বদলে যাওয়া

রওশন হক
গল্প
Bengali
বদলে যাওয়া

চট্টগ্রাম বাদশা মিয়া রোডে আমি একটা পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে ভাড়া থাকি। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এখানে কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি প্রতিষ্ঠা করে। এর বাঁ পাশের পাঁচতলা একটি বাড়ির পাঁচতলায় আমার বাস। গাছগাছালি আর পাহাড়ঘেরা এলাকা সেটা। চারদিকে সবুজের সমারোহ। আমার ভীষণ পছন্দের একটা জায়গা। তখন আমি অফিস করি সাউথইস্ট ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখায়। মেয়েকে আমার মায়ের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে সকালে যাই, সন্ধ্যায় ফিরি। নিচতলায় থাকেন আমার চোখে দেখা অপূর্ব সুন্দর এক দম্পতি। ভদ্রলোক কাজ করতেন পূবালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায়। অপরূপ সুন্দরী বউ তাঁর সুরমা ভাবী। আমার সঙ্গে তেমন আলাপ হয় না। কারণ তাঁকে কখনো বোরকা ছাড়া দেখার সুযোগ হয়নি বলে সুযোগ পাইনি ঘনিষ্ঠ হবার। বোরকার সঙ্গে চোখদুটো নেট দিয়ে ঢাকা থাকে। কর্মব্যস্ততায় কখনো কারো বাসায় যাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না আমার। কিন্তু আম্মা সুরমা ভাবীকে দেখেছেন। তাঁর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক।

তবে কিছুদিন পরপরই তাঁরা দেশের বাইরে যাওয়া-আসা করেন। একটা বাচ্চা পাওয়ার আশায় তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁক ছাড়াও দেশি-বিদেশি ডাক্তার দেখানোর জন্যই নাকি নানান দেশে যান। একদিন মহিলাকে কাছে পেয়ে বলেই ফেললাম, আপনি টেস্টটিউব বেবি ট্রাই করে দেখেন না কেন! এখন তো ঢাকাতেই সফলভাবে টেস্টটিউব বেবি হচ্ছে। তারপর টেস্টটিউব বেবি সম্পর্কে যতটুকু জানি তার আলোকেই তাঁকে বোঝালাম। মনে হলো আমার কথা পছন্দ হয়নি তাঁর। আমার কথা যে পছন্দ হয়নি কথা বলার ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন সেকথা। খুবই বিরক্তি নিয়ে কোরআন-হাদিসের নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়ে এ রকমভাবে বাচ্চা নেওয়া কেন ঠিক না তা আমাকে  বোঝান। লজ্জা পেলাম আমি। ভাবলাম কেন গায়ে পড়ে এসব বলতে গেলাম! তারপর থেকে তাঁদের দেখলেও আর এগিয়ে যাই না। তবে আম্মার কাছ থেকে সব খবরই পাওয়া হয়ে যায়।

খুশির খবর হলো, বছর দুয়েক পর সুরমা ভাবী গর্ভবতী হন। খবর শুনে আমিও খুব খুশি। একদিন তাঁর বাসায় গিয়ে আমার আগের দেওয়া পরামর্শের জন্য ক্ষমা চাই, এবং তাঁর জন্য মনে মনে দোয়া করতে থাকি।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে তাঁর যমজ দুটো পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এত দিন পর আল্লাহ সত্যি তাঁদের ঘর আলোকিত করে দুটো সুন্দর ফুটফুটে ছেলেসন্তান দিলেন। ভদ্রলোক মিষ্টিমুখ করালেন পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে।

বাচ্চাদুটো একটু আলাদা পরিচর্যায় বড় হতে থাকে। সময় গড়াতে থাকে আর আমি আমার অজান্তেই তাঁদের অযাচিত পরামর্শ দেয়ার জন্য কষ্ট পেতে থাকি। ধীরে ধীরে বাচ্চাগুলো হাঁটতে শেখে। খুব অল্প বয়স থেকেই ওদের জন্য স্পেশাল লম্বা আলখাল্লা পরানো হয়। আর কোনো পোশাকে দেখা যায় না ওদের। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের মিশতে দেওয়া হয় না। এই মিশতে না দেওয়াটাও সবার কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়। অনেক কষ্টে পাওয়া বাচ্চা, তার ওপর যমজ শিশু। তারা একটু আলাদা বড় হবে-এটাই স্বাভাবিক।

