ফিরে আসা

স্নিগ্ধা বাউল
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
ফিরে আসা

হাতের লম্বা লাঠিটা নরম মাটির মধ্যে বারকয়েক গুঁতিয়ে রশিদ জোরে জোরে বলতে থাকে, তোর মারে চুদি। ঘাটের এইদিকে নৌকা থেকে প্রতিদিন রশিদ মাল নামায়, ঠিকঠাক টাকা না হলেই গালির এমন তর্জমা ছুটায় সে। মেঘনার এই ঘাটে বেড়ে উঠেছে রশিদ মিয়া। বাবা মায়ের কথা তার মনে নেই, শুনেছে কোন এক নৌকাডুবিতে বেঁচে যাওয়া একমাত্র শিশু ছিল রশিদ, আজ তার বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি, তামাটে রঙের আড়ালে চাপা পড়া সাদা রঙটা এক হলকায় বিভ্রান্ত করে যাবে রশিদের ভাগ্য দেবতারে, একঝাঁক চুল তার মাথাভর্তি, আয়েস করে সে যখন আকিজ বিড়ি ধরায়, মনে হয় ফিরে এল বুঝি ভাওয়াল সন্ন্যাসী তার রাজ্যে। পরনের লুঙ্গিটা তিন বছর আগে চুরি করেছিলো, শরীরে ঝুলছে একসাথে দুইটি গেঞ্জি, শীতের এইসব দিনে রশিদের গোড়ালি ফেটে যে রক্ত বেরিয়ে আসে তা পুঁজের ঘা থেকে কিছু কম না, ঠোঁট টেনে টেনে চামড়া ছাড়ানো রক্ত দেখেও সে বেশ আনন্দ পায়, চেটে খায় নোনতা রক্ত।

চিত্র: রিয়া দাস

ঘাটের পাগলি মরে যাবার পর রশিদ তার ঘরটা দখল করে নেয়। মজি পাগলী নিজে না খেয়ে রশিদকে খাইয়েছে, বড় করেছে তারে গায়ে গতরে, বিনিময়ে শিখিয়েছে অবাধ্য খিস্তি। একটু বড় হয়ে সে কাজ শুরু করে ব্যবসায়ী মহাজন সুবল বাবুর বাড়িতে, সেখানে তার সাথে বেড়ে উঠেছে ওই বাড়ির কালো রঙের মদ্দা কুকুরটা, আর সুবল বাবুর ছোট মেয়ে রূপা। টানাটানা চোখ আর ধবধবে গায়ের রঙের রূপা বড় হয়ে যায় রশিদের সামনেই, আড়ালে রশিদ অনেকদিন দেখেছে মেয়েটারে, কেবল যেদিন সুবলের মা দেখলো বিষয়টি, বুড়ি চ্যাঁচালো-ওরে বাইর কর, বাইর কর বাড়ির থন। শুয়োরের পোলা খাইতে পায় না, খাওজানি উঠছে অর, বাইর কর। উত্তরের পুকুরপাড়ে নিম গাছের গুড়ায় প্রচণ্ড খিঁচিয়ে উঠেছিল সেদিন রশিদ।

দিনের শেষ লঞ্চ পৌছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায় শীতের সময়ে, এইদিকে ঘাটের পাটাতন পেড়িয়ে মাটির পথটাও বেরিয়ে এসেছে, আশ্বিনের শেষের পড়ন্ত বিকেলের হালকা কুয়াশায় দুরের লঞ্চ দেখতে একটু কষ্ট হয়। কাছাকাছি এসে ভেঁপু বাজার পর অন্য কুলিদের সাথে রশিদও দৌড়ে যায় জেটির দিকে। মানুষ নেমে আসার পর শুরু হয় ঘাটের কুলিদের হট্টগোল আর গালাগালি। ঠিক এই সময়টা রশিদের বেশ ভালো কাটে, কারণ ছাড়াই সবাইকে গালি দেয়া যায়। মনে মনে যত গালি রশিদ দেয়, তার সিকিভাগ সে বের করে আনে মুখে। আজও একটা বড় ব্যাগ টানতে গিয়ে বাঁ পাটা মুচড়ে গেলে, ফিরে দেখে রশিদ – নৌকা থেকে নেমে আসছে সুবলের মেয়েজামাই, দুই নাতনি আর রূপা।

এইখানে বসন্তপুরে বেশ কয়েকঘর হিন্দু আছে, বেশিরভাগ নিম্নশ্রেণির। তাদের একসময় জমজমাট অবস্থা থাকলেও এখন ছোটখাটো ব্যবসা ছাড়া তেমন আয় নেই। তবে সুতার মহাজন সুবল সাহা এখনও ভালোই আছেন, যদিও আজকাল আতঙ্ক তারেও পেয়ে বসেছে। তাই কিছু কিছু করে টাকা তিনি ওপাড়ে পাঠাচ্ছেন; মেয়েজামাই বিশেষ করে ছোট মেয়ের জামাই এইগুলো খুব ভালো বুঝে।

