বায়স্কোপ

অয়ন্ত ইমরুল
গল্প
Bengali
বায়স্কোপ
জমিলাবিবি দুয়ার ঝাড়ু দিচ্ছে আর ক্রমাগত বকবক করে যাচ্ছে।
দুয়ারের শেষ মাথায় শিমুল গাছ।লাল ফুলে ছেয়ে আছে আর এই সূর্যোদয়ের সকালে কোথা থেকে উড়ে এসে একঝাক দাঁড়কাক কা-কা জুড়ে দিয়েছে।
মাঝেমাঝে কাকের কা-কা শুনে বিরক্ত হওয়ার পাশাপাশি আতঙ্কিতও হচ্ছে।
মুরব্বিদের কাছে সে শুনে এসেছে,
বাড়ির উপর কাক ডাকা নাকি ভাল লক্ষণ নয়।বিপদআপদ আসে।
সেই ভোর থেকে বকবক করেই যাচ্ছে—
ঘরে চাইল নাই,তয়-তরকারি নাই,উনি নাক ডাইকে ঘুমাইতাছেন।হুউস–ফাকে যাইয়ে কা-কা কর,ফাঁকে যাইয়ে মরতে পারিস না,সব মরা কি এইখানে আইসে মরতে অইবো?
গরীব মাইনসের কি শুইয়ে-বইসে থাকলে চলে?
কিছু কইতে গেলেই কপাল-কপাল করে
কপাল কী মুখে তুইলে খাওয়াই দিবি?
সব আমার নসিব।সব আমার নসিব।
লেবুমিয়া আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বারান্দায় আসলো।
কি অইছে? সকাল সকাল এত ক্ষেপলা কেন?
—এতক্ষণে আইছে কি অইছে?
বেলা গড়ায়ে যাইতেছে হেইদিকে কোন
খেয়াল নাই।
কত্থুন পরই তো আইসপাআনে,সবুর মা-ভাত দে,
ক্ষিধা লাগছে।
লেবু মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে
জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে বললোঃ
বাজার তো মনে অয় ভাইঙ্গা গেছে সবুর মা!
চাউল কি সব শেষ?
পরশুদিন না,পাঁচকেজি আনলাম!
ভাল কইরা দেহো,কাইচাকুইচা যা পাও তাই দিয়া আইজ খিচুড়ি রান্ধো।
যদি তাও যদি না অয়,ক্ষুদের ভাত রান্ধো।
ক্ষুদ আছেই।
-হ,খিচুড়ি রান্ধো!
পিয়াজ-মরিচ ছাড়াই রান্ধি,খাইয়েনে।
লেবুমিয়া ক্ষাণিক চুপ করে থাকার পর
গামছা টা গলায় ঝুলিয়ে বাজারের দিকে বেড়িয়ে পড়লো।
বাজারে গিয়ে কোন কাজ হল না।
বাজার ভাঙছে আরও আগে।
নোলকপুরের বাজার বসে খুব ভোরে।
দশটা দশ ঘটিকায় ভেঙ্গে যায়।
জমিলাবিবি পাশের বাড়ী থেকে এক কেজি চাউল আর কিছু পিয়াজ-মরিচ ধার করে এনে
চুলায় খিচুড়ি বসিয়ে দিয়ে,চুলার মধ্যে খড়ি দিচ্ছে আর বকবক করছে–
তেলের মাথায় সবাই তেল ঢালে।
এহন অভাবে পড়ছি তো তাই মাইনষে ধারও দিতে চায় না।
দিন সব সময় এক রকম থাকব না।
আমারও দিন আসবো।
আল্লায় ঘুরাইবোই একদিন।
লেবুমিয়া যে খালি হাতে ফিরে আসবে
তা জমিলাবিবি আগেই অনুমান করেছিল।
কয়দিন যাবত লেবুমিয়ার হাত একেবারেই খালি।
তিনদিন অইলো গাওয়ালেও যাওয়া হয় না।
কিছু পাইলাম নারে সবুর মা।
—আইজ গাওয়ালে যাইবে না?
–না।শরীর ডে ম্যাচম্যাচ করতাছে।
সামাদ ভাই’র কাছে পাঁচশো টাহা ধার চাইছিলাম
আইজ রাইতে দিয়ুনের কতা।
লেবুমিয়া জলচৌকি টান দিয়ে জমিলার কাছে গিয়ে বসলো।
–কিছু কইবা?
