বাস্তুসাপ

মঈনুল হাসান
গল্প
Bengali
বাস্তুসাপ

রমিজ, ও রমিজ! কই গেলি বাপধন? আমারে ধইরা তোল। হাত-পায়ে ঝিনঝিনি লাগছে। পিঠখান তো কুঁজা হইয়া গেল আমার।

উঠানে শুয়ে ঝাপসা চোখে বৃদ্ধা মতিজান বেওয়া এদিক ওদিক তাকায়। ঘরের পেছনের চালতা বনের জংলা ঝোপে সূর্য ডুব দিয়েছে অনেকক্ষণ। পশ্চিম আকাশের সন্ধ্যালোক মুছে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে সন্ধ্যার উঠানে। মেঘের গুড়গুড় আওয়াজ শুনে তার বুকের ধড়ফড়ানি বাড়ে।

কই গেলি রমিজ? আমারে ঘরে নিয়া যা বাজান। আকাশের ভাও ভালা না। আইজ বাদল নামব আবার। রজিফা গেল কই? বউডার খালি উচাটন স্বভাব।

আকাশের খামখেয়ালিপনায় মতিজানের গলা এবার ঝনঝন করে ওঠে। ঘন অন্ধকার ভেদ করে আসা ঝিঁঝিঁর একটানা অবিশ্রান্ত ডাক তাকে আরও চঞ্চল করে তুলে। ওদিকে হাঁটুর পুরাতন ব্যথাটা চাগাড় দেয়ায় গলার আওয়াজ আরও তীব্র হয় তার। রুক্ষ সে আওয়াজ বাতাসে চাবুক মেরে যায়। অনেক ডাকাডাকি করে কারো সাড়া শব্দ না পেয়ে এক সময় তা নরম হয়ে আসে। আগ সন্ধ্যার নিভে যাওয়া নরম আলোর মতো মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে।

যন্ত্রণাদায়ক গোঙানির সুর তুলে মতিজান বেওয়া কায়ক্লেশে একমনে বিড়বিড় করে চলে। কিন্তু, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই ছেলে রমিজের। কুয়াতলার গোড়ায় বাঁধানো ঢিবিটার ওপর বসে নিবিষ্ট মনে অজু করে যায় নির্বিকার রমিজ। মতিজানের চাপা আর্তনাদ রমিজের কান পর্যন্ত আসার আগেই খানখান হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে দমকা বাতাসে। তাই বদনা থেকে পানি ঢেলে ততোধিক ধ্যানমগ্ন হয়ে আঙুল চালায় ধুলা জমে থাকা পায়ের গোড়ালিতে। হাতের বদনা কলপাড়ে রেখে মাথা মসেহ্ করে উঠে পড়ে সে। লম্বা আচকানের পকেট থেকে সাদা কিস্তিনামা টুপি বের করে বেশ পরিপাটি করে মাথায় বসিয়ে নেয়। এশার ওয়াক্ত ঘনিয়ে আসায় তার মধ্যে কিছুটা ত্রস্তভাব দেখা যায়। কাছের মসজিদ থেকে বেলাল মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনিত হতেই মতিজানের ব্যাকুল কণ্ঠ আবার শোনা যায়।

কীরে রমিজ, জবাব দেসনা ক্যান? রজিফা গ্যাছে কই? হাঁটুর বেদনায় মাগরেবের নামাজডা কাজা হইছে। এশারও আজান দিছে। আমি কি আর একা চলতে পারি? আমারে ঘরে নিয়া রাখ।

আসতাছি, বলে মায়ের কাছে আসে রমিজ। হঠাৎ ভাবে তিন কুড়ি বয়স পার হলেও মানুষটার গলার ঝাঁঝ এতটুকুন কমেনি। হোগলার চাটাইয়ে বিছানো মোটা কাঁথার ওপর বিরক্ত মুখে চিত হয়ে শুয়ে থাকে মতিজান। রমিজ দুইহাত ধরে সাবধানে টেনে তোলে তাকে।

আস্তে তোল বাজান। হাঁটুর ব্যাথাডা ভীষণ বাড়ছে। কোমরডাও ব্যথায় টনটন করতাছে।

কী দরকার ছিল বাইরে আসনের? আকাশের এই গতিকে ঘরে থাকনই ভালো।

আঁধি নামতাছে। ঘরে কুপি জ্বালন দরকার। রজিফারে ডাক দে।

রজিফা বাড়িত নাই। সে তোমার দুই নাতি লইয়া গহরডাঙি গ্যাছে সফুরারে আনতে। সফুরার শরীর ভালা না অনেকদিন। জামাইডারও কোনো খোঁজ নাই। মনটা বড়ই অস্থির হইয়া আছে।

মনে নাইরে বাজান। আইজকাল কিছুই মনে রাখতে পারি না। কিছুই মনে থাকে না। কই, আমারে তো কিছু কইয়া যায় নাই।

মা, কিছুই মনে নাই তোমার। দুপুরে রওনা দেওনের আগে রজিফাই তো তোমারে বিছনা পাইতা দিল উঠানে। আমার দেরি হইতাছে। দোরে শক্ত কইরা খিল দিয়া রাখো।

কাঠের তক্তপোশের মোটা তেলচিটে কাঁথার ওপর শুইয়ে দিয়ে নীরবে প্রস্থান করে রমিজ।

দুই

রমিজের নিজের ওপর অভিমান বা অভিযোগ-অনুযোগের মাত্রাটা অচল পাহাড়ের মতো বিশাল। তবে মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তিতে কোনো খাদ নেই তার। মতিজানের প্রতি খেদোক্তি প্রকাশ তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। মসজিদ-মক্তব আর মায়ের ছোট্ট ঘরখানা তার একান্ত আপন জগৎ। ঘরের ছোট্ট চতুষ্কোণে মায়ের নির্বাসিত জগৎ দেখে তার আত্মগ্লানি বাড়ে। মাঝে মাঝে তাই সেবা শুশ্রূষা করে পরকালের পুণ্য কামায় সে। মাকে আজকাল তার বড় অস্থির আলুথালু মনে হয়। সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সে মায়ের প্রতি যে খেয়াল রাখা দরকার তা যে সবসময় হয় না তা রমিজ জানে। অসুস্থ মতিজানের এই যন্ত্রণা তার অন্তর্জ্বালা বাড়ায়। তীব্রভাবে দহন করতে থাকে তার মনের ভেতরের পুরা জগৎটা।

