বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব-৭)

শাহনাজ হোসেন
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব-৭)

বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব-৬)

ম্যাজেন্টা গোলাপী বাগানবিলাস দিয়ে ঢাকা গেটের ভিতর দিয়ে বাড়ীতে পা দিয়েই কবির চমকে উঠল আব্বা আর ডাইরেক্টর সাহেবকে বারান্দায় বসে চা খেতে দেখে, উনাদের সালাম দিয়ে বাসার ভিতর ঢুকে আরেকবার অবাক হবার পালা, ড্রইং রুমে অপরিচিত কিছু মানুষ বসে আছে, রান্না ঘর থেকে আম্মা বের হয়ে আসলেন সঙ্গে আরেকজন অপরিচিত মহিলা। আম্মা পরিচয় করিয়ে দিলেন উনি ডাইরেক্টর সাহেবের স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে আর ছেলের বউ। আম্মা ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে খাবার টেবিলে নাস্তা খেতে আসতে বললেন। ডাইরেক্টর সাহেবের পুরো পরিবারকে ওদের বাড়ীতে দেখে কবর একটু চিন্তিত হলো, আবার আম্মা কাল ফোনে জরুরি ভাবে বাড়িতে আসার জন্য বলার সময় উনাদের আসার কথাও কিছু কেন বললেন না সেটাও ওকে চিন্তিত করল। ঘরে এসে রায়নাকে ম্যাসেজ করে জানালো ওর ভালোভাবে পৌঁছানোর কথা, এরপর বাথরুমে ঢুকে হাতমুখ ধোয়ার বদলে  একবারে গোসল সেরে কাপড় বদলে খাবার টেবিলে গেল।

নাস্তা শেষে আম্মাকে বলে চায়ের কাপটা নিয়ে ছাদে ঊঠে এলো রায়নাকে ফোন করা দরকার। রায়নাকে ফোনে ধরে ক্থা শুরু করতেই আব্বা আর ডাইরেক্টর আবদুল্লাহ সাহেব ছাদে উঠে এলেন, কবির পরে কথা বলবে বলে ফোন কেটে দিল। আব্বা বললেন জোহরের নামাজের পর কবিরের সঙ্গে উনার জরুরী কথা আছে ও যেন বাড়ী থেকে কোথাও না যায়। মামার গলার আওয়াজ পেয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলো মামা, খালা আর ছোট চাচা এসেছে। ব্যাপার কি সবাই একসঙ্গে এবাড়ীতে? যাকগে সারারাত জার্নি করে এসেছে আর গতকাল সারাদিন দৌড়াদৌড়ীর মধ্যে কেটেছে, ওর একটু রেস্ট দরকার। নীচে নেমে আম্মাকে বলে ওর ঘরে ঢূকে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়ল।

দরজা ধাক্কাধাক্কি আর আম্মার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে কবির প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় আছে, কয়েক মুহূর্ত পরে মনে পড়ল ও বাড়িতে এসেছে, আজ বিকেলে অথবা রাতে আম্মাকে রায়নার কথা বলতে হবে, আম্মা আব্বাকে বুঝিয়ে বলবে। দরজা খুলতেই আম্মা ওর হাতে একটা নতুন পায়জামা পাঞ্জাবী ধরিয়ে দিয়ে কাপড় পালটে তাড়াতড়ি বসার ঘরে আসতে বলল, কাপড় পাল্টাতে হবে কেন বললে আম্মা বললেন বাসায় অনেক মেহমান এসেছে তাই, আর বাকীটা ও চেঞ্জ করে এলে আব্বা বলবেন।

বসার ঘরে এসে যা দেখল তার জন্য কবির মোটেও প্রস্তুত ছিল না, মোটামুটি কাছের সব আত্মীয় স্বজন এসেছে, আব্বা আম্মা খুবই খুশী, পাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেব, শহরের মেয়র সাহেব আর কাজী সাহেব এসেছেন। আম্মা ওকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন তুই তো এতোদিনেও নিজে কোন মেয়ে পছন্দ করতে পারিস নি আর আবদুল্লাহ সাহেব তোকে খুবই পছন্দ করেন তাই ঊনি নিজে থেকে ঊনার একমাত্র মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ের প্রস্তাব দেয়াতে আমরা রাজী হয়ে গিয়েছি, এই জন্যই তোকে ডেকে আনা, এইমাত্র কাজীসাহেব গওহরকে কবুল পড়িয়ে এলেন, এখন তুই কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লেও কবির এতো অবাক হতো না, ওকে না জানিয়ে ওর কোন মতামত না নিয়ে আব্বা আম্মা কিভাবে এতোদুর এগোলেন?

