সাধনারাধ্য

বেনজির শিকদার
কবিতা
Bengali
সাধনারাধ্য

ন্যুব্জ নিবেদন

তুমি দেখে নিও—
দুর্যোগের রাত্রি শেষে
আমরা শিখে নেবো ঘনবৃক্ষের প্রেম!
আমাদের ঘর হবে নিখিল সবুজে ঢাকা
একরত্তি উন্মাতালের প্রেমালু বাগান!

দগ্ধ-সময়ের ক্ষতচিহ্ন মুছে—
মুখোমুখি বসবো কূজনে দু’জন
বালিহাঁসের নরম ঠোঁটের মতো
ভালোবাসা মুছে দেবে মৃত্যুর স্বাদ!

তুমি দেখে নিও—
শ্রী-হীন এ শহর হবে ঋতুবতী
অতসীর মতো খসেপড়া আস্তর সাদৃশ্য নয়
মুগ্ধতার মহিমাদীপ্ত যবনিকায় ফিরবে
ঘুনেধরা অভিশপ্ত দেহের বলি-রুক্ষ ত্বক!

বন্ধ দুয়ারের আলোহীন অন্ধ-সজ্জায়
বড়ো মৌনতায় লুটোপুটি খাবে ছেনাল-রোদ্দুর,
নিকোনো যৌবন ঘিরে নেশাতুর কামরাঙ্গা-সুঘ্রাণ;
আঁখিপাতে শঙ্খচিল পারাপারের হলুদ স্বপ্নালু সাম্পান!

তুমি দেখে নিও—
দহন-বায়ু কিংবা অম্লজানে
ছেঁয়ে যাবে এ শহর— বিটপীর উলঙ্গ ডাল
মুগ্ধ চাষির আঙিনায় ফুটবে প্রেমার্দ্র বসন্তের চেরি;
নটী-জলসার মৃত্যুঠোঁট ছিঁড়ে; সাজবে ভ্রূণের-বাসর!

ধুতুরা, হেমলক কিংবা আকন্দ-হিজল ভুলে
সর্বগ্রাসী হাহাকার ফিরবে অবিরল ধারাপাতে
বাতাসের চিবুক ছুঁয়ে প্রজ্জ্বলিত ধবল জোসনায়;
অমল প্রেম হবো মেঘের সিঁথিতে— আকাশের গায় !

তুমি দেখে নিও—
আলোহীন-ধূসর-মন্দাক্রান্ত সময়ের ভারে—
জলধ মেঘের মতো; যদি ন্যুব্জ হয়ে আসে পৃথিবী;
নিঃশ্বাসের হাঁপরে রেখে সুবর্ণকারের কৌশলী-চোখ;
পোড়াবো সভ্যতা; পবিত্রতার— পরিশুদ্ধ প্রার্থনায় l

 

বসতসাক্ষী

বাতাসে সাইরেনের সুর !
গুলিবিদ্ধ শালিকের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে
ষোলো–লেনের সুবিস্তৃত পিচঢালা শরীর।
ঘড়ির কাটা যৌবন খুইয়েছে—
পৌঢ় স্তনের ঘুমহীন নীরব নিথর পৃথিবী
সময়ের মুখেও ঠোকর খাওয়া বুড়োমানুষি ছাপ!

স্বপ্নের চাষ নয়;
নহলী মৃত্যুর দামামা বাজিয়ে—
ঘরে ঘরে অমানিশার ভয়ার্ত শ্মশান !
প্রেমিক ভুলে গেছে ছুঁয়ে দিতে প্রেমিকার আহ্লাদী ঠোঁট
রমণে স্বাদ নেই—পুরুষ ভুলে গেছে অপ্রতুল চাষের হিসেব
নারীর জঠর—বীজহীন, অনাবাদী, উড়ির চর।