নাইলে ফাঁকে যাইয়ে বসো।চুলার ধোয়ায় থাহা পারবে নে।
–ভাবতাছি বাপদাদার পেশাটা বাদ দিয়ে দিমুরে জমিলা।কয়দিন আর এভাবে কষ্ট করা যায়।
তুই কি কি কস?
এহন তো আর আগের মত আয়-উপার্জন অয় না।
এহন যন্ত্রসভ্যতার যুগ।পোলাপাইনে কম্পিউটার,ভিডিও গেমস নিয়েই আনন্দ পায় বেশি।সময় বদলায় বুঝলি,সময় বদলায়।
পোলাপাইনের রুচিও বদলাইয়ে গেছে।
কিন্তু বাপের কতা ডা খুব মনে পড়ে রে জমিলা।
এই জন্যেই তো ওরে আগলাইয়্যা বাঁইচ্যা আছি।
—আমি তো আগেই কইছিলাম–লও ঢাহায় যাই।
রিক্সা চালাইলেও আমাগো সংসার ভাল মতোই চলবো।কানুরে দেহো না।ও তো সমিতি থেইক্যা টেহা তুইল্যা রিক্সা কিনছে।তাও তো করলে না।
যদি নাই ই কর তাইলে ঘরে বইস্যা না থাইহে
খোঁজখবর নেও–দেশের কোন অঞ্চলে,কোন জায়গায় মেলা হয়।
—মেলায় যাইয়্যাও তো লাভ নাই।
থাহা-খাওয়ার খরচও উঠে না।এহন পোলাপান বখাটে অইয়্যা গেছে।পতুলনাচ দেহে।কিসের পুতুল নাচ? মাইয়্যা মাইনষের নাচ দেহে।তয় এই মাইয়্যা মাইনষের নাচে অনেক টেহা পাওয়া যায়।
ওগো দলে ভীড়তে ইচ্ছে করে,আবার রুচিতেও বাঁধে।
দেহি কি করা যায়,একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লেবুমিয়া বলে–আজ কয়দিন ধরে বায়স্কোপটা ঘরে পড়ে আছে।লেবুমিয়া তিনচার দিন ধরে বায়স্কোপের কাছে যায়না।আজ হঠাৎ কি মনে করে যেন বায়স্কোপটা পরিস্কার করলো।ওর কাছে নিজের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা বললো।
লেবুমিয়া বাড়ি আছো?
ও লেবুমমিয়া,জমিলাবিবি মাথায় ঘোমটা টেনে এগিয়ে এল।
—তুমি বুঝি লেবুমিয়ার বউ?
—হ।তয় আপনেরে তো চিনতে পারলাম না।
—-আমারে চিনবা না।আমার বাড়ি ঐ তিনগ্রাম পরেই।
লেবুমিয়া চোখের জল মুছে বাইরে এল।
–ভাই আপনে? তা কি মনে করে।
–কয়দিন ধইরে তোমার সাথে দেহা অয় না।
এদিকে আমাগো সাহেব আবার আইছে উনার চৌদ্দগোষ্ঠি নিয়া।তোমারে একবার যাইতে অইবো।
—কহন যামু?আর শো প্রতি কিন্তু পঞ্চাশ টেহা কইরে দিতে অইবো।
—আরে টেহার লাইগ্যা ভাইবো না তো,তিনারা অনেক বড়লোক,টেহাপয়সার কোন কমতি নাই।
তোমারে ঠগাইবো না।তাছাড়া উনার নাতিনাতকুরেরা উনার মুখে বায়স্কোপের গল্প শুইন্যা একেবারে অস্থির হইয়ে গেছে।তুমি রেডি হইয়া
এহনই আসো।
—-আইতাছি। কয়ডা ভাত খাইয়্যা।
—আরে ভাত খাইতে অইবো না।ওনে
বিরিয়ানি রান্ধার ব্যাবস্থা করা অইছে।নানান ধরণের খাবার-প্রসাদও আছে।
জমিলাবিবি ঘর থেকে বললো–
সবুর বাপ,উনারে কও,ভাত বাড়া হইয়া গেছে।
২রঞ্জিত সাহেব প্রতিবছর সাকরাইনের সময় পৈত্রিক বাড়িতে আসেন।পৌষ মাসের শেষ দিনটি বংশীয় পরম্পরায় সাকরাইন হিসাবে পালন করে আসছেন।এটাকে ঘুড়িউৎসবও বলা হয়।
বাড়িতে আজ সাজ সাজ রব।বাহারি রঙের সুন্দর সুন্দর ঘুড়ি উড়ানো হচ্ছে।হরেক পদের খাবার তৈরি করে প্রতিবেশীদের বিতরণ করা হচ্ছে।আশেপাশে যারা হিন্দু পরিবার আছেন সকলেই মিলিত হয়েছেন।তাছাড়া রঞ্জিত সাহেবের চৌদ্দগোষ্ঠি তো আছেই।যারা তালের বীজ মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন সবাই উঠিয়ে এনেছেন।বীজের ভিতরের অংশটি কেটে বের করা হয়েছে।এটি খুব সুস্বাদু।এটিও তাদের সাকরাইনের একটি অংশ।
বাড়ীর পিছুনের খোলা জায়গায় ছোট একটি মঞ্চ সাজানো হয়েছে।এলাকার সুরেন বাউলকেও বলা আছে।তাছাড়া লেবুমিয়াও টুকটাক গান জানে।আজ সারারাত কীর্তন হবে।
রঞ্জিত সাহেব নগেনকে ডেকে বললেন–
লেবুমিয়ার দেরি হচ্ছে কেন?