কয়েক বছর পর বাচ্চা দুটিকে আর দেখা যায় না। তাদের মা-বাবাকেও দেখি বেশ মনমরা হয়ে থাকেন। যেন খুব গুটিয়ে থাকেন তাঁরা। একদিন আম্মার কাছে শুনলাম বাচ্চাদুটিকে হাটহাজারি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়েছে। তারা ওখানে বোর্ডিংয়ে থাকে। তারা কোরানে হাফেজ হবে, সে তো ভালো কথা, তাতে মন খারাপের কী হলো! সবার বাচ্চা তো আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয় না। আমার পরিচিত চট্টগ্রাম এবং সিলেটের অনেকের বাচ্চা মাদ্রাসায় পড়ে। বাচ্চা দেরিতে হওয়ায় সুরমা ভাবী আল্লাহর কাছে মানত করেছিলেন বাচ্চা হলে তাদের ইসলামের শিক্ষা দেবেন,  কোরআনে হাফেজ বানাবেন। যথারীতি তাদের হাটহাজারি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন।

কওমি মাদ্রাসাগুলো বোর্ডিংভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। তাই এই ছেলে দুটিকেও বোর্ডিংয়ে রেখে আসা হয়েছে। যখন অনেক খুশি হবার কথা তখন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মন খারাপ করে থাকেন। ছেলে দুটো মাদ্রাসা কাম বোর্ডিংয়ের কড়া নিয়ম-কানুন মেনে নিতে পারছে না। তারা ওখানে থাকতে চায় না। মা-বাবা দেখা করতে গেলে তারা বাসায় ফিরে আসার জন্য কান্নাকাটি করে। সমাধানস্বরূপ মাদ্রাসার বড় হুজুর তাদেরকে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করতে বারণ করেছেন। ইসলামের খেদমত করতে চাইলে পরিবারকে শক্ত অবস্থানে যেতে হয়। মায়া-মহব্বত ছেলেদের ইসলামি শিক্ষায় বাধা তৈরি করে। প্রথম দিকে সব বাচ্চাই এমনটা করে, পরে তারা মানিয়ে নিতে পারে। তাই তারা আর দেখা করতে যান না। সারা দিন মনমরা হয়ে থাকেন।

এত সাধনা করে পাওয়া বাচ্চা আজ মা-বাবার কাছ থেকে দূরে-আমার ভাবতেই কান্না পেত, তাই আমি চলার পথে দেখা হলেও তাদের না দেখার ভান করতাম। তাঁরা মানত করে আল্লাহর কাছে কেঁদে-কেটে বাচ্চা পেয়েছেন, তাই কোথায় পড়াবেন, এটা তাঁদের বিষয়।

তাাঁদের সঙ্গে দেখা না হলেও বিষয়টা আমার ভেতরে খোঁচাতে থাকে। কওমি মাদ্রাসায় এ কেমন পড়ালেখার স্টাইল যে বাচ্চা কাঁদবে বলে মা-বাবার সঙ্গে তাদের দেখা করতে দেবে না! সুরমা ভাবীর মনের বাসনা ছিল ছেলে হলে তাদের ইসলামের পথে নিয়ে যাবেন। প্রকৃত মুমিন বানাবেন এবং তা-ই করেছেন। এ শিক্ষা ছেলেদের ভালো লাগছে না। তাঁর মনোকষ্টের কথা ভেবে কওমি শিক্ষা সম্পর্কে ওই মাদ্রাসার হুজুরের কাছ থেকে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করি।