বিজন রাত্রি
বাতাসের গায়ে নেই সুকোমল স্পর্শ ;
অনিশ্চয়তার উল্লাসে মেতে নিবুনিবু দূরের তারা;
শোকময় চিতার ন্যায় কিছু সময় অন্তর—
শবদেহের স্পর্শী কাঙাল বাঁকা ঠোঁট, সুরতহীন—
এক একটি  অ্যাম্বুলেন্সের স্বকরুণ মরণস্পর্শী আর্তনাদ।

প্রবল ঘূর্ণন কাল
অনিদ্রা মিশে যাচ্ছে ঘ্রাণহীন বোধে
বুকে বুক মেলাতে অক্ষম, হাতের তালুতে হাত
সুরম্য প্রার্থণায় রোজ সঘন স্পন্দন-—
সবুজ ধানের ফাঁকে সারসের ন্যায় বড় আলগোছে
নামাজ ঘর হতে আসে মায়ের অশ্রু মাখা ক্রন্দন !

ক্ষরণের লাল স্রোত
মানুষে মানুষে বইছে বিষ ! ছড়াচ্ছে—বিষের কুহক !
দিন তলিয়ে যাচ্ছে দিনের গর্ভে, রাত তলিয়ে যাচ্ছে রাতে;
অদূরে বিউগল, দমকলের মতো নৃত্যে বাজছে ভয়ার্ত সুর !
নিথর চোখ, পয়মন্ত খোয়াব নেই—হিম হয়ে আসে শ্বাস;
কখন জানি খাটো হয়ে আসবে জগতের দীর্ঘশ্বাস?

বিষন্ন তন্দ্রালু চোখ
সুবর্ণলতার বিশ্বাস নয়; আর্তনাদের পেয়ালা হাতে
আঙ্খির নদীর মতোই নিশ্চল, নিশ্চুপ, অনড় সাক্ষী—
মানুষের পৃথিবীতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা-—
শুভ্র-শান্ত খই রঙা বাড়িটি !

 

কাঁকড়া-চর

তার সাথে শেষ দেখা—
জানুয়ারি মাসের আট তারিখ, এইদিনে।

এরপর বহুবার রঙ-খেলায় মেতে উঠেছে দোলপূর্ণিমা
আরব সাগর ঘুরে ইবনে বতুতা
আবিষ্কার করেছেন বহুমূল্য মুক্তোর অস্তিত্ব!

মীরা’র পদাবলী শুনে—
শ্রীফলে সেজে উঠেছে অনাবাদী বৃক্ষরাজি
করমচার লালচে রঙে রাঙা হয়েছে কিশোরীর গাল
যুবতী সন্ধ্যায় খুলে ফেলে বিন্নিরঙা থান
আকাশটাও অঙ্গে জড়িয়েছে নীলকণ্ঠ-পাড় শাড়ি।
হয়েছে—
প্রগতির হাতঘড়ি মেপে বিজ্ঞানের মহাশূন্য অভিযান।

ফরাসি নাবিক ও পর্যটক সিয়্যর দ্য লা সাল
পৌঁছে গেলেন নায়াগ্রা জলপ্রপাতে
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসা
প্রদর্শিত হলো আমেরিকার ন্যাশনাল গ্যালারী অব আর্টে।

সিঁদুররঙা সূর্যকে বিদায় জানিয়ে–
তেবরিজ শহরে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর
বিপরীত স্রোত কেটে পুনরায় জেগে উঠলো পৃথিবী!

পয়মন্ত খোয়াবে মাছরাঙা খুঁজে নিলো বিষুবীয় অঞ্চল;
কতবার প্রেম এলো পাষাণ খচ্চরের মতো!
কতবার নখ কাটলাম দাঁতে;
পায়ের বুড়ো আঙুলে ভূ-পৃষ্ঠের বুকে তৈরি করলাম ক্ষত।

শূন্যে ভাসিয়ে দীর্ঘশ্বাসের সপ্তডিঙা
গুঞ্জরিত বকুলগন্ধা এইসকল স্মৃতি;
রাবীন্দ্রিক মমতা ভুলে যেন বৃন্ত থেকে স্খলন,
অজস্র অনাগত ভ্রূণ; বুকের জমিনে সেই আট তারিখ!
বালিয়াড়ির চরজুড়ে ফুটে আছে লাল কাঁকড়ার মতো!

