বহুরূপী মন

খুরশীদ শাম্মী
গল্প
Bengali
বহুরূপী মন

বাস্তবতার চাপে ঝুলে পড়েছে পলাশের বোধের ডানা। ব্যর্থতা তাকে কুটকুট করে কাটে। আজকাল প্রায়ই সে নিরুদ্যম নিজের কৃতকর্ম বাছে। “ইচ্ছে হয় ঝাপটা দিয়ে ঝেড়ে ফেলি ভুলগুলো। ইস্‌, জীবনটা যদি আবার নতুন করে শুরু করা যেত! নিখুঁত এক জীবন গড়তাম নিশ্চিত। ফাঁক-ফোকরগুলো সফলতায় পূর্ণ করতাম কানায় কানায়।” ভাবনাগুলো ফোঁটায় ফোঁটায় তার হৃদয় নিংড়িয়ে ঝরে। অন্তর-প্রেম খামচি কাটে, অট্ট হাসে। চিন্তাশক্তি দোল খায়। হুঁকার ধোঁয়া তার চোখ-মুখে চুমু খায়। ব্যর্থতায় আনত নয়নতারা, তবুও নির্ভীক সততার চাদর আগলে ধরে তাকে।

শিমুল উচাটনে বকবক করে, “কী আমার সুপুরুষ! না করে ঠিকমতো স্ত্রী দেখবাল। না পারে লইতে ঘরের ভার। এই বর্ষার আগে মেরামত না করলে ঘরের চাল, আমি যাবো বাপের ঘর। তখন ছুটবে কাজ ফেলে বসে বসে হুঁকা টান।”

বকবকানি থামা, বউ। মাথা ধরে। এই বয়সে বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কি উপায় আছে আর? ভাইয়েরা যে দখল করছে তোর বাবার ভিটে ঘর।

তা তুমি ঠিকই কইছো, সোয়ামি আমার। মায়ের পেটের ভাই হয়েও কেমন মস্ত ঠকালো আমায়। ওরা মরুক। নরক আগুনে পুড়ুক। তবুও ওমুখো হবো না আমি আর।

এই তো লাইনে আসছিস। এইবার দুই চিমটি জর্দা প্যাঁচিয়ে এক খিলি পান দে তো, বউ। ভাবনা বসেছে মনে। কাজে মনোযোগ দিতে পারি নাই। হুঁকাও ফেল করেছে। পান চিবাতে চিবাতে মন ভরে একটু ভাবি, শেষ বয়সে পেয়েও যেতে পারি জীবনের সঠিক পথ।

জাবর কাটায় যদি মিলতো জীবনের সঠিক পথ, তবে তো গোয়ালের গরু পাইতো সফল জীবন।

কেমন কথা বললি, বউ? আমারে শেষমেশ করলি গরুর সাথে তুলনা?

কী যে কও! পাপের ডর আছে না বুঝি আমার? শত হইলেও তুমি আমার সোয়মি। পকেটে পয়সা, গতরে শক্তি না থাকলেও সম্পর্কের শক্তি আছে যে মেলা।

মশকরা করো? কর্‌। তোর স্বামীর ব্যর্থতা। তেতুল মাখাইয়া খাবি, না গুড় মাখাইয়া খাবি, তা সবই তোর মরজি।

বাড়ি ফেরে দোলনচাঁপা। স্কুল ব্যাগ মাটিতে রেখেই সে ঝুলে পড়ে পলাশের পিঠ পেল্টে। দুলে দুলে বলে, “বাপজান, স্কুল বনভোজনে যাবো। পঞ্চাশ টাকা চাঁদা। স্যার বলেছে, এই সপ্তাহেই দিতে হবে।”

