ফরাসি বিপ্লব: সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার প্রজ্জ্বলিত শিখা

আলী নাঈম
প্রবন্ধ
ফরাসি বিপ্লব: সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার প্রজ্জ্বলিত শিখা

সমাজে এতো বৈষম্য কেন, এতো অবিচার কেন? কেন সমাজের অল্প কিছু মানুষ আরামে-আয়েশে থাকে আর বেশিরভাগ মানুষের জীবনে অভাব-দারিদ্র্য-অপমান নিত্য সঙ্গী? সমাজ শ্রেণিবিভক্ত হওয়ার পর থেকেই যুগ যুগ ধরে এসব প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়েছে, আজো ভাবাচ্ছে। মানুষ এর উত্তর খুঁজেছে, সামাজিক বৈষম্য আর অবিচারের প্রতিকার সন্ধান করেছে। কখনো মানুষ ধর্মের আশ্রয় নিয়ে পরকালে সব শোষণ-বঞ্চনার অবসান কামনা করেছে, কখনো শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে। একটা সময় পর্যন্ত মানুষের বিদ্রোহে-বিক্ষেভেও ধর্মচিন্তার প্রাবল্য ছিল। মানবজাতির ইতিহাসে আধুনিক গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইহজাগতিক বা স্যেকুলার সংগ্রামের নাম ফরাসি বিপ্লব।

অষ্টাদশ শতকের অন্তিমপর্বে সমাজ পরিবর্তনের উদ্বেলিত তরঙ্গ ফ্রান্সের বুকে গমকে গমকে আছড়ে পড়েছিল। ফ্রান্সের মানুষ রাজতন্ত্র, যাজকতন্ত্র এবং অভিজাততন্ত্র উচ্ছেদ করে আধুনিক স্যেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনের লক্ষ্যে যে সংগ্রামের সূচনা করেছিল, তাকে আধুনিক মানবসভ্যতার ঊষা বললেও অত্যুক্তি হবে না। কারণ ফরাসি বিপ্লবের অভিঘাত, তার সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার (Liberty-Equality-Fraternity) বাণী শুধু ফ্রান্সের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপ, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আমেরিকা এমনকি সুদূর এই বাংলার বুকেও স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল। রাজা রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডিরোজিয়ো এবং তার ‘ইংয় বেঙ্গল’ শিষ্যসহ তৎকালীন বিভিন্ন মনীষীর চিন্তায় ফরাসি বিপ্লবের ছাপ পড়েছিল।

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা থেকে আমরা জানি যে বিবর্তনের ধারায় মানুষের আবির্ভাবের পর দীর্ঘ সময় মানুষ আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন-যাপন করেছে। তখন কোনো শ্রেণি ছিল না, সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। এক সময় সমাজ শ্রেণিবিভক্ত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এসেছে দাসসমাজ এবং সামন্তসমাজ। সামন্তীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে মানুষে মানুষে সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির আকুতি সমাজ মননে ক্রমাগত নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। ইউরোপে, বিশেষত ফ্রান্সে ওই সংগ্রাম মূর্ত রূপ লাভ করে।

রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্ট

রেনেসাঁ (Renaissance) এবং এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) শব্দ দুটি আমাদের কাছে অপরিচিত নয়। মধ্যযুগের ইউরোপে ছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রবল প্রতাপ। মানব চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বর এবং ধর্মবিশ্বাস। রেনেসাঁ কথাটার মানে নবজন্ম। ইটালিতে এর সূচনা, যা পরে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। রেনেসাঁ ঈশ্বরকে সরিয়ে দিয়ে মানুষকে নিয়ে এল চিন্তা ও শিল্পকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে, যাকে আমরা বলি মানবতাবাদ। অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে নিয়ে এল যুক্তি। এ ক্ষেত্রে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বতিচেল্লি, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল প্রমুখ চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের ভূমিকা অনেকেরই জানা। চিন্তার জগতে নতুন ধারা নিয়ে এলেন পিকো দেলা মিরানদোলা (১৪৬৩-১৪৯৪), ম্যাকিয়েভেলি (১৪৬৯ – ১৫২৭), টমাস মুর (১৪৭৮-১৫৩৫)।

এনলাইটেনমেন্ট শব্দটার অর্থ আলোকায়ন, যার সাহায্যে চিন্তার নবজাগরণ বোঝায়। এর পটভূমি ছিল ফ্রান্স। ফরাসি বিপ্লবের আগে প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফ্রান্স আলোড়িত হয়েছে পুরনো আর নতুন চিন্তার দ্বন্দ্বে। গোড়ার দিকে ছিলেন সংস্করপন্থী অভিজাত চিন্তাবিদ বস্যুয়ে (১৬১২-১৭০৪), মঁতেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫); পরে বিপ্লবী ভাবধারা নিয়ে এলেন ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮), রুশো (১৭১২-১৭৭৮), কন্ডসেট (১৭৪৩-১৭৯৪)-এর মতো বহু দার্শনিক-চিন্তাবিদ। এসেছেন প্যাসকেল (১৬২৩-১৬৬২), ব্যুঁফ (১৭০৭-১৭৮৮), ল্যাভয়সিয় (১৭৪৩-১৭৯৪)-এর মতো বিজ্ঞানসাধক। এর পরই আমরা পাই এনসাইক্লোপিডিস্ট (Encyclopedist বা মহাকোষ-সংকলক) নামে একদল চিন্তাবিদ যার মধ্যে আছেন দেনিশ দিদেরো (১৭১৩-১৭৮৪), দালেমব্যার, দোলবাশ্, এলভেতিয়াস প্রমুখ।

বিপ্লবের পূর্ব এবং বিপ্লবের সময়টাতে ফিজিওক্রেট (Physiocrats) নামে একদল অর্থবিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটে যাদের মধ্যে আছেন লেজে-ফেয়ার (Laissez-fair বা অবাধ প্রতিযোগিতা) তত্ত্বের উদ্গাতা ভ্যাঁসাঁ দ্য গুরনে (১৭১২-১৭৫৯), মার্কিস দ্য মিরাবোঁ (১৭২৭-১৭৮১) যিনি বিপ্লবেরও নেতা ছিলেন; তুর্গো, নেমুর প্রমুখ। এঁরা গড়ে তুলেছিলেন যুক্তি ও বিজ্ঞান-নির্ভর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তির মুক্তি তথা সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার মানবতাবাদী চিন্তার জগৎ। এনলাইটেনমেন্ট-এর প্রবক্তারা সনাতন ও ঐতিহ্যগত সব কিছুর ভিত্তি ও কার্যধারা সম্পর্কে তীব্র ঘৃণার সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এর সাথে আরো একটি ঘটনা ফরাসি জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেটি আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমেরিকা তখন ব্রিটেনের উপনিবেশ। ১৭৭৬ সালে আমেরিকা ব্রিটেনের বিরম্নদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা করে। বহু ফরাসি এ সময় আমেরিকানদের পক্ষে লড়তে সে-দেশে গিয়েছিল। তারা দেশে ফিলে এল স্বাধীনতার চেতনা বুকে নিয়ে।

আজো কেন তোমরা জেগে উঠছো না, হে পরাধীন চাকর-নফরের দল!