জানা গেল মাদ্রাসা দুই ধরনের হয়। এক ধরনের মাদ্রাসায় জাগতিক শিক্ষা দেয়, মানে প্রাধান্য দেয় দুনিয়াদারির শিক্ষাকে। আরেক ধরনের মাদ্রাসায় শুধু ইসলামি শিক্ষা দেওয়া হয়। ওরা প্রাধান্য দেয় আখিরাতের অর্থাৎ পরকালের কল্যাণের শিক্ষাকে।

জেনে খুশি হলাম। আরো একটু চেষ্টা করে জানা গেল বাংলাদেশে আলিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত মাদ্রাসাগুলো সরকারি খরচে ও নিয়ন্ত্রণে চলে। এসব মাদ্রাসায় পুরাপুরি দীনি ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। আলিয়া মাদ্রাসার ধরন অনেকটা সাধারণ স্কুল-কলেজের মতোই। মাধ্যমিক পর্যায়কে এখানে বলা হয় দাখিল, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়কে বলা হয় আলিম, ডিগ্রি পর্যায়কে বলা হয় ফাজিল আর মাস্টার্সকে বলা হয় কামিল।

কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে আরো খোঁজ করে জানতে পারলাম এই ধরনের মাদ্রাসা জনগণের সাহায্য-সহযোগিতায়, হাক্কানি ওলামায়ে কেরাম দ্বারা দারুল উলুম দেওবন্দ (ভারত)-এর শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলে। পরিপূর্ণ দীনি ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা আছে এই মাদ্রাসায়। কওমি মাদ্রাসা অবশ্য গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু আমার মনে হলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিলেবাস আপডেট না করায় তারা জনগণের মূলস্রােত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। তাদের অনেক ধরনের বিধিনিষেধও রয়েছে। এ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে সমাজে। কওমি শিক্ষায় বিশ্বাসীরা মনে করে এ শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হলো ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী হওয়া। তাদের সিলেবাস অনুসারে তাকমিল বা দাওরায়ে হাদিস স্তরে শিক্ষার্থীরা মূলত হাদিস-সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ করে।

আমার কাছে আলিয়া মাদ্রাসার পড়ালেখার সিস্টেমই পছন্দ। সুরমা ভাবীকে আবারও অযাচিত পরামর্শ দিলাম, বাচ্চা দুটোকে মাদ্রাসায়ই যদি পড়াতে চান তাহলে আলিয়া মাদ্রাসায় পড়ানোই তো ভালো। ওখানে বোর্ডিংয়ে না দিলেও চলে। কিন্তু উনি আলিয়া মাদ্রাসা পছন্দ করেন না, কারণ তাঁর বিশ^াস এই সিস্টেমে পুরোপুরি আল্লাহকে ধারণ করা যাবে না, পরকালের পথ সুগম হবে না। তাঁর জানার কাছে আমি এবারও ছোট হয়ে যাই।

এক ঈদে বাচ্চা দুটোকে কাছে পেয়ে জানতে চাইলাম, মাদ্রাসা কেন তাদের ভালো লাগে না? তারা বলল, ওদের ভালো লাগে না উর্দু ভাষায় পড়তে। তারা একটুও খেলাধূলার সুযোগ পায় না, অনেক ভোরে উঠে পড়া শুরু করতে হয়। এসব শুনে আমার আরো আগ্রহ বেড়ে গেল ওদের সম্পর্কে জানতে। আরেকটু খোঁজ-খবর করলাম। জানতে পারলাম ভারতের পরাধীন মুসলমানদের ধর্মীয় জাগরণ ও সত্যিকার দীনি এলেম অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের বিশ^বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে ১৮৬৬ সালে এটা চালু হয়। সে সময়কার ভারতের মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এ কারিকুলাম তখন জনপ্রিয় হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থে এর সংশোধন এখন খুব জরুরি।