পলাশ পকেট থেকে দিনের কামাই বের করে বলে,“বেশ তো! ঠিক পঞ্চাশ টাকা। এই নে, মা। কালই দিয়ে দিস চাঁদা।” কন্যার আবদার উপেক্ষা করার শক্তি নেই পলাশের। পৃথিবীর প্রায় সকল পিতাই তার কন্যার হাসিমুখ দেখতে ব্যাকুল থাকে। কন্যার খুশির ব্যাপারে সকল পিতা থেকে পলাশ যেন আরও এক কদম এগিয়ে। তার এমন উদগ্রীব থাকার কারণ অবশ্য আছে একটা। বিয়ের দশ বছর পর দোলনচাঁপাই যে তার পিতৃত্বের স্বাদ মিটিয়েছে। দেখতেও সে হয়েছে ঠিক তার মায়ের অনুরূপ। মুখের বোল যেন পাখির ডাক। গলায় মধু টসটস সুর। পলাশের মন খারাপ দেখলেই সে গান ধরে, “কাটে না সময় যখন আর কিছুতে…।” পলাশ সব ফেলে কন্যার সাথে কণ্ঠ মিলায়, “আয় খুকু আয় …”। সে ভুলে যায় সকল কষ্ট, ব্যথা।

দুই

শিমুলের চল্লিশোর্ধ দেহ অপুষ্টিতে নেতিয়ে পড়েছে। নাম লিখিয়ে সরকারী হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকে সে ডাক্তারের অপেক্ষায়। ব্যথায় চিৎকার করতে ইচ্ছে হয় তার। সে পেট চেপে, দাঁত কামড়ে কুঁকড়িয়ে পড়ে থাকে, মাঝে মাঝে প্রলাপ বকে, “মা-গো। বাবা-গো, মরে গেলাম-গো।” পলাশ বাড়ি থেকে বয়ে আনা পানির বোতল এগিয়ে দেয়। গলা ভিজিয়ে বোতল ফিরিয়ে দেয় সে পলাশের দিক। অস্পষ্ট স্বরে বলে, “তিতা! নিমপাতা গোলা পানি কি খাওন যায়?” পলাশ নিরুপায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে শিমুলকে দেখে। তার নিখুঁত লাল টুকটুক চেহারা কেমন কালো হয়ে গেছে। ভাসা ভাসা তালশাঁস আঁখি জোড়া যেন শুকনো বরই। গলায় তাম্রাভ ছোপ। এলোমেলো রুক্ষ কেশগুলো যেন পাখির বাসা। পরিধানের শাড়িটা পুরাণ, রঙ জ্বলে ধূসর।

কেরানি এসে ডাকে, “শিমুল হায়দার”। পলাশ শিমুলকে ধরে ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করে। ডাক্তারকে দেখা মাত্রই চমকে ওঠে পলাশ। হৃদকম্পন বেড়ে যায়, ঢেঁকি শস্য ভানতে শুরু করে তার বুকে। কাঁপে নয়ন জোড়াও। শক্ত করে ধরে সে শিমুলের হাত। নির্ধারিত চেয়ারে বসে। ডাক্তার রোগীকে প্রশ্ন না করে প্রশ্ন করে পলাশকে, কেমন আছো তুমি?

ভালো।

ভালো থাকলে তুমি এখানে আসতে না।

আমি অসুস্থ নই। অসুস্থ আমার স্ত্রী।

সে আমি জানি, পলাশ। তবে তুমি বদলাওনি এক রতিও। শিমুল, তোমার শেষ ঋতুস্রাব কবে হয়েছে?

প্রায় দশদিন ধরে চলেছে।

রক্ত কি এখনও অনেক ঝরছে? পেটে ব্যথা?

হ্যাঁ, এখনও অনেক রক্ত ঝরে। ব্যথাটা অসহ্য তেতো। মুখে স্বাদ নেই, সবকিছু তিতা লাগে।

তোমার আল্ট্রাসাউন্ড ও ব্লাড টেস্টের রেজাল্ট আমি দেখেছি। তোমার ডাক্তার ক্যান্সার সন্দেহ করে তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। এই রোগ নির্ণয় করতে বায়োপ্সির বিকল্প নেই। বায়োপ্সি যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই ভালো। আগামী সোমবার সকাল দশটায় তোমার সার্জারির জন্য বুকিং দিয়ে দিচ্ছি। এর মধ্যে কোনো অপারেশন বাতিল হলে আমার অফিস থেকে তোমার সাথে যোগাযোগ করবে। তোমার ফোন নাম্বার দিয়ে যাও।

আমার ফোন নাই।

তোমার ফোন নেই, পলাশের ফোন নাম্বার দাও।

আমাদের বাড়িতে কোনো ফোন নাই, কবিতা।

বাড়িতে ফোন না রাখাও কি পলাশের অবাধ মনের সিদ্ধান্ত?