ভলতেয়ার অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে তুলে ধরেছিলেন যুক্তির হাতিয়ারকে, “খোদা পাখির যেমন পালক দিয়েছেন, দিয়েছেন ভালুকের সূক্ষ্ম লোম, তেমন আমাদেরও দিয়েছেন এক সর্বজনীন আদর্শ, তাহলো যুক্তিজ্ঞান, এবং এ আদর্শ এতো দীর্ঘস্থায়ী যে সমস্ত ভাবাবেগের সংঘাত সত্ত্বেও এবং কুসংস্কারমগ্ন ভণ্ডদের এ আদর্শ নির্মূল করার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এটা থাকবে অটুট।”

ফ্রান্সের সমাজে ঘনায়মান পরিবর্তনের আভাস তুলে ধরে ১৭৬৭ সালে তিনি লিখেছিলেন, “গত ১৫ বছরে মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে এক মানসিক বিপ্লব; এরই পরিণতি হবে এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিদগ্ধ-জনের সোচ্চার-কণ্ঠ এ মহাপরিবর্তনের আগমনবার্তা বয়ে আনছে – পাখির কলকাকলী যেমন ঘোষণা করে শুভ আবহাওয়ার আগমন। … আগামী দশ বছরের মধ্যে বিপ্লব হবে, যদি ‘হাজার জন মানুষও’ বেঁচে থাকে। আমার সমবয়সী কেউ হয়তো তা দেখবে না, কিন্তু আমরা এ আশা নিয়ে মরবো যে, মানুষ অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত হবে, হবে আরো মর্যাদাসম্পন্ন, … সান্ত্বনা আমার এখানে যে বিশ্ব যখন ছেড়ে যাব পেছনে রেখে যাব সৎউদ্দেশ্য-প্রণোদিত সদ্য প্রস্ফুটিত পুষ্পরাজির মতো অপূর্ব ক্ষুদ্র এক জন-মানুষের দল; সংখ্যায় ও সামর্থ্যে এ দল বলবান হয়ে উঠবে দিনদিন; নির্বোধ আর ধর্মান্ধদের কণ্ঠরোধ করে তবেই সম্পূর্ণ হবে এদের কাজ। সেই মনোরম দিনে আমি থাকবো না, কিন্তু সে দিন যে আসন্ন তা আমি প্রত্যক্ষ করছি।”

রুশো তুলে ধরেছিলেন সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবতার পতাকা, “স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার, কিন্তু তবু সর্বত্রই মানুষ শৃঙ্খলিত। মানুষ মাত্রেই অন্যের উপর প্রভুত্ব দাবি করে বটে, কিন্তু সে ভুলে যায়, সেও অন্যের চাইতে কম পরাধীন নয়।” “মানুষ আজন্ম স্বাধীন ও স্বীয় সত্তায় অধিষ্ঠিত বলে কেউ কখনও তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গোলামির জিঞ্জির পরাতে পারে না। ‘গোলামের সন্তান গোলাম’, এ অভিমত যারা প্রকাশ করেন, তারা কি বলতে চান যে, গোলামের সন্তান জন্মমুহূর্তে মানব-সন্তান হিসেবে জন্মায় নি?”

সামাজিক বৈষম্য, ধনী-গরিবের পার্থক্যকে অমানবিক ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে রুশো তুলে ধরেছিলেন সাম্যের দাবি, “প্রকৃতির বিধান কিন্তু একেবারে নিরপেক্ষ : প্রকৃতি কাউকে রাজা, ধনবান বা অভিজাত করে সৃষ্টি করে নি।” “গরিবদের উদরের চাইতে ধনীর উদর তো আর বড় নয়, ভৃত্যের চাইতে প্রভুর বাহু দীর্ঘতর বা অধিকতর সবল নয়; বড় লোকও সাধারণ মানুষের চাইতে অধিকতর লম্বা নন। বস্তুত সব মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমরূপ এবং এ প্রয়োজন মেটাবার উপকরণও সমভাবে সবার নাগালে থাকতে হবে।” ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সমাজ-প্রগতির প্রতিবন্ধক হিসাবে চিহ্নিত করে তিনি লিখেছিলেন, “মানুষ এবং নাগরিক মাত্রের সমাজে সম্পত্তি বলে কিছু নেই, আছে শুধু নিজের সত্তা, এছাড়া সব বিষয়-সম্পদের মালিক হয়েছে সমাজ …।”

সমাজের বিপ্লবী পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে রুশো ১৭৬২ সালে বলেছিলেন, “আমরা দ্রুত এগিয়ে চলেছি একটা সঙ্কটপূর্ণ এবং বিপ্লবী শতাব্দীর দিকে। … আজো কেন তোমরা জেগে উঠছো না, হে পরাধীন চাকর-নফরের দল!”

প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্স

ফ্রান্সে তখন ছিল বুরবো রাজবংশের রাজত্ব। সামরিক স্বৈরশাসনের সঙ্গে খানিকটা মিল থাকলেও আজকের দিনে বসে কল্পনা করাও কঠিন কেমন ছিল সেই রাজতন্ত্রের আমল। রাজার কথাই ছিল আইন। রাজাকে বিচার করার ক্ষমতা কারো ছিল না।

রাজা চতুর্দশ লুইয়ের আমলে তার সভাসদ বিশপ বসওয়ে রাজাকে খোদা বা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে ঘোষণা করে বলেছিলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে রাজা হলেন নিষ্কলুষ এবং সেজন্য রাজার বিরূপ সমালোচনা করা বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া খোদানিন্দা বা রাজার পবিত্র চরিত্রের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করার শামিল (আমরা এখন যাকে ব্লাসফেমী বলি)। তার মতে, অন্যদের চাইতে রাজাকেই খোদা অধিকতর বুদ্ধি-বিবেচনার অধিকারী করেছেন। রাজার ক্ষমতা হবে অসীম এবং নিরঙ্কুশ, রাজা তার এ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য দায়ী থাকবেন একমাত্র খোদার কাছে, মর্ত্যের মানুষ ন্যায়ত রাজকীয় নির্দেশের বিরুদ্ধচারণ করতে পারে না। আর অসৎ রাজার বিরুদ্ধে প্রজাসাধারণের সামনে একমাত্র পথ হল খোদার কাছে প্রার্থনা করা যাতে রাজার নিষ্ঠুর হৃদয় পরিবর্তিত হয়। তো এই কথিত খোদার প্রতিনিধি রাজা একদিকে ছিলেন অমিতব্যয়ী, বিলাস-ব্যসনে মত্ত, অন্যদিকে জনগণের প্রতি দায় পালনে ছিলেন বিমুখ ও উদাসীন।

রাজার এ খোদাদত্ত অধিকারকে খারিজ করে দিয়ে ইহজাগতিক চিন্তা তুলে ধরে রুশো লিখেছিলেন, “সকল প্রকার ক্ষমতা খোদাদত্ত, এ না হয় মানলাম; কিন্তু সকল প্রকার রোগ-ব্যাধিও তো খোদার প্রদত্ত : এর অর্থ কি এই যে আমাদের ডাক্তার ডাকতে হবে না?”

শুধু রাজাই নয়, রাজ পরিবারের সদস্য, রাজার কর্মচারী, অভিজাত সম্প্রদায়, জমিদার, ক্যাথলিক গির্জার পাদ্রী এবং যাজক – এদের হাতেও ছিল প্রভূত ক্ষমতা। রাজদরবার, সামরিক বাহিনী, গির্জার যাজকসহ বিভিন্ন পেশায় জন্মসূত্রে অভিজাতদের ছিল একাধিপত্য। অভিজাতদের সম্পর্কে একজন ফরাসি ইতিহাসবিদ লিখেছেন, “ফ্রান্স ছিল একটা বৃহৎ আস্তাবলের মতো, যেখানে কুলীন অশ্বগুলো কিছু কাজ-কর্ম না করেও অথবা মাত্র আধাআধি কিছু করে লাভ করে দু’গুণ-তিনগুণ খোরপোষ, অথচ ধরে আনা অশ্বগুলো সব কাজ সম্পন্ন করে আধাখোরাকে, তাও সর্বদা সরবরাহ করা হয় না।”

এমনকি শিকার করতে গিয়েও অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকজন কৃষকদের ফসল নষ্ট করত। এ অভিজাতদের রুশো তুলনা করেছেন চোর-ডাকাতের সঙ্গে, “যে লোক কুঁড়ে এবং শ্রমবিমুখ, নিজের উপার্জিত আয়ের উপর নির্ভরশীল নয়, সেই তস্কর এবং যে লোক কিছু না করেও রাষ্ট্রের খোরপোশে জীবিকা নির্বাহ করে, আমার চোখে তার সাথে রাজপথে দস্যুবৃত্তি করে যে জীবিকা নির্বাহ করে যে লোক তাদের তেমন কোনো পার্থক্য নেই।”