এই লেখাটির অডিও শুনুন এখানে:

বেশ কয়েকবছর পর রূপা আবার বাড়ি এলো। দুর্গা পূজার পর পর সাহা বাড়িতে শীতলা পূজা হয়ে আসছে বহুবছর ধরে। সে এক ইতিহাস। গ্রামের নাম ছিল তখন তুলাতুলি, গুটি বসন্তে গ্রাম উজাড় হয়ে যাবার দশা, সুবল সাহার তখনও জন্ম হয়নি, মা ঠাকুমার মুখে শুনেছে গ্রামের এমন কোন পরিবার নেই যাদের কেউ তখন মরেনি, কোন কোন বাড়ির সবাই চলে গেছে একসাথে। তারপর থেকে এই পূজা চলে আসছে বছর -বছর ধরে। তবে আশ্বিনে কেন এই পূজা তা নিয়ে প্রশ্নও অনেক। প্রচলিত যাই থাক, আসল কথা হল একসময়ে পূজাটা সেরে ফেলে গ্রামবাসী, সংগ্রামের পর থেকে এটাই হচ্ছে বলে সবাই জানে, সংগ্রামের বছরও নাকি এই পূজা বন্ধ হয়নি।

সন্ধ্যার পর থেকে হিন্দুপাড়ায় জ্বলে উঠে মণ্ডপের আলো। নদীর পাড়ে চায়ের দোকানে বসে নানান আলোচনা চলে। রশিদ মনোযোগ দিয়ে এইগুলো শোনে, বেশ ভালো লাগে তার। আজকাল আলোচনায় নতুন করে আসছে এই পুজার আর প্রয়োজন কী! এখন তো আর এই রোগ কারও হয় না, হলেও তা সেরে যায়, তবে আর এত আয়োজন করে পুজার দরকার কী! এইসব আলোচনা গিয়ে থামে দেশের রাজনীতিতে, দাঁড়িতে চাপ দিয়ে দিয়ে নতুন মাওলানারা জানায় গজবের দিন আসলো বলে!    

এইখানে মেঘনার শাখা বয়ে চলেছে, স্থানীয় লোকেরা বলে গাঙ। নদীটি এক বহতা স্থিরতা যেন, ঢেউ আসে যায় নিয়তির মতো, কেবল কারণ ছাড়া কেন নৌকা ডুবির খেলা এই গাঙে জমে উঠে, তা আজও এক রহস্য। তিন চার বছরের ব্যবধানে শান্ত নদীটির বুকে হারিয়ে যায় মানুষভর্তি বড় কোন নৌকা, খোঁজ নাপাওয়া মানুষগুলো কেবল কয়েকদিন পর ভেসে উঠে পানার মতো। মুরুব্বিরা বলে, নদীর খিদা লাগে। পাড়ের সাথে পাল্লা দেয়া জীবনের মানুষেরাও নদীটারে মেনে চলে, অদৃশ্য এক আর্তনাদ আর খেয়ালি খেলায় তারাও মেপে রাখে নদীর ধরম, আর রশিদ সবাইরে গালি দিলেও কেবল নদীরে সে কোনদিন গালি দেয় না, হয়তো ভয় পায়, অথবা খোঁজে কোন হারানো মায়া। কখনো কখনো দুই একটা পয়সা সেও ছুড়ে দেয় গাঙের বুকে।

বসন্তপুর জমে উঠেছে বসন্ত দেবীর পুজায়, নদীর ধারে বসে গেছে বারোয়ারি মেলা। মেয়েগুলো নাইয়র চলে এসেছে বাড়ি। তিনদিন চলবে সাহা বাড়ির পুজা। বাচ্চাদের আনন্দের শেষ নেই, উঠোন জুড়ে মেয়েরাও ব্যস্ত। রান্না হচ্ছে খিচুড়ি ভোগ আর পায়েস। একটা হট্টগোল সন্ধ্যার পরপর দেখা দেয় এবং এইবার প্রথম এমন হয় আর, ঠিক হয় সন্ধ্যার আরতি বন্ধ থাকবে।

তিনদিনের পুজা শেষে বসন্তপুর আবার ফিরে আসে। নাইয়রিরা ফেরত যায়, দিনের শেষ লঞ্চ ঘাটে ফিরে আসে; রশিদ মাল খালাশ করে গালি ছুড়তে ছুড়তে। ন্যাংটা ছেলেগুলো জেটি থেকে লাফিয়ে পড়ে জলে, সাঁতরে এসে আবার লাফায়; চায়ের দোকান জমে উঠে নতুন নতুন আলোচনায়।