কবিতা, তুমি যেমন পলাশকে জানো, তেমন একই শহরে বসবাস করার নিমিত্তে আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাও জানো। এতগুলো বছর পর কেন মিছেমিছি লজ্জা দিচ্ছো ওকে? আমি বরং সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।

শিমুল, আজকাল অর্থের কারণে কেউ ফোন রাখে না বললে মানুষ হাসবে। আর, লজ্জা দেয়ার কথা বললে না! যার সাথে কোনো সম্পর্ক-ই নেই, তাকে লজ্জা দেই কী করে? উদাসীন লোককে লজ্জা দেয়া বেকার। ওর ঔদাসীন্য তোমাকে বিরক্ত করে না?

দেখো, পলাশের উদাসীনতা আমার যে খুব পছন্দ, তা কিন্তু নয়। তবুও বিছাহার হয়ে গলার ঝুলিয়ে রেখেছি দীর্ঘ পঁচিশ বছর। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি অকল্পিত এক জীবনে, যে জীবনে অভাব আমার পায়ের নূপুর, প্রেম আমার হাতের পলা, খুনসুটি আমার প্রাতরাশ।

শিমুল, তোমার কি মনে হয় না যে তোমার পায়ের নূপুরের জন্য পলাশ দায়ী? তুমি এত প্রেম প্রেম না করে, বরং ওকে আঘাত করে সঠিক পথ দেখাও। আরে, আধমরাকে ঘা দিয়েই বাঁচাতে হয়; দিবাস্বপ্নখোরকে চোট দিয়েই জাগাতে হয়।

আমি জীবনের লড়াইকে এত বেশি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি যে আমার জীবনের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করতে পারছি না, কবিতা। আর প্রেমের কথা বললে না? প্রেম, ভালোবাসা, মায়াবিহীন জীবন তো শুকনো নারিকেল ছোবড়া। পেটের ক্ষুধা প্রকৃতি মায়ের লতাপাতা খেয়েও মেটানো যায়, কিন্তু অন্তরের খিদে মেটাতে পারে ক’জন?

ডাক্তার, আমার স্ত্রী ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছে। অতিরিক্ত রক্তপাতে কাহিল হয়ে পড়েছে। রাতে একদম ঘুমাতে পারে না। খেতেও পারে না। যদি কোনো ঔষধ লিখে দিতেন তবে খুব ভালো হতো।

আয়রন ঘাটতি আছে রক্তে। আয়রন ট্যাবলেট লিখে দিচ্ছি। তাছাড়া, শরীর অসুস্থ হলে মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে খাবারে বৈচিত্র আনা যেতে পারে, যেমন ভাত-রুটির পরিবর্তে কখনো সূপ, তাজা ফল, ফলের রস, ইত্যাদি। ব্যথার ঔষধ যত কম খাওয়া যায় তত ভালো। তবুও ব্যথার ঔষধ লিখে দিচ্ছি। ব্যথা অসহ্য হলে খেতে পারে।