স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসার কোর্সগুলোতে ফারসি ও উর্দু ভাষার প্রাধান্য। অথচ বাংলাদেশে এ ভাষার কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ নেই। ফারসি সাহিত্যের জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক ও সুফি সাধকদের মূল্যবান গ্রন্থাদি এখনো পাঠ্যসূচিতে রাখা হয়েছে। এসব গ্রন্থ পাঠদান যদি নিতান্ত জরুরি হয়, তবে তা বাংলায় ভাষান্তর করে পাঠদানের ব্যবস্থা নিলে অসুবিধা কী! অথচ কওমি মাদ্রাসার সর্বস্তরে উর্দু এখনো শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম ও বাহন হয়ে আছে। দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাকারী বুজুর্গরা ও শিক্ষার্থীরা উর্দু ভাষাভাষী ছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই সব কোর্সই তখন উর্দুতে প্রণীত হয়েছিল। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষা আমাদের হৃদয়ের ভাষা। এ ভাষায় মনের আবেগ, সুখ-দুঃখ, ওয়াজ-নসিহত, দাওয়াত ও তাবলিগ যত সহজ ও কার্যকর, যা বিদেশি ভাষায় এত সহজ নয়। কওমি মাদ্রাসায় পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চাদের বোর্ডিংয়ে রেখে কোরান হাদিসের হাফেজ তৈরি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন ‘কওমি জননী’ উপাধি পেলেন সেদিন থেকেই আমার সুরমা ভাবীর কথা খুব করে মনে পড়ছে। যা-ই হোক কিছুদিন পর আমি বাসা বদল করে অল্প দূরত্বে পাঁচলাইশের ফ্ল্যাটে উঠি। তারপর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে ছেলে দুটোর জন্য। ওদের লেখাপড়ার আপডেট নিতে গিয়ে জানলাম, কওমি শিক্ষাব্যবস্থা সব সময় বোর্ডিংভিত্তিক। ভোরে তাহাজ্জুতের নামাজের আগে বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলে কোরআন-হাদিসের পড়া মুখস্থ করানো হয়। কঠিন  অনুশাসনের মধ্যে ছাত্রদের রাখা হয়। কোনো রকম খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো টেলিভিশন দেখার সুযোগ। পড়া ছাড়া বাড়তি কোনো আনন্দের ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। খাবারদাবারও অতি নিচু মানের। যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দল বেঁধে এদের যেতে দেখা যায়। সরকারি কোনো ছুটিতে এ ধরনের মাদ্রাসা বন্ধ থাকে না। একটা পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চার বেড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার কোনো ব্যবস্থা কওমিয়ানদের নেই বললেই চলে। সুরমা ভাবীর বাচ্চারা এই কঠিন নিয়মে বড় হতে থাকে ঠিকই, কিন্তু প্রয় সময়ই তারা অসুস্থ থাকে। বেশ কয়েকবার হাসপাতালেও নিতে হয়েছে। সুস্থ হলেই আবার ওদের মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। দীনের কথা ভেবে সুরমা ভাবী মনকে শক্ত করে ফেলেছেন। রীতিমতো জোর করে ওদের মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। দুবার বাচ্চাগুলো পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। যতবার তারা এসব করে ততবারই ওদের ওপর বোর্ডিংসহ পড়াশোনার নিয়ম আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে চেপে বসে।

আমি একবার এই মাদ্রাসা বাইরে থেকে দেখেছিলাম। বোরকা ছিল না বলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শত শত বাচ্চা ওখানে পড়ে। এই নিয়ম-অনুশাসন মেনেই পড়ে, ঝরে পড়ে অল্প কিছুসংখ্যক। অনেকে মনে করে এ মাদ্রাসাগুলো অধিকাংশ আবাসিক হওয়ায় এখানে শিক্ষার্থীরা একদল দীনদার আমলি আলেমের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরহেজগার ও হাক্কানি আলেম হিসেবে গড়ে ওঠে। আমি কেবল ভাবি, অন্য একটা ভাষা শিক্ষায় অনেক মেধা, প্রতিভা ও সময়ের অপচয় হয়; অথচ বাংলা ভাষায় এলমে দীন শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করলে একজন শিক্ষার্থী কত সহজেই না আরো বেশি উন্নতি করতে পারত!