 

সাধনারাধ্য

রাতের অন্ধকার নেমে এলে-
তারাদের মতো জ্বলতে থাকা যে অভিমান পোড়ে;
তারমধ্যে তুমিও ছিলে।

চিলমচি রাখা ছিল, আলমিরায় গুছিয়ে রাখা বাসন-কোসনের ভাঁজে;
আসছে অমাবস্যায় হাহাকারী জলস্ফীতির হাত ধোয়াতে।

বাড়ির আঙিনায় যে থল-কমলের পোয়াতি গাছটি বেড়ে উঠেছিল;
দোদুল্যমান কেদারায় প্রায়ই তার দীর্ঘশ্বাসের ঝাঁপটা এসে লাগতো।

দেয়ালের ওপাশে ভালোবাসার কেনাবেচায় শারীরিক ঝড় উঠলেও;
বারবার বড়ুচণ্ডীদাসের কাব্য রচিত হয় না।

রুদ্র অভিশাপে মরে গেলে কলিকাবয়সী সাধ; জলকুন্তলের মতো ঘটাকাশে তবু লেগে থাকে মধ্যবিত্তের অশ্রু।

মানুষ-শিকারে তাবিজি দখলিস্বত্ব -এ বড়ো কঠিন সাধনা।

 

পরিতাপ

এখানে পিঠ পেতে দাঁড়িয়ে আছে একখানা তন্ময় দুপুর
মাছের গালিচায় বড়শি গেঁথে চলছে সুকৌশলী খেলা।

বৈদ্যুতিক তারে ঝুলে থাকা দাঁড়কাকের মতো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে এখানে দোদুল্যমান নষ্টামি ও ভেলকিবাজির লকলকে জিভ ।

মণি-মুক্তোর চাষ দেখে ঈর্ষায় তাকিয়ে খানিক,
এখানে অবান্তর যুক্তিতে ছেড়ে যায় আড়চোখি সুদীর্ঘ ট্রেন।

কোমল বিকেলে একখানা ঘর-বিবাগী কাক; ডাকে কা কা কা
মহল্লার কুকুরটি এসে অভুক্তই ঘুরে যায় এবাড়ি ওবাড়ি।

রানির মতো ফুটে থাকা ষোড়শী চেরিগুলোকে দেখে
জোয়ারে ভাসায় জল আটলান্টিকের অতলান্তিক বুক।

খুলে দিয়ে বুকের বোতামখানি, পর্যটক আকাশটা;
গার্হস্থ্য-প্রেমে এখানে মাঝেমধ্যে ঢেলে যায় অমৃতকুম্ভজল।

কেবল এখানে কোনো ঈশ্বর নেই;
নেই কোনো অদৃশ্য কারিশমা;
যা থামিয়ে দিতে পারে আয়না বিক্রির মোকাম,
কূপমণ্ডূকতার শোরগোল কিংবা ভেসে আসা
ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত চিৎকারে অব্যাহত মৃত্যুর হিড়িক।

বেনজির শিকদার। কবি ও লেখক। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুরে। শৈশব থেকেই কবিতার সাথে সখ্য। শৈশব কেটেছে যমুনা, ধলেশ্বরী, কালিগঙ্গা বেষ্টিত নির্জন প্রকৃতির কোলে। তিনি জীবন খুঁজে বেড়ান- বই প্রকৃতি সংগীত ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মাঝে। বেনজির শিকদার পরিবারসহ নিউইয়র্কে বসবাস করেন। প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