বাংলাদেশের সমাজ ও বাস্তবতায় নারীবাদ

একেএম ওয়াহিদুজ্জামান
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
বাংলাদেশের সমাজ ও বাস্তবতায় নারীবাদ

ফেমিনিজম শব্দের বাংলা হিসেবে নারীবাদ প্রতিশব্দটি আমার পছন্দ হয় না। নারীবাদ কথাটি শুনলে কেন জানি ‘স্তালিনবাদ’, ‘লেনিনবাদ’, ‘মার্কসবাদ’ এমনকী ‘জঙ্গীবাদ’ এর মতো তত্ত্বজাতীয় বিষয় বলে মনে হয়। বরং নারী অধিকার ও নারীদের সমতার বিষয়ে এডভোকেসি করার বিষয়টাকে বাংলায় ‘নারীপক্ষ’ বললে বুঝতে সুবিধা হয়। কিন্তু সবার বোঝার স্বার্থে আমি এখানে নারীবাদ কথাটিই ব্যবহার করব। যদিও বাংলাদেশে যারা নারীবাদী হিসেবে পরিচিত, তাদের বেশিরভাগ মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এই বিষয়টি এতটাই দুর্বোধ্য হয়ে গেছে যে এটাকে যেভাবেই নামকরণ করা হোক না কেন, ঘুরেফিরে ভিন্ন অর্থ দাঁড়াতে বাধ্য। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, একই কারণে অর্থাৎ ভুল অ্যাক্টিভিস্ট এবং ভুল পদ্ধতির অ্যাক্টিভিজমের কারণে ‘প্রগতিশীল’, ‘সমাজতন্ত্র’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘নাস্তিক’ শব্দগুলোও বাংলাদেশে ভিন্ন অর্থ বহন করে।

বলাবাহুল্য ওপরের ওই বিষয়গুলোর মত নারীবাদও আমদানি হয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব তথা ইউরোপ থেকে। ইউরোপ কিন্তু প্রগতিশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাস্তিক্যবাদ কিংবা নারীবাদ-এর মত বিষয়গুলো কপি-পেস্ট করে অন্য কোথাও থেকে আমদানি করতে পারে নি।  তাদেরকে এই বিষয়গুলো বুঝতে এবং অর্জন করতে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে; রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে যে সিমন দ্য বোভোয়ার এর হাত ধরে নারীবাদ পূর্ণতা লাভ করেছে, তার দেশ ফ্রান্সকে ফরাসি বিপ্লবের মত কষ্টকর সংগ্রামকেও পাড়ি দিতে হয়েছে। ওখানকার সমাজে ন্যায্য অধিকার, ন্যায় বিচার এবং সমতা প্রতিষ্ঠার পর সামাজিক চর্চার মাধ্যমে নারীবাদ আসার কারণে তারা এটিকে সঠিকভাবে বুঝতে এবং প্রয়োগ করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এসেছে পড়াশোনার মাধ্যমে। মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পশ্চিমে গিয়ে কিংবা পশ্চিমে প্রকাশিত বই বাংলাদেশে বসে পড়ে নারীবাদ সম্পর্কে জেনেছে।

আগেই বলেছি- এই মানুষগুলো উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত, অর্থাৎ সমাজের প্রভাবশালী শাসকশ্রেণিতে তাদের বসবাস। নিজেদের শ্রেণি অবস্থানগত কারণে এমনিতেই তারা প্রভাবশালী এবং প্রাধিকারপ্রাপ্ত। ফলে তাদের ক্ষমতায়নকে কোনোভাবেই নারীবাদের অগ্রগতি বলে মনে করার কোন কারণ নাই। এই কারণে আমি দিল্লির সুলতানা রাজিয়া, ঝাঁসির রানী লক্ষী বাই, ইন্দিরা গান্ধী, বেনজির ভুট্টো, খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনাকে নারী শক্তির প্রতীক কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখি না। আমার কাছে বরং নারীর ক্ষমতায়নের উদাহরণ হচ্ছে ওপরা উইনফ্রি; যিনি পশ্চিমা সমাজের সাম্য ও ন্যায়বিচারকে পুঁজি করে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী থেকে এসে নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ওপরা উইনফ্রি পেরেছেন,  কারণ  তিনি যেই দেশে বসবাস করেন সেই দেশের মানুষরা একটা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাম্যের অধিকার আদায় করে নিয়েছে। কোন দেশে যদি সার্বিকভাবে সাম্য বিরাজ না করে অর্থাৎ, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে, সাদা-কালোর মধ্যে, সুন্দর-অসুন্দর এর মধ্যে, এমনকী দূর্বল-শক্তিমানের মধ্যে সাম্য বিরাজ না করে, তাহলে সেই সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা আশা করা অনুচিত।