একটু এগিয়ে দ্যাখো তো,কত দূর এল।
বলতে বলতে লেবুমিয়া হাজির।
—-নমস্কার দাদাঠাকুর।
—নমস্কার।তা তুমি কেমন আছো?
—-গরীব মাইনসের আর থাহা,কোন রহম দিন কাইট্যা গেলেই অইলো।
—-কেন? তোমার বায়স্কোপ কি এখন আর তেমন চলে না?
—-না।দেশের হালচাল তো জানেনই পোলাপান সব ডিজিটাল হইয়া যাইতেছি।ওরা কি আর মক্কা মদিনা দেখবো? রহিম-রূপবান দেখবো?
একটা সময় ছিল–আমাগো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে
মেলা হইতো।এহন আর তেমন মেলা অয় না।
কোন আচার অনুষ্ঠানেও ডাকে না।
অনেকেই এই পেশা ছাইড়্যা দিয়ে অন্য পেশায় ঢুইকা গেছে।দুইচাইর ছয়গ্রামের মধ্যে কেবল আমিই আকড়াইয়ে ধইরে আছি।অনেক কষ্টে দিন কাটাইতাছি।ভাবতাছি আমিও ছাইড়্যা দিমু।রঞ্জিত সাহেব লেবুমিয়ার কথা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন।বাঙালি তার ঐতিহ্য ভুলতে বসেছে।
লেবুমিয়া আজ রংবেরংয়ের কাপড় পরেছেন হাতে একটা ঝুনঝুনি।যে কেউ দেখলেই মনে করবে।লোকটি কি সুখী।আসলে পোষাকের আড়ালে আসল মানুষটাকে কেবল জমিলাবিবিই চেনে-জানে।
ঝুনঝুনির শব্দে রঞ্জিত সাহেবের সব নাতিনাতকুর,আরোও যারা শহরের চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী জীবনযাপনে অভ্যস্ত সে সকল শিশুরা জড়ো হল,লেবুমিয়াকে ঘিরে ধরলো।
রঞ্জিত সাবেব সবাইকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন।এই ফাঁকে লেবুমিয়াকে কয়েক পদের খাবার পরিবেশন করা হল।কিন্তু লেবুমিয়া বেশি মুখে দিতে পারলো না।বারবার সবুরের আর সবুরের মায়ের মুখটি ভেসে উঠছিল খাবারের বিশাল থালায়।সবুর স্কুলে ছিল,তা না হলে বাবার সাথে আসার জন্য বায়না ধরতো।রঞ্জিত সাহেবও বিষয়টি বুঝতে পেরে লেবুকে বললেন–খাও,যতটুকু খেতে পারো।তোমাকে আলাদাভাবে প্যাকেট করে কিছু দিয়ে দেব।বাড়িতে নিয়ে বউ-ছেলেকে খাওয়াতে পারবে।
লেবুমিয়া একটু বিশ্রাম নিয়ে শো শুরু করে দিল ঝুনঝুনি বাজিয়ে—-
দ্যাখো,দ্যাখো,কত মজা/চোখের কাছে মক্কা-মদিনা/
তারপরেতে মধুবালা/আরোও দ্যাখো,কৃষ্ণের লীলা।
কি চমৎকার দেখা গেল/রহিম-রূপবান আইসা গেল/ঢাকার শহর দেখেন ভাল/কি চমৎকার দেখা গেল।
এভাবে দৃশ্যের চমৎকার বর্ণনায়
একে একে আজমির শরীফ,বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সহ অনেক দৃশ্যই দেখানো হল।
একেক শো তে ছয়জন করে করে দেখলো বায়স্কোপ।
সবাইকে দেখাতে দেখাতে বিকেল হয়ে এল।
এখন সবাই ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
আকাশে রংবেরংয়ের ঘুড়ি উড়তে লাগলো।
কি সুন্দর লাগছে আকাশের দৃশ্যগুলো!