কিছুদিনের মধ্যে একটা হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হতে হলো আমাকে, যা ছিল কল্পনারও অতীত। ঈদের ছুটি শেষে ছেলে দুটির সেদিন মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা। শুনলাম তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। পরে শুনলাম যেন মাদ্রাসায় ফিরে যেতে না হয় সেজন্য তারা লুকিয়ে ছিল। সব পরিচিত জায়গায় খোঁজাখুঁজি করা হলো, এলাকায় মাইকিং এবং থানা-পুলিশও করা হলো, পাওয়া গেল না কোথাও। পরের দিন তাদের নানাবাড়ির পুকুরে ভেসে উঠল ওদের লাশ। নিজেদের আড়াল করতে শিশু দুটি পুকুরে ডুব দিয়েছিল। বেশি সময় ডুবে থেকে সাঁতার না জানার কারণে তাদের মৃত্যু হয়। কতটা নির্মম ছিল সে দৃশ্য, তা লিখে বোঝানো যাবে না। কড়া শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হলো দুটো তাজা প্রাণ। কতটা নির্মম ওদের মাদ্রাসার নিয়ম-কানুন শিশুদুটির মৃত্যুই তা বুঝিয়ে দিল আমাদের।

কওমি মাদ্রাসার যাঁতাকলে দুই ছেলে হরিয়ে সুরমা ভাবী বর্তমানে মানসিক রোগী। কারো সঙ্গে নাকি কথা বলেন না। স্বামী-স্ত্রী দুজনই পুত্রশোকে পাগল হয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের অবস্থা দেখে আমারও মন বিষণœ হয়ে পড়ে।  কিছুদিন আগে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি মাস্টার্স ডিগ্রির সম মান প্রদান করেছেন। এজন্য তাঁকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয়া হয়েছে। এাঁ শুনে আমার মনে হলো, আমার সুযোগ থাকলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করতাম সরকারি ব্যবস্থায় যেন এদের দেখাশোনা করা হয়। বুঝতে পারি না মাদ্রাসায় শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা আর শরীরচর্চাসহ আনন্দদায়ক পাঠদানের পদ্ধতি চালু করতে আপত্তি কেন? শিশুরা যেন আনন্দ নিয়ে পড়তে পারে, সে বিষয়ে নজর দেয়া দরকার মাদ্রাসায়। আমি বুঝতে পারি না তাদের এত কঠোর নিয়ম-কানুন কিছুটা শিথিল করলে আল্লাহর পথে থাকতে কী এমন অসুবিধা! সাধারণ স্কুলগুলোর মতো মাদ্রাসা শিক্ষায় শিশুদের আনন্দ পাওয়ার মতো বিষয়া যোগ করা যায় না! মাদ্রাসার বোর্ডিং কেন শিশু-কিশোরের আতঙ্কের কারণ হতে হবে! মাদ্রাসা ছোট ছোট বাচ্চাদের শৈশব-কৈশোরের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াবে কেন! কোরান-হাদিসের কথা লেখা পাঠ্যবই বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে সহজ করে দিলে আল্লাহর কথা বুঝতে তো আরো বেশি সহজ হবার কথা। ‘কওমি জননী’ প্রধানমন্ত্রী এ-কথা কেন বুঝতে পারেন না তা আমার বুঝে আসে না!

আমরা খুব দ্রুতই ঘটনা ভুলে যাই। এই যুগে মানুষমাত্রই দ্রুত ঘটনা প্রবাহ ভুলে যেতে চায়। না হয় স্মৃতির হার্ডডিস্ক মেমোরি ফুল হয়ে যায় যেন। স্মৃতির কিছু জিনিস অটো ডিলিট হয়ে যাওয়াই ভালো। যোগাযোগ ও প্রাসঙ্গিকতা না থাকতে থাকতে সুরমা ভাবী আর আনিস ভাইয়ের ছেলেদের কথা ভুলেই গেছিলাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কওমি জননী খেতাব পাওয়ার সূত্রেই তাঁদের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ভাবনার বাক্সে তালা ঝুলিয়ে রেখে আমাদের জীবনের গতি চলতে থাকে। সেই গতি রোধ করে আর কখনো চেষ্টা করা হয়ে ওঠে না তাদের খবর নিতে। পরেও হয়তো ভুলেই থাকা হতো তাদের কথা। সেটা সম্ভব হলো না আমার আম্মার জন্য।