দাস ব্যবসায়, বর্তমান হাইতির কালো দাসদের রক্ত-ঘামের মূল্যে উৎপন্ন চিনি ফ্রান্সকে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিল। অনেকটা এর ভিত্তিতেই ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল বার্দো, মার্সেই, নাঁত, লে আগ্র ইত্যাদি বন্দর নগর। লেস, নানা ধরনের পোশাক, সাবান, সুগন্ধি, দক্ষিণের লিঁয় শিল্পনগরের রেশমসহ গার্দি অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন পণ্যের কদর ছিল সারা ইউরোপে। খনি এবং অল্প কিছু ভারী শিল্পও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সবকিছুর পরও, ফ্রান্সের রাজা এবং অভিজাতদের আয়ের উৎস ছিল জনগণ বিশেষত কৃষক সম্প্রদায়। রাজার সম্পদের উৎস যে জনগণ, সে সম্পর্কে মঁতেস্কু লিখেছিলেন, “… প্রতিবেশি স্পেনের রাজার মতো তার কোনো স্বর্ণখনি নেই বটে, তবুও তিনি অধিকতর ঐশ্বর্যবান; কেননা তার ঐশ্বর্যের উৎস হয়েছে প্রজাসাধারণের ভাঁড়ার, স্বর্ণখনি থেকেও এটা অধিকতর অক্ষয় …।”

অভিজাত বনাম কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ

ফ্রান্স তখন একটি কৃষিপ্রধান দেশ। ১৭৮৯ সালের হিসাবে দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ গ্রামাঞ্চলে থাকতো। তার মধ্যে ৬৬ ভাগ অর্থাৎ আড়াই কোটি ফরাসির মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষই ছিল কৃষক। অথচ চাষযোগ্য জমির প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল গির্জা ও সামন্তপ্রভুদের হাতে, যদিও তারা ছিল জনসংখ্যার মাত্র ২ ভাগ। জমির ৩০ শতাংশের মালিক ছিল বণিক বা বুর্জোয়াশ্রেণি। চাষচাষীদের ভাগের জমিগুলো ছিল অনুর্বর। চাষীদের মধ্যেও মূলত তিনটি প্রধান ভাগ ছিল – গৃহস্থ চাষী, ভাগচাষী এবং দিনমজুর। এছাড়া বিপ্লবের সময়টাতে ফ্রান্সে প্রায় দশ লাখের মতো ভূমিদাস ছিল।

ফ্রান্সে মাঝেই মাঝেই দেখা দিত অজন্মা, নানা কারণে ফসলের ফলন মার খেত। ফলে গ্রামীণ জনসংখ্যার এক দশমাংশ অংশ কখনো না কখনো ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিতে বাধ্য হত। একজন ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, ফ্রান্সে নয় দশমাংশ লোক অনাহারে মারা যায়, আর এক দশমাংশ মরে অতি ভোজনের ফলে। ইতিহাসিবদদের মতে, মাত্র ১.৫ ভাগ মানুষ গোটা ফরাসি সমাজটাকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছিল।

শিল্পশ্রমিক বলতে যা বোঝায় তার সংখ্যা ছিল নিতান্তই অল্প। এরা ছিল অসংগঠিত। এদের পাশাপাশি শহরে ছিল বিপুল সংখ্যক ছোট দোকানদার, হকার, ফেরিওয়ালা, ছোট ব্যবসায়ী, কারিগর, শিক্ষানবীশ কারিগর, ভবঘুরে, ভ্রাম্যমান অস্থায়ী শ্রমিক, বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ব্যাপক অসংগঠিত শ্রমিক, শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার প্রভৃতি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। শ্রমিক-বিরোধী আইন ছিল অত্যন্ত কড়া। মালিকের সই করা পাস বই ছাড়া শ্রমিক নতুন চাকরি পেত না। শ্রমিক-মালিক বিরোধে মালিকের কথাই বিশ্বাস করা হতো।

কত রকম কর বা খাজনা যে দিতে হত সাধারণ মানুষকে – রাজার আরোপ করা কর, গির্জা কর্তৃক আরোপ করা কর, ভূস্বামী বা জমিদারদের আরোপ করা কর! প্রত্যক্ষ করকে বলা হত তেই (Taille)। আর এক ধরনের কর ছিল যাকে বলা হত টাইদ্ (Tithe) –জমির ফসল বা পালিত গবাদী পশুর একাংশ এ কর হিসাবে দিতে হত। এমনি এক কর হল ‘লবণ কর’ – দরকার থাক বা না থাক, পরিবারের সাত বছরের উপর বয়সী প্রতিটি সদস্যের জন্য বছরে সাত পাউন্ড করে লবণ কিনতে বাধ্য ছিল প্রতিটি পরিবার। আর বাড়িতে যতটুকু লবণই থাক তার জন্য কর দিতে হত।

এর সাথে ছিল রাস্তার খাজনা, ঘাটের খাজনা, হাটের খাজনা, জমিদারদের উৎসব খাজনা। বিয়ে, মৃত্যু, সামাজি উৎসব অনুষ্ঠান সবকিছুর জন্যই জমিদারকে কর দিতে হত। গম পেষা, আঙুর নিঙড়ে মদ তৈরির মতো কাজগুলো করতে হত জমিদারের যাঁতা বা যন্ত্রে, পাউরুটি তৈরি করতে হত জমিদারের চুল্লিতে – এসবের জন্যও দিতে হত আলাদা কর। জমিদারের পায়রার খাবার যোগাড় করতে হত চাষীদের। সেনাবাহিনীর চলাচলের জন্য বেগার খাটতে হত সাধারণ মানুষকেই।

ফরাসি কৃষকদের আয়ের চার-পঞ্চমাংশ নিঃশেষ হত রাজার কর, গির্জার ধর্মকর ও জমিদারদের দায় মেটাতে। শিল্পমালিক, বণিকশ্রেণি, ছোট ছোট কারখানা বা গিল্ডের মালিক ও কারিগর সম্প্রদায়ের জন্যও কর ব্যবস্থা ছিল দারম্নন বিপত্তির কারণ। দেশের মধ্যে এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে, এক জমিদারী থেকে আরেক জমিদারীতে মালামাল বহন করতে হলেও কর দিতে হত। জমির চড়া দাম এবং করের বদৌলতে জমিদারী পরিণত হয়েছিল সোনার খনিতে।

আইনও ছিল গরিবের বিপক্ষে। এটা ধরেই নেওয়া হতো যে গরিবেরা চুরি করবেই। তাদের বিচার করার সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে ততটা মাথা ঘামানো হতো না। সামান্য চুরির অভিযোগে কাজের লোকের ফাঁসি পর্যন্ত হয়েছে, পরে হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া গেছে বা ইতোমধ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা ব্যক্তির নির্দোষিতা প্রমাণিত হয়েছে, এমন ঘটনা নিতান্ত বিরল ছিল না।

প্যারিসে অভিজাত, যাজক, উচ্চিবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার। রাজার দরবারে অভিজাত দরবারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ছিল ৫ লক্ষ। এদের বাইরে ছিল প্রায় ৫০ হাজারের মতো ভাসমান মানুষ। people শব্দটা তখন অবমাননাসূচক। শ্রমজীবী মানুষকে ডাকা হতো সাঁ-কুলোৎ (sans-culotteculotte), অন্যদিকে অভিজাতদের ডাকা হতো সাঁ-নিয়েৎ নামে। দেশের প্রায় সব বিদ্যালয়ই ছিল চার্চের নিয়ন্ত্রণে। চার্চ নিজস্ব আদালত চালাতো। চার্চের অত্যাচারে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু চার্চের মধ্যেও ছিল দুটো শ্রেণি – উপর তলার যাজক অর্থাৎ বিশপ, অ্যাবট এবং ক্যানন’রা আসত অভিজাত পরিবার থেকে, তারা ছিল বিত্ত-বৈভবের অধিকার। আর নিচের তলার পাদ্রী এবং ভিকাররা আসত সাধারণ মানুষদের মধ্য থেকে। এদের ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরানো দশা। তাই এদেরকে বলা হত সর্বহারা যাজক।