অনেক মুসলমান পরিবারও এতে অংশ নিয়েছে তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে।
সন্ধ্যার পরপরই শুরু হবে গান।
৩রঞ্জিত সাহেব শুধু আমোদপ্রিয় মানুষই নন।উনি একজন মনেপ্রাণে বাঙালি।এ উৎসবে চৌদ্দগোষ্টিকে একত্র করার পিছুনের উদ্দেশ্য হল
নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে
নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়া।এতে করে যেমন সকলের প্রতি মেলবন্ধন তৈরি হবে তেমনি শেকড়ের টানও অনুভব করতে পারবে।
রঞ্জিত সাহেব মঞ্চে বসে আছেন।একটু পর শুরু হবে কীর্তন।তার পূর্বে সকলের উদ্দেশ্যে রঞ্জিত সাহেব বললেন কীর্তন সম্পর্কে তোমাদের যদি কিছু জানা থাকে বলতে পার–
কেউ যখন কোন সাড়া দিলনা তখন রঞ্জিত সাহেব নিজেই মুখ খুললেন।কীর্তন হচ্ছে সংগীতের আদি ধারা।যারা সাধারণ লোক অর্থাৎ স্বল্পশিক্ষিত তারা যেন সহজ উপায়ে ঈশ্বরের সাধনা বা ধর্মচর্চা করতে পারেন সেই ভাবনা থেকেই চৈতন্যদেব কীর্তন বেছে নিয়েছিলেন।তিনি মনে করতেন নারি-পুরুষ উভয়ের কাছেই
সংগীতের এক রকম আবেদন আছে,তাই তিনি ঈশ্বরউপাসনায় কীর্তনের প্রচলনে তৎপর ছিলেন।এতে ঈশ্বরের গুণ বা লীলা বর্ণিত হয়।
গোপী–শ্রীকৃষ্ণের কাহিনী অবলম্বনে যে পালাগানকে লীলাকীর্তন বলে।আজ আমরা এই লীলাকীর্তন শুনবো বলতেই,
যন্ত্রশিল্পীরা যন্ত্র বাজিয়ে সুর ধরলেন—
করে ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
সুরেন বাউলও কিছু কথা বলে নিলেনঃ
শাস্ত্রে আছে,কোটি জন্মব্রহ্মজ্ঞানে মুক্তি মিলে না।সেই মুক্তি পাওয়া যায় নামের গুণে।
পাশে দুজন বলাললি করছে,আহা! আগে কত সুন্দর কীর্তন হতো,এর বিরহী সুর কোথায় যেন নিয়ে যেত,এখন আর সেই টান সেই মোহাব্বত নেই।গান শুরু হয়ে গেছে।সঙ্গীরা কখনো কখনো গলা মিলাচ্ছেন।গায়েন হাত তুলে কখনো আকুতি জানাচ্ছেন কখনো মাটিতে মিশে যাচ্ছেন।একে বলে আত্মনিবেদন।
এভাবে সারা রাত গুণ-কীর্তন,লীলাকীর্তন শেষে
লেবু মিয়া খুব ভোরেই বাড়ি ফিরে এল।
রাতের বেলা ভীর-ঝামেলার মধ্যে লেবুমিয়াকে কোন টাকাপয়সা দিতে পারেননি।তাই বিকেলে যেতে বলেছিলেন।লেবুমিয়া ঘুম থেকে উঠে গাওগোসল দিয়ে সবুরকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।রঞ্জিত সাহেব বেশকিছু টাকা ও প্রসাদ সহকারে লেবুমিয়াকে বিদায় জানালেন।
নিজের বাড়ির দুয়ারে পা রাখতেই জমিলা জমিলা করে ডাকছেন লেবুমিয়া।ডাকের ভঙ্গি শুনে জমিলারও বুঝতে বাকি রইল না যে আজ সে অনেক খুশি।
—কি,আইল্যা?
