বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব-৪)

শাহনাজ হোসেন
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব-৪)

ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফাইনান্সে অনার্স মাস্টার্স করা কবির পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে সরকারি ব্যাংক জনতাতে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে জয়েন করার পর এখন সিনিয়ার অফিসার, বর্তমানে টি এস সি শাখায় অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে। প্রতি বছর ভর্তির সময়টায় হাজার খানেক একাউন্ট খুব সহজেই হয়ে যায়। আজ সকালে নিজের টেবিলে গুছিয়ে বসে ব্রাঞ্চের মেইন দরজায় চোখ পড়তেই কবির নিজের হার্টের একটা বিট মিস করল। কচি কলাপাতা রঙের সালোয়ার ওড়না আর গাড় সবুজ কামিজ পরা যে মেয়েটা এইমাত্র ঢুকল তাকে দেখেই মনে হল এতদিন এই মেয়েটার জন্যই কবির অপেক্ষা করেছে। সদ্য কলেজ পেরনো ঝকঝকে, উচ্ছল, প্রাণবন্ত মুখগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে পৃথিবীর কোন পঙ্কিলতা এদের এখনো ছুঁতে পারেনি। কবিরকে এক্সপোর্ট এর একটা ডকুমেন্ট দেখতে হবে কিন্তু পরিচিত হবার অজুহাত হিসেবে নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে ওদের নিজের টেবিলে নিয়ে এলো। পিয়নকে  দিয়ে তিনটা একাউন্ট ওপেনিং ফরম আনিয়ে নিজেই একাউন্ট ওপেন করে দিলো আর দশ দিন পরে এসে চেক বই নিয়ে যেতে বলে দিলো। একাউন্ট ওপেন করার অজুহাতে ওদের নাম ঠিকানা, কে কোথায় ভর্তি হয়েছে, কে কোন হলে থাকবে সব জেনে নিয়েছে। পরের দিন সকালে আগের দিন ওপেন করা একাউন্ট ওপেনিং ফরমগুলো নিয়ে কাজ করার সময় রায়নার ফরমটা হাতে নিয়ে কবির মনে মনে ঠিক করে ফেলল এই মেয়েই হবে তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী।

দুইসপ্তাহ পরে ছেলেমেয়েগুলো আবার কলকল করতে করতে চেক বই নিতে আসলো, মামুন আর রনির চেক বই ঠিকঠাক মতো হয়েছে কিন্তু রায়নার চেক বইয়ে নামের বানান ভুল হয়েছে, কবির ওকে ভরসা দিলো যে কবির নিজে চেক বই ঠিক করে পৌঁছে দেবে।

শুক্রবার সকালে সাদা পাঞ্জাবি আর জিন্সের প্যান্ট পরে রায়নার হলের গেটে গিয়ে পিয়নকে বলল রায়নাকে ডেকে দিতে। রায়না এসে কবিরকে দেখে খুবই অবাক হল, ও ওর বন্ধুদের ছাড়া অন্য কাউকে আশা করেনি। ছেলেদের সঙ্গে বেড়ে উঠা রায়না খেয়ালই করল না কবির ওর জন্য সুন্দর করে পরিপাটি হয়ে এসেছে। চেক বইটা পকেট থেকে বের করে দিতেই সদ্য কৈশোর পেরোনো রায়নার মুখটা খুশিতে চিকচিক করে উঠল। ওর হাসি মাখা মুখটা দেখে কবির আবার হার্ট বিট মিস করল। চেক বইটা হাতে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে যাবার জন্য ঘুরতেই কবির বলল এতোদুর কস্ট করে আসার জন্য আমি মনে হয় এক কাপ চা একসঙ্গে খাবার দাবি করতে পারি।

রায়না খুবই লজ্জা পেল, কারণ ওরই ভদ্রতাটা করা উচিত ছিল। টাকা আনার কথা বলতেই কবির বলল আজ বিল ও দিয়ে দিবে কিন্তু পরের বার রায়নাকে দিতে হবে। কাছাকাছি চা খাবার জায়গা বলতে মেডিক্যালের ক্যান্টিন। পরের শুক্রবার সকালে কবির আবার হাজির, বাহানা আগের দিনের কথা অনুযায়ী রায়নার টাকায় চা খেতে এসেছে। সারা সপ্তাহের ক্লাস শেষে ওরা বন্ধুরা ছুটির দিনের অপেক্ষা করে আড্ডা দেয়ার জন্য। ধীরে ধীরে কবির ওদের আড্ডার অংশ হয়ে গেলো। এক সঙ্গে নিউমার্কেট যাওয়া, টিএসসি’তে আড্ডা, বইমেলায় যাওয়া, পহেলা ফাল্গুন বা পহেলা বৈশাখ সবকিছুতেই একসঙ্গে। বছরখানেকের মধ্যে ওরা বন্ধুরা সবাই বুঝতে পারল কবির রায়নার প্রেমে পড়েছে কিন্তু বেচারা বলতে পারছে না।