রজিফা বিয়ের পর থেকেই কেমন জানি খেয়ালি স্বভাবের। বাবা মরেছে সেই কোন কালে। তার অস্পষ্ট চেহারাও আর মনে ভাসে না। সেই থেকে রমিজের যেন চড়কের পিঠ। আজকাল সবই গায়ে সয়ে গেছে তার। রমিজের যাপিত জীবনের টানাপড়েনে অন্ধকার ছাড়া আলোর রেখা খুব কমই ফুটেছে। তার মনের অতল গহ্বরে আনন্দের সঞ্চয় খুবই ক্ষীণ। বিত্ত-বৈভব, সংসার, আকাঙ্ক্ষা সব কিছু নিয়ে তার গ্লানি উপচে পড়ার মতো। চকমকি আশার স্রোতে সে ভাসেনি কোনোদিন। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনের অনেকটা পথ সংসারকে আগলে ধরে এতদূর পর্যন্ত এনেছে। তার এই প্রবল সংগ্রামে সে একাই তো যোদ্ধা। এই ভেবে শুধু কিছুটা গর্ব হয় তার। নিজেই নিজেকে জীবনযুদ্ধের সৈনিকের স্বীকৃতি দিয়ে আত্মসুখ লাভ করে।

বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমি-জিরাত তাদের একমাত্র সহায় সম্বল। জীবনে জৌলুস না থাকলেও মা, বউ আর দুই সন্তানকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার দিব্যি চলে যায় কোনোমতে। সঙ্গতি সামর্থ্য অনুযায়ী একমাত্র মেয়ে সফুরাকেও বিয়ে দিয়েছে বেশ ধুমধাম করে। জীবন নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। চাওয়ারও কিছু নেই কারও কাছে।

সংসারের ঘানি টেনে রমিজ আজ ভীষণ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। তার আজ ছুটি চাই। যে বয়সে সবাই আমোদ করে বেড়ায় তখন থেকেই সে কাঁধে নিয়েছে দায়িত্বের বোঝা। দুর্বহ এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিলিয়ে দিয়েছে অকাতরে। আজ তার অবসর চাই। নিজের মতো অবসর।

সাত পাঁচ এমন নানান কথা ভেবে মসজিদের দিকে পা বাড়ায় সে। গুড়িগুড়ি অলস বৃষ্টি তার চিন্তায় ছেদ ঘটায়। মসজিদের কাছাকাছি আসতেই দেখে সবাই দাঁড়িয়ে গেছে কাতারে। রমিজ শেষ কাতারে দাঁড়িয়ে ফরজটুকু আদায় করে বের হয়ে আসে।

মায়ের শারীরিক কষ্ট দেখে আজ ঠিক এবাদতে মন বসে না তার। অন্যদিন বেশ সময় নিয়ে নামাজ আদায় করলেও আজ যেন তড়িঘড়ি করেই বের হয়ে আসে সে। অন্ধকারে হাতের টর্চ থেকে আলো ফেলে এঁদো কাদায় বাড়ির পথ চিনে নেয় রমিজ। অবারিত আকাশের মতো জটিল ভাবনার জাল তার মাথায় অবিরাম পাক খায়। সবকিছুই নাকি প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বাঁধা। প্রকৃতিও কি সব সময় সেই নিয়ম মেনে চলে? বড় বিচিত্র মনে হয় তার সবকিছু। নিয়তির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিজেকেই তিরস্কার জানায় রমিজ।

বুকের পাঁজরের গভীরতম কোণে হঠাৎ একটা চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করে। ঝাপসা হয়ে আসা চোখের বিন্দু বিন্দু নোনা জলের সাথে বৃষ্টির ছাঁট মিলেমিশে ধুয়ে যায়। বিদ্যুৎ চমকের হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে দ্বিধান্বিত মুখ লুকানোর চেষ্টা করে সে। যে মুখে বৃদ্ধা মতিজানের দিনভর যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের একটা ছায়া প্রতিবিম্বিত হয়। একসময় টর্চের গোল আলোর নিশানা তাকে বাড়ির কাছাকাছি নিয়ে যায়।

উঠানের কাছে পা রাখতেই চমকে ওঠে রমিজ। মতিজানের ঘরের বাইরের মাটির দাওয়ায় কুণ্ডলী পাকিয়ে কী যেন একটা বসে আছে। খিল দেয়া দরজার বন্ধ কপাটের বাইরের চৌকাঠের ওপর নির্বিঘ্নে জলকাদা ছেড়ে বসে আছে ওটা। বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না তার।

একটা হলদে কালো বাস্তুসাপ। চকচক করছে গাটা। তিন হাত লম্বা শরীরে দীর্ঘ বয়সের ছাপ স্পষ্ট। অনেক আগে মায়ের কাছে শুনেছিল তাদের পুরাতন ভিটায় বহু বছর ধরে বসত ছিল একজোড়া বাস্তুসাপের। কখনও কাউকে ক্ষতি করেছে এমনটা শোনেনি। আজ স্বচক্ষে এখানে দেখে চমকে উঠেছে হঠাৎ। বংশ পরম্পরায় পাহারাদারের মতো এখনো আগলে রেখেছে মতিজানের সংসার।

অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকানো দড়ির মতো সাপটাকে দেখে রমিজ প্রথমে চমকে গেলেও ঠিক পরক্ষণেই তার প্রতি একটা গভীর মায়া উদয় হয়। মায়ের কথাই সত্যি। এ যে বাপকেলে সম্পত্তি। বাড়িতে বাস্তুসাপ থাকলে অন্য কোনো বিষধর কালসাপ বাড়িতে প্রবেশ করে গৃহস্থের অনিষ্ট সাধন করতে পারে না। তাই গৃহস্থের কল্যাণের কথা ভেবে রমিজ কিছুক্ষণ থামে। দু দণ্ড ভেবে নেয় মতিজানের ঘরের দিকে এগিয়ে যাবে কিনা? কিন্তু, হঠাৎ পায়ের আওয়াজে জল-কাদার অসতর্ক শব্দে ঘরের কোল থেকে গড়িয়ে নেমে যায় সাপটা। এঁকেবেঁকে করমচার অন্ধকার ঝোপের দিকে এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানি শুরু হয়। বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ার সাথে সাথে থেমে থেমে শুরু হয় গর্জন। চমকে চমকে ওঠা লুকানো আলোয় রমিজ স্পষ্ট দেখতে পায় হলদে কালো একটা খোলস পড়ে আছে। রমিজ ভাবে, বাস্তুসাপও খোলস বদল করে। অথচ কত শত বিপদের ধাক্কা সামলে সে তার পুরানো খোলসেই এখনও দিব্যি বেঁচে-বর্তে আছে। খোলসটা বদল করতে পারলে অনেক শান্তি পেতো সে। কিন্তু, রমিজের আর খোলস বদলানো হয় না। মতিজানের ঘরের দরজার কপাট বন্ধ দেখে সেও নীরবে তার ঘরে প্রবেশ করে একাকী বাস্তুসাপটার মতো। বিষণ্ন ব্যথাতুর মনে বাস্তুসাপের মতো খোলস বদলের অলীক স্বপ্ন তাকে কিছু সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করে রাখে।

নিঃসঙ্গ মতিজান জানালার শিক দিয়ে দৃষ্টি মেলে দেয় বাইরে। একটানা ঝমঝম বৃষ্টি আর শোঁ শোঁ বাতাসের দাপটে কান পাতা দায়। বাতাসের প্রবল ঘূর্ণি টের পায় সে ঘরের গণ্ডি থেকে। বিক্ষুব্ধ প্রকৃতি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে চলে করুণাহীনভাবে। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা বাইরের জগতের জমাট অন্ধকারের সাথে তার বুকের ব্যথার গহ্বর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আবছা চোখেও দেখতে পায় জানালার ধারের বুড়ো আম গাছটা। বাতাসের সাথে অবিরাম যুদ্ধের এক টালমাটাল অবস্থা তার শাখায় শাখায়। এ যেন তার নিজ হাতে গড়া সংসারের এক ক্ষয়িষ্ণু প্রতিচ্ছবি।

কোটরে বসা হুতোম প্যাঁচার করুণ বিরহী ডাক থেকে থেকে তার কানে এসে লাগে। সে ডাকের মধ্যে এক অশুভ ইঙ্গিত খুঁজে পায় মতিজান। বাড়ির পেছনের সুপারি, গাব আর চালতা গাছের বাগিচা থেকে তক্ষকটা ডেকে চলে একটানা। তকÑখক, তকÑখক, তকÑখক।

অশুভ সঙ্কেতের এসব চিহ্নগুলো তার বুকে কাঁপন ধরিয়ে নিঃসঙ্গতার সময়কে প্রলম্বিত করে শুধু। বাইরের প্রকৃতির উত্তুঙ্গ দাপাদাপি আর নিজের সাথে নিরন্তর যুদ্ধ কখন যে তাকে ক্লান্ত করে তোলে মতিজান তা নিজেও জানে না। চেতন জগতের বাস্তবতা থেকে সে হারিয়ে যায় এক অচেনা অচেতন জগতে। অসীম থেকে অতলে মতিজানের মনের বিস্তৃত আকাশের গায়ে নীলচে গাঢ় অন্ধকার খেলা করে বেড়ায়। অচেতন সে বুকের গভীরে কষ্টের এক সুনিপুণ দগদগে ক্ষত মিশে থাকে নির্বিকার। ঘোর লাগা সময়ের প্রবল ধাঁধার মাঝখানে বুকের চাপা দীর্ঘশ্বাস সে শুনতে পায় না। তবে রাতজাগা তক্ষকটার ক্লান্তিহীন সে অশুভ ডাক রাতের শেষ প্রহরেও ঘুমের ঘোরে মতিজান স্পষ্ট শুনতে পায়।

তিন

মতিজানের স্বভাবটা কোদালের মতো। সব সময় সবাইকে শুধু বুকেই টানে। আশপড়শির কারও সাথেই তার কোনো কলহ-বিবাদ নেই। রজিফা না থাকায় সকাল থেকেই তার কেমন যেন একা একা লাগে। বুকের শূন্যতার মতো খাঁখাঁ করে বাড়িটা।

গতরাতের ঝুম বৃষ্টির পর আকাশটা আজ বেশ ঝকঝকে। শেষ রাত্রির দিকে গভীর ঘুম হওয়ায় মতিজানের শরীরের ধকল, চোখ-মুখের ক্লান্তির ছাপ নিভে গেছে অনেকটা। তারপরও রমিজ সকালে একবার বলছিল, মা, রজিফারে নিয়া আসি আজকে। তোমার যেহেতু শরীরের গতিক খারাপ।

না, থাক। কুটুমবাড়ি গ্যাছে। দুই একটা দিন বেড়াইয়া আসুক। সফুরা পোয়াতি। ওর ভালোমন্দ দেখা দরকার।

কিন্তু, এদিকে যে তোমার মরণ দশা।

তা কিছু হইব না বাজান। তুই বাইরে যাওনের সময় সকিনার মারে খবর দিয়া যাইস। সে আইসা আমাগো দুইজনার একটা ব্যবস্থা কইরা দিব।

মতিজানের নিষেধের কারণে রমিজ আর গহরডাঙির ওমুখো হয়নি। রাতের মেঘাচ্ছন্ন ভাব কেটে গিয়ে আকাশের গায়ে হালকা রোদ উঠেছে আজ। যে রোদের পিঠে সে নতুন আশার বীজ বুনতে চায় আবার নতুন করে।

মতিজান বেওয়ার হাঁপের টান অনেক পুরানো। রাতভর এ যন্ত্রণার আদ্যোপান্ত কানে যেতেই দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে আসে এ বাড়ির পুরানো লোক সকিনার মা। সে আসার পর রমিজ অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করে। কুয়াতলায় বসে সকিনার মা গৃহস্থালির কাজ সামলাতে থাকে। আর মতিজান তাকে সঙ্গ দেয় শুধু। সকাল থেকে শরীরটা অনেক হালকা মনে হয় তার।

বুঝলা সকিনার মা; কাইল রাতের কথা চিন্তা করলে বুকখান খালি ধড়ফড় করে। কাজ ফেলে সকিনার মা নিরুত্তর চেয়ে থাকে সে মুখের দিকে।

আক্ষেপের সুরে মতিজান আবার বলে যায়, আমিও তো এই বাড়ির বউ আছিলাম। কখনও কারও লগে মুখ ব্যাজার কইরা দুইটা কথা কইছি এমুন মনে পড়ে না। কিন্তু, আমার বউডা আমার মতো হইল না। সে কেমুন দূরে দূরে থাকে। কয়দিন পর তারও তো ছেলের বউ আইব। কত দেইখা শুইনা রজিফারে পছন্দ কইরা আনছিলাম আমি। সবই আমার কপাল!