—হ,কয়দিন আমরা ভালমত চলতে পারুমরে জমিলা।ভালকিছু খাইতেও পারুম এই দ্যাখ,কত টেহা পাইছি,কাইল রাইতে গানও গাইছিলাম সুরেনের সাথে,বকশিসও পাইছি অনেক।
-তা, হাড়িতে কি নিয়্যা আইছাও?
–ও বাড়ি থেকে দই দিল,কইল তোমার পরিবার নিয়্যা খাইয়ো।
জমিলা হাত থেকে হাড়িটি নিয়ে ঘরে রাখলো।
গরীব মানুষ অল্পতেই খুশি থাকে।যেটা বড়লোকের নেই।তাদের শুধু আরও চাই,আরও চাই।
দুজন বিছানায় শুয়ে শুয়ে সুখ-দুঃখের কথা বলছে–কাইল খুব সকালে ডাক দিবি।
বড় দেইহ্যা একটা বোয়ালমাছ কিনুম।
—-না,থাক।বোয়ালমাছ কিনতে অইবো না।
একটা বোয়ালেই যদি সব টেহা শেঅ্যাষ কইর্যা ফালাও তাইলে বাকি দিনগুলা কিভাবে চলবো?
রইয়্যা-সইয়্যা খাইতে হইব।
নোলকপুরের মেলা শুরু অইতে এহনও অনেকদিন বাকি আছে।তাছাড়া মেলায় কত কি আয় হয় না হয়।
গাওয়ালে গেলেও তো কোনদিন আয় হয় আবার কোনদিন খালি হাতেই ফির্যা আসো।
—হ,কতাডা মিছ্যা কস নাই।দেহি কমের মধ্যে পাইলে আনুম না পাইলে অন্য মাছ আনুম।
লেবুমিয়ার প্রিয় মাছ হল বোয়ালমাছ।বোয়াল মাছে কাঁটা নাই,আইড়মাছও প্রিয়।লেবুমিয়া কাঁটাওয়ালা মাছ খাইতে পারে না।
আনন্দের পরিমাণ বেশি হওয়ায় আজ লেবুমিয়ার ঘুম কম হল।খুব ভোরে উঠেই বাজারে গেল।চাল-ডাল আনুষঙ্গিক কিছু কেনার পর গেল মাছঘাটায়,বাজারে যেমন মাছ উঠেছে তেমন দামও খুব চড়া।মাছঘাটায় অনেকক্ষণ যাবত লেবুমিয়া ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু নিজের টাকা অনুযায়ী কোন মাছ কিনতে পারছে না।
যে জেলেরা বড় বড় নদীর মাছ নিয়ে বসে আছে তারা কেউ লেবুমিয়ার সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণও করছে না।দাম চেয়েই চুপচাপ বসে থাকছেন।লেবুমিয়া যে দামাদামি করবে সে সাহসটাও পাচ্ছে না।পাশে এক মসুলমান জেলে লেবুমিয়াকে এত ঘোরাঘুরি করতে দেখে ডাক দিয়ে বলল—
কি লেবুমিয়া,কি মাছ নিবা?
লেবুমিয়া একটু সাহস পেয়ে বললো-
তোমার এই বোয়ালমাছটার দাম কত?
—এইড্যা তো দুই হাজার টেহা।তুমি
এই ছোটডা নেও এইড্যার দাম কম আছে।
—এইড্যা কত?
—-এইড্যা তুমি পাঁচশো দিও।অন্য মানুষ অইলে ছয়শ’র কম বেচতাম না।
—ভাই,চাইরশোতে দেওয়া যায় না?
—নারে ভাই,তোমার যদি টেহায় সমস্যা অয়
তাইলে পরে দিও।আমি তাগাদা দিমনা।
যহন টেহা হাতে অইবো তহন দিও।
—-তাইলে তুমি এহন তিনশো রাহো,বাকিডা পরে দিমানি,নোলকপুরের মেলার পরে।
লেবুমিয়া বাজারঘাট করে বাড়ি ফিরলে
সবুর বোয়ালমাছ হাতে নিয়ে যে খুশি ছড়িয়ে দিল বাড়িময়
তাতে লেবুমিয়ার প্রাণ জুড়িয়ে গেল।
জমিলাবিবি রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।ঘন্টাখানিক পর ছলিম,কাহা,কাহা করতে ছুটে এল।
–কি রে,কি অইছে?