  • আম্মা একবার আমার মতামত জানতে চাইলেন না? আমার তো কাউকে পছন্দ থাকতে পারে।
  • তোর পছন্দ থাকলে এতোদিনে আমাদের জানাতিস না? আর ছোটনের নিজে পছন্দ করে বিয়ে করার পর আমরা তোর কাছে এটুকু নিশ্চয়ই আশা করতে পারি যে তুই আমাদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিবি।
  • আম্মা আপনাদের সিদ্ধান্ত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আমার জীবনের এতোবড় সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাস করবেন না?
  • দেখ এতোগুলো মানুষের সামনে তোর আব্বাকে আমাকে ছোট করতে চাইলে আব্দুল্লাহ সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করতে না কর তবে এটাও মনে রাখিস ঢাকায় ফিরে যাওয়ার আগে আমাদের লাশ দাফন করে যেতে হবে।
  • আম্মা এটা কি বলছেন?
  • আবদুল্লাহ সাহেব তোর জন্য কি করে নি, তোর প্রমোশন, বিদেশে পড়তে যাবার যাবতীয় সহযোগিতা সব করেছেন, উনি তোর মাথার উপর গার্জিয়ানের মতো সবসময় থাকবেন, আর কি চাই?

সন্ধার পরে গওহরের কাজিনরা যখন বধুবেশী গওহরকে কবিরের রুমে দিয়ে গেল, কবির ওর স্বাভাবিক চিন্তা করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে, রায়নাকে কি বলবে ও, আব্বা আম্মকে সন্মান দিতে গিয়ে এতোদিন যে মানুষটার জন্য অপেক্ষার পর নিজের করে পেয়েছে তাকে কি জবাব দেবে। কবির শুধু বলল আমি খুব ক্লান্ত, তোমার সঙ্গে কাল কথা বলব। গওহরকে দেখে মনে হলো কবিরের কথায় আহত হওয়ায় বদলে ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

ফজরের আজানের সময় উঠে কবির ভাবল কাউকে কিছু না বলেই ঢাকা চিলে যাবে কিন্তু বারান্দায় আসতেই দেখে আব্বা আর আবদুল্লাহ সাহেব কথা বলছেন ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে। আবদুল্লাহ সাহেবের ইচ্ছা এখান থেকে গিয়ে কবির সরাসরি উনার বাসায় উঠবে আর কানাডা যাওয়ার সব প্রস্তুতি উনার বাসা থেকেই করবে, আর এসপ্তাহেই গওহরের নাম ওর ফাইলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাকিছু করতে হবে ঊনি নিজে সব সহযোগিতা করবেন। কবিরকে দেখে বলে উঠলেন এই যে জামাই বাবাজী তোমার আর সেই চিলেকোঠার বাসায় যাওয়ায় দরকার নেই, এখান থেকে আমরা সবাই একসঙ্গে ঢাকায় ফিরব আর আমাদের দারোয়ান গিয়ে তোমার সব জিনিসপত্র নিয়ে আসবে। কবিরের কোন আপত্তিই ধোপে টিকলো না আব্বা আম্মাও সায় দিলেন, একা একা সবকিছু না করে শ্বশুর সাহেবের কথামতো সব কিছু করতে।

ঢাকায় ফিরে কবির কোনভাবেই রায়নার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ বের করতে পারল না। প্রায় দুমাস হয়ে গেছে কবির রায়নার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেনি, ওর চিলেকোঠার বাসায় গিয়ে জানতে পেরেছে কবির বাসা ছেড়ে দিয়েছে, কোন এক লোককে দিয়ে বাসা ভাড়ার টাকা পাঠীয়েছিল, সেই লোকই ওর জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছে। ওর সেলফোন সবসময় বন্ধ পেয়েছে। কোথায় গেল মানুষটা? ওর মুন্সিগঞ্জে পোস্টিং হয়েছে, এমাসেই ওকে জয়েন করতে হবে। গত মাসে ওর পিরিয়ড মিস হয়েছে, দুসপ্তাহ আগে টেস্ট রিপোর্ট পেয়েছে।

ঢাকায় ফিরে আসার সময় ফেরিতে ধাক্কা লেগে কবিরের সেলফোনটা পানিতে পড়ে গিয়েছিল, আবদুল্লাহ সাহেব জামাইকে নতুন ফোন নতুন নাম্বার সহ উপহার দিয়েছেন, প্রতি পদক্ষেপে নিজে সঙ্গে থেকেছেন অথবা নিজের লোক সঙ্গে দিয়ে নিশ্চিত করেছেন কবির যেন উনার নির্ধারিত পদক্ষেপের বাইরে কিছু করতে না পারে। আগামী পরশু দিন কবির কানাডা চলে যাবে, এর কিছুদিন পর হয়ত গওহরও চলে যাবে। প্রথম প্রথম কয়েকদিন কবির একা বের হওয়ায় চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত বুঝেছে সামাজিকতার এই চক্র থেকে ও বের হতে পারবে না।  শুধু যাওয়ায় আগে রায়নাকে একবার ওর অবস্থাটা বলে যেতে পারলে ভালো হতো, ও বেইমানী করে নি শুধু লোকলজ্জা সামাজিকতার বিরুদ্ধে মাথা তুলতে পারেনি, মেয়েটা সবকিছু ভুলে নতুন করে জীবনে আগাতে পারত।