বাংলাদেশে সাম্য আদায়ের এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম না করেই যারা নারীবাদী হয়ে গেছেন, তাদের আচার-আচরণগুলো সূক্ষ্ণভাবে পর্যালোচনা করলেই বুঝতে পারবেন পাশ্চাত্যের ফেমিনিজম থেকে তাদের এই বঙ্গীয় নারীবাদ কত দূরে! এক্ষেত্রে প্রথমেই বলে নেয়া প্রয়োজন, পাশ্চাত্যের ফেমিনিজম শুধুমাত্র নারীর অধিকারকে বোঝায় না, এটা সার্বিকভাবে মানবাধিকারকেও বোঝায়। ক্ষেত্রবিশেষে পাশ্চাত্যের নারীবাদ পুরুষের রক্ষাকবচ হিসেবে আবির্ভূত হয়। পাশ্চাত্যের নারীবাদ ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভেদ কিংবা নিপীড়নের বিরোধিতা করে। কোন নারী যদি ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে অন্য নারী কিংবা পুরুষের ওপর চড়াও হয় তাহলে পাশ্চাত্যের নারীবাদ ওই ক্ষমতাবান নারীর বিপক্ষেও দাঁড়ায়। ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতনকে পাশ্চাত্যের নারীবাদ দেখে ক্ষমতার প্রদর্শন হিসাবে। কিন্তু বাংলাদেশের নারীবাদীরা এগুলোকে কীভাবে প্রয়োগ করে সেটা ভেবে দেখেছেন কী?

কিছুদিন আগে নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় আলোচকরা বলেছেন, প্রত্যেকের পরিবার থেকে নারীর সমঅধিকার বাস্তবায়ন শুরু করতে। খুবই সুন্দর কথা। প্রশ্ন হচ্ছে এই সমঅধিকার কি শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রী আর পুত্র কন্যার মধ্যে? নাকী বাসার কিশোরী গৃহকর্মীও অধিকারের আওতায় আসবে? ওই নারীবাদী বক্তাদের বাসার গৃহকর্মীরা কি তাদের সাথে এক টেবিলে বসে খেতে পারে? একই ধরনের পোশাক আশাক পড়তে পারে এবং একই ধরনের বিছানায় ঘুমাতে পারে? কয়েকবছর আগের একটি ঘটনা স্মরণ করতে পারেন, একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলার স্ত্রী গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর একটি নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আমলার স্ত্রীর পক্ষাবলম্বন করা হয়েছিল এই বলে যে, একজন গণ্যমান্য নারীকে এভাবে রিমান্ডে দেয়া যায় না! উদাহরণ আরো দেয়া যায়। বছরখানেক আগেই এক নারী সাংবাদিকের নৈতিক অসততার কারণে একজন সিনিয়র সিটিজেন তাঁকে ‘চরিত্রহীন’ বলতে চেয়েছিলেন। এই কারণে দেশের সকল নারীবাদীরা একত্রিত হয়ে সিনিয়র সিটিজেনকে কয়েকমাস জেল খাটিয়েছেন। পশ্চিমা ফেমিনিজমের ধারণায় এখানে নারীবাদীরা অপরাধী। পশ্চিমা ফেমিনিস্টরা এই পরিস্থিতিতে ওই সিনিয়র সিটিজেন-এর পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন; আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো খোঁজ করলে প্রমাণ পাবেন আশাকরি।