–ঢাকা থেইক্যা চারপাঁচ জন মানুষ আইছে,
তোমারে বাজারে যাইতে কইছে।
লেবুমিয়া অবাক হয়ে গেল।
—ঢাকায় তো আমার কেউ নাই।কেরা আইলো!
৪–আমি জানিনে কাহা।তয়
অন্য গ্রাম থেইক্যাও কয়েকজনরে ডাকছে,
যারা যারা বায়স্কোপ দেখাইতো তাগো সবাইরেই ডাকছে দেখলাম।
লেবুমিয়া গেঞ্জি পরে ছলিমের সাথে বেরিয়ে গেল।বাজারে গিয়ে দেখলো,শুকুর,আলমাছ,বলাই দা,সহ আরোও তিনচারজনের সাথে কথা হচ্ছে।
লেবুমিয়া গিয়ে সালাম দিল।
পাঁচ জনের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করলো-
লেবুমিয়া কেমন আছো?
লেবুমিয়া কৌতূহলপূর্ণ চোখে চেয়ে উত্তর দিল ভাল।তা আপনেরা কারা?
—-আমরা ঢাকা থেকে এসেছি তোমাদের খোঁজখবর নিতে।তা তোমাদের সবারই বায়স্কোপ আছে,নাকি?
আলমাছ বললো–আছিল স্যার,তয় এখন অটো চালাই।
মোটা এবং লম্বা লোকটি জিজ্ঞাসা করলো
বায়স্কোপটা আছে নাকি বিক্রি কয়ে দিয়েছো?
—নাই।জিদ্দি কইর্যা চুলায় পুইড়ে দিছি।
এভাবে প্রত্যেকের সাথেই কথা হল।
সবাই নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার বর্ণনাই দিলেন।
লেবুমিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানালেন
আমারটা আছে তয় আমিও মনে অয় আর এই পেশায় থাকতে পারুম না।বায়স্কোপের যুগ শেষ হইয়্যা গেছে।
সবার সাথে আলাপ শেষে উনারা চলে গেলেন
এবং জানিয়ে গেলেন তারা আবার আসবেন।
সবার ঠিকানাও নিয়ে গেলেন।
এদিকে ওরা সবাই ভাবতেছিল–হয়তো সরকারি লোক,আমাদের খোঁজখবর নিতে আইছে।
কেউ বললো-আমাদের সাহায্য করার জন্যেও আইতে পারে।কেউ বললো–মনে অয় বায়স্কোপ দেহার জন্যেই আইছিল।কওয়া তো যায় না,
বড়লোকেদের কহন কুন শখ জাগে।
লেবু বললো–আবার যহন আইবো তহন
মনে অয় আমাগো কোন সাহায্য দিব।
তা নাইলে আবার আসপো ক্যা?
যে যার কাজে চলে গেল।লেবু একটা আকিজ বিড়ি ধরিয়ে যোগ-বিয়োগ হিসেব করতে লাগলো।কিন্তু হিসেবে গড়মিল হচ্ছে।
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হঠাৎ মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে–মেলা,মেলা, মেলা।বকশির টেক মাঠ প্রাঙ্গণে সাতদিন ব্যাপী এক বিশাল মেলার আয়োজন করা হইয়াছে।
লেবু মিয়ার খটকা লাগলো।ভাল করে কান খাড়া করে শুনে নিল।হ ঠিক ই তো কইতাছে।
তয় বকশির টেক মেলা হইবো কি উপলক্ষ্যে?
যাই ভাল কইরা খোঁজ নিয়া দেহি।
লেবু সামনে যেতে যেতে মাইকিং করার রিক্সাটি কাছে চলে এল।যে লোকটি মাইকিং করছে তার কাছে বিস্তারিত জেনে নিল।শুক্রবার থেকে মেলা শুরু হবে।যারা যারা মেলায় অংশগ্রহণ করবে তাদের আগে থেকেই গিয়ে প্রস্তুতি নিতে হয়।বাকি আছে মাত্র একদিন।
বকশির টেক এখান থেকে বেশ দূর
লেবুমিয়া বাড়িতে এসে বউকে খবরটা দিল।
জমিলাবিবি বললো—
বকশির টেকের মেলায় তো বাড়ি থেইক্যাও যাইতে পারব্যা।পরিশ্রমডা একটু বেশি অইব আর কি।
—আমিও তাই ভাবতাছি।ওনে থাহা-খাওয়ারও তো ঝামেলা আছে।
–হ।দুপুরের খাওন খাইয়েই রওনা দিতে অইবো আর কি।মেলার ভাব দেইহে—যদি মনে কর মেলা খুব জমছে তাইলে দুপুরে হোটেলেই খাইয়ে নিবা।
–হ।সবুরের স্কুল না বন্ধ দেওনের কতা!