প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের জনগণের দুঃখ-কষ্টের অবধি ছিল না বটে, কিন্তু শুধু দুঃখ-কষ্টই তাদের বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করেনি। আঠারো শতকের এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানোন্মেষজনিত চেতনা তাদের ওই পুঞ্জিভূত বেদনায় অগ্নিসংযোগ করেছে, বিপ্লবের পথ দেখিয়েছে।

বিদ্রোহ নয়, বিপ্লব

রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সময় থেকেই জনজীবনে অবক্ষয় আর অবনতি প্রকট হয়ে উঠতে থাকে।রাজা এবং তার আমর্তøদের অপচয়, জনগণের প্রতি দায়হীন আচরণ বাড়তে থাকে। যাজক-অভিজাতদের শোষণ-অত্যাচারও ক্রমাগত বাড়ছিল। এল ১৭৮৯ সাল।রাজা-রানীর বিলাসিতায় রাজকোষ শূন্য। জনগণের কাছ থেকে আরো বেশি করে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে রাজা এতা জেনেরোর অধিবেশন ডাকলেন।

তখন ফ্রান্সের জনগণকে তিনভাগে ভাগ করা হত।ধর্মীয় যাজকগোষ্ঠী এবং সমাজের উপরতলার অভিজাত সম্প্রদায় হল প্রথম দুই এস্টেট। বণিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, কারিগর এবং বিভিন্ন পেশাজীবী অর্থাৎ সাধারণ মানুষ হলেন তৃতীয় এস্টেট। এই তিন এস্টেটের প্রতিনিধি নিয়ে হল এতা জেনেরো বা এস্টেটস জেনারেল (Estates General)। এই এস্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ১৬১৪-এর পর আর একবারও ডাকা হয়নি।

১৭৮৯ সালের ৫ মে ভার্সাই-এর এস্টেট জেনারেলের অধিবেশন বসল। প্রথা ছিল, রাজা বক্তৃতা করার সময় তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা হাঁটু গেড়ে বসবেন। কিন্তু এবার তা হল না, তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্য অবাধ্যতা দেখালেন, তারা দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজা আসলেন, তার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় আরো টাকা দাবি করে চলে গেলেন। এদিকে বাইরে প্যারিস থেকে বিক্ষুব্ধ জনগণ এসে ভীড় করছে ভার্সাইতে। রাজার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের জন্য তারা চাপ দিচ্ছে তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিদের ওপর। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা মূলত পেটিবুর্জোয়া শ্রেণিভুক্ত। তারা রাজার বিরুদ্ধে হলেও বেশিদূর যেতে চান না, পরিস্থিতির চাপেই তারা সংগ্রামী ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

এস্টেট জেনারেলের অধিবেশনে প্রথম দুই এস্টেটের সঙ্গে তৃতীয় এস্টেটের বিরোধ শুরু হল ভোট দেয়ার পদ্ধতি নিয়ে। নিয়ম ছিল পরিষদে প্রত্যেক এস্টেটের একটি করে ভোট থাকবে, তা সে এস্টেটের সদস্য সংখ্যা যাই হোক না কেন। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা এই পুরনো নিয়ম পরিবর্তনের দাবি জানালেন। কারণ এ নিয়মের কারণে সংখ্যায় বেশি হয়েও তাদের ভোটের কোনো মূল্য থাকবে না। এ নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে বিরোধ চলল। অভিজাত এবং যাজক সম্প্রদায় যখন কিছুতেই এ দাবি মানতে রাজি হল না তখন তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা নিজেদেরকেই জাতীয় পরিষদ বলে ঘোষণা করল। এটা ১৭ জুনের ঘটনা।

তৃতীয় এস্টেট আরো জানাল, তৃতীয় এস্টেট অর্থাৎ জাতীয় পরিষদের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত, রাজার কোনো অধিকার নেই তা বাতিল করার বা অমান্য করার। একদিক থেকে দেখতে গেলে ফরাসি বিপ্লব হল প্রথম দুই এস্টেটের বিরুদ্ধে তৃতীয় এস্টেটের বিদ্রোহ। গির্জার একজন যাজক সিয়ের লিখলেন, “তৃতীয় এস্টেট কি? কিছু না। তার কী হওয়া উচিত? সব। সে কী হতে চায়? একটা কিছু।” এর তিনদিন পর, ২০ জুন বিপ্লবী জাতীয় পরিষদের সদস্যরা যে হলঘরে মিলিত হতেন, দেখা গেল সেই ঘরের দরজা বন্ধ। বলা হল, ঘরের মেরামত কাজ চলছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিদের সামনে গোপন রইল না। রাজা চান না যে তৃতীয় এস্টেট বা বিপ্লবী জাতীয় পরিষদের সভা বসুক।

বিপ্লবী জাতীয় পরিষদের সদস্যরা এতে না দমে গিয়ে পাশের এক টেনিস কোর্টে সভায় মিলিত হলেন। তারা নিজেদের সংবিধান প্রণয়নকারী সংসদ বলে ঘোষণা করলেন এবং সংবিধান রচনা শুরু করলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রাজা চাতুর্যের সঙ্গে জানালেন যে তিনি সংবিধান রচনার কাজে বাধা দেবেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তৃতীয় এস্টেটের ওপর সশস্ত্র আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। ভার্সাই-এ প্রচুর সেনা মোতায়েন করা হল, প্যারিস শহরও বিশ হাজার সেনা দিয়ে ঘিরে ফেলা হল। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে জনগণ আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। প্রতিদিনই শহরের কেন্দ্রস্থলে শহরবাসীরা জমায়েত হচ্ছে, সেখানে চলছে রাজতন্ত্র-অভিজাততন্ত্র-যাজকতন্ত্র-বিরোধী বক্তৃতা। রাজা একদল বিদেশী সৈন্য নিয়ে এসেছিলেন প্যারিসবাসীকে দমন করার জন্য। ১২ জুলাই তারা প্যারিসবাসীর ওপর আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল বিস্ফোরণ। জনগণ প্রস্তুতি নিয়েই ছিল, আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে শহরের ঘণ্টা বেজে উঠল। বিপ্লবী জনগণ রাষ্ট্রীয় অস্ত্রভাণ্ডার দখল করে নিয়ে পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হল। একটি ফরাসি গার্ড রেজিমেন্ট জনগণের পক্ষে অবস্থান নিল।

১৪ জুলাইকে বলা হয় ফরাসি বিপ্লবের সূচনা পর্ব। বাস্তিল দুর্গ থেকে জনগণের ওপর কামান দাগা হবে এমন গুজব চারিদিকে। এই বাস্তিল দুর্গটি ছিল একদিকে অস্ত্রের ভাণ্ডার, অন্যদিকে রাজার কারাগার। রাজবিদ্রোহের অপরাধে সেখানে আটকে রাখা হত সাধারণ মানুষকে। বলা হত যে একবার বাস্তিলের ভেতরে আটক হয়েছে সে আর জীবিত বের হতে পারে না। জনতা ছুটল বাস্তিল দুর্গের দিকে। কারাগার ভেঙে জনতা মুক্ত করে দিল বন্দিদের। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল বিপ্লবী জনতার বিজয়বার্তা। কথিত আছে যে বাস্তিল পতনের খবর শুনে রাজা আঁতকে উঠে বলেছিলেন, ‘কি বলছ, এ-যে বিদ্রোহ!’ উত্তরদাতা বলেছিলেন, ‘এটা বিদ্রোহ নয়, বিপ্লব।’

বাস্তিল দুর্গ পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ল সারাদেশে। ফ্রান্সের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল বিপ্লবের দাবানল। গ্রামে গ্রামে কৃষকরা জোট বেঁধে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ে সামিল হল। তারা জমিদারি দখল করে নিল। জমিদারের দপ্তরে প্রজা-নিপীড়নের যেসব দলিল-দস্তাবেজ ছিল তাতে আগুন লাগিয়ে দিল। ভয়ে-আতংকে জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করল।

