বানভাসি পাইন

পিকু চৌধুরী
কবিতা
Bengali
বানভাসি পাইন

বানভাসি

কেন এই জোট বাঁধা, ছোট ছোট কথা ঘাঁটা
কাছাকাছি মেশামেশি গুনগুন কথাদের এত তৃষ্ণা?
আসলে বলার জন্য অন্য মানুষ প্রয়োজন
তবু বলা যেন জমে ওঠা ক্লেদের বমন
বলা হয়ে গেলে হাল্কা অনুভুতি আর শুধু সাবধানী দেওয়াল
সবটুকু উজাড় করে দেবার কথাও অবশ্য ছিলনা কখনো।
মনের ঘরের কুলুঙ্গিতে নিষ্কম্প শিখা জ্বলে রাত্রিদিন
সে আলোতে কত কথোপকথন
নিভৃতে নথিভুক্ত হতে থাকে বানভাসি মাছেদের অন্তরঙ্গতা
খালবিল সব একাকার হবার দিনের আকস্মিক মিলন ।
তবু কেন এতো আকুলতা, একসাথে বলাবলি, হাসাহাসি
অন্তরজালে তৈলাক্ত পাশাপাশির প্রমাণ দাখিল
গৃহহীন রাত্রিযাপনের অসহায় সমর্পণ
কোনদিন প্রকাশ পাবেনা জানো তবু –
একা নই বোঝাবার এত আয়োজন।
এদিকে যে মন ঘরে ঝমঝম অবিশ্রান্ত বর্ষণ
রুপোলী আঁশের টান – গোপন স্রোতের কানাকানি
তুমিও জানো সে কথা কাউকে বলার নয়, শুধু নিজেকেই ভোলাবার মিথ্যে আয়োজন।
মহামারী ঘটায়নি বিচ্ছেদ, আকণ্ঠ নেশায় চুর হয়ে কতদিন আগেই দেউলে হয়ে গেছো
দুর্যোগে ঠোক্কর শরীরে শরীরে, সেটুকুই নেশাধরা স্মৃতি
ঢেলে দেয় শিরায় শিরায়; তবু একা নই প্রমাণের এত প্রয়োজন?
পড়ন্ত বেলার নারী আর কত স্বেচ্ছা বিমোহন, নোনাধরা গুপ্ত অন্তঃপুরে
বানভাসি হতে শেখ একা, আবার দুর্যোগের রাতে –
চোরা স্রোতে নতুন করে।

 

চিঠি

অদ্ভুত হাল্কা হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা বিবর্ণ পাতা
কুয়াশা ভেদ করে হয়ে যায় চিঠি;
এক একটা ঝরে পড়া হলদেটে দলিল
ঝলমলে ভোরের শিশির বা
রাতজাগা গলে পড়া মোমবাতির অনুযোগ,
নিস্তব্ধ গোপন মহাকাব্যের উত্তরাধিকার।
প্রেরক মহাকাল আর বিস্মিত বিহ্বল মানুষ
সে দলিলের অমোঘ নির্দেশে জেগে ওঠা বিলুপ্ত অবয়বের সারি
অপরিচিতের অনুভূতিহীন চাহনি নিয়ে
বেঁকেচুরে হয়ে ওঠা অতীতের শবরূপ শব্দের সমাহার –
সে সব চিঠির উত্তর দেবে কি তুষার বা
বাঙময় পরিয়ায়ি পাখির উড়ান?

 

পাইন

একটা প্রাচীন পাইন গাছের কাছে বারবার ফিরে গেলে
কি জমে থাকা শিশির বিন্দুদের চেনা যায়?
একই নরম কুয়াশা মাখা রোদের উত্তাপ অনুভব করা যায় শিরায় শিরায়?
পাইন তো একই ভাবে নিশ্চুপ মগ্নতায় উদাসীন
পুরাতন শ্যাওলা মাখা কাণ্ডে তবু ইতিহাস সন্ধানের কেন এ প্রয়াস?
যে ভাবে বেজে ওঠে ঢাক, মহা সন্ধিক্ষণে
শত প্রদীপের শিখায় জ্বলে চিরন্তন আকুতিময় প্রার্থনা
নিমিলিত চক্ষু ঘিরে থাকে ঘূর্ণায়মান ধূমে অবিচল স্থির দেবী মুখ
অগণিত নালিশ, মিনতি ভয় আশা দোলাচল কি আদৌ থেকে যায় এক?
অভ্যাসের তাড়নায় যদি আরশিতে দেখা অবয়ব রোজ একই চেনা চেনা লাগে
তবু সে দেহের ভাঁজে ভাঁজে নামে অচেনা সন্ধানী ঢল
আরশির কাঁচ বানভাসি হয় রোজ, আগুন্তুক আবেগ বা ভাবনার দোলাচলে।
নীল মৃত্যুর হিম মিশে যায় কি অবলিলায় শারদীয়া নীলাকাশে
কাশে কেঁপে ওঠে না বলা কথার গভীর দীর্ঘশ্বাস
গলির আঁধারে নীল আকাশের বাহুবলি পরওয়ানায়
তবু বারবার প্রথম দেখার কেন এ অন্বেষণ?
সব নদীর তীর্থ হয়না সাগর সঙ্গমে, দিগন্ত ছোঁয়া বালিয়াড়ি গ্রাস করে নেয় তার চলা
তবু তো অন্তঃসলিলা কামনার অদেখা অনুভূতি
পরিণতিহীন পরিচিতিহীন গোপনীয় গতিময়, নিয়ত নূতন কামনায়।

 

যাচনা

ঘড়ির কাঁটা আর লম্বা হয়ে ওঠা পড়ন্ত বেলার ছায়া
তাপ হারানো সফেদ চিনামাটির পেয়ালায়
নিঃসীম উদাসীনতায় নিমগ্ন সোনালি শীতল চা,
অথবা আসন্ন বর্ষণের শঙ্কায়
নীড় সন্ধানী পাখির গভীর কালো চোখ,
ললাট প্রান্তে স্থির রুপোলী রেখার নীরব নির্ঘোষ-
তুষারাবৃত দিগন্তবিস্তৃত চরাচরের মত নিষ্কলঙ্ক কবিতার পাতা
যেন যুগান্তব্যাপী মৌনতা ঘেরা মৃত ফসিলের ফরিয়াদ;
শূন্যতা নয়, অনন্তের যাচনা সে যে
শুধু শুনতে জানতে হয়।

পিকু চৌধুরী, পিএইচডি। কবি, অনুবাদক, চারুশিল্পী ও অধ্যাপক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

শঙখচিল

শঙখচিল   অসীম নীলাভ শূন্যতায় নির্ভার মেঘপুঞ্জের মত উড়ছে শঙখচিল, শিল্পিত ছন্দে পাখায় গেঁথে শূন্যতার…..