কবিতা প্রেসক্রিপশন লিখে পলাশের হাতে দিতে দিতে অফিসের ফোন বেজে ওঠে।

তিন

গহীন রাত। এক ফালি চাঁদ কালো মেঘের ভাঁজে ভাঁজে আকাশের বুকে লুকোচুরি খেলে। ঘরের দাওয়ায় নাটাই রেখে পলাশের মন ঘুড়ি উড়িয়ে স্মৃতি খোঁজে। উদ্দেশ্য চিত্তের প্রায়শ্চিত্ত করণ। মশাগুলো সুযোগ করে রক্ত চোষে। হাতের তালুর ঠাস-ঠাস আঘাতে মশক মরে, তবুও ভাঙ্গে না তার ধ্যান। স্মৃতিগুলো কচকচে, সজীব। অনুভূতি বুকে ভূমিকম্প ঘটায়। দগদগে স্মৃতি বেড়িয়ে আসে লাভার মতো। পলাশ অতীত, বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যতের টানাপোড়েনে নিজেকে পেষে।

জানা সাত-রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে গন্তব্যের সড়কটি নিরূপণ করা যতটা কঠিন, যৌবনের ভরা তারণ্যে জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়া ততটাই অনিশ্চিত। তবুও মানুষ যৌবনে স্বপ্ন দেখে অধিক। সিদ্ধান্ত নেয়, গন্তব্যে পৌঁছাতে অলিগলি ছুটে বেড়ায়। কেহ একবারে পারে তার কাংখিত গন্তব্যে পৌঁছে যেতে। কেহ করে একাধিক বার চেষ্টা। কেহ বিকল্প পথে খুঁজে নেয় শান্তি। কেহ ব্যথিত হয়। তবুও জীবন থেমে থাকে না। থেমে থাকেনি আমার জীবনও।

যৌবন উদয়কালে আমি বেছে নিয়েছিলাম টকটকে লাল প্রেম সড়ক। মাত্র অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম তখন। সেই পথে আমার সঙ্গী ছিল লাবণ্য। কাঁঠালের আঠার মতো জোর ছিল তার প্রেমে। লেপ্টে ছিল সে আমার অন্তর জুড়ে। তার আবেশে দিবানিশি আমি চরকি হয়ে ঘুরতাম। আমার উর্বর মনে স্বপ্ন-বীজ বপন করতো সে পদে পদে। দ্রুত অংকুরিত হতো সেগুলো। আমি ওই স্বপ্নডানায় ভর করে তার জন্য মহল গড়তাম, পঙ্খিরাজ ঘোড়া নিয়ে ছুটতাম, চাঁদের বুকে তার ছবি আঁকতাম। বিহঙ্গ হয়ে উড়ে বেড়াতাম বৃক্ষ শাখায়। প্রজাপতির রঙ মেখে ফুলে ফুলে মধু আহরণ করতাম। স্কুলজীবন শেষ না হতেই হঠাৎ তার বাবা শঙ্খচিল বেশে ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো তাকে অন্য শহরে। ঠিকানাবিহীন খুঁজেছি তাকে পাশের শহরগুলোতে প্রায় এক বছর।

শুরু হয় কলেজ জীবন। তামাকের পোড়া গন্ধ প্রিয় হয়ে ওঠে। সিগারেটের ধোঁয়ায় খুঁজে বেড়াই সুখ। পরাণের বন্ধু শিশিরের বড় ভাই কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি। শিশিরও মিছিলের মধ্যমণি। শিশির নিয়মিত মিছিলে ডাকে। কিন্তু আমি সদা ব্যস্ত থাকি কবিতা, নাটক নিয়ে। জন্মদিনে নীল মলাটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সঞ্চয়িতা” বইটি উপহার দেয় ক্লাসের এক মেধাবী ছাত্রী। নাম তার কবিতা। আমার লাল সড়ক ততদিনে ধুলোমাটিতে বিবর্ণ কিছুটা। সুযোগে নীল রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকে সেখানে। অন্তর জুড়ে প্রেম বউল ধরার পূর্বেই নীল সড়কে বাদামী দাগ কাটতে শুরু করে কবিতার জেদ ও দাম্ভিকতা। আমার নবীন অন্তর তা কিছুই না দেখে। তার অহমিকা, অন্যায় আবদার দীর্ঘদিন গ্রহণ করতে পারলেও আমি ব্যর্থ হই শিমুল তলায় পৌঁছে।