বিসর্জিত হয় দেবী, রয়ে যায় বিরানের মতো নদীর ঘাট। ছিটকিনির ঝোপে চলে গেছে ততদিনে ঢোঁরাই সাপের দল। ঘাটে এসে জমেছে সানকি পাতিলের নৌকার বহর। বিকেলে সূর্যটা আজকাল ডোবার আগেই নেমে আসতে চায় ঘন অন্ধকার। পাথরের নৌকাগুলোর টিমটিম আলো অন্ধকারে জ্বলতে থাকে তামাকের কল্কের মতো। দুই-চারটা কুকুর অস্থির হয়ে ডেকে যায় রাত আরও গভীর হলে।

শীতের এমন রাতে বাইরে বেরিয়ে আসতে বেশ লাগে রশিদের। অন্ধকারের রাজা হয়ে সে তোলপাড় করে নিজের ভিতর। কুয়াশায় হাত বাড়িয়ে মেপে নেয় নিজের হাতের দূরত্ব। দুই একজন পথচারীকে আচমকা ভয় দেখিয়েও বেশ আনন্দ পায় সে। যেন এক আক্রোশ বদলা, ডুবে যাবার ভয়ঙ্কর কোন এক অতীত। জোরে জোরে হাসে রশিদ। সে হাসি ভেসে গিয়ে মান্দার গাছে আঘাত করে আবার ফিরে ফিরে আসে; অশরীরী গন্ধে দরজার খিল লাগায় সবাই। এমন এক রাতে হাতের লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রশিদ। নদীর পাড় ধরে ভেজা মাটিতে পা ফেলে ফেলে হাঁটছিল সে। নরম মাটি ভস করে পা ঢুকে গেলে আনন্দ লাগে তার, মাটিকে গালি দিয়ে টেনে আনে নিজের পা; ধরে দেখে ঝুলিয়ে দেখে পায়ের গড়ন।

পায়ে আচমকা শক্ত কিছু লাগলে ঝুঁকে নিচে আসে রশিদ, কিছু না ভেবে টেনে তুলে আনে সে, প্রতিমার মত এক মাটির স্তম্ভ। বিসর্জিত বিবসনা দেবী, কুলের কাছে আনতেই দুরের নৌকা থেকে টর্চের আলো এসে পড়ে, রূপার মুখের আদলে হেসে যায় বসন্ত দেবী রশিদের হাতে, হাঁক আসে, রশিদ নাকি! হ হ চুদির ভাই, আমি ঐ

ধপ করে ফেলে দেয় রশিদ হাতের প্রতিমা, ভয়ঙ্কর এক অজানা ক্রোধে তুলে ফেলে পরনের লুঙ্গি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেড়ে দেয় তার তীব্র বর্ষণ। কিছু সময় পিছনে ফেলে, এগিয়ে যায় রশিদ নিজের ঘরের দিকে। আজ বড্ড তাড়া তার, অমাবস্যার রাত ঘনিয়ে আসছে, আর কিছুক্ষণের জন্য মনে হল রশিদ নিজে ভয় পাচ্ছে হালকা বাতাসে কেঁপে উঠে সে শীতের মতো। নদীর ধার ঘেঁষে মান্দার গাছটা যেন নেমে আসছে রশিদের বুক বরাবর, কাঁটার ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে দলা দলা গুইসাপ আর জোনাকির মতো শামুকের খোলস, গুড়ি বের হওয়া আমগাছের তলাটা দাড়িয়ে আছে বিচিত্র প্রাণী অক্টোপাসের ভঙ্গিতে। এই গাছে ফাঁস ঝুলেছিল কাননের বউ, পাশ কাটিয়ে রশিদ দৌড়ে ঢোকে তার মাচার মতো ঘরে। বাঁশের চৌকিতে পাতা চটচটে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সে টের পায় তীব্র কাঁপন, হাত বাড়িয়ে দড়িতে ঝুলানো কাঁথাটা টেনে নেয় রশিদ।

শেষরাতে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ছটফট করে জেগে উঠে রশিদ অনুভব করে, প্রচণ্ড ব্যথা আর সারা শরীর জুড়ে দানা দানা মুসুরের মতো ফোষ্কা, কোথাও বাকি নেই যেখানে ফেলবে এক দানা সরিষা। পানি ঢালতে গিয়ে দেখা গেলো গলা দিয়ে পানি নামছে না, আস্তে আস্তে রশিদ ঢলে পড়ে যায় মাটিতে।

রশিদকে নিয়ে যাওয়া হয় সদর হসপিটালে, গুটি বসন্তে তার দুটি চোখ নষ্ট অবস্থা। সেদিন বিকালেও নদীর ধারে পড়েছিল বসন্ত দেবীর বিসর্জিত প্রতিমা, বল আনতে গিয়ে ছেলেরা তা দেখে সরে আসে তফাতে।

স্নিগ্ধা বাউল। কবি। কবিতা পড়েন ভালোবাসেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..