বলয়গ্রাস

মায়িশা তাসনিম ইসলাম
কবিতা
Bengali
বলয়গ্রাস

বলয়গ্রাস

প্রিয়তমা অন্ধকার
একটি দীর্ঘতম রাত মানুষের জন্য দেহতত্ত্বের বিদ্যাপীঠ।

কখনো নাকফুলের শবের পাশে পড়ে থাকে ময়ূরের পালক
কারো কারো জন্য উরু হয়ে ওঠে ধর্মসিঁড়ি কিংবা ভাত খাওয়ার পর মিষ্টান্নের ব্যবস্থা।

কেউবা মেঘের ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আকাশের কবরস্থানে
চাঁদের মরা ঘাস হাসে যেসব কবরে, সেগুলো খুদে বের করতে চায় প্রিয়ার হাড়!

প্রিয়তমা অন্ধকার
একটি দীর্ঘতম রাত আমাকে অমাবস্যা শেখাতে আসলে আমি শীতের ভূমিতে পাঠ করি কাশবন।

বলয়গ্রাস ২

প্রিয়তমা অন্ধকার
শহীদ হয়ে যাওয়া পাখিটি এখনো উড়ছে তো উড়ছেই
পালকগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছে বধ্যভূমির পাহারাদার।
সদ্যফোটা গোলাপের বাগানের পাশে বসেছে হস্তমৈথুনের বাজার!
কুমারীস্রাব চেয়ে ছাপানো হচ্ছে বিছানার বিজ্ঞাপন।

প্রিয়তমা অন্ধকার
তুমি মদের বোতলের মতো দাঁড়িয়ে থাকো
আমি বোনের শাড়ি দিয়ে মশারী টাঙিয়ে ভুলে যাই বীর্যের একাকীত্ব।

বলয়গ্রাস ৩

প্রিয়তমা অন্ধকার
মায়ের কবরের পাশে এখনো অনেক কুকুর ঘেউঘেউ করে
আমাকে জারজ বলা হলেও জানি যে আমার জন্ম মৃত মায়ের হাড়গুলোর মতোই পবিত্র।

যখন কেউ বলে “নির্মল ও শুদ্ধ হও!”
তাকে বলি, যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে গাছ লাগানো যায়নি কখনো।

প্রিয়তমা অন্ধকার
মায়ের শাড়িটি পরে এসো একবার
তোমার প্রেমিক যেনো আঁচলে মাথা রেখে আরেকবার হয়ে ওঠে আদরের সন্তান।

যজ্ঞশেষে

মিথ্যার আশ্রমে
দেহের জপ হরি হরি।

অন্তর্বাসে
লেগে নেই ছাপ
হ্যাঙ্গার নুয়ে কার অপরাধে?

চিবুকের কাছ থেকে
সরে যায় নেশা
মাতাল শুধু লিঙ্গের পাহারাদার!

তোমার ভয়ানক আঙুল
উন্মাদ নখ
ব্যক্তিত্বময় অপবাদ
সমস্তই মুছে যাচ্ছে
নিজস্ব নগ্নতায়।

 

অনিঃশেষের উত্থান ২

এতটা প্রেমে পড়লে স্বপ্নেরা নামে ফেরেশতার মতো
বাম কাঁধে লেখা পাপগুলো শিশুর মতো হাসে নিষ্পাপ
হৃদয়ের দোযখ ঘোরাফেরা করে হৃদয়েরই স্নানঘরে!
নির্লজ্জতার বারান্দায় অন্তর্বাস খুলে প্রেমিকা হয়ে ওঠে নারী।

আগে জানা ছিলো, নারীরা প্রেমে পাপী হয়, নারীরা নারীত্বে পাপী নয়!
নারীর প্রেমময় চোখে কাজল লেপ্টে থাকতে নেই
নারীরা হিংস্র হয়ে উঠলেই বরং মাধবীলতা ফুটে ওঠে উষর মেরুদণ্ডে।

এখন ফেরেশতার মতো স্বপ্নেরা ওহী নিয়ে আসে শয়তান হওয়ার!
যুগ্মজপে ছিঁড়ে যায় সকল জ্ঞানের তসবিহ
জ্যোতির্বিদের গ্যালাক্সি নেভে নারীর ত্রিভুজে হেঁটে চলা প্রেম-সম্পাদ্যে…

নিথর বৃন্দাবন

ঘুমাচ্ছো তবে, বাস্তবের নিরামিষে!
জেগে থাকি শুধু, কাজলমাখা স্বপ্নদোষে…

নির্ঘুম একটা রাত, মানবী থেকে অসুর বানায়
নির্ঘুম একটা রাত, প্রজাপতি থেকে দেবী বানায়

ছায়ামানুষ তো ঘামে না, তবু গন্ধ কেনো রমণের!
পাপবিদ্যার খসড়া বুকে কেনো ঈশ্বরী নাঁচে শরমে!