৪ আগস্ট ১৯৮৯, জমিদারতন্ত্রের অবসান ঘোষণা করল বিপ্লবী জাতীয় পরিষদ। এরপর ২০ আগস্ট থেকে শুরু হল ‘মানবাধিকারের ঘোষণা’। রুশোর মতবাদকে ব্যক্ত করেই বিপ্লবীদের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে বলা হল, “মানুষ মাত্রেই সমান, সমষ্টিগত ইচ্ছাই হল আইন, জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।” সংবিধান সভা ফ্রান্সের সংবিধান রচনা করল যেখানে রাজার ক্ষমতাকে কেটেছেঁটে কমিয়ে আনা হল। অর্থাৎ রাজা রয়ে গেলেও তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রইল না। একে বলা হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ফ্রান্সের প্রথম বিপ্লবী পরিষদ জাতীয় সংবিধান সভায় (১৭৮৯-৯১) যে সংবিধান রচনা করেছিল তাতে মঁতেস্ড়্গুর ‘ক্ষমতার বিভাজন নীতি’ অর্থাৎ বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইন বিভাগকে পরস্পর থেকে পৃথক করার নীতি কঠোরভাবে অবলম্বন করেছিল।

জাতীয় সভায় যখন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়েছে, তখন দেশে খাদ্যসংকট চরমে। এমন পরিস্থিতিতে, ভুখা নারীরা রুটির দাবিতে মিছিল নিয়ে বারো মাইল দূরের ভার্সাই গিয়েছে রাজার কাছে দাবি পেশ করতে (৫-৬ অক্টোবর)। সারাদিন রোদবৃষ্টির মধ্যে পায়ে হেঁটে, সারারাত রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করে রেখে, পরদিন রাজাকে সপরিবারে বন্দি করে প্যারিসে নিয়ে এসেছে, তাকে বাধ্য করেছে জাতীয় সভার অধিবেশনে যোগ দিতে। এ বছর ২ নভেম্বর বিপ্লবী পরিষদ গির্জার সম্পত্তি জাতীয়করণ করার ঘোষণা দেয়। ১৭৯০ সালের ১৯ জুন ঘোষণা করা হল অভিজাততন্ত্রের অবসান।

বিপ্লবের তরঙ্গসংকুল পথ

ফরাসি বিপ্লবের সূচনা ১৪ জুলাই ১৭৮৯ ধরা হলেও তা ধাপে ধাপে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এগিয়েছে। বাস্তিলের পতন, সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকারের ঘোষণা ইত্যাদি ধাপ পেরিয়ে বিপ্লব এগিয়ে গেল প্রজাতন্ত্র ঘোষণার স্তরে। ১৭৯১ সালের ১০ আগস্ট প্যারিসের সংগ্রামী জনতা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে রাজপ্রাসাদ দখল করে নেয়। বিপদ টের পেয়ে রাজা-রানী আগেই পালিয়ে গিয়েছিল। ফ্রান্স থেকে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা সীমান্তের দিকে যাওয়ার পথে ধরা পড়েন। বন্দি রাজা বাধ্য হলেন সংবিধানকে স্বীকৃতি দিতে। এর মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটে, স্থাপিত হয় প্রজাতন্ত্র। এটাকে ধরা হয় বিপ্লবের দ্বিতীয় স্তর হিসাবে।

১৭৯২ এপ্রিল মাসে প্রতিবেশী অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং সে যুদ্ধে ফ্রান্সের বিপর্যয়ও ঘটে। এ সময় জিরদ্যাঁ গোষ্ঠী (ফইয়্যা মন্ত্রীসভা) ‘জন্মভূমি বিপন্ন’ শ্লোগান তোলে এবং বিদেশী শক্তির সহযোগিতায় তারা ঘোষণা করে যে রাজতন্ত্র-বিরোধীদের প্রতি কঠোর শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হবে। রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ফরাসি ন্যাশনাল গার্ডদের সহযোগিতা করার জন্যে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে প্যারিসে সমবেত হতে থাকে। এই স্বেচ্ছাসেবকদের বলা হত ফেদেরে (federates)। মার্সেই অঞ্চলের ফেদেরেরা যে গান গাইতে গাইতে প্যারী আসে সেই গানই বিপ্লবী ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত হিসেবে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় বিপ্লব দোদুল্যমান আইন সভার ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়। ক্ষমতায় আসে জিরদ্যাঁপন্থী বা জিরোন্ডিস্টরা। ১৭৯২ সালের সেপ্টেম্বরে আইন পরিষদ বাতিল করে ডাকা হয় জাতীয় কনভেনশন। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এ কনভেনশন গঠিত হয়। জ্যাকোবিন গোষ্ঠীর রাজত্বকালকে ধরা হয় বিপ্লবের তৃতীয় পর্ব হিসাবে। সামন্ততন্ত্র পুরোপুরি উচ্ছেদ, রাজার বিচার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে জিরদ্যাঁ গোষ্ঠী আপোষমুখী ভূমিকা গ্রহণ করলে জ্যাকবাঁপন্থী বা জ্যাকোবিনরা বিপ্লবের সামনের কাতারে চলে আসে। ১৭৯৩ সালের ২ জুন প্যারিসের বিপ্লবী জনতা ঘেরাও করে জাতীয় কনভেনশনের সভাস্থল। বন্দি করা হয় জিরদ্যাঁপন্থী নেতাদের। এরপর জ্যাকোবিনদের নেতৃত্বেই সামন্ততন্ত্র ও যাজকতন্ত্রের পুরোপুরি উচ্ছেদ সাধিত হয়।

বুর্জোয়াশ্রেণি শক্তি নিয়ে উদ্ভূত হলেও এ শ্রেণির কোনো একক নিটোল চরিত্র ছিল না। এদের মধ্যে পুঁজি লগ্নীর কারবারে লিপ্ত অংশ ছিল যথেষ্ঠ শক্তিশালী, সামন্তী ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সংযোগ ছিল নিবিড়; তাদের ওপর রাজা নির্ভরশীল থাকত, বিনিময়ে তারাও নানা রকম সুবিধার ভাগ পেত। ফলে বিপ্লবের ময়দানে এদের ভূমিকা সংস্কারবাদী হলেও ছিল রক্ষণশীল, খানিকটা সামন্ততন্ত্রের সমর্থক। অভিজাত ও যাজকদের মধ্যে যারা বিপ্লবের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের মতো এরাও ছিলেন দোদুল্যমান, রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্র পুরোপুরি উচ্ছেদের প্রশ্নে বিপ্লব-বিরোধী। অন্যদিকে ফ্রান্সের গরিব মানুষেরা, বিশেষত নারীসমাজ ও শ্রমজীবীরা তুলনায় ছিল অনেক বেশি বিপ্লবকামী।

বিপ্লবের মঞ্চে প্যারিসের সংগ্রামী নারী ও শ্রমজীবী জনগণ

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ফ্রান্সের, বিশেষত প্যারিসের নারীদের ভূমিকা, তাদের বিপ্লবী উদ্যোগের কথা। শুধু যে জনগণের প্রতিটি অভিযানে দরিদ্র, নিপীড়িত পরিবারের নারীরা অংশগ্রহণ করেছে তাই নয়, নারীদের ভুখা মিছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ওই উত্তাল সময়ে নারীরা দাবি তুলেছে একচেটিয়া সম্পত্তি তথা একচেটিয়া পুঁজিকে খর্ব করা, খাদ্যশস্যের দর বেঁধে দেওয়া, জমির খাজনা নির্দিষ্ট করা, নারীদের ওপর পুরুষের অত্যাচার বন্ধ করার দাবি তুলেছে। বাস্তিল দখল, রাজাকে বন্দি করা, জনগণের কর আদায়, ন্যায্যমূল্যে জোর করে জিনিস কেনা, রাজার সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা, নিজেদের সঞ্চয় এমনকি গয়না দিয়ে বিপ্লবীদের সহযোগিতা করা, বিপ্লবী সৈনিকদের জন্য মোজা বুনে দেওয়া, সুলভ দামে খাদ্যের দাবিতে কঁভ্যাসিয়ঁ ঘেরাও, জার্মিনাল ও প্রেয়ারিয়ালের সশস্ত্র বিদ্রোহ প্রচেষ্টা, সব কিছুতে মেয়েরা ছিল অগ্রণী।

