বাদল মেঘের আলোয় (শেষ পর্ব)

শাহনাজ হোসেন
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
বাদল মেঘের আলোয় (শেষ পর্ব)

আগের পর্ব পড়ুন এখানে: >>> বাদল মেঘের আলোয় (পর্ব ১২)

কবির আর গওহর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন শুরু না করলেও আইনগত ছাড়াছাড়িটাও আর করেনি। একই ছাদের নিচে আগের মতোই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসবাস। তবে এখন আর গওহর রায়না বা অর্ককে দেখলে তেড়ে উঠে না, রায়নার জন্যই এখন ও ওর আগের মারমুখী মানসিকতা কাটিয়ে উঠে একটা চাকরি করছে, ওর লিঙ্গ সম্পর্কে জানতে পেরে যেসব মানুষগুলোকে একসময় ও প্রানের বন্ধু মনে করতো তারা সবাই এখন ওকে এড়িয়ে চলে। শুধু রায়নাই না রায়নার বন্ধুরা আর তাদের পরিবার ওকে ওর মানসিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে বর্তমান স্বাভাবিক অবস্থাটায় আসতে সাহায্য করেছে। রায়নার অনুমতি সাপেক্ষে কবির প্রতি সপ্তাহে অর্ককে দেখতে যায়, মাঝেমাঝে গওহরও যায় কবিরের সঙ্গে। বাবা ছেলের আড্ডার সময়গুলোতে রায়না সচেতনভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখে। গওহর রায়নাকে যতই দেখে ততই অবাক হয় আর ভাবে মানুষ এমনও হয়? কবিরের সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেয়েও রায়না যে শুধু গওহরের কথা ভেবেই আবারো সেক্রিফাইস করছে সেটা ও বুঝতে পারে তারপরও কবির, রায়না আর অর্ককে পরিবার হিসেবে দেখার সাহস বা ইচ্ছা কোনটাই তার নেই। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসবাস করলেও অন্ততপক্ষে একা তো থাকতে হয় না।

ছুটির দিন সকালে বাগানের ফুল গাছগুলোতে পানি দিয়ে এসে এক কাপ কফি নিয়ে আরাম করে ডেক চেয়ারে বসতেই ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার দেখে ধরবে কি না চিন্তা করেও ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে অনেক অনেক দিন আগে শুনা ছোটদার আওয়াজ ভেসে আসল- বুড়ি?

রায়না কথা বলার চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হলো না। ছোটদাই আবার বলল- বুড়ি বাবা-মা আর আমি তোকে দেখতে আসছি, বিকেল পাঁচটার সময় তোর শহরে ল্যান্ড করব এয়ারপোর্টে আসবি আমাদের নিতে?, তোর বাসায় কয়েকটা দিন থাকতে দিবি?

নিজের কানে শোনা কথাগুলো রায়নার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না, ও ঠিক শুনছে তো নাকি হেলুসিনেশন হচ্ছে? ছোটদা একটু ধরো বলে অর্ক অর্ক করে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকল। মায়ের ডাক শুনে অর্ক দরজায় উঁকি দিতেই রায়না ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল একটু কথা বলতো বাবা । হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ছোটদা বলল আমি তোমার মামা, মাকে বলো আমি তোমার নানভাই আর নানুমনিকে নিয়ে বিকেলের ফ্লাইটে আসছি। কথাগুলো অর্ক পুনরাবৃত্তি করার সঙ্গে সঙ্গে রায়না অর্ককে ধরে কাঁদতে শুরু করে দিল। অর্ক ঠিক বুঝতে পারছে না মা কেন কাঁদছে। মাকে বসিয়ে রেখে এক গ্লাস পানি এনে দিয়ে বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল- বাবা কে একজন ফোন করে বলল আমার মামা, নানা-নানুকে নিয়ে আসছে, এটা শুনে মা অনেক কান্না করছে, বাবা আমি মাকে কখনো কান্না করতে দেখি নি, মা কান্না করছে কেন কিছু বুঝতে পারছি না। একটু থমকে থেকে কবির বলল- এতোদিন আমার ভুলের জন্য তোমার মা শাস্তি পাচ্ছিল, আজ তোমার মায়ের শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে তাই কাঁদছে, কাঁদতে দাও, মন খুলে কাঁদতে দাও, চোখের পানিতে ধুয়ে যেতে দাও এতোদিনের জমাট বাঁধা পাথর।

এয়ারপোর্টের এরাইভালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাউঞ্জে দাড়িয়েও রায়নার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে, এতোগুলো বছর পরে বাবা-মা আর ছোটদার সঙ্গে দেখা হবে, সত্যি সত্যি ওরা আসবে তো? ডিসপ্লে বোর্ডে টরোন্টো থেকে ফ্লাইট ল্যান্ড করার ঘোষণা ভেসে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই গেট দিয়ে তিনজনকে বেরিয়ে আসতে দেখে রায়না এগিয়ে গেলো। মা এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরতেই রায়না শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, মায়ের হালকা হয়ে যাওয়া শরীরটা রায়নাকে ধরে নিঃশব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

বাসায় এসে বাবা-মা আর ছোটদা অর্ককে জড়িয়ে ধরে বলল আমাদের মাফ করে দিও তোমাদের এতোগুলো বছর দূরে ঠেলে রাখার জন্য। চা নাস্তা পর্ব শেষ করে রায়না জানতে চাইল কিভাবে ওরা রায়নার ঠিকানা বা ফোন নাম্বার পেয়েছে। ছোটদা জানালো মামুন এবার দেশে গিয়ে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে সবকিছু জানিয়েছে, পরে বাবা-মার কাছ থেকে ছোটদার ফোন নাম্বার নিয়ে ছোটদার সঙ্গেও কথা বলেছে। বাবা-মা যেহেতু প্রতি বছর ছোটদার কাছে বেড়াতে আসে তাই এবার উনারা হারিয়ে যাওয়া মেয়েটাকে ফিরে পেতে চেয়েছেন।

দুটো সপ্তাহ খুব ভালোভাবে কেটে গেল, গত ১৬ বছরের না পাওয়া আদর রায়না আর অর্ক গত ১৫ দিনে উশুল করে নিল।  বাবা-মা চলে যাওয়ার পর এক বিকেলে হাটতে বের হয়ে হঠাত করে অর্ক বলল মা তুমি মামুন বাপি কে বিয়ে করছো না কেন, বাপি তোমার সব ব্যাপারে কত খেয়াল রাখে, আর আমাকে নিয়ে কোন চিন্তা করো না, বাপি আর আমি অনেক ভালো বন্ধু আমরা দুজন দুজনকে অনেক ভালো বুঝতে পারি ।

রায়না খুব অবাক হয়ে ওর বড় হয়ে যাওয়া ছেলেকে দেখলো। তারপর আস্তে করে বলল- অর্ক কিছু কিছু সম্পর্ক যেমন আছে তেমনই থাকতে দিতে হয়, অনেক সময় সম্পর্কের মাঝে তেল, নুন, চাল-ডালের হিসাব এলে সম্পর্কের সৌন্দর্য এলোমেলো হয়ে যায়।

অর্ক কি বুঝলো কে জানে, ও আবার জিগ্যেস করল, মা তুমি কি এখনো বাবাকে ভালোবাসো?

উত্তরে রায়না বলল- তোমার বাবা সারাজীবন তোমার বাবা হিসেবেই থাকবে, তুমি ছাড়াও তার আর একটা পরিচয় আছে- সে গওহরের হাজবেন্ড, তাকে সে দায়িত্বটাও ঠিকভাবে পালন করতে হবে।

কিন্তু তোমার প্রতি তার কোন দায়িত্ব নেই মা? তুমি সারাজীবন এভাবেই একা একা পার করে দেবে? কারো সঙ্গে তোমার সময় কাটাতে ইচ্ছে করে না?

কে বলেছে আমি একা, এই যে তুমি আছো আমার সঙ্গে, কাজের চাপে তোমাকেই তো ঠিকমতো সময় দিতে পারি না, তোমার পড়াশুনা শেষ হলে তবেই না আমার ছুটি।

আরো এক যুগ পর-

আজ অর্কর গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম। মার পথে চলে অর্কও ডাক্তার হয়েছে,  রেসিডেন্সির জন্যও ওকে অপেক্ষা করতে হয়নি, ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার ওয়াল্টাল মেকেঞ্জী হাসপাতালে আর মাঝে কার্ডিয়াক ডিপার্টমেন্টের জন্য রয়্যাল আলেকজান্ড্রা হাসপাতালে, রায়নার ভয় ছিল রেসিডেন্সির জন্য ছেলেকে আবার তার কাছ থেকে দূরে না থাকতে হয়।  স্বাভাবিক ভাবেই মামুন এসেছে রায়নার সাথে, ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধুর অর্জন দেখতে, এই প্রথমবার গওহর নিজে থেকে রায়নাকে ফোন করে অনুরোধ করেছে কবিরকে গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামে নিয়ে যেতে, সঙ্গে গওহর নিজেও এসেছে।

ব্যাচে অর্ক সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করার কারনে, ওর সার্টিফিকেট আর মেডেল হাতে তুলে দেয়ার পর যখন ওকে কিছু বলতে বলা হলো তখন ও বলল-

অনেক আগে যখন আমি আমার মায়ের গর্ভে এসেছিলাম তখন আমার বাবা সহ অনেকেই চায়নি আমি এই পৃথিবীর আলো দেখি, কিন্তু আমার মা কারো কথা শুনেনি, সবার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল শুধুমাত্র আমাকে ভালোবেসে, আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে, আমার আজকের এই অর্জন আমার মার জন্য যে নিজেও পেশায় একজন ডাক্তার, মা তুমি কি স্টেজে উঠে আসবে?

তুমুল করতালির মধ্যে ঘোষক রায়নাকে স্টেজে উঠে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করল।

শান্ত সৌম্য চেহারার রায়না উঠে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। ঘোষকের এগিয়ে দেয়া মাইক হাতে নিয়ে বলল- আমার ছেলে রায়ান কবির যার ডাকনাম অর্ক- বাংলায় অর্ক শব্দের অর্থ সূর্য, জীবনের একটা সময় আমার চারদিক মেঘে ঢেকে গিয়েছিল, যেদিন আমি আমার ছেলেকে প্রথম হাতে ধরেছিলাম সেদিনই আমি জেনেছিলাম অর্ক শুধু আমার জীবনেই না সারা পৃথিবীকে আলোকিত করতে এসেছে. সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই আমার জীবনে সেই বাদল মেঘের দিনটি দেয়ার জন্য যেদিনের জন্য আমি রায়ানকে পেয়েছি, ধন্যবাদ জানাই সেই মানুষটিকে যে নিজে আমার জীবনে না থাকলেও রায়ানকে আমার জীবনে আসতে সাহায্য করেছে, ধন্যবাদ জানাই সেই সব শিক্ষকদের যারা স্কুল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত পথ চলতে রায়ানকে সহযোগিতা করেছে।

পাশে বসে গওহর দেখলো কবিরের দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা। কবির নিজের উপলব্ধি থেকে জানে জীবনে সহজ সাফল্য পেতে গিয়ে একসময় সে রায়নাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলো, আর সেসময় রায়না হেরে গিয়েও আজ চরমভাবে জিতে গিয়েছে, প্রকৃতি সব দেনা শোধ করে দেয় শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

সমাপ্ত।

শাহনাজ হোসেন (ঝিনুক)। গল্পকার। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে। শিক্ষা জীবন ঢাকা শহরে, সেই সময় সংস্পর্শে আসেন দৈনিক বাংলার সাপ্তাহিক বিচিত্রার একঝাঁক মেধাবী মানুষের সঙ্গে; পরিচিত হতে শুরু করেন লেখালেখির সঙ্গে। এরপর শিক্ষাজীবন শেষ করে দীর্ঘ ১৫ বছর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..