বার্তা

সুশান্ত সৎপতি
গল্প
Bengali
বার্তা

সকাল থেকে সুধাময়দার কথা মনে পড়ছে।মনে পড়ছে রাখী বৌদির কথা। বছর কুড়ি আগে ‘কালবেলা’ পত্রিকার জন্য লেখা আনতে ঘাটশিলায় প্রথম সেই যাওয়া। সুধাময়দার স্বর্ণমৃগয়া আবাসনেরA4 ফ্ল্যাট এর কলিং বেলে হাত রেখে দরদর করে ঘামছিল সুর‌ঞ্জন। তারপর এল সেই অলৌকিক মুহুর্ত, প্রিয় কবি নিজের হাতে দরজা খুলে একেবারে মুখোমুখি!কী অপূর্ব কণ্ঠস্বর! সুর‌ঞ্জনের গলাবন্ধ হয়ে যায়, তবু কোনোক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রণাম করে। সেই দেবকল্প পুরুষ তার হাত ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে যান আর বলেন-“রাখী দেখ কে এসেছে?

অমনি যিনি এগিয়ে এলেন তার দুর্গাপ্রতিমার মতো মুখ। মৃদু হেসে বললেন- “আমিই তো সুবিমল বাবুকে বলেছিলাম,এমন সুন্দর যে লেখে, সে কেমন?একবার আমাদের বাড়িতে পাঠান!”। তার পরের কথা ইতিহাস। কেমন করে সুর‌ঞ্জন সুধাময়দার নিজের ভাইয়ের অধিক হয়ে উঠল, কেমন করে খ‍্যাতিমান কবি হয়ে উঠল, তার টুকরো টুকরো স্মৃতি সারা ঘরে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াতে লাগলো। খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তবু তার মনের কোনে জমে উঠলো পিঙ্গল‌ একটা মেঘ। বন্ধু পলাশের কাছে শুনেছিল-তাদের সহপাঠী তৃণা নাকি সুধাময়দার খুব বড়ো ফ‍্যান।

ছাত্রী হয়েও বিবাহিত অধ্যাপকের প্রতি সে ক্রমশ দুর্বল হয়ে হয়ে পড়ছিল। সুরঞ্জন বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি, কেননা সুধাময়দা ও রাখীবৌদির বন্ডিং যে কত মজবুত তা সে জানে। কিন্তু একটা গুঞ্জন ক্রমশ চারপাশে ডালপালা মেলছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রিয় কবিকে নিয়ে রসালো খবর ও ব‍্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে পড়েছে দেখে তার অন্তরে যেন আগুন জ্বলে উঠল, নিজেকে অনেক বোঝাল, কারো ব‍্যক্তিগত জীবনে উঁকি ঝুঁকি দেওয়াটা অসভ্যতা। তবু শেষ পর্যন্ত একদিন কলকাতা যেতে গিয়ে ঘাটশিলায় এসে হাজির হলো। কতদিনের ঘনিষ্ঠ ,প্রিয় মানুষটি মনে হলো তাকে দেখে ভূত দেখছেন।

রাখীবৌদি বাড়িতে নেই, সেমিনারে যোগ দিতে জামসেদ পুর গেছেন। নিজের হাতে কড়া লিকার চা বানিয়ে নিয়ে কবি বসলেন অনুজকবির মুখোমুখি।চাকরি, সংসার এবং কবিতা বিষয়ে কথা বলতে বলতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল, সুরঞ্জন বুঝতে পারে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, আসলে স্বাভাবিক নয়। কিছু একটা মিসিং! সে নিজেও কিছুতেই বলতে পারছে না -তার ঘাটশিলায় আসার কারণ। কিন্তু আচমকাই সিগারেট ধরিয়ে সুধাময়দা তৃণার প্রসঙ্গে এসে পড়লেন, যা সুরঞ্জনের কাছে পুরোনো অস্বস্তির বদলে অচেনা একটা অস্বস্তিতে গিয়ে পড়া।

তৃণা গতবছর স্নাতকোত্তর বাংলা নিয়ে বিদ‍্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে তাঁর মেদিনীপুর এর বাসায় পড়তে আসা শুরু করে। প্রথম দিন একঝলক চোখাচুখি হয়ে যেতেই মাঝবয়সী অধ্যাপকের বুকের ভেতর টা ধক্ করে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন-এই বিশ্বের আর সব নারীর থেকে সে আলাদা। তবু শিক্ষকের মর্যাদা বজায় রেখে তিনি তাঁর আলোচ‍্য  পোস্ট মডার্ণ ও উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতা বিষয়ে পাঠ ও আলোচনা শুরু করলেন। প্রতি দিনের পাঠাভ‍্যাসের‌ আড়ালে মনের ভিতরে নতুন এক ঝর্ণার জন্ম হচ্ছে। চোখে চোখ পড়ে গেলে তৃণার মধ্যেও কিছু একটা হচ্ছে যা অন্য ছাত্রীদের ক্ষেত্রে ঘটছে না। একটা অপরাধ বোধ, পাপবোধ নির্জন বাসায় তাঁকে আয়নার মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। তিনি বুঝে উঠতে পারেন না কীকরবেন! কী করা উচিত! শনিবার ঘাটশিলায় ফিরে রাখীর মুখোমুখি হতে তাঁঁর ভয় করে, কে যেন তাঁর পা টেনে ধরে। ট্রেন থেকে নেমে টোটোতে চাপতে অকারণ দেরি হয়। কিছুতেই আগের মতো হাসতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না। একদা বান্ধবী, স্ত্রী তাঁর এই অসুখের কারণ জানতে চেয়ে উত্তর পাননা, কষ্ট পান,কষ্ট পেতে থাকেন। কিছুই ঘটে না, তবু গুঞ্জন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তৃণার কবিতা প্রেম, না কবি প্রেম? তা নিয়ে বন্ধুরা মস্করা করে। তৃণা পাত্তা দেয়না। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে একটি মানসক্রিয়া ঘটতে দেবনা ভাবলেও ঘটে। এতটা বলার পর সুধাময়দা কিছুক্ষণ চুপকরে থাকেন। তার পর আর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলেন-মনের মধ্যের এই তীব্র ভূমিকম্প এড়াতে টানা একমাস ছুটিতে আছি। তাঁর কাছে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। মনে মনে ঘটনার আগাগোড়া ভাবি, ভাবতে ভাবতে মনে হয়, সুধাময়দা সবটা বলেন নি। সবটা বলা হয় তো সম্ভব নয়। অন‍্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকি। বহুবছর আগে ছেড়ে দেওয়া সিগারেটের ইচ্ছাটা মাথায়  চড়ে।

প্রায় ছ মাস পর একসন্ধ‍্যায় সুরঞ্জনের হোয়াটস‌আ্যপে সুধাময়দা-“কিছুই ভালো লাগছে না! “মিনিট পাঁচ পর -“কীকরব জানি না, রাখীর সাথে তুমুল অশান্তি হয়ে গেল! “একটু পর -“বাড়ি থেকে পালাচ্ছি, স্টেশনের দিকে যাচ্ছি”। সু্রঞ্জন পাল্টা বার্তা পাঠায়-“কেন? কোথায় যাচ্ছেন?” উত্তর আসেনা।আরো একটি বার্তা আসে- “লাইন ধরে হাঁটছি, ট্রেন আসছে, এখন দূরন্ত এক্সপ্রেসের সময়। “সুরঞ্জন মরিয়া হয়ে কলিং বটনে চাপ দেয়। মোবাইল বলে-“আপনি যে নাম্বারে কল করতে চাইছেন-সেটি এখন সুইচ অফ আছে।”

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..