প্যারিসের একদল মেয়ে একটি চিনির গাড়ি থামিয়ে ন্যায্যমূল্যে – অর্থাৎ মোটামুটিভাবে মূল্যবৃদ্ধির আগের দামে চিনি বেচতে বাধ্য করল। নারীদের এ ভূমিকায় উৎসাহিত হয়ে সাধারণ মানুষও দোকানে দোকানে হানা দিয়ে ‘ন্যায্যমূল্যে’ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে লাগল। তারা জারি করল ‘জনগণের কর’। ধোপানিদের একটি দল মিছিল করে সাবানের দাম বেঁধে দেওয়ার দাবি করেছিল। অনেকটা মেয়েদের চাপেই সম্পত্তির সর্বোচ্চ সীমার আইন পাস হয়েছিল। সাঁকুলোৎ’দের সভা-সমিতিগুলোতে মেয়েরাও যোগ দিত। ১৭৯০ সালে ক্লদ দানসার্ট প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী-পুরুষের ভ্রাতৃত্ব সংঘ’। মেয়েরা ১৭৯৩ সালে গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সংগঠন গণতান্ত্রিক নারী সমিতি (Society of Revolutionary Republican WomenWomen)। শুধু নিজেদের জন্য নয়, তারা সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত নারীদের কথাও ভেবেছিল। নারী গণতান্ত্রিক সমিতির একটি দাবি ছিল গণিকাবৃত্তি বন্ধ করা, গণিকাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

জিরদ্যাঁ নেত্রী পলিন রোলাঁ, অলিম্পে দ্য গুগজ এমন অনেক নারীনেত্রীকেই প্রাণ দিতে হয়েছে গিলোটিনে। নারী গণতান্ত্রিক সমিতির নেত্রী রোজ লাকঁবকে কেউ কেউ বিশ্বের প্রথম নারী কমিউনিস্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন। শোনা যায়, নেপোলিয়ান যখন নারীদের রাজনীতি করার অধিকার খর্ব করেছিল তখন এক বিপ্লবী নারী তার মুখের ওপর জবাব দিয়েছিল, ‘সম্রাট, মেয়েদের মাথা যদি গিলোটিনে কাটা যেতে পারে, তাহলে তারা কেন রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে না?’ মেয়েদের রাজনীতি করা নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল। সবশেষে ত্যারমিদরী প্রতিক্রিয়ার আমলে মেয়েদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়।

ফরাসি বিপ্লবে দরিদ্র জনগণের বিশেষত পেটিবুর্জোয়া জনগণের ভূমিকা শুধু কিছু মিছিল আর সশস্ত্র অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বুর্জোয়াদের উচ্চারিত সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বাণী এদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সামন্তীসমাজ থেকে মুক্তির বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু বিপ্লবের গতিপথে কিছুদূর এগোনোর পর এরা দেখেছে, যে স্বাধীনতার কথা তারা শুনেছে এবং ভেবেছে, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বুর্জোয়াদের সম্পত্তি অর্জনের ও তার সাহায্যে সম্পত্তি বৃদ্ধির অধিকারের স্বাধীনতায় (১৭৮৯ সালে ঘোষিত মানবাধিকারের ঘোষণায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে অবিচ্ছেদ্য ঘোষণা করা হয়)। তারা দেখল যে দরিদ্র জনগণ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেল।

পেটিবুর্জোয়াদের সংগঠিত শক্তি ‘সাঁকুলেৎ’-দের ১৭৯৩ সালের কনভেনশন থেকে দাবি তোলা হল যে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দর, শ্রমের মজুরি, শিল্পবাণিজ্যের মুনাফা – এগুলির হার বিনাশর্তে বেঁধে দিতে হবে। তারা দাবি তুলেছিল, সম্পদের ঊর্ধ্ব সীমা বেঁধে দিতে হবে, প্রত্যেকের জন্য একটাই ঊর্ধ্বসীমা থাকবে, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি চাষের জমি কেউ রাখতে পারবে না, কোনো নাগরিক কেবল একটা কারখানা বা একটা দোকানের মালিক হতে পারবে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হল, ‘যারা বলে সম্পত্তির স্বাধীনতা অলঙ্ঘ্যনীয়, তারা ভুল বলে কারণ বাস্তব প্রয়োজনের বাইরে সম্পত্তির কোনো ভিত্তি নেই’।

শ্রমিকদের অবস্থার কথা আমরা আগেই বলেছি। এরাই সেদিন দলে দলে এগিয়ে এসে এক একটা জুর্নি (JourneeJournee) বা বিপ্লবী অভিযানকে সফল করে তুলেছিল। এরাই সেদিন ভেঙে দিয়েছিল কুখ্যাত শুল্ক ঘাঁটি – রাজার খাজনা আদায়ের কেন্দ্রস্থল, এদের হাতেই ধ্বংস হয়েছে সামন্তী শাসনের ঘৃণিত প্রতীক বাস্তেই বা বাস্তিল দুর্গ। রাজার আদেশ মেনে তৃতীয় এস্টেটের ডেপুটিদের বন্দি করতে অস্বীকার করার সৈন্যদের কারারুদ্ধ করা হলে এরাই জেল ভেঙে সৈন্যদের মুক্ত করেছে।

বিপ্লব যত এগিয়েছে, দেখা গেছে যে পেটিবুর্জোয়া জনগণ অসংগঠিত হলেও নেতৃত্ব যখনই বিপ্লবী লক্ষ্যকে সামনে তুলে ধরেছে, জনগণ তার সমর্থনে দাঁড়িয়েছে। যখই নেতৃত্ব আপোষ করতে চেয়েছে, কিছুদূর এগিয়ে থেমে যেতে চাইছে, জনগণ তার বিরোধিতা করেছে। চলতে চলতে পেটিবুর্জোয়া জনগণও খানিকটা সংগঠিত হয়েছে।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের ধারণা

আমাদের মনে রাখতে হবে যে সেদিন আধুনিক রাজনৈতিক দল বলতে যা বোঝায় তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। রাজনৈতিক দল বা সংগঠন ছিল ভ্রণাবস্থায়। তখন গড়ে উঠেছিল কিছুটা ঢিলেঢালা ধরনের সংগঠন বা গোষ্ঠী। মানুষ কোনো বিশেষ নেতা বা ব্যক্তির পেছনে জোট বাঁধত, কোনো বিশেষ পত্রিকাকে ঘিরে গোষ্ঠী বা সমিতি গড়ে উঠেছিল।

জ্যাঁকোবিনদের ক্লাবগুলো গড়ে উঠেছিল শহরাঞ্চলে। কর্দেলিয় ক্লাব ছিল সমাজের নিচুতলার মানুষদের নিয়ে। প্যারিসের প্রতি পাড়ায় মহল্লায় গরিব-শ্রমজীবী মানষের সংগঠন সাঁকুলোৎ’দের ক্লাব বা সমিতি গড়ে উঠেছিল। তারা নিজেদের অফিসার নির্বাচন করত, স্থানীয় প্রশাসনের ভার নিত, আবার জাতীয় রাজনীতির দিকে তীক্ষ্ম নজর রাখত। সমিতির মিটিংয়ে আসার জন্য প্রত্যেককে চল্লিশ সু (পয়সা) করে দেওয়ার রেওয়াজ চালু ছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিল যে গরিব মানুষ রুজি-রোজগার বাদ দিয়ে রাজনীতি করবে কিভাবে? তাদের এ সহায়তা না দেওয়া হলে রাজনীতি করতে পারবে না, আর এর ফলে রাজনীতি ধনীদের একচেটিয়া হয়ে যাবে। ক্লাবের মিটিংয়ে নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, পত্রিকা পড়া, দার্শনিকদের রচনা পাঠ করত। সাঁকুলোৎ’রা পথনাটকও মঞ্চস্থ করত যেখানে দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি, জনগণের সমস্যা সবাই উঠে আসত।