খামাখা চিন্তা কইরো না চাচী। মানিক রতনের বউ আইলে সব ঠিক হইয়া যাইব।

কিন্তু, এই আশ্বাসে গলে যায় না সে। তার দুই নাতি কবে বড় হবে আর সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে সেই ভরসা সে এখন করে না। সে আশায় গুড়ে বালি। নৈরাশ্যের উল্টাস্রোত তাকে প্রবলভাবে ভাটির দিকে টানে।

মতিজান বেওয়ার শরীরে এখন নানান ব্যাধি বসত গড়েছে। হাড় ক্ষয়ে ক্ষয়ে কোমর আর হাঁটুর গিঁটে গিঁটে মরণব্যথা ওঠে প্রত্যেক অমাবস্যা পূর্ণিমায়। আশ্বিন বৈশাখে ঝড় আসার আগে যেমন বাতাসের ঘূর্ণি লাগে মতিজানের পুরানো হাঁপের টানে ঠিক তেমনি শোঁ শোঁ আওয়াজ আসে। একেবারে যমে মানুষে টানাটানি অবস্থা। শরীরে বল কমে এসেছে। চোখের দৃষ্টি হয়েছে ঝাপসা যার গণ্ডি তার ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ। মৃত্যুচিন্তায় কাতর হওয়া মতিজান রমিজের বাবার ভাঙা কবরের পাশে নতুন বসতের চিন্তা করে যায় এখন। দিনের নিয়মে যে দিন চলে যায় সেখানে তার জন্য খুব সামান্যই লেখা থাকে।

চার

ছোট্ট পুতুলের মতো রজিফা যখন রমিজের বউ হয়ে আসে গভীর আনন্দে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল তাকে। দূর সম্পর্কের জ্ঞাতি ভাইয়ের মেয়ে রজিফা। তাই প্রথম থেকে আহ্লাদ ছিল অন্যরকম। রক্তের সম্পর্ক হোক বা না হোক নিজের দিকের আত্মীয়ের প্রতি মতিজান বরাবর একপেশে। তবে তার লাগামহীন কথার বাণ অচিরেই কাল হয় সকলের।

মতিজানের নিজের হাতে গড়া কতকালের সংসার। রজিফার হঠাৎ আগমনে সম্পর্কের আয়নায় একটু একটু করে চিড় ধরতে থাকে। সে যে একজন নির্লোভ, নির্বিবাদী মানুষ আজ অবধি তা পরিষ্কার হলো না বউ রজিফার কাছে। এসব ভেবে ভেবে কোনো কূল কিনারা পায় না সে। তার ওপর রমিজের বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে তার কেমন যেন দিগ্বিদিক লাগে, সবকিছু শূন্য মনে হয়।

সকিনার মা, রমিজের বাপ নাই কতকাল হইছে। আল্লাহ যে কবে আমারে নিব।

অলক্ষুণা কথা কইয়োনা চাচী; বউ নাই তো কী হইছে। আমারে সময়ে অসময়ে ডাকবা। দুপুরের সব রান্ধন কইরা দিতাছি। আমারে আবার সন্ধ্যায় ডাইকো। খবর পাঠাইলেই আমি চইলা আসুম।

বেলা গড়িয়ে মধ্যাহ্ন আসে। মতিজান আবার উঠানে বসে থাকে একা। তার মনোজগতে চিন্তার চক্র ঘুরপাক খায় একইভাবে একই নিয়মে নিত্যদিনের মতো। বয়সের কারণে স্মৃতিযন্ত্রটার ক্ষয় হয়েছে অনেক। সেও আর আগের মতো হাতড়ে যৌবনের সুখস্মৃতিগুলো খুঁজে আনতে পারে না। আবছা স্মৃতি আবছা দৃষ্টি সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বাঁধা পড়ে গেছে এ বাড়ির প্রাচীনতম বাস্তুসাপটার মতো। চলৎশক্তিহীন মতিজান ভেবে ভেবে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

সব কাজ শেষ করে সকিনার মা চলে যায়। ওদিকে রমিজ বাড়ি ফিরলে মতিজানের সাথে খাবার খেতে বসে একসাথে।

তোরে একখান কথা কই রমিজ।

কী কইবা মা?

আমাগো ঘরের পেছনে যেইখানে ঘন গাব-চালতার জংলা; তোর বাপের কবরখান ওইখানেই বান্ধা। ভাঙা কবরখান আগের পুরাতন ভিটার লগেই। ওইখানে দুইটা বাস্তুসাপ আছিল। তাগোরে আমি ভালা কইরাই চিনতাম।

কী হইছে অখন?

আমি বউ হইয়া আসনের আগেই তোর বাপজান এইখানে নতুন ভিটা বান্ধে। মানুষটার কী যে সখ আছিল নতুন ভিটায় নতুন ঘর বান্ধনের। নতুন বউ লইয়া সংসার পাতনের। নতুন মানুষের লগে সাপ দুইটাও বসত গড়ে এইখানে। অনেক আগের কথা। তখন তুই অনেক ছোড ছিলি। একবার ভয়ে না বুইঝা একটার গায়ে দা দিয়া কোপ দিছিলাম। তোর বাপ আমারে অনেক বকা দিছিল। আমি কি আর জানি ওইগুলান বাস্তুসাপ? কারুর ক্ষতি করে না।

রমিজ খাওয়া থামিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে মায়ের দিকে। মায়ের সে চোখ আনন্দ-খুশিতে ছলছল করে। খইয়ের মতো কথা ফুটে মতিজানের ভাঙাচোরা মুখটায়।