তা কবে বন্ধ দিব? ওরেও তো নিয়্যা যাওয়া যাইতো।
—-ওর তো মাত্র দুই দিন বন্ধ দিব।
পরশুদিন।
–ও।
ঠিক আছে।ভাত দে।
–গোসল দিয়্যা আসো।
–না।আগে ভাত খাইয়্যা পরে গোসল করুমানি।
সবুর স্কুল থেকে চলে এসেছে।দাঁড়া তাইলে-
আইজ বাপবেটা একসাথেই খামু।গোসল দিয়্যা আসি।
—মা আইজ তরকারির মেলা ঘ্রাণ পাইতেছিরে,
না জানি রান্ধা কর মজা হইছে!
জমিলাবিবি ভাত বেড়ে বসে আছেন।পোলায়ও মুখে দিচ্ছে না,বাপে এলে একসাথে খাবে।
বাপের আসতে একটু দেরি হল।
পুকুরে সামাদের সাথে লোকগুলোর ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে দেরি হল।
–তোমরা এহনও বইস্যা আছো?
–তাড়াতাড়ি বইসো,পোলার আর তর সইছেনা।
৫আজ মেলার শেষ দিন।আজ আর লেবুমিয়া মেলায় যায়নি।দুই দিন গিয়েছিল।মেলা জমে না দেখে যাওয়া বাদ দিয়েছে।ঢাকা থেকে কয়েকদিন আগে যে লোকগুলো এসেছিল তারা আজ আবার এসেছে।আজ সরাসরি লেবুমিয়ার বাড়িতে এসেছে।লেবুমিয়া পাশের বাড়ি থেকে চেয়ার এনে দোয়ারে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
লেবুমিয়া একটু খুশি খুশি লাগছে,
সম্ভাব্য সাহায্য পাওয়ার আশায়।কিন্তু শুকুর,আলমাল,বলাইদা,ওগো বাড়িতেও মনে হয় গিয়েছিল,সবার বাড়ি ঘুরে আমার এখানে এসেছে।মোটা-লম্বা লোকটি বললেন
লেবুমিয়া—আমরা সারা বাংলাদেশে একটা জরিপ চালিয়ে আসছি বিগত দশ বছর যাবত।
আপনাদের পেশায় জরিতদের নিয়ে।এটি অতি দুঃখের বিষয় যে বায়স্কোপের প্রতি এখন আর মানুষের আগ্রহ নেই।লেবুমিয়া এবং তার বউ জমিলাবিবি খুব মনযোগ সহকারে কথাগুলো শুনছেন।দিন বদলের পাশাপাশি মানুষের রুচিরও পরিবর্তন ঘটে।বায়স্কোপ এখন বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিয্যের নাম।সারা দেশ ঘুরে জরিপ চালিয়ে কোথাও কারো কাছে আমরা একটি বায়স্কোপও দেখতে পাইনি।
লেবুমিয়া একটু হাসি দিয়ে বললেন– স্যার,
আমারও মাঝেমধ্যে জিদ চাপে,মনে অয় আগুনে জ্বালাই দেই কিন্তু বাপডার কতা মনে কইরে আর পারিনে।
–শুনুন আমরা এসেছি জাতীয় যাদুঘর থেকে।
আমরা চাচ্ছিলাম,আপনার এই বায়স্কোপটি আমাদের জাতীয় জাদুকরে রাখবো।
কথাটা শোনার পর লেবুমিয়ার মনে হইল,আকাশ থেকে বিশাল এক বজ্রপাত হল।
—না,না স্যার,এইড্যা কি কন!