সবার মধ্যে রনি একটু ফাজিল টাইপের, একটু ইঁচড়ে পাকা, কিন্তু সবার মধ্যে ওই সবচাইতে পরিণত মনের। সোমবার ক্লাস তাড়াতাড়ি শেষ হওয়াতে কী মনে করে হাঁটতে হাঁটতে কবিরের অফিসে গিয়ে হাজির হলো।

– কবির ভাই আপনাদের ফ্রি চা খাওয়ানতো ভাই।

– শুধু চা কেন, ক্লাস থেকে এসেছো খিদেও তো পেয়েছে তোমার, দাঁড়াও, বশির ভাই একটু এদিকে আসেন তো। পিয়ন বশির এসে সামনে দাঁড়াতেই দশ টাকা বের করে রনির জন্য ভেজিটেবল রোল আর চা আনতে বলে দিল।

– ভেজিটেবল রোলটা আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে বলল, আর কতদিন লাগবে রায়নাকে বলতে? চলেন শুক্রবার সোনারগাঁ যাই সবাই। বেড়ানোর ফাঁকে পেত্নীটার কাঁধে মামদো ভুত হয়ে ঝুলে পড়েন, যেভাবে দিনে দিনে সুন্দর হচ্ছে কোনদিন দেখবেন মেডিক্যালের কোন বড়ভাই বুকিং দিয়ে ফেলছে, তা ছাড়া আমি আর মামুন তো আছিই, আমাদেরও পা পিছলাতে পারে।

মামুন আর রায়নাকে সোনারগাঁ যাওয়ার প্ল্যান বলতেই সবাই হইহই করে রাজি হয়ে গেল। শুক্রবার খুব ভোরে উঠে সবাই সোনারগাঁ রওনা হয়ে গেলো। খুব ভোরে যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো সোনারগাঁয়ের বিখ্যাত জামদানীর হাট ঘুরে সকালের নাস্তা বাজারে সেরে পানামনগর ঘুরে বেলা থাকতে থাকতে ঢাকা ফিরে যাওয়া।

গত দু’বছর ধরে রায়না হাত খরচ থেকে অল্প অল্প করে যে হাজার দুয়েক টাকা জমিয়েছে সেটা সঙ্গে নিয়েছে যদি মনমতো কোন শাড়ী পেয়ে যায় তাই। সাড়ে পাঁচটার সময় যখন ওরা হাটে গিয়ে নামল পুরো হাট হরেক রকম রঙবেরঙের জামদানির ঝলক, তাঁতিদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের উত্তেজনায় ভরপুর। অসম্ভব সুন্দর মরিচ লালের সঙ্গে সোনালী জরির কাজ করা একটা শাড়ী মুগ্ধ হয়ে দেখছিল রায়না, দামটা একটু বেশী, ওর কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে কেনা যাবে না, ঘুরে ঘুরে দেখে শেষ পর্যন্ত বেগুনী রঙের একটা শাড়ী কিনে ভিড় থেকে বের হয়ে একপাশে দাঁড়াল। একটু পর রনি আর মামুনও বের হয়ে এলো। সবার পেটে ছুঁচোর ডনবৈঠক চলছে। হাটের একপাশে একটা খাবারের দোকানে বসে পেট ঠাণ্ডা করে, গরম ধোঁয়া উঠা গুঁড়ের চায়ে চুমক দিতেই সবাই পরবর্তী রাউন্ডের জন্য চাঙ্গা। পানাম নগর যাবার জন্য একটা ভ্যানগাড়ি ঠিক করে পা দুলিয়ে রওনা দিতেই রনি ভাঙ্গা গলায় গান ধরল। ওদের সবার দাদুবাড়ী পাশাপাশি গ্রামে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই শীতের ছুটিতে সবাই একসঙ্গে গ্রামে যাওয়া হয় আর গ্রামের করিম চাচা ওদের সারা গ্রাম ভ্যানে করে ঘোরায়। রায়নার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে, আর দু’সপ্তাহ পরে শীতকালীন ছুটি শুরু হবে, কোনমতে এ দুটো সপ্তাহ পার করে বাড়ী যাবে, রাতের বাসে খুব ভোরে ভোরে বাড়ী পৌঁছে মার হাতের তৈরি নাস্তা খাবে। এবার রনি আর মামুন একসঙ্গে বাড়ি না গিয়ে আগে বান্দরবান যাবে।

রনির হেঁড়েগলার গান শুনতে শুনতে ওরা যখন  পানাম নগরে এসে নামল, সূর্যের তেজে সকালের ঘাসের শিশির তখন বিদায় নিয়েছে। পুরনো পানাম নগরের অলিগলি ঘুরতে ভালই লাগছে। প্রতিটি ইট, কাঠ ইতিহাসের সাক্ষী। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে রায়না দালানের এক কোণে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। একটু পর গুটি গুটি পায়ে কবির এসে ওর পাশে বসল। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থেকে সঙ্গে রাখা অফিসব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল, এটা তোমার জন্য। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে সেই মরিচ লাল জামদানীটা সঙ্গে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি।

এমা! এটাতো অনেক দামী, না না এ আমি নিতে পারব না, আপনি ফেরত দিয়ে দিন, আর আমিতো আমার জন্য একটা কিনেছি।

তুমি কি এই লাল শাড়িটা পরে হাতভর্তি চুড়ি, লালটিপ আর খোলা চুলে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে রায়না? রায়না থেকে রায়না কবির হবে?

গত এক বছরে রায়না বুঝে গিয়েছিল যে কবির ওকে পছন্দ করে, কিন্তু ও সবসময় চেষ্টা করত বন্ধুরাসহ একসাথে বেড়াতে, কিন্তু আজ একসঙ্গে এসেও যে কবির প্রপোজ করবে এটা আন্দাজ করতে পারে নি। কী বলবে বুঝতে পারছে না, এদিকে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। মেডিক্যাল স্টুডেন্ট হয়েও হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে, ওদিকে ওর বাল্যবন্ধুদের কোন পাত্তা নাই। জোড়াভুরুর নিচে চোখ জোড়া এমন করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে যে ও বুঝে গেল এ লোকের হাত থেকে ওর নিস্তার নাই। ও নিজেও যে কবিরকে পছন্দ করে না তা না, কবির শিক্ষিত, মার্জিত, ভালো চাকরি করে, কোন বদভ্যাস নেই, দেখতে ভালো, কিন্তু বাবা-মার স্বপ্ন ও ডাক্তার হবে, ওর নিজেরও ইচ্ছা বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করা, সবকিছু মিলিয়ে ওর ভিতরে একটা চরম অস্থিরতা কাজ করছে। জোড়া ভুরুর নিচে চোখজোড়া মনে হয় ওর মাথার খুলি ভেদ করে মগজটাকে পড়ে ফেলেছে। দূরে রনি আর মামুনকে ডাব হাতে এদিকে আসতে দেখ্তে কবির বলল, তোমাকে এখনই কিছু বলতে হবে না, তুমি সময় নিয়ে চিন্তা করে আমাকে জানিও, তোমার সিদ্ধান্ত ‘না’ হলেও আমাদের বন্ধুত্ব ঠিক থাকবে।

রনি এসে একটা ফিচকে হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল কীরে পেত্নী তোর চেহারা দেখে কেন মনে হচ্ছে তোকে মামদো ভুত ধরেছে, নে ডাব খা। ওর হাতে কবিরের দেয়া প্যাকেটটা দেখে ছোঁ মেরে নিয়ে খুলে দেখে মামুনকে বলে, দোস্ত গুরু তো মনে হয় লাজ-সরমের যানজট কাটায়ে আমাদের পেত্নীকে শেষ পর্যন্ত প্রপোজ করে ফেলেছে। মামুনের মাথার ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, কী বলছে রনি এসব! সেই ছোটবেলা থেকে ও রায়নাকে মনে মনে পছন্দ করে, ইচ্ছা ছিল আর একটা বছর গেলে রায়নাকে নিজের মনের কথাটা বলবে, দু’জনে পড়াশুনো শেষ করে বাড়ীর বড়দের জানাবে, এদিকে রায়নার লাল হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ওর আর কোনদিনই রায়নাকে ভাল লাগার কথাটা বলা হবে না।

শাহনাজ হোসেন (ঝিনুক)। গল্পকার। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে। শিক্ষা জীবন ঢাকা শহরে, সেই সময় সংস্পর্শে আসেন দৈনিক বাংলার সাপ্তাহিক বিচিত্রার একঝাঁক মেধাবী মানুষের সঙ্গে; পরিচিত হতে শুরু করেন লেখালেখির সঙ্গে। এরপর শিক্ষাজীবন শেষ করে দীর্ঘ ১৫ বছর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..