জাগরণকে করলে স্বীকার, বৃন্দাবনে সফেদ শীৎকার!
ঘুমজলে তবে প্লাবন হোক, প্লাবন হোক অকরুণ নিথরতার….

অনিকেত দহন ৯

আলোর অক্ষমতায় সাপের মতো কাঁদছে আঁধার
মগজের সেলাইমেশিনে প্রস্তুত অর্ধেক কাফন

চামড়ায় অপরাধী পায়ে খোঁজ নেই মৌসুমি মর্গের

প্রতিটি রাস্তা নিয়ে যায় এক গৃহবন্দী বুকের বেহায়া হিমাঙ্কে
বিলাতি শীত যেন ছুঁতে না পারে গ্রীষ্মপাপী লাশের কাঠফুল।

অনিকেত দহন ১২

পেটে চুলা, বাষ্প উড়ে চুলের
কবিতা কি? নিউজপেপারের ক্ষুধা?
শব্দের জাটকা খাচ্ছে ক্যালকুলেটর
টাকার চোখে চোখ রেখে কবি হবো

 

দুয়ারদণ্ড

দরজার ওপাশে কারা কাঁদে?
চোখের গর্ত থেকে হাউমাউ করে বের হয় সাপ
ফণা তুলে লবণাক্ত বিষাদ!
কারা কাঁদে? কাদের বুকের পোড়া গন্ধে শ্মশানের অনুবাদ?
কাদের কান্নায় বন্ধ দরজা হয়ে ওঠে মৃত্যু-মন্দিরের জীবন্ত যাজক!

আমি যদি বলি বেশ্যা কাঁদে, তোমরা বলো ওটা কান্না নয়, শীৎকার
আমি যদি বলি ধর্ষিতা কাঁদে, তোমরা বলো সে আসলে গেয়ে যাচ্ছে শরীরের পুঁথি
আমি যদি বলি নারী কাঁদে, তোমরা বলবে জরায়ু হবে একসময় পুরুষের পরিত্যক্ত উঠান!

মূলত পৃথিবীর পুরুষদের কাছে সতীপর্দাই বেহেশতের প্রথম দরজা….

 

দুয়ারদণ্ড ২

দরজার এপাশে আমিও কাঁদি
কাঁদি এক অবিবাহিত যুগ
যেখানে নেই ভ্রমণের ডাকবাক্স।

কেঁদে যাই অধম গর্ত
এবং শব্দের নেশাগ্রস্থ পায়চারি
কারণ কবিতার ফুল ছিঁড়লে জ্ঞানপাপের বিষ ছড়ায়।

প্রেমেরও আগে কাঁদি তোমার শৈশব ও খেলার মাঠ
এবং তুমি যখন যাও বাবার কবর জিয়ারতে
এতিম হয়ে কাঁদি দরজার অধীন এ শ্মশানে!

আমাকে কাঁদেন ঈশ্বর
কারণ জন্মেরও আগের নরক গড়াচ্ছে বাবার ওযুঘরে
আর আমি পৃথিবীর আগুনকে বিশ্বাস করি, যখন খুব ক্ষুধা লাগে।

গ্রামের সাঁতার না জানা পুকুর নামে রোদহীন গালে
আর মাদ্রাসার দানবাক্সে কাঁদতে হয় জাতীয় সঙ্গীতের চিরকুট
দরজার এপাশের চোখ আমার পূর্বপুরুষদের মাটির পাশে গুল্মলতা!

এত কান্নায় কোনোদিন ভাসেনি দরজার ওপাশের প্লাস্টিকের বাগান
প্রশ্নপত্রের টেবিলের পাশে মেধার মাস্টারবেশন
কিংবা শিক্ষার পায়জামায় লম্পট যৌনতা

দরজার ওপাশ থেকে কারা যেনো ‘কবি কবি’ বলে ডাকছে
এতদিনে কাঁদতে কাঁদতে আমি শুধু নিজস্ব মানুষ হয়ে উঠেছি।

মায়িশা তাসনিম ইসলাম। কবি ও শিক্ষার্থী। জন্ম ও বাস ঢাকা শহরে। অনেকের মতো ছোটবেলা থেকে লেখালিখি শুরু করেননি, তবে দেরিতে হলেও তিনি বিশ্বাস করা শুরু করেছেন কবিতাই প্রথম উপাসনা এবং শব্দের পাঁপড়িতে ফোটা বোধের ফুল। তিনি এটাও বিশ্বাস করেন কলমের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..