সাঁকুলোৎ’দের সবচেয়ে বড় অবদান নিজেদের মধ্যে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের (direct democrecydemocrecy) চর্চা, যার কথা রুশো বলতেন। কয়েক বছর অন্তর অন্তর নির্বাচনে প্রতিনিধি নির্বাচন করে নিশ্চিত হয়ে বসে থাকা নয়। জনগণ নিজেরাই সরাসরি প্রশাসন চালাবে, আইন পাস করবে। ক্লাবের অফিসারদের নির্বাচকরা ইচ্ছামতো প্রত্যাহার করে (right to recallecall) নিতে পারত। প্রাচীন রোম ও গ্রিসে খানিকটা এ ধরনের চর্চা হত, এ পদ্ধতিরই উন্নত ও বিকশিত রূপ আমরা দেখেছি রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে।

সাঁকুলোৎ’দের রাজনীতি নরমপন্থী-আপোষকামী বুর্জোয়া শক্তিকেও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। বিপ্লব-বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাঁকুলোৎ’দের আপোষহীন লড়াই নরমপন্থী বুর্জোয়াদের আরো বেশি করে বিপ্লব বিরোধী করে তুলেছিল। ফরাসি বিপ্লবের রোবসপীয়ের ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। রুশোর একনিষ্ঠ অনুগামী রোবসপীয়ের যখন নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তখন একদিকে রাজতন্ত্রের সমর্থক বিদেশী রাজশক্তির হাতে ফ্রান্সের সৈন্যবাহিনী ক্রমাগত পর্যুদস্ত হয়ে চলেছে, বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী তখনও পর্যন্ত সংহত হয়ে ওঠেনি, অপরদিকে দেশের মধ্যে হীনবল রাজতন্ত্রী-অভিজাত-যাজকশক্তি, আপোষকামী উচ্চবর্গীয় বুর্জোয়াশ্রেণি, জিরদ্যাঁ গোষ্ঠীর মতো মধ্যবুর্জোয়ারা, এমনকি তাঁর নিজের জ্যাকবাঁ গোষ্ঠীতে দাঁতঁ’র মতো অনেকে বিপ্লবের অগ্রগতিকে রোধ করতে চাইছে, বিপ্লববিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। ওই সময় রোবসপীয়ের নির্ভরযোগ্য সহযোগি হিসেবে পাশে পেয়েছিলেন বিপ্লবী সাঁকুলোৎ জনগোষ্ঠীকে। এদের সাথে নিয়েই তিনি কঠিন হাতে বিপ্লববিরোধী বিশ্বাসঘাতকদের দমন করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

গরিব মানুষ, বিশেষত সাঁকুলোৎ’দের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র চর্চার ঘটনা বুর্জোয়াশ্রেণি ও বিপ্লবী সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্বকে প্রবল করে তোলে। ১৭৯৪ সালের ২৮ জুলাই ফরাসি বিপ্লবের মহান নেতা রোবসপীয়ের গিলোটিতে প্রাণ দিলেন। বিপ্লবের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল উপরের দিকের বুর্জোয়াদের হাতে, তারাই ক্ষমতা দখল করল। শুরু হল ত্যারমিদরী প্রতিক্রিয়া। এ সময় সাঁকুলোৎ’দের কেবল অর্থনৈতিকভাবে সর্বনাশ করা হল তাই নয়, রাজনৈতিক দিক থেকে তাদের পাখা কাটার বন্দোবস্ত হল। বিপ্লবী কমিটিগুলি তুলে দিয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হল। বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সবক্ষেত্রে প্রতিআক্রমণ শুরু হল। এক আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তোলা হল যারা সাঁকুলোৎ’দের খতম করা। এরই এক পর্যায়ে সাঁকুলোৎ জনগণ জ্যাঁকবা গোষ্ঠীর অবশিষ্টাংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জার্মিনাল ও প্রেয়ারিয়লের বিদ্রোহ (এপ্রিল ও মে ১৭৯৫) শুরু করেছিল। কিন্তু তাদের সে বিদ্রোহ সফল হয়নি। বুর্জোয়াদের এই প্রতিবিপ্লবী বর্বরতার ধারাবাহিকতায় নেপোলিয়ন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হল। ১৭৯৯ সালে এক ক্যুদেতার মাধ্যমে নেপোলিয়ন বোনাপোর্তের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল প্রকারান্তরে রাজতন্ত্রই কায়েম করেছিল।

বিপ্লবের ফলাফল : আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা

১। এক জাতি, এক দেশ, এক সংবিধান: জাতি সম্পর্কে, গণতন্ত্র সম্পর্কে ফরাসি বিপ্লব নিয়ে এল এক নতুন ধারণা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পুরনো ল্যাটিন ধারণা অনুযায়ী জাতি বলতে বোঝাত একটি দেশের অধিবাসীদের। ফরাসি বিপ্লবের মধ্যদিয়ে জাতি শব্দটি একটি নতুন ব্যঞ্জনা পেল। ‘জাতি’ শব্দটির অর্থ হয়ে দাঁড়াল দেশের নাগরিকদের দ্বারা সৃষ্ট এক রাজনৈতিক সমষ্টি। বিশেষত, রাজা ষোড়শ লুইকে খোদার প্রতিভূ থেকে সাধারণ নাগরিক লুইতে পরিণত করার পর, জাতি শব্দটি তার সার্বভৌমিক পরিপূর্ণতা লাভ করল। কিন্তু এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ‘জাতি’ নিঃসন্দেহে বুর্জোয়াদের শ্রেণিগত প্রাধান্যে উত্তরণের প্রতীক, মাধ্যম ও অভিব্যক্তি। ১৭৮৯-এর ৪ আগস্ট প্রাদেশিক বিশেষ সুবিধাগুলির বিলোপসাধন, প্রদেশগুলির সমতাভিত্তিক, সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক বিভাজন করা হল। সাম্যভিত্তিক এই নতুন প্রাদেশিক বিভাজনের কাঠামোটি নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগকে সহজতর করেছিল। প্রাদেশিক পুনর্গঠনের সমান্তরালে ১৭৯১ সালের সেপ্টেম্বর বিপ্লবীদের রচিত সংবিধান ঘোষণা করেছিল যে মাতৃভূমি হল ‘এক এবং অবিভাজ্য’। পুরনো সামন্তীয় রাষ্ট্রকাঠামোর বিলোপ সাধন করে তারা প্রণয়ন করেছিল একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় মানচিত্র।

২। সবার জন্যে এক আইন: একইভাবে সেদিন ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আইনি সমতা। দার্শনিক হেগেলে বলেছিলেন যে ফ্রান্সে ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন বদলায়। দেশটির কোথাও ছিল লিখিত আইন, কোথাও প্রথাগত আইন। বিপ্লরেব পর একটিমাত্র নির্দিষ্ট আইন ও বিচারব্যবস্থার আওতায় এল সমগ্র দেশ। ১৭৯০-এর ৫ জুলাই সংবিধানসভা আইন করে বিচারপতিদের সরকারি বেতনভোগী কর্মচারীতে পরিণত করল এবং বিনাখরচে সাধারণ মানুষের কাছে বিচারব্যবস্থাকে পৌঁছে দিল। এই আইন অনুযায়ী, শুধু অভিজাতরাই নন, যে-কোনো নাগরিকই বিচারপতি পদে নিযুক্ত হতে পারবে।

৩। গণতান্ত্রিক শাসন: ফরাসি বিপ্লবের যুগান্তকারী ঘটনাটি ইউরোপে এক অবিশ্বাস্য ওলটপালট ঘটিয়েছিল। এ সময় থেকেই ‘গণতন্ত্র’ হয়ে উঠল এক আন্দোলন, এক যুদ্ধ, যা নিছক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বলা দরকার যে আংশিক হলেও, জনগণের এক বিরাট অংশকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব গণতন্ত্রকে প্রয়োগ করে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে জোরদার করে।