কিন্তু, আমি অখন জানি ওইগুলার বংশ রইয়া গেছে। অখনও মাঝে মাঝে দেখি। তোর বাপের কবরটা যেইখানে, ওইখানেই মাঝে মাঝে দেখি। আমাগো ঘরের কোণায় লেবুগাছের তলায় খোলস ছাড়ছে একটা। কোনো বিপদের আভাস পাইলে আমি খালি তাগোরে দেখি। কখনও ওইগুলার ক্ষতি করিস না বাজান। আমার মনে কয় আমাগো বিপদ আসতাছে। আমাগো সাবধান হওয়া দরকার বাপধন।

গতকাইল রাতে মসজিদ থিকা আসনের পর তোমার দরজার সামনে দেখছিলাম একটা। চৌকাঠে বসা। আমারে দেইখা সরসর কইরা নাইমা গেল।

আমারও এমনটা মনে হইছে। তাই তো আজ তোরে কইলাম। কিন্তু, খবরদার দেখিস কোনো বিপদ যেন না হয়।

ঠিক আছে মা; তুমি কোনো চিন্তা কইরো না।

রমিজ মাদুর ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মতিজান থালার দিকে তাকিয়ে একা বসে থাকে। দু এক লোকমা মুখে পুরে গলাধঃকরণের চেষ্টা করে। তারপর রমিজকে ডেকে বলে, আমার শরীলডা কেমুন জানি লাগে রমিজ।

সকিনার মারে ডাক দেই মা?

কাউরে ডাকতে হইব না। কাইল রজিফারে আনতে খবর পাঠাইস বাপ। মনটা কেমুন অস্থির লাগতাছে।

মায়ের কথায় সায় দিয়ে রমিজ ঘর ছেড়ে উঠানে বেরিয়ে আসে। মতিজান তারপর আকাশ পাতাল ভাবনা নিয়ে বসে। অজানা অমঙ্গল আশঙ্কায় সংসারের কল্যাণ নিয়ে ভাবে। রমিজের কথা ভাবে; রজিফার কথা ভাবে। সফুরা, মানিক, রতন সকলের কথা ভাবে। তবে তার মনের একটা কোণ জুড়ে থাকে সদ্য নির্মোকহীন বাস্তুসাপটা। যে কিনা ভবিতব্য কোনো অশনির বাজনা বাজিয়ে নিঃশব্দে বিচরণ করে যায় তার মনের উঠানে।

পাঁচ

রজিফার সাথে মতিজানের মনের দূরত্ব অনেক। এই অমিল দিন-রাত্রির মতো, যা কোনো কিছু দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কোনো মাপকাঠিও নেই তা পরিমাপের। আজ এত বছর কেটে গেলো রজিফা বউ হয়ে এসেছে, তারপরও মতিজানের সাথে তার মনোবিবাদ পুরানো হয় না। কোনো কিছুতেই আর ছেড়ে কথা বলে না রজিফা। তার কথার প্রতিটি বাণ মতিজানের চেয়েও রমিজের বুকে এসে লাগে।

দ্বন্দ্বের এই গভীরতা যতটা না মনস্তাত্ত্বিক, তার চেয়েও বেশি সবকিছু দখল বা নিজের মতো করে আগলে রাখার একান্ত চেষ্টা। দুজনের এই সহজাত আচরণ দূর থেকে রমিজকে খোলসের মধ্যে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করে রাখে। শতবর্ষী কাছিমের মতো মুখ লুকিয়ে রাখতে প্রলুব্ধ করে। রজিফা মনে করে এটা তার স্বামীর ভিটা। এখানে তার কর্তৃত্বই সব। মতিজানও তার মতো এক সময় এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছিল। তাই রজিফার আগমনে একদিন যে সাম্রাজ্যে চিড় ধরেছিল আসলে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত সেদিন থেকেই।

নৈমিত্তিক দ্বন্দ্বের মাঝে রমিজ বরাবর নির্লিপ্ত থাকে। তবে মায়ের প্রতি চুল পরিমাণ অবহেলা তার আত্মগ্লানি বাড়িয়ে দেয় শতগুণে। স্বামীহীন নিঃসঙ্গ মতিজানের বুকের জগদ্দল পাথর টলাবার শক্তি ও সাহস কোনোটাই তার নেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও একদিন কী শক্ত মনের সংগ্রামী ছিল মানুষটা। তাই রজিফাকেই নানানভাবে বুঝ দিয়ে খোলস ছাড়বার বৃথা চেষ্টায় মগ্ন হয়। রমিজের আপ্রাণ চেষ্টার আড়ালে নির্বিষ সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে রজিফা। একসময় শক্তি হারিয়ে নিজের মধ্যেই মিইয়ে যায় শাপ-শাপান্তের কথা ভেবে।

দিনশেষে রজিফা বুঝে নেয় শাশুড়ি তাকে অভিশাপ দিয়ে দুটা কথা বললেও শাপ মোচনের কৌশল সে জানে। রমিজকে হাত করে আবার কাছ ঘেঁষে মতিজানের। রমিজ যে বৃদ্ধার আশা ভরসার একমাত্র অবলম্বন। তাকে ঘিরেই তার সংসারের বিস্তৃতি, অকপট স্নেহের আধিপত্য। তাই রমিজের সন্তুষ্টিই সব। দূর থেকে এসব দেখে মতিজান মিটমিট করে হাসে।

একসময় সংসারের এসব অদ্ভুত চক্রের কথা ভেবে তার মাথায় ঝিম ধরে আসে। তারপরও সে অপেক্ষা করে রজিফার আসার আশায়। লোহার গরাদের দিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে তাদের আগমন পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে সে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। মতিজান জানে রজিফা আজ আসবে না। তার ঝাপসা চোখ অজান্তেই অস্থির হয়ে খুঁজে বেড়ায় তাদের। বাড়িটা কেমন খালি খালি লাগে। সাঁঝবাতির আলোয় তার আদরের দুই নাতি মানিক আর রতনের উচ্চস্বরে পড়ার আওয়াজ নেই আজ। দুই নাতি তার খুব নেওটা হয়েছে। সারাদিন দাদী, দাদী বলে বাড়ি মাথায় করে রাখে। এসব দেখেও রজিফার খালি ঈর্ষা লাগে। যার আদি অন্ত খুঁজে পায় না মতিজান।

