বন্দী নক্ষত্রেরা

উজান উপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
বন্দী নক্ষত্রেরা

শীত পড়েছে বারান্দায়। গাছেদের মেরুদন্ড বেঁকে যাচ্ছে। শীতল আর্তনাদ নেমে যাচ্ছে শিকড়ে। মাটি জলপীড়ায়।
প্রেমিকা ঘুমিয়ে গেছে। ওর শরীরের চড়াই উৎরাই শাদা থানে ঢেকে শবসাধনায় বেয়াক্কেলে নদী।
কমপিউটার ডেস্কটপে কালো জানালা। একঘেয়ে চিড়বিড় দাঁতখিচোনো মনোলগ।
এসব রাত্তিরে জ্বর না এলে নেশা চড়েনা। ঈশ্বরীর আগাপাশতলা চেটেপুটে অক্ষর খুবলে এনে ছেনি হাতুড়ি আর পাথর-সন্ন্যাস।
বেঁকে যাচ্ছে হাড়হাভাতে দেশ। ন্যাকামি আর ফিচলামি দিয়ে বানানো সংবিধানে সত্তরোর্ধ ছুঁচো ছাড়পোকা নেচে বেড়াক মুক্তছন্দে-
শীতের গন্ধে থার্মোমিটার, শ্রাদ্ধ বিবাহ আর অন্নপ্রাশনের ব্যান্ডবাজনা-
স্যাক্সোফোনের সেক্সিটোনে নিপাত যাচ্ছে ফুটন্ত অন্নপূর্ণার পা থেকে মাথায় ঝোলানো ঘোমটা।
যত সামনে যাচ্ছি-পেছনটা উদোম ফর্সা লজ্জার-পিছনে তাকিয়ে দেখি সামনের দিনগুলো ক্রমাগত ল্যাঙটো হয়ে যাচ্ছে।
ভিতরে নামছে শুধু উৎসবের বিষ।
ঈশ্বরী আমি আর ২০১৯।

 

পাখি

ভয় পেতে দেখিনি পাখিকে, যতবার ঝড় এসে গেছে-ওর চোখে অগণিত লোকে … বাড়িঘর উড়ে যাওয়া ছবি, খোঁজে শুধু মুক্ত হইচই… তারপর বৃষ্টি বিভুঁই-
আমাদের ভয়ের ঠিকানা পাখিদের ঠোঁটে তছনছ-
আমাদের হৃদয়ে চড়ুই-

ব্রিফকেস লেদারের ব্যাগ-আমাদের হারানো বুকর‍্যাক-বুকের ভিতরে খচখচ-পাখিদের ভাঙুক না ডানা-তবুও তো স্বপ্ন উদার-ঠোঁটে ঠোঁটে খড়কুটো ছানা…
পাখিদের খিদে তো আকাশ..

জানালাতো অমল সুধার-
পাখিদের হাঁড়িভর্তি চিঠি-মেঘে ভরা ডাকঘরে কবি তিতাসের কন্ঠে পিঠোপিঠি-ভয় নেই পাখির নৌকায়-আমাদের ধ্বংসের মাটিতে পাখি একা ‘অন্ন’ এঁকে যায়।

গুপ্ত ছকে সুপ্ত হত্যা দেখেও পাখি তুই কিভাবে তাকাস!!
সুপ্ত ঠোঁটে গুপ্ত হত্যা দেখেও পাখি তুই জন্মের ভাষায়..

 

বন্দী নক্ষত্রেরা

এপার্টমেন্ট এর সাততলা থেকে তাকিয়ে আছো শহরের দিকে।
তোমার মুখোমুখি একটি ল্যাম্পশেড।
ধরাযাক তোমাকে দেখে তিনজন কবি পাগল হয়ে গেলেন, সাতটি নদী বেসামাল-
কয়েকটি পাখি অসতর্ক –
তোমাকে ওভাবে আনমনা দেখে আঁচল সামলাতে ভুলে গেল মেঘমিত্রা।
শহরের কয়েকজন রূপবিশেষজ্ঞ অন্ধ হয়ে গেলেন।
বেশকিছু শাস্ত্রজ্ঞ মলাট বন্ধ করলেন।
তুমি ভাবলে এইবার ঘরে ফিরে দরজা জানালা আটকে শুয়ে পড়বে আকাশের গায়ে-
কিন্তু ভিতরে যেমন খাঁচা, বাইরেও তেমনই-
জানতেই না- তোমার শরীর থেকে সুতো খুলে নিতে নিতে নক্ষত্রেরা বন্দী হয় ভিতরে, বাইরেও।

 

মুখোমুখি

মুখোমুখি না হয়েও দেখা হয়।
আমাদের একসাথে প্ল্যাটফর্মে চা দোকানে ঝুপড়িতে পাশাপাশি চা খাওয়ার সুযোগ হয় না রোজ, তবুও তো পাশাপাশি থাকার ইঙ্গিত টের পাই।
আমরা কে কোনদিকে যাই, আমাদের মিলন তো পরস্পরছেদি রেখার মতো নয়।
হুইসেল সিগন্যাল ধোঁয়ায় তবুও না ছুঁয়ে যে ছোঁয়া চাই-
আমাদের ভিতরে যে ফ্রেম-ছবি তোলে লীন সমলয়ে-
এমন সহজ কিছু ক্ষয়ে আমাদের আনন্দিত স্বাদ-উজ্জ্বল বিষাদ।
আমরা তো এইভাবে নান্দনিক অসুখেই সুখী-
কখন যে কিভাবে দেখা না হয়েও মুখোমুখি!