ফরাসি বিপ্লবের ধারণা অনুযায়ী গণতন্ত্র হল এমন এক জমানা যেখানে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলির পেছনে থাকবে জাতীয় স্বার্থ এবং যেখানে নাগরিকের অধিকার থাকে সুরক্ষিত। বিপ্লবের পর নাগরিকদের নিজ নিজ পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, সমস্ত সরকারি পদে নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়োগ এবং নিয়মিত নির্বাচন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলিকে জোরদার করেছিল। ফরাসি বিপ্লব এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিল যা থেকে ফ্রান্স তো বটেই ক্রমে ইউরোপ এবং সারা পৃথিবী লাভবান হয়েছে। আজকের পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ, জাতীয় তথা জনগণের সার্বভৌমত্বের ভাবাদর্শটির জন্য ফরাসি বিপ্লবের কাছে ঋণী।

৪। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র: এর পাশাপাশি ফ্রান্সে কার্যকর করা হল রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি। বিপ্লবী সরকার কর্তৃক নাগরিকদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হল। ফ্রান্সে ক্যাথলিক চার্চ ও এর যাজক-পাদ্রীদের দৌরাত্ম্যে প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান ও ইহুদিদের বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। জোর করে ধর্মান্তর করানোর ঘটনাও ঘটত। ১৭৯১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নিয়ম করা হল, নাগরিকদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে গির্জার কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না, থাকবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। যেসব নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় যেগুলিতে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সুপরিস্ফুট। উদাহরণস্বরূপ, বিধিবদ্ধ উপায়ে সরকারি কর্মচারীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত না হলে, বিবাহকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। এ ধরনের বিবাহে যাজকদের অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ করা হয়। এমনিভাবে নিয়ম করা হয় যে ‘কোনো পার্থক্য না করে, সমস্ত অধিবাসীদের’ জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ সংক্রান্ত তথ্যগুলি শুধু সরকারি কর্মচারীরাই লিপিবদ্ধ করবেন।

৫। অখণ্ড জাতীয় বাজার: ফরাসি বিপ্লব আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। সেটি হল মেট্রিক পদ্ধতি চালু এবং অখণ্ড জাতীয় বাজার প্রতিষ্ঠা।

১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে ৮শ’ ভিন্ন রকমের পরিমাপ-পদ্ধতি প্রচলিত ছিল যা কৃষক, কুটিরশিল্পী, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনকে ব্যাহত করত। বিশেষত উঠতি বুর্জোয়া এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এ ছিল এক চরম দুর্ভোগ – এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বাণিজ্য করার পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা।  ১৭৯০ সালের ৮ মে সংবিধান সভায় পরিমাপ ব্যবস্থার ঐক্যসাধন সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয় এবং ১৭৯৩ সালের ১ আগস্ট এ পদ্ধতি সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়। ১৭৯৫ সালের ৭ এপ্রিল থেকে তা সমগ্র ফ্রান্সে প্রচলিত হয়। আর এই আধুনিক পরিমাপ পদ্ধতি গোটা ফ্রান্সকে একটা অখণ্ড জাতীয় বাজারে পরিণত হতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতি পরে পুরো ইউরোপ এবং গোটা বিশ্বে এ পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে।

বিপ্লবের অভিমুখ: সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ

বিপ্লবের সময় একজন গরিব ধর্ম যাজক বলেছিলেন, “মানুষের জীবনের চেয়ে কি মূল্যবান কতিপয় শয়তানের সম্পত্তির অধিকার?” ফরাসি বিপ্লবই প্রথম এ চিন্তা তুলে ধরে যে সমাজে বৈষম্য আর অবিচার-নিপীড়নের ভিত্তি হল ব্যক্তিগত সম্পত্তি। রুশোর লেখায় আমরা তার সন্ধান পেয়েছি। এ বিপ্লব আরো দেখিয়েছে সমাজের তথাকথিত নিচুতলার অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্ঘশক্তির স্বরূপ। ফরাসি বিপ্লবের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে গরিব শ্রমজীবী মানুষের মনে এ উপলব্ধি স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছিল যে, বুর্জোয়ারা যে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার শ্লোগান তুলেছে তা আসলে বুর্জোয়াদের সম্পত্তির অধিকার এবং শোষণের স্বাধীনতা। গরিব মানুষ শোষণ থেকে মুক্তি পায় নি, কারণ শ্রেণির উচ্ছেদ হয়নি। বিপ্লবের এক পর্যায়ে যখন গরিব মানুষের মধ্যে এসব চিন্তা প্রবলভাবে ধাক্কা দিচ্ছিল তখনই আবির্ভূত হয়েছিলেন বাব্যুফ ও তার সমর্থকগোষ্ঠী। বাব্যুফ’কে বলা হয় ইউটোপিয়ান বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা।

ফরাসি বিপ্লবে যে শোষণমুক্তির চেতনা মার খেয়েছিল তাকে বিজ্ঞানসম্মত ও ইতিহাসসম্মতভাবে প্রণালীবদ্ধ করে মহান কার্ল মার্কস বন্ধু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সহযোগিতায় দাঁড় করালেন এ যুগের বিপ্লবী তত্ত্ব, যাকে আমরা বলি মার্কসবাদ বা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। কার্ল মার্কস দেখালেন, যে পর্যন্ত সম্পত্তির ওপর ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ হয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হবে সে পর্যন্ত সামাজিক সাম্য বা ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

তাঁদের ওই চিন্তা ফ্রান্সের বুকে নতুন ঢেউ তুলেছিল। ফরাসি সমাজের ক্রমবর্ধমান শোষণমুক্তির চেতনা সদ্য গড়ে ওঠা মার্কসবাদী চিন্তাকে অবলম্বন করে পরিণতি পেয়েছিল ১৮৭১ সালে প্যারিসের মাটিতে প্যারি কমিউনে, মাত্র ৭২ দিনের সংক্ষিপ্ত অথচ বিশ্বের প্রথম শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রব্যবস্থায়। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে মার্কসবাদকে হাতিয়ার করে শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাশিয়ার মাটিতে বিপ্লব করেছেন কমরেড লেনিন এবং রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণি। প্যারি কমিউন টেকেনি, মাত্র ৭২ দিন ছিল তার আয়ু। রাশিয়ার মাটিতেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, বহু সফলতা সত্ত্বেও, এক পর্যায়ে এসে চিন্তা ও প্রয়োগের নানা ভুলে ব্যর্থ হয়েছে।

বলে রাখা দরকার যে ফরাসি বিপ্লবও আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল নেপোলিয়ানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও পুনরায় রাজতান্ত্রিক শাসন প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। তারপরও এ কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায় যে ফরাসি বিপ্লব, প্যারি কমিউন এবং রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলন যে অনির্বাণ শিখা জ্বেলে রেখে গেছে – তা বিশ্বের শোষিত মেহনতি মানুষকে শোষণমুক্তির সংগ্রামে পথ দেখাবে, শক্তি ও সাহস যোগাবে।

তথ্যসূত্র:

১. দেশ (ফরাসী বিপ্লব : দ্বিশতবার্ষিকী সংখ্যা), ১৫ জুলাই ১৯৮৯; কলকাতা।

২. ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি — আবুল কালাম; বাংলা একাডেমী, ঢাকা; ডিসেম্বর ১৯৮২

৩. ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব — হায়দার আকবর খান রনো; তরফদার প্রকাশনী, ঢাকা; একুশে বইমেলা ’০৭।

৪. পথিকৃৎ, অক্টোবর ১৯৮৯; কলকাতা।

৫. ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস — মোরশেদ সফিউল হাসান; ঈক্ষণ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮।

আলী নাঈম। লেখক ও সংবাদকর্মী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার নাখালপাড়ায়। স্কুলজীবন থেকেই পাঠাগার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কলেজজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়। বিজ্ঞান সংগঠন গড়ে তোলা, দীর্ঘদিন যাবৎ পত্রিকা সম্পাদনার কাজসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে সম্পৃক্ত। ছাত্রজীবন শেষে বামপন্থী রাজনীতির সাথে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