সেদিন ছিল শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বিবি পুকুরের পার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম টাউন হলে।  সদর রোডে দেখা হয় শিমুলের সাথে। সে যাচ্ছিল বুক ভিলায়। শিমুল আমার সহপাঠিনী। চতুর্থ শ্রেণী থেকে একত্রে পড়ি আমরা। শিমুলের সহজ সরল আচরণে চুম্বকটা অনুপস্থিত ছিল সর্বদা। সেদিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আলোচনায় পাশাপাশি হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম বুক ভিলায়। ওহ্‌ মা! সেখানে কবিতা। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে সে গাইড বই দেখছিল অগ্রিম। শিমুলের সাথে আমাকে দেখতেই তার অন্তর-সলতে কেরোসিনে ভেজে, দপ করে জ্বলে ওঠে। চোখ নাচিয়ে আমাকে বলে, “ফাইনাল পরীক্ষা তো এসে গেলো। পরীক্ষা শেষ হলেই কোচিং করতে হবে। তাই এখন থেকেই গাইডগুলো দেখতে শুরু করেছি। আমার মনে হয় তোমারও দেখা উচিত। দিনশেষে জীবনটা তোমার। নাটক কিংবা গল্প-কবিতায় তো জীবন গড়া যাবে না। এখন আমাদের নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সময়।” আমি কবিতার হাত থেকে গাইড নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে বলি, “অবাধ মনকে খাঁচা বন্দি করা অন্যায়। তাকে উড়তে দিতে হয়। নতুবা জীবনটা বেঁটে থেকে যায়।” শিমুল নির্বাক তাকিয়ে আমাকে দেখে। হঠাৎ শুনি কর্কশ কণ্ঠে কবিতা কা-কা করছে, “কী দেখছো এমন নিস্পলক তাকিয়ে? মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হতেও ফার্স্ট ডিভিশন প্রয়োজন। সেকেন্ড ডিভিশন – থার্ড ডিভিশনের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য গাইড নয়।” কবিতার কথাগুলো দ্রুত বয়ে আনে রাশি রাশি মেঘ। কালো মেঘগুলো জমে শিমুলের বদন জুড়ে। বিদ্যুৎও চমকায়, “পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জনের অহমিকায় যদি কারো ব্যবহার আগাম তৃতীয় বিভাগে অবনমিত হয়, তবে সেই প্রথম বিভাগ আমার প্রয়োজন নেই। আর, প্রতিযোগিতা আমার জীবনের লক্ষ্য ছিলো না কখনোই।” নিজেকে সামলে নিতে সময় নেয় কবিতা। ততক্ষণে শিমুল নিজের বইয়ের মূল্য পরিশোধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কবিতা বরাবরই ভীষণ জেদি। প্রতিঘাত না করে থাকাটা তার জন্য কষ্টকর। সে শিমুলের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “প্রতিযোগিতা করার জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটা কি তোমার আছে? তবে তোমার একটা যোগ্যতা অবশ্য আছে, ন্যাকামি। ন্যাকামি করে অন্যের প্রেমিকের সাথে ঘুরে বেড়ানো।” অপমান কাহাতক সহ্য করা যায়? শিমুল নির্বাক বেরিয়ে পড়ে। আমি হতভম্ব! কবিতা আমার হাত ধরে বলে, “যত্তসব! চলো, আজ আর বই কেনার মুড নেই।” আমি হাত গুটিয়ে নিয়ে বলি, “আমার টাউন হলে যেতে হবে। কাজ আছে।” অভিমানে জ্বলে কবিতা রিকশায় চড়ে। আমি টাউন হল অভিমুখে রওয়ানা হই। পথে অনেক মানুষের ভিড়। রিকশা দুর্ঘটনা। একজন আহত হয়েছে ভীষণ। তাকে হাসপাতাল পর্যন্ত নেয়া প্রয়োজন। দায়িত্বটা যেন হঠাৎ করে আমার হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় পথচারী শিমুলের হাত ভেঙ্গে বাঁকা হয়ে গেছে। শিমুলের হাত টেনে সোজা করে চেপে ধরে ওঠে বসি এক রিকশায়। উদ্দেশ্য হাসপাতাল। মুহূর্তেই শিমুলের ছলছল রুপালী আঁখিতে বিকশিত হয় ঘন সবুজ দোদুল্যমান প্রেম। আমাকে স্পর্শ করে তা। আমি শিমুলের এত কাছাকাছি হই সেদিনই প্রথম। খুব আশ্চর্য হই জেনে, শিমুল আমাকে ভালোবাসে পঞ্চম শ্রেণীর সেদিন থেকে, যেদিন জ্যামিতি বক্স ধার দিয়ে ওর বাড়ির কাজ করতে সহযোগিতা করে হাতকাটা স্যারের মার থেকে রক্ষা করেছিলাম আমি। হাতকাটা স্যারের কথা মনে হতেই হাসে পলাশ। বেচারা! ডান হাত ছিলো না, তবুও বাম হাতেই বেত চালাতো সপাং সপাং। কত সুন্দর নাম ছিল তার, ইউনুস! অথচ তার কৃতকর্মের জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ডাকতো হাতকাটা স্যার।

