বিদায় আর্তনাদ

শরীফুর রহমান
ছোটগল্প
Bengali
বিদায় আর্তনাদ

কোথা থেকে যেন হাঁফিয়ে আসল। দুদিন যাবৎ ও কোথায় ছিল তা কেউ জানে না। কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে বলল, মা,মা,ওই মা মরে গেলাম! ওর মা আসবে