এম ট্রেনে আম্মাকে নিয়ে ব্রংকসে যাচ্ছিলাম একটা কাজে। আম্মা নিউইয়র্কে এলে তাঁকে নিয়ে যতটা সম্ভব সাবওয়েতেই চলাফেরা করি। এই বিরাট শহরের মাটির নিচে দ্রুত ট্রেন চলাচল দেখে আম্মা বেশ উৎসাহ বোধ করেন; আল্লা গো, মাটির নীচে এত তালা ট্রেন লাইন ক্যমনে বানাইছে গো! তিনি বেশ উৎফুল্ল থাকেন ট্রেনে চড়তে। লোকাল ট্রেন দ্রুত গতিতে গেলেও সব স্টপেজ থেমে থেমে চলে। তাই কোন এলাকায় কেমন মানুষ ওঠানামা করে সেসব দেখতে দেখতে আমরা যাচ্ছি! এমন সময় আম্মা একটা মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, দেখ দেখ সুরমার মত দেখতে!

আম্মা কোন সুরমা?

আরে ঐ যে পানিতে ডুবে ছেলেদুটো মারা গেল না, সেই বাচ্চাদের মা!

দেখলাম ছোট চুলের জিন্স আর ফুল স্লিভ টপস পরা একটা আধুনিক স্মার্ট মেয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বললাম,

আম্মা, অসম্ভব! এই মেয়ে সুরমা ভাবী হতেই পারে না। সে তো হিজাব পরে। তা ছাড়া তারা তো দেশে থাকে এখানে আসবে কোত্থেকে! তোমার ভুল হচ্ছে!

আম্মা চুপ করে গেলেন, তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে একটু পরে সুরমা ভাবীর বর আনিস ভাইকে দেখিয়ে দিলেন হাতের ইশারায়! আমিও দেখলাম, হ্যাঁ, আনিস ভাইই তো! উঠে গিয়ে মানুষ ঠেলে তাঁদের ডেকে আম্মার কাছে নিয়ে এলাম।

ভাবি যে এতটা বদলেছে তা নিজ চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কথায় কথায় জানা গেল, তাদের আবার বাচ্চা হয়েছে। এবারের দুটোও ছেলে! কথা প্রসঙ্গে আনিস ভাই খোলামেলা ভাবেই বললেন, তাঁদের আগের ছেলে দুটোও টেস্টটিউব বেবি ছিল!

বহুদিন পর তাঁদের দেখে খুব ভালো লাগল আমাদের। এখনকার ছেলেদুটোর জন্ম এখানেই! সুরমা ভাবীর ডিপ্রেশন রোগ সারাতে এদেশে বেড়াতে এসে তাঁরা আর ফিরে যান নি। বদলে যাওয়ার পালের হওয়ায় ভাসতে ভাসতে থেকে গেছেন এই শহরেই। সে অনেক কথা! তবে নিজেকে বদলে ফেলে সামনে চলতে পারা তো আর সোজা কথা নয়! তাদের দেখে, সব কথা শুনে আমার মন আরো ভালো হয়ে যায়।

পরিবর্তন জীবনেরই অংশ। পরিবর্তনের ব্যাপারটাকে আমরা পছন্দ করি না বটে, কিন্তু এটা মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হয় আমাদের। সবটাই সময়ের ব্যাপার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে জীবনে চলতে শিখে যাই। যারা পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে এগিয়ে চলে জীবনে, তাদের কাছে সফলতা ধরা দেয়  খুব সহজেই। তাই তো পরিবর্তনকে নেতিবাচক ভাবে নেয়া ঠিক নয়!

রওশন হক। লেখক ও সাংবাদিক। রওশন হকের জন্ম জন্ম হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটে। লেখাপড়া করেছেন চট্টগ্রামে। ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম থেকে এমবিএ করেছেন ব্যবসায়ী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক করেছেন নাসিরাবাদ গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ থেকে।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..