এইড্যা আমার বাপদাদার পেশা,এইড্যা আমাগো শুধু পেশাই না আরও অনেক কিছু,এই বায়স্কোপটা আমার বংশের পরম্পরায় আমি পাইছি,আমি যতদিন বাঁচুম আমার কাছেই থাকবো।
–শুনুন,আমরা কি বলি-এইড্যা আমাদের ঐতিহ্যের জন্যেই আমরা এ কাজটি করতে যাচ্ছি।জাদুঘরে থাকলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য।তাছাড়া আমরা আপনাকে কিছু টাকাও দেব,যাতে কিছু একটা করে খেতে পারেন।
—-না,না।আপনেরা চইলা যান।আমার কোন টাকা লাগবে না।আমি এই বায়স্কোপ দিতে পারুম না।আমি চাইনে আমার বাপদাদাদের আত্মা কবরে কোন কষ্ট পাক।তাছাড়া এই বায়স্কোপ আমার সন্তানের মতো।
—লেবুমিয়া,বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করুন।
আমরা আপনাকে বেশ ভাল অংকের একটা এমাউন্ট দেব।
—না।আপনেরা এইবার আসতে পারেন।
–ঠিক আছে,আপনাকে ভাবার সময় দেয়া হল।
ভেবে দেখুন,সিদ্ধান্ত টা না হয়,ঠান্ডা মাথায় জানিয়েন।আমরা বিকেলের দিকে আবার আসবো।আপাতত চেয়ারম্যানের বাড়ি যাচ্ছি।
লোকগুলো চলে যাওয়ার পর লেবুমিয়া
ক্ষোভে-দুঃখে বায়স্কোপের কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।জমিলাবিবি তাকে সান্তনা দিতে লাগলো।
—-শোন,একটু ঠান্ডা মাথায় ভাইব্যা দেহ,
উনারা তো আমাগো টেহা দিতে চাইছে।
তোমার তো অন্য একটা ব্যবস্থা হয়েই যাইবো।
তাছাড়া উনারা সরকারি লোক,কম টেহা দেব বইল্যা মনে অয় না।
আমরা যদি ইটু ভাল মত চলবের পারি তাইলে অসুবিধা কি?
তুমি বরং দিয়া দেও,তুমিও ইতিহাসের স্বাক্ষী হইয়ে থাকব্যা।লোকজন যহন জাদুঘরে যাইয়্যা এই বায়স্কোপ দেখবো তহন পাশে তোমার নামও লেহা থাকবো।জমিলাবিবির কথা শুনে লেবুমিয়া আরোও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।এদিকে বিকেল হয়ে এল।লেবুমিয়া কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না।
এবার চেয়ারম্যান সাহেবও এসেছেন লোকগুলার সাথে।সবাই মিলে লেবুমিয়াকে বুঝাইলেন।কিন্তু লেবুমিয়ার মুখে কোন কথা নাই।
লেবুমিয়ার কানে বার বার ধ্বনিত হচ্ছে তার বাবার কথাঃলেবুরে আমাগো ঐতিহ্য তুই টিকাইয়ে রাখিস।জমিলাবিবি এতে তেমন অখুশি নন।জমিলাবিবি টাকার পরিমাণটা জানতে চাইলেন।চেয়ারম্যান সাব বললেন—
দেখো,জমিলা,এটার তো কোন দাম নেই।আবার বলতে গেলে দাম আছেও,তোমরা যেহেতু অসহায় একটি পরিবার তোমাদের ঠকানো হবে না।লেবুমিয়াকে একটি পুরনো দেখে অটোরিক্সা কিনে দেয়া হবে।তবে বেশি পুরনো নয়।
জমিলাবিবির মুখটায় এখন অন্ধকার নেমে এল।
ত্রিশ হাজার টাকা মাত্র। তাহলে এই কথাই রইল,কি বলো লেবুমিয়া?
আগামীকাল এসে আমার লোকজন বায়স্কোপটা নিয়ে যাবে। লেবুমিয়া কোন কথা বললো না,সোজা ঘরে গিয়ে বায়স্কোপটা ধরে শিশুর মত কাঁদতে লাগলো,জমিলাবিবি তাকে সান্তনা দিচ্ছে কিন্তু কান্না ক্রমশ গভীর হচ্ছে,সন্ধ্যার আজান হচ্ছে,আজানের সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে লেবুমিয়ার কান্নাধ্বনি—

অয়ন্ত ইমরুল। কবি। জন্ম ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের সাভার। প্রকাশিত বই: 'ছায়া সমুদ্র' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৬), 'বুদ্ধের ভায়োলিন' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৮), 'সাদা ধূলির দূরত্বে' (কাব্যগ্রন্থ, ২০২০), 'স্বৈর হাওয়ার হরিণী'  (কাব্যগ্রন্থ, ২০২০) এবং 'কিসমত আলী অথবা শূন্য' (গল্পগ্রন্থ, ২০২০)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..