অন্ধকারে এসে পাশে বসে শিমুল। পলাশের ধ্যান কাটে না তবুও। শিমুল পলাশের বাহুতে হেলান দেয়। গুনগুনিয়ে গায়, “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়। ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায় …।” পলাশ শিমুলের চুলে হাত বুলায়। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “ঘুম থেকে ওঠে আসলি ক্যান, পাগলী? রাত জাগলে তো তোর শরীর খারাপ করবে আরও।”

জীবন তো এমন-ই। সয়ে সয়ে ক্ষয়। একদিন বিলুপ্ত হয়।

জীবনকে ক্ষয় হতে দেয়া যাবে না। তোকে ভালো থাকতে হবে।

আমাকে ভালো রাখতে তুমি চেষ্টা তো জীবনে কম করলা না, দোলনের বাপ। পড়ালেখা শেষ করলা না। মাইনষের গান্ধা মুখ বন্ধ করতে ডিগ্রী পরীক্ষা চলাকালেই বিয়া করলা আমাকে। তবুও আমার পোড়া কপাল ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা পড়ে।

চুপ কর। কপাল তোর পোড়া না, বউ। আমার চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত যে তোর জীবনে এত কষ্ট আনবে, জানলে আমি পঞ্চেন্দ্রিয় বন্ধ করে হলেও চাকরি করে যেতাম।

চাকরি তো আর তুমি ইচ্ছা করে ছাড়ো নাই। তুমি ঘুষ খাইতে চাও নাই। সেই অপরাধে মিথ্যা মামলায় পড়ে তুমি নিজের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে বাধ্য হইছো। কাগজে কলমে তুমি চাকরি ছাড়লেও ওটা তো ছিল তোমার ম্যানেজারের মনোবাসনা।

মিথ্যার সাথে আপোষ করতে শিখিনি। আবার আঘাত করতেও জানিনা। আমার এই দুর্বলতাকে হাতিয়ার করে প্রতিবারই জিতে যায় সমাজের ধান্ধাবাজেরা।

তোমার মন বুঝি আইজ খুব বেশি খারাপ! আমার ডাক্তার দেখানোর দরকার নাই, তোমার কঠিন কথা শোনারও দরকার নাই। আমি নিজেই নিজের যত্ন নেবো।

কঠিন সে যতই কঠিন হোক, তাকে গ্রহণ করি আমি স্নিগ্ধ কোমল স্পর্শে, যেন ব্যথা না পায় ঘুণাক্ষরে।

সত্যটা তুমিও জানো, আমিও জানি। তবুও মিথ্যাকে আঁকড়াইয়া কি আর সত্য ঢাকা যায়?