শশুরের গাড়িতে করে নীলক্ষেতে নেমে ড্রাইভারকে গাড়িতে বসতে বলে বাংলা একাডেমীর ডিকশনারি কিনতে দোকানে ঢুকতেই মামুন আর রনির মুখোমুখি পড়ল কবির।

-কবির ভাই, এতোদিন আপনি কোথায় ছিলেন? আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করেও আপনাকে খুজে পাচ্ছিলাম না, রায়নার সঙ্গে আপনি যোগাযোগ করছেন না কেন?

– রায়নাকে বলো আমি আগামীকাল ভোরে কানাডা চলে যাচ্ছি, পরিস্থিতির কারনে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরিনি। ও যেন ভালো থাকে।

– কি বলছেন? আপনি জানেন রায়না প্রেগন্যান্ট? আর আপনি ওর সঙ্গে কোন কথা না বলে বিদেশ চলে যাচ্ছেন? আপনি না ওকে ভালোবাসেন? চলেন আপনি এক্ষুনি ওর সঙ্গে দেখা করবেন।

কবির চমকে উঠল। মামুন আর রনি একপ্রকার জোর করে কবিরকে রায়নার বাসায় নিয়ে আসল। দরজা খুলে কবিরকে দেখে রায়না ওকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কবিরের খুব ইচ্ছা করছিল ওকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলতে ভয় নাই আমি আছি তো, কিন্তু ও জানে সামাজিকতার যে জালে ও বন্দী হয়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সাহস ওর নেই। শক্ত হাতে রায়নাকে ধরে শুধু বলতে পারল আমি কাল ভোরে কানাডা চলে যাচ্ছি, আর হয়তো কখনো দেখা হবে না, ওদের কাছে তোমার শরীরের অবস্থা শুনেছি পারলে মাফ করে দিও আর এবরশন করে নিও।

লম্বা লম্বা পা ফেলে কবির যখন বেরিয়ে গেল রায়না মামুন রনি সবাই হতভম্ভ হয়ে নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেল।

রায়নাকে ভুলে থাকার জন্য কানাডা এসে কবির নিজেকে লেখাপড়ায় ডুবিয়ে ফেলল। বাংলাদেশে থাকতে ও একপ্রকার গওহরের কাছ থেকে পালিয়ে থাকত, প্রায় সাড়ে আট মাস পর গওহর কানাডা আসার পর কবির গওহর আর ওর সম্পর্কটাকে মর্যাদা দেয়ার কথা চিন্তা করে গওহরকে জোর করতেই যে সত্যটা ওর সামনে আসল কবির তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না, আবদুল্লাহ সাহেবের এতো তাড়াহুড়া, ওর বাবামাকে বিয়ের জন্য রাজী করানো, সবকিছুর পিছনে যে এতোবড়ো সত্যি লুকানো ছিল কবির আর ওর বাবামা সেটা বুঝতেই পারেনি। জন্মগতভাবে গওহর ব্রিহন্নলা, সাদা বাংলায় আমরা যাকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বলি।  পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখার জন্য গওহরের পরিবার ছোটবেলা থেকে ওর এই জন্ম সত্যিটা লুকিয়ে রেখে ওকে মেয়ে হিসাবে বড় করে দেশ থেকে বিদেশে পাঠিয়েছে। ঠিক যেদিন কবির ওর জীবনের এতোবড় হেরে যাওয়ায় মুখোমুখি হলো সেদিন পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রায়নার কোল আলো করে আসা অর্ক চিৎকার করে জানান দিল ওর মায়ের মেঘে ঢেকে যাওয়া জীবনে ও সূর্যের আলো হয়ে এসেছে।

চলবে…

শাহনাজ হোসেন (ঝিনুক)। গল্পকার। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে। শিক্ষা জীবন ঢাকা শহরে, সেই সময় সংস্পর্শে আসেন দৈনিক বাংলার সাপ্তাহিক বিচিত্রার একঝাঁক মেধাবী মানুষের সঙ্গে; পরিচিত হতে শুরু করেন লেখালেখির সঙ্গে। এরপর শিক্ষাজীবন শেষ করে দীর্ঘ ১৫ বছর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..