বাংলাদেশের নারীবাদীরা যেহেতু তাদের নিজেদের স্ট্যান্ডার্ডের নারীবাদকে পশ্চিমা নারীবাদের বিপরীত মেরুতে নিয়ে এসে চর্চা করার চেষ্টা করছেন, তাই বাংলাদেশে নারীবাদের প্রচেষ্টায় এদেশের নারীদের কোন উন্নয়ন হচ্ছে না বরং পতন হচ্ছে। বাংলাদেশের নারীবাদ তাই নারীদের জন্য এক আধুনিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই নারীবাদের সাথে নারীর সম্মান ও মুক্তির কোন সম্পর্ক নাই। বাংলাদেশের নারীবাদ যেহেতু শ্রেণিস্বার্থের ছকের বাইরে যেতে পারে না, ফলে নারীর পণ্য হয়ে ওঠা, এমনকী বডি শেমিংও ঠেকাতে পারে না। খেয়াল করে দেখবেন নারী দিবসের স্পন্সর হয় মেয়েদের ত্বক ফর্সা করার ক্রিম ‘ফেয়ার এন্ড লাভলী’! যারা নিজেরাই দেখিয়ে দেয় ফর্সা নারীদের চেয়ে কালো নারীরা খারাপ। বাংলাদেশের নারীবাদীরা হয়তো বলবে, নারীত্বের পতন এবং পণ্য হওয়া যেহেতু ঠেকাতে পারছিনা, আসুন পতনের ও পণ্যের ব্যবসাতে ন্যায্যতা চাই। পতনের ও পণ্যের মূল্য নিয়ে আন্দোলন করি। এটাই উনাদের বোঝার ভুল। উনারা সিমন দ্য বোভোয়ার এর নারীবাদী পরিচয়টাই শুধু জানেন, উনি একজন রাজনৈতিক দার্শনিক এবং অস্তিত্ববাদী চিন্তাবিদ ছিলেন সেই বিষয়টা ওনাদের ধারণাতেও নেই। অথচ পাশ্চাত্যের বিষয়কে কপি-পেস্ট না করে দেশে খোঁজ করলেই উনারা দেখতে পেতেন যে সিমন দ্য বোভোয়ার এর আগেও এই বাংলাদেশেই একজন পথিকৃৎ ফেমিনিস্ট রয়েছেন; বেগম রোকেয়া।

এইজন্য বাংলাদেশের নারীদের বলি, আপনারা এইসব বাংলাদেশি নারীবাদের কথাবার্তা না শুনে বরং বেগম রোকেয়ার কথা শুনুন। আপনাদের লিঙ্গ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা না করে বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয়ে পরিচিত হবার চেষ্টা করুন। অর্ধেক সমস্যার সমাধান তো এখানেই হয়ে যাবে। বাকি সমস্যার সমাধান আপনাদের একার হাতে নয়। এর জন্য সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আপনার ছোট ভাই যেদিন আপনার বাবার বয়সী রিক্সাওয়ালাকে ‘তুই’ না বলে ‘আপনি’ সম্বোধন করবে, বাংলাদেশের শীর্ষ নারীবাদীরা যেদিন দিনমজুরের ধর্ষিতা কিশোরী কন্যা ধর্ষকদের বিচারের দাবি করতে পারবে, যেদিন যে কোনো সাধারণ নাগরিক আইনের কাছে সমান গুরুত্ব পাবে, যেদিন দেশের সাধারণ মানুষ পুলিশ আমলা বিচারকদের আপনজন মনে করতে পারবে, সেদিন আর আপনাদের সমঅধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে হবে না, ওটা এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নবজাগরণের সঙ্গে নারীর জাগরণ, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা, এবং নারীমুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে এই নবজাগরণের…..