বউ, মিথ্যাকে আঁকড়ে নয়। সত্যটা তুইও জানিস, আমিও জানি। তবুও না জানার বাহানায় দূরত্ব ঠিক রাখি।

দূরত্ব নয়। দোলনের বাপ, দূরত্ব নয়। স্বল্পে তুষ্ট এই তুমি, অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি থেকে প্রেমের মূল্যায়ন করছো অধিক। অভাব জর্জরিত সংসারে রানি করে রাখছো আমাকে। বারবার সততা তোমার সাথে প্রতারণা করলেও তুমি অবিচল থাকছো নিজের সিদ্ধান্তে।

বউ, মনদর্পণে আজ আমি সাতাশ বছর আগের আমাকে দেখছি। সত্যি-ই আমি বদলাইনি একদম। কবিতার জন্য করুণাও হয় ভীষণ। তোকে আমি ঢাকা নিয়ে বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করাবো। খরচের কথা ভাবিস না, ট্যাক্সিটা নিয়মিত চালাবো। ঘরের পেছনের বড় গাছ দু’টো বেচলে দুই লাখ টাকা পাবো। পুকুরের মাছগুলো না হয় অগ্রিম বেচে দেবো এবার।

মানুষ বদলায় না, দোলনের বাপ। মানুষ বদলায় না কখনো। কেবল অবস্থার পরিবর্তন হয়, পরিপ্রেক্ষিতে বাহ্যিক আবরণ বদলায়। মনদর্পণে আজীবন থাকে অভিন্ন প্রতিবিম্ব। এই যে তুমি, কবিতা, আমি তার জাজ্বল্য উদাহরণ।

কাঁচাপাকা আঁধারে ঝিঁঝিঁ পোকাদের ভৌরব রাগ রেওয়াজের মাঝে ভেসে আসে চৌকিদারের বাঁশির শিস ও কর্কশ ধ্বনি, “সজাগ। সজাগ।”

পলাশ শিমুলকে আলতো করে ধরে তোলে। ঘরে নিয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে দিয়ে বলে, মানুষের চাওয়াগুলো মুঠো ভরা। পাওয়াগুলো চিমটি তোলা। তবুও মানুষ চাওয়া বন্ধ করে না। আমিও চাই। পরে ভুল খুঁজে পাই। আমি আমার এই জীবনে আর কিছু চাই না, কেবল তোকে আর দোলনচাঁপাকে ছাড়া।

শিমুল চোখ বন্ধ করে। পলাশের বুকে হাত রেখে বলে, মানুষের বক্ষপিঞ্জরে থাকে বহুরূপী মন, যা খাঁচাবন্দি পাখির মতো ছটফট করে। আর মানুষ তার মনের ক্রীতদাস। মন যা চায়, মানুষ সেই পথেই আগায়। মাঝেমধ্যে বিবেক এসে থাবা বসায়। তখন অতৃপ্ত মনের দায়িত্ব বেড়ে যায়, উদাস করে। ইচ্ছে করলেই একান্ত বাসনাগুলো বন্ধ করা যায় না। তবে, গভীরভাবে শুনতে হয় হৃদয়ের ডাক, দেখতে হয় অন্তরদর্পণে নিজের অবস্থান। সচেতন মানুষেরা বিবেচনায় নিরপেক্ষকে রাখে পাহারাদার। তখন সম্যকদৃষ্টি লয় তার কামনা পূরণের ভার। তবুও মন রাজত্ব খাটাতে চায় বারবার। তোমাকে আমি চিনি, জানি। নিজেকে খুলে দেখাতে হবে না আর। আমি মরে গেলেও অতৃপ্ত থাকবে না আমার অন্তর।

খুরশীদ শাম্মী। লেখক। জন্ম বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলায়। বর্তমান নিবাস কানাডার টরেন্টো শহর। প্রকাশিত বই: 'রুপালি আঁচল', 'নাইওর' এবং  'মৃত্তিকা অবিনশ্বর'

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

লিফট

লিফট

গুলশান এক থেকে দুইয়ের দিকে যাওয়ার পথে চৌরাস্তার পঞ্চাশ গজ দক্ষিণে পঁচিশতলা আর্কেডিয়া টাওয়ারের তেরতলায়…..

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..