলেও সে তার কিছ্ইু জানে না, জানা সম্ভবও নয়। আবার এমনও কি হতে পারে না, সে তো মাস তিনেক আগে ওই বিদেশি ব্যাংকটাতে দু’বার রিটেন আর ভাইভা পরীক্ষা দিয়ে এসেছে, পরীক্ষাও খুব ভালো হয়েছে। এতদিন চাকরি না হওয়ার কারণে ভেতরে ভেতরে যে অবদমনের সূচনা হয়েছে হয়তো সেখান থেকেই বের হয়ে এসেছে ওই কথাগুলো। কে জানে, মানুষের মনোজগৎ তো অদ্ভুত-জটিল রহস্যময়। রিকশা থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে রঞ্জুর মনে হলো আজ তার হাঁটাটাও কেমন যেন একটু অন্যরকম হচ্ছে। বাসায় ঢোকার আগে দেখলো প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পরিষ্কার বগলের পাশে গলায় প্রাচীন হরপ্পা মহেঞ্জাদারোর কণ্ঠহার লেপ্টে আছে। পিয়াঙ্কা পেপসি খাচ্ছে। কলিংবেল টিপলো রঞ্জু। অন্যদিন দরোজা খোলে রুবি, আজ দরোজা খুললো মা। মায়ের মুখের দিকে তাকালো সে। মা কোনো কথা বলছিল না। তবে মায়ের মুখে কেমন একটা প্রফুল্ল ভাব, যেটা সে আগে কখনও দেখেনি। মনে হলো মায়ের মুখে মৃদু হাসি। মা বলল, তোর বাবা তোকে ডেকেছে যা। বাবা ডাকছে, মা এসব কী বলছ। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাবা তাকে ডাকবেন, এটা অভাবনীয় ব্যাপার। বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রঞ্জু- বাবা? বাবা বললেন- তুই কি মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছিস? না তো বাবা, ব’লে দ্রুত প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলো, হ্যাঁ তাই তো, বন্ধ নয়, সাইলেন্ট ছিল, কয়েকটা কল এসেছে। হ্যাঁ বাবা, ফোনটা সাইলেন্ট ছিল, কেন?

– তুই কি এইচবিএস ব্যাংকের জন্য পাঠানো সিভিতে আমার নম্বরটা দিয়েছিলি?

– হ্যাঁ বাবা দিয়েছি, ইমারজেন্সি কলে তোমার নম্বরটা দিয়েছিলাম, কেন কী হয়েছে বাবা?

বাবা সবটা বলতে পারলেন না, বললেন, ওই ব্যাংকে থেকে ফোন করে ওরা তোকে পায়নি তাই আমাকে ফোন করেছিল, বলল, অভিনন্দন… বাবা কথা শেষ করতে পারলেন না। বাবা হাসছেন, মা হাসছেন। ছোট বোন রুবি যে সব সময় দূরে দূরে থেকেছে সেও আজ এসে জড়িয়ে ধরে বলল- ভাইয়া। রঞ্জু দেখলো হাসতে হাসতে বাবা-মা’র চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে।

হাবিব আনিসুর রহমান। গল্পকার, ঔপন্যাসিক। জন্ম মেহেরপুরে ৬ জানুয়ারি। বাবা এস এম হাবিবুর রহমান, মা বেগম আশরাফুন্নেসা। পড়াশোনা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে পেশাজীবনের শুরু। প্রফেসর, অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়েছেন। সাহিত্যে স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছেন জীবননগর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..