 

ভালো করে ধোয়াই হলো না মুখ

ভাতসেদ্ধ করবো বলে ডেকচিতে চাল নিয়ে
বেসিনের জলে কচলে , ধমকে, যত্ন করে ধুতে গিয়ে হঠাৎ করেই মনে হলো –
এমন করে তো আমার দেশটার মুখ ধোয়া হয়নি অনেকদিন।
পিচুটি, লালারস, ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা এঁটো ও দুর্গন্ধ মুছে ফেলাও তো হয়নি তেমন করে।
প্রায় কোনওদিনই খেয়াল হয়নি যে, সবচেয়ে জরুরি কাজ তো ছিলো এটাই।
আভিধানিক কোম্পানি থেকে ” স্বাধীনতা ” ব্রান্ডের শাড়িটা কেনা হয়েছে গুপ্ত পথে -বিনিময় হয়েছিল ঠিক কোন মূল্যে আজো স্পষ্ট নয়।
শাড়িটা কেনাই হয়েছে শুধু, প্রায় একশোটা বছর পার হতে গেলো —
আদর করে মাথায় তুলে খুব খুব করে ভালোবেসে আঁচল , পাড় ও কুচি সাজিয়ে শাড়িটা তাকে পরানোই হলোনা আজও।
আলুথালু চুলে যেমন-তেমন দায়সারা করে পড়ানো শাড়িটা যেখানে সেখানে আলগা হয়ে নগ্ন করে তুলেছে ভারতবর্ষ নামের মেয়েটিকে।
জল ফুটে যাচ্ছে , ভাত সেদ্ধ হচ্ছে –কিন্তু কে যে খাবে, দেশ না রাষ্ট্রের ম্যাপ, নাকি একদল হুলো —
এখন আদিগন্ত সেদ্ধ মানচিত্রের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় শাড়িটার রঙটাই উঠে যাচ্ছে রোজ রোজ।

 

প্রাতঃভ্রমণ

প্রাতঃভ্রমণে যাবে মানুষেরা , অচিন পাখিরা যাবে সাথে।
অচিন পাখিরা জানে, খোলসেরা ঝরে যাবে নিহত পর্দায়।
ক্রমশঃ অলস রাত শরীরে মেখেছে জল, অকেজো দৃশ্যরা এক তিল অবসরে শিশির মাখানো ঠোঁটে উষ্ণতা চায়।
অন্ধতা ছেড়ে যেতে এলে নিসর্গেরা উঠে যাবে কবন্ধ রাস্তায়-
লাগাতার ডেকে যাবে ঘোষক-অন্ধকার- আয়। আয়।
পথিকেরা কোনদিকে যাবে !
জড়তা খসবে ধীরে। পিঁচুটি ও ঠোঁটকষে কুন্ডলিত জলবায়ু দাগ। খসে যাবে ষোলোভাগ রাত্রিপরাগ।
পথিকেরা পথের অভাবে!
প্রাতঃভ্রমণে এসে ঝরিয়ে ফেলবে নদী হৃদয়ের অনার্দ্র্য ক্লেশ।
ফিসফিস জলস্বর, ধোঁয়া ওঠা কিনারায় কৌতুক জেগে যাবে মেঘলা আকাশে পথিকের চিহ্ন বিশেষ।
প্রতিটি অমল দৃশ্যে স্বভাবেরা আলতো জেগে গেলে, নাস্তানাবুদ হবে ভুল ঠিকানাও।
ছায়ারও রঙবদল হবে , ভ্রমণের সুধাছল প্রতিটি পরবে – ক্রমাগত উড়ে যাবে প্রবাসের ডানা-
প্রাতঃভ্রমণে যাবে আমাদের রাত্রিবিছানা।

উজান উপাধ্যায়। কবি। কবিতাপুরুষ। জন্মের আগেই প্রথম দোয়াত শূন্যে কুড়িয়ে নেওয়া। যাপনের প্রতিটি কার্নিশে, ভ্রমণের প্রতিটি আক্ষেপে কবিতার মেয়ে কবি উজানের অক্ষরবৃষ্টিকে ছুঁয়ে থাকে প্রেমে-অপ্রেমে। শুষ্ক নগরীতে ভালোবাসা লিখতে এলাম - এই উচ্চারণে একাকীত্বের গর্ভে লালিত তার নির্জন, ম্যাজিকাল, অভিকেন্দ্রীয় রূপান্তর।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..