রাতে নামাজ থেকে ফিরে মতিজানের হাঁটুর ব্যথায় মালিশ করে দেয় রমিজ। কিছুটা আরাম হয় তার। রমিজ চলে যাবার পর ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে নামে সে। ফিনিক ফোটা সাদা আলোয় মাখামাখি চারপাশ। হালকা নরম সে জোছনা গায়ে মেখে হেঁটে বেড়ায় মতিজান। ওদিকে বনের জংলা হাওয়া ছাতিম ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধটা বারবার তাড়িয়ে নিয়ে আসে। তাড়িয়ে নিয়ে আসে রমিজের বাবার হারিয়ে যাওয়া খণ্ড খণ্ড স্মৃতিগুলো। তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠলেও রমিজের বাবার বড়ই পছন্দ ছিল এ সুবাস। এদিকে সাদা জোছনার ধবধবে আলোয় সাপটা বেরিয়ে পড়েছে আবার। দূর থেকে মতিজানের সঙ্গী হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায় ওটা।

সে কতকাল আগের কথা। রমিজের বাবার কথা আবছা মনে পড়ে তার। বড় চালতা গাছের নিচের ঘন ঝোপ-ঝাড়ের মাঝখান দিয়ে ভালো করে ঠাওর করলে মানুষটার ভাঙা কবর দেখা যায়। তার ছানিপড়া দৃষ্টি ততদূর পর্যন্ত না গেলেও ওই কবরখানাই তার সান্ত্বনা। ঘরের পেছনের পুরানো সে কবরখানা থেকে মতিজান বেঁচে থাকার ভরসা পায়। আজ এসব কথা ভেবে ভেবে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।

বিষধর কালসাপ সহজে ফণা তুলে না। যখন তখন ফোঁস করে ছোবল মারতে চায় না কাউকে। অথচ তার চারপাশের আপন মানুষগুলোই হিংসার জাল বিছিয়ে দংশন করতে চায় তাকে। নির্বিষ বোবা প্রাণির মাঝে ভরসার যে অদৃশ্য আশ্রয় খুঁজে পায় ক’জনইবা তার খোঁজ রাখে? সে জানে দরজার কপাট বন্ধ করে দেয়ার পরই সাপটা আবার দাওয়ায় উঠে শুয়ে থাকবে। ভরা জোছনায় আগেও দেখেছে সে। নিশুতি রাতের গভীর একাকীত্বের মাঝে তারপরও ভেতরে ভেতরে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করে মতিজান।

বাইরে সাদা জোছনার ঢল নামে। বিকালের বৃষ্টির পর মেঘের আনাগোনা কেটে গিয়ে আকাশ ফর্সা হয়েছে অনেকটা। রাত বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টিধোয়া জোছনার আলো হয়েছে আরো ঝকঝকে। পেছনের জঙ্গল থেকে আসা ছাতিম ফুলের তীব্র গন্ধমাখা বাতাস মতিজানকে নেশাতুর করে দেয়। উঠান ছাপিয়ে মনের গোপন কুঠুরিগুলো ভেসে যায় উৎকট ঝাঁঝালো সে গন্ধে। রমিজের বাবার অদৃশ্য স্পর্শ-গন্ধ-সুখ মনে করে শরীর মন সবকিছু থরথর করে কাঁপতে থাকে তার।

অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসে না মতিজানের। আজকাল বাস্তুসাপটার মতো সময় জ্ঞানের কোনো হুঁশ থাকে না। যখন তখন বেরিয়ে পড়তে মন চায় তার। হালকা বাতাসে জানালার কপাটগুলো নড়ছে থেকে থেকে। ভাঙা কপাটের শিকলের টুংটাং আওয়াজ শুনতে শুনতে শেষ রাত্রির দিকে মতিজানের গভীর ঘুম আসে।

ছয়

সফুরার শ্বশুরবাড়ি পাশের গহরডাঙি গ্রামে। সেখান থেকে তার সঙ্গিন অবস্থার খবর আসার সাথে সাথে উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে রজিফা। ক’দিন থেকেই তার মন বেশ অস্থির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু, অসুস্থ শাশুড়িকে রেখে যেতে মন সায় দেয় না একদম। তবে সফুরার শ্বশুরের জরুরি চিঠি পেয়ে রমিজ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রজিফাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

বছর সাতেক আগে বেশ ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল রমিজ। বছর না ঘুরতে সন্তান আগমনের সংবাদে দুই পরিবারে আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু, সে সন্তান আর পৃথিবীর আলো দেখেনি। মাঝখানে অনেক বছর পার হয়ে যায়। গাঁয়ের লোকে অনেকেই বলাবলি করেছিল সফুরা কাকবন্ধ্যা। কিন্তু, সে সব মিথ্যা করে দিয়ে সে এখন আবার সন্তান জন্মের অপেক্ষায়। তাই নতুন আশার প্রদীপকে নিয়ে সবাই আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।

সিন্দুরকাঠি গ্রাম থেকে গহরডাঙির পথ পাঁচ মাইলের বেশি নয়। দুপুরে রওনা দিয়ে রজিফাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেদিন সন্ধ্যা লেগে গিয়েছিল। সফুরাকে প্রথম দেখে আঁতকে উঠেছিল রজিফা। চোখে মুখে অজানা আতঙ্কের নীলচে কালো ছাপ। চোখের নিচে কালির ছোপ ছোপ দাগ। এ কোন সফুরাকে দেখছে সে? নিজের ও গর্ভজ সন্তানের এ সময় যে যত্ন আত্তির প্রয়োজন তার যে ছিটেফোঁটাও পড়েনি তা গর্ভিণী সফুরাকে দেখলেই বুঝা যায়। পরনের এলোমেলো বসনের ভাঁজ ঠেলে যে উঁচু পেট বেরিয়ে আছে তা দেখে মনে খুশির বান ডাকলেও চিন্তাগ্রস্ত হয় সে। প্রবাসে স্বামীর খোঁজ নেই মাস খানেক ধরে। দুই ভুবনের দুটি মানুষকে চিন্তায় ঠাঁই দিয়ে নিজের কথাই ভুলে গেছে সফুরা। পাহাড়সমান উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত সফুরা রজিফাকে দেখে আশার ডাঙা খুঁজে পায়।

ক’দিন থেকেই সফুরার ঘন ঘন প্রসব বেদনা উঠছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠা এ যন্ত্রণায় আনন্দ ও শঙ্কা দুইই লুকিয়ে আছে। সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে আসায় শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দাবী করে তাকে যেন নিয়ে যাওয়া হয়। রজিফা এ কথায় সম্মতি দিলে সফুরা নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করে নেয়। দীর্ঘ ব্যবধানের পর আনন্দের এতখানি ধকল সে সইতে পারবে কিনা সে ভয়ও তাকে আঁকড়ে ধরে তীব্রভাবে।

সফুরার শ্বশুরবাড়িতে দিনে দিনে তিনদিন কেটে গেল রজিফাদের। গতকাল রাতও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটেছিল তাদের। আজ রাতটা কোনোমতে কেটে গেলে কালই ফিরে যাবে এমনটাই নিয়ত আছে তার। মাটির রাস্তায় এক হাঁটু জল-কাদা ভেঙে আসায় এমনিতেই বেশ কাহিল হয়ে আছে শরীরটা। তাছাড়া অনেকদিন বাদে বেয়ানবাড়ির খাতির যত্নের ধকল বাড়তি পাওনা হিসেবে তো আছেই।

কুটুমবাড়ির লোকের পীড়াপীড়িতে তিনদিন থেকে গেলেও তার মন পড়ে থাকে স্বামীর ভিটায়। সে বরাবরই ওরকম। নিজের রক্তের সম্পর্ক ছাড়া পাড়ার লোক কিংবা অন্যান্য দূর আত্মীয়ের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলে। কেমন যেন আলগা স্বভাবের। সফুরার শ্বশুর বাড়ির লোকজন এটা সেটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও সহজে মন গলে না রজিফার। এই সমাদরে উলটা তিতিবিরক্ত হয় সে। সফুরাকে নিয়ে পরদিন ফিরে যাবে তাই কোনোমতে রাত পোহানোর অপেক্ষা।

কাকভোরে উঠে নামাজের চৌকিতে তসবিহ নিয়ে বসে রজিফা। দখিনের ফুরফুরে হাওয়া ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতরে। বুক ভরে নিশ্বাস নেয় সে অনেকদিন পর। রাতে সফুরার ছটফটানিতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি তার। মনের ভেতর শুধু কুডাক ভেসে ওঠে তার। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি দেয় সফুরার ঘরের দিকে। জানালার শিক ধরে সোহাগি চোখে চেয়ে থাকে সফুরার মায়াবী মুখখানার উপর। যে মুখে প্রসবপূর্ব যন্ত্রণার পৌনঃপুনিক মহড়ার একটা গভীর ক্লান্তি লেগে থাকে।

সাত

গর্ভিণী সফুরাকে নিয়ে রজিফা যখন রমিজের উঠানে নামে তখন সন্ধ্যা লেগে যায়। তবে গোধূলি সন্ধ্যার মুখে রাত্রির নেকাব লাগেনি তখনও। উঠানে পা দিতেই সফুরা আর টাল সামলাতে পারে না। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে তার। দীর্ঘ যাত্রাপথের ভোগান্তি আর থেমে থেমে ওঠা প্রসব বেদনার ধকল তাকে একেবারে কাবু করে ফেলে।

নয় মাসের গর্ভিণী সফুরা তার শরীর আর অনাগত সন্তানের সাথে যুদ্ধ করে করে সর্বস্ব সমর্পণ করে দেয়। সকিনার মা দৌড়ে এসে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নেয় তাকে। চৌকির উপর শুইয়ে দিতেই সফুরার অস্ফুট জড়ানো কণ্ঠ শোনা যায়; মা, দাদীজানরে ডাকো। আমার কেমন জানি ভয় লাগতাছে। আমার সময় হইছে। তাড়াতাড়ি ডাকো।

হতবুদ্ধি রজিফা সফুরার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। নিষ্ফল সে চেষ্টায় যন্ত্রণাকাতর সফুরার ছটফটানি এক দণ্ডও থামে না। বরং, আরও বেড়ে যায়। রুদ্র আকাশের আসন্ন তুমুল তাণ্ডব ছোট্ট ঘরখানায় ঘনীভূত হতে থাকে ক্রমাগত। এক নিমিষেই সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে শান্ত হওয়ার বাহানা খোঁজে সে। ওদিকে সকিনার মা অনবরত মাথায় পানি ঢেলে বলতে থাকে, চাচীরে ডাকো রজিফা; রমিজরে তাড়াতাড়ি খবর দাও। সফুরার ব্যথা উঠছে। কিন্তু, রজিফা বোধ-বুদ্ধিহীন অসাড় হয়ে যায়। আগের মতোই নিশ্চুপ বসে থাকে।

সিন্দুরকাঠি গ্রামের রমিজের বাবার প্রাচীনতম ভিটায় কয়েক যুগ আগে আসা যে নতুন মানুষটি এখনও বেঁচে আছে ক্ষয়ে ক্ষয়ে, তার ওপর সফুরার অগাধ আস্থা রজিফাকে হতবুদ্ধি করে দেয়। অগাধ ভরসার শক্ত খোলসের মধ্যে রজিফার নমনীয় সহজাত ঈর্ষা কোনো তল খুঁজে পায় না অথবা সেই কঠিন আবরণ ভেদ করে বের হতে পারে না। সংসারের মায়ার বন্ধনের বিশাল বিস্তারের মধ্যে রজিফার ছোট ছোট বাসনাগুলো ছোট্ট ডিঙি নৌকার মতো ভাসতে থাকে। তাই সে আজ মুখ লুকাবার চেষ্টায় নির্বাক নিশ্চল কাঠের মূর্তির মতো চৌকির একপাশে বসে থাকে।

বাইরে বৃষ্টির মধ্যেই বিচলিত রমিজ তসবিহ হাতে উঠানের এ মাথা ও মাথা পায়চারি করে যায়। নিচু স্বরে দোয়া দরুদ পাঠ করে যায় চিন্তাগ্রস্ত মুখে। সকল মুশকিল আসানের জন্য সর্বজ্ঞাত স্র্রষ্টাকে ডেকে যায় অনর্গল।

মানিক ও রতন এ সঙ্কটের মর্ম উপলব্ধি করতে না পেরে শূন্য চোখে বাবাকে অনুসরণ করে যায়। জিজ্ঞাসার আকুল দৃষ্টির শাণিত কৌতূহল কাটে না তাদের। ঘনঘোর বিক্ষুব্ধ রাত্রির হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানি আর বাজের গর্জনে তাদের ফরিয়াদ খোদার আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা তা কেবল তিনিই ভালো জানেন।

রাত যত গভীর হতে থাকে সফুরার যন্ত্রণা তীব্রতর হয় ধীরে ধীরে। অন্ধকার রাতের গর্ভে সে ব্যথার কাতর ধ্বনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সে আর্তনাদ আছড়ে পড়ে গড়াগড়ি খায় বাতাসের গায়ে, আলোর আয়নায় মুহুর্মুহু ফুটে ওঠে তার প্রতিবিম্ব। একসময় তার নাড়ির গতির চঞ্চলতা ও দ্রুততর নিঃশ্বাস আরও বেগবান হয়। আগাম সতর্কতা হিসেবে সিন্দুরকাঠি বাজারের পুরানো ডাক্তার ব্রজলালকে খবর দেয়া হয়েছিল আগেই। কিন্তু, ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ রাতের ফাঁদে পড়ে সেও আর আসে না। ওদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে টালমাটাল প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় মতিজানের সেই পুরানো অসুখ। সফুরাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মতিজানের দিকে কারও আর খেয়াল থাকে না।

আকাশের তুমুল গর্জন আর বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজের মধ্যে সফুরার শ্বাস প্রশ্বাসের দ্রুত আস্ফালন অনুমান করা যায় না। প্রকৃতির এই ভীষণ তাণ্ডবে হতভম্ব রজিফা শুধু বলে যায়, সফুরা মা, শান্ত হ। মনটা শান্ত কর, অক্ষনি সব কষ্ট দূর হইয়া যাইব।

সফুরার সারা শরীর ঘামে ভিজে ওঠে। গলা শুকিয়ে আসতে থাকে।

মা, আমারে একটু পানি দাও; আর পারতাছি না। বড় কষ্ট হইতাছে।

খোদারে ডাক মা। খোদারে ডাক।

অবসন্ন সফুরার গোঙানি ও আর্তচিৎকারে বিদীর্ণ হয় রাত। কথা বলার শক্তি হারিয়ে সফুরা এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বাইরে উৎকণ্ঠিত প্রতিটি মানুষ নির্ঘুম চোখে শুভ সংবাদের অপেক্ষা করতে থাকে সারা রাত ধরে।

ভোর হবার আগ পর্যন্ত সফুরা যুদ্ধ করে যায়। সারারাত ছটফট করে ভোরের কিছু আগে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয় সে। কিছুটা হুঁশ ফিরে আসলে নিমীলিত চোখে অর্ধস্ফুট স্বরে রজিফাকে দেখে বলে ওঠে, মা তোমার জামাইরে একটা খবর দিও।

ভোরের আলো ফোটার পর যখন তার গর্ভের ফুল খসে পড়ে বেসামাল পৃথিবীর সাথে সেও হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। গভীর অন্ধকারে ডুব দিয়ে অন্যলোকের যাত্রী হয় সে। সন্তানের কান্না তার কান পর্যন্ত যায় না। সারা রাত্রির ধকল শেষে নিথর একলা দেহ পড়ে থাকে চৌকিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বিলাপ করে ওঠে রজিফা।

নবাগত সন্তান নিয়ে ব্যস্ত সকিনার মা বেরিয়ে আসে সফুরার ঘর থেকে। শোকের মাতম নয়, চোখে মুখে উদ্বেলিত আনন্দের প্রসারিত হাসি।

ও রমিজ, ফুটফুটে ছেলে হইছে সফুরার। চাচী কই? সবাইরে ডাকো।

আনন্দের এ বার্তা ছড়িয়ে পড়ার আগে ঘর-মন-উঠান সর্বত্র বিষাদের কালো ছায়া নেমে আসে। কিছুক্ষণ আগেও সবার মধ্যে চাপা আনন্দের যে লেশ ছিল শোকের চাদরে ঢেকে যায় সব। রমিজের বার বার মনে পড়ে মায়ের সেই আগাম সতর্কবাণী। অবশেষে নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করে যে উত্তর খুঁজে পায় সেখানে শুধু অভিসম্পাতের চিহ্ন লেগে থাকে।

রমিজের উঠানে জড়ো হওয়া মানুষগুলো ছুটে আসে মতিজানের ঘরের দরজায়। কপাটবন্ধ ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ আসে না। বেলা গড়িয়ে গেলে ঘরের চৌকাঠ মাড়িয়ে বের হয় সে। বিগত রজনীর দীর্ঘ পদাবলী শোকের কালো অক্ষরে লেখা হয় মতিজানের বিবর্ণ উঠানজুড়ে। রমিজের বাবার নতুন ভিটায় আনন্দ বেদনার যে কাব্য লেখা হয় সেখানে মতিজানের হৃদয় বৃত্তান্ত থাকে, থাকে না শুধু সফুরা।

মধ্যাহ্ন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মতিজান যখন শূন্য দৃষ্টিতে রজিফার দিকে তাকায় সে তখন বিলাপ করতে থাকে। তবে সফুরার নিঃসাড় দেহটা ঘরের ভেতরে যেখানে পড়ে থাকে সেটা তার দৃষ্টিগোচর হয় না। ওদিকে রমিজের অন্তর্লোকে যে দুঃসহ মর্মাঘাতের সৃষ্টি হয়, তা যতদূর সম্ভব অব্যক্ত থেকে যায়। সে ব্যথা গোপন রেখে গভীর বিষাদ আর শোকাতুর মন নিয়ে সংবিৎহারা রমিজ দাফনের ব্যবস্থা করতে থাকে সফুরার।

চরিত্রসমূহঃ

মতিজান বেওয়া, রমিজ, রজিফা, সফুরা, মানিক, রতন, সকিনার মা, ডাক্তার ব্রজলাল।

স্থানসমূহঃ

সিন্দুরকাঠি, গহরডাঙি।

মঈনুল হাসান। কথাসাহিত্যিক ও ছড়াকার। ১৯৭৮ সালের ৪ আগস্ট (বাংলা ২০ শ্রাবণ, ১৩৮৪ বঙ্গাব্দ), ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার তেজগাঁওয়ে শৈশব কাটলেও পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলায়। বাবা মরহুম মোঃ আব্দুল আউয়াল এবং মা বেগম শামসুন নাহার। বটমলী হোম বালিকা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..