বাদল মেঘের আলোয়

শাহনাজ হোসেন
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
বাদল মেঘের আলোয়

আজ রায়নার সকালটা অন্যান্য দিনের চাইতে একটু অন্য রকম ভাবে শুরু হলো। ঘুম থেকে উঠে পাশের রুমের ভেজানো দরজাটা খুলে বিছানাতে কবিরের ঘুমন্ত মুখটা দেখে বুকের ভেতরে একটা অন্য রকম ভালো লাগায় ভরে গেল। গত ১৩ বৎসর ধরে যে মানুষটাকে শুধু দূর থেকে দেখেছে আর ভেবেছে যে এই মানুষটা তো তার একান্ত নিজের হবার কথা ছিল অথচ নিয়তির সিদ্ধান্তকে মেনে দূর থেকে ভালোবেসে গেছে আর প্রতিনিয়ত সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্য তার ভালো চেয়েছে।

রায়নার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে  যে কবির তার কাছে  এসেছে, জীবনের বাকী কটা দিন এক সঙ্গে থাকবে বলে এসেছে। গত রাতে হাসপাতালের ইমারজেন্সি বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রায়না কবিরকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে এসেছে। না নিয়ে এসে উপায় ছিলনা, আপাতত কবিরের অন্য কোথাও যাবার জায়গা নেই, আর এরকম অসুস্থ অবস্থায় মানুষটাকে রায়না হাসপাতালে ফেলে আসতে পারে নি।

এক সময়ের ক্যাম্পাস কাঁপানো টগবগে যুবক কবির এখন আর আগের মত নেই। জোড়া ভুরু এখনো আগের মতই আছে, শুধু একটু কাঁচাপাকা মিশানো হয়েছে, মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চূল গুলো এখন অনেক্ টা হালকা হয়ে গেছে, চূলেও কাঁচাপাকার মিশেল। তবে ৪৭ বৎসর বয়স হিসেবে চুল একটু বেশিই পেকেছে কিন্তু এখনো অনেক সুদর্শন, অথবা শুধু রায়নার কাছেই সুদর্শন।

গ্র্যান্ড ভিউ হাইটস রোড এর এই বাড়িটা খুব সুন্দর ছিমছাম, শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। গত বৎসর এই বাড়িটা কেনার পর রায়না আস্তে আস্তে সময় নিয়ে ডেকোরেশন করছে, এখনো পুরোপুরি করে উঠতে পারেনি। রায়নার ইচ্ছা খুব বেছে বেছে সুন্দর মানানসই আর রুচি সম্পন্ন ফার্নিচার আর ডেকোরেশন পিস কিনবে। সে অনুযায়ী এ পর্যন্ত শুধু মাত্র বেডরুমের ফার্নিচার আর বসার ঘরের জন্য এক সেট সোফা কেনা হয়েছে। গত বৎসর সামারে এখানে উঠে এলেও এবারের সামারটা রায়না আর অর্ক বাড়ির পিছন দিককার সৌন্দর্যটা অনুভব করতে শুরু করেছে। সামারে সময় কাটানোর জন্য এ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হল পেছনের ডেকটা। হোম ডিপো আর কানাডিয়ান টায়ার থেকে রায়না আর অর্ক সামার এর শুরুতেই বেশ কিছু ফুলের গাছ নিয়ে এসেছে।

এ পাড়ার সব বাড়ীর সামনে আর পিছনে খুব সুন্দর করে সাজানো, সবাই তাদের বাড়ীর খুব যত্ন নেয়। সামারে সময় মত লনের ঘাস কাটা, ফুলের কেয়ারী করা, শখের সবজি চাষ আর শীতকালে সময়মত স্নো পরিস্কার করা, আর শীতের শুরুতে ঝরা পাতা পরিস্কার করা। পুরো পাড়াটা ছবির মতো ঝকঝকে সুন্দর আর সাজানো। একই দামে রায়না শহরের বর্ধিত এলাকা গুলোতে এর চাইতে বড় আর নতুন বাড়ী নিতে পারতো। কিন্তু রায়না আর অর্ক দুজনেই একটু নিরিবিলি, বড় লট এ মোটামুটি সাইজের বাড়ী খুঁজছিল যেটা একটু পুরনো হলেও ক্ষতি নেই। গ্র্যান্ড ভিউ হাইটস কে পছন্দ করার আরও একটা কারন হলো অর্কর স্কুল। গ্র্যান্ড ভিউ হাইটস স্কুল এডমন্টন শহরের একমাত্র সাইন্স এন্ড ম্যাথ স্পেশাল স্কুল। অর্ক বরাবরই লেখাপড়ায় ভালো, আর এই শহরে আসার পর থেকেই ওর ইচ্ছা ছিলো এই স্কুলটাতে পড়ার। আর এমনই ভাগ্য যে ওরা বাড়ীটা পেয়েছে একেবারে স্কুলের পাশ ঘেঁসে। রায়নার যেহেতু শিফট এ কাজ করতে হয় ওর পক্ষে অর্ককে সবসময় স্কুলে নিয়ে যাওয়া বা নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। তাই বাড়ী ভাড়া বা কেনা সব সময়ই রায়নাকে অর্কর স্কুলের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হয়েছে। রায়না সবসময় চেষ্টা করেছে এমন জায়গায় থাকতে যেন অর্ক একাএকাই হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে।

অর্ক, পুরো নাম রায়ান কবির অর্ক। এ বছর বয়স ১২ হলো, এই প্রভিন্স এর নিয়ম অনুযায়ী এলিমেন্টারি (গ্রেড-৬) শেষ করে জুনিয়র হাই স্কুল (গ্রেড-৭) শুরু করবে। এই ১২ বছর বয়স পর্যন্ত অর্ক জানে ওর মা আর ওর এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সত্যি বলতে যদিও অর্কর বাবা আছে কিন্তু অর্ক জানে বাবা তাকে বা তার মাকে কারো কাছে নিজের পরিবার বলে পরিচয় দিতে পারবে না, এই নিয়ে অর্কর কোনো আক্ষেপ নেই কারন অর্ক জানে ওর মা ওকে বাবা ছাড়াই অনেক ভালোভাবে বড় করছে। অর্ক জানে গত রাতে মা যে লোকটাকে বাড়ীতে নিয়ে এসেছে সে তার বাবা। মা কখনো বাবা সম্পর্কে কিছু না বললেও মার আলমারিতে বাবা মার লুকিয়ে রাখা ছবিটা অর্ক অনেক আগেই দেখেছে, আর মা বাবাকে নিয়ে তাকে কখনো খারাপ কিছু বলেনি, শুধু বলেছে বাবার অসুবিধা আছে ওদের সঙ্গে থাকতে। ওর বয়সী বাচ্চাদের তুলনায় অর্ক অনেক শান্ত। অর্ক যদি এরকম শান্ত না হতো তাহলে রায়নার পক্ষে ওর জীবনের এ পর্যন্ত করা জার্নিটা করা সম্ভব হতো না।

পাঁচ বছর আগে যখন রায়না ছোট্ট অর্ককে নিয়ে কানাডাতে আসে তখন ভাবতেও পারেনি যে আজ সে ক্যারিয়ার এর যে জায়গাটায় পৌঁছেছে সেখানে পৌঁছাতে পারবে। তবে বরাবরই ওর চেষ্টার কোন কমতি ছিল না। রায়না শুধু জানে জীবনের একটা সিদ্ধান্ত ওর পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেটা নিয়ে ওর কোন আক্ষেপ নেই। যদিও সেই একটা সিদ্ধান্তের জন্য ওকে ওর নিজের পরিবার, মা, বাবা ভাই বোন সবাই সেই সময় ত্যাগ করেছিলো যখন ওর নিজের পরিবারকে বড় প্রয়োজন ছিলো, আর সব চাইতে যে মানুষটাকে পাশে প্রয়োজন ছিল সেতো জানার চেষ্টাই করেনি রায়না কেমন আছে। রায়না শুধু জানে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আজ সে আর তার ছেলে নিজেদের পায়ের নিচে মাটি পেয়েছে, রায়নাকে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন একটা চিন্তা আর করতে হবে না। রায়না কবির বা ডাক্তার রায়না যদিও এডমন্টন শহরের রয়্যাল অ্যালেক্স হাসপাতালে মাত্র ১৮ মাস আগে প্রাকটিসনার ডাক্তার হিসেবে জয়েন করেছে কিন্তু এরই মাঝে ইমারজেন্সি বিভাগের ট্রমা ইউনিট এ সে সবার কাছে পপুলার ডাক্তার হিসেবে পরিচিত।

ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে সামনের বারান্দা আর পিছনের ডেকের টবের গাছগুলোকে একবার পর্যবেক্ষণ করে সব গুলো গাছে নিয়ম করে পানি দেয়া রায়নার সকালের রুটিন। এর পর মা ছেলে এক সঙ্গে নাস্তা করবে। অর্কর বয়স ১২ হলেও গ্রোথটা একটু বেশিই, দেখতে ১৪/১৫ মনে হয়। রায়না পিছনের ডেক এর টবের গাছ গুলোতে পানি দেবার সময় অর্ক এসে মাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাস করলো মা আজ কি আমরা বাবার সঙ্গে একসাথে নাস্তা করব? রায়না চমকে উঠে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল হ্যাঁ বাবা, তুমি নাস্তায় কি খাবে? সিরিয়াল না পরোটা আর আলু ভাজি

চলবে…

শাহনাজ হোসেন (ঝিনুক)। গল্পকার। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে। শিক্ষা জীবন ঢাকা শহরে, সেই সময় সংস্পর্শে আসেন দৈনিক বাংলার সাপ্তাহিক বিচিত্রার একঝাঁক মেধাবী মানুষের সঙ্গে; পরিচিত হতে শুরু করেন লেখালেখির সঙ্গে। এরপর শিক্ষাজীবন শেষ করে দীর্ঘ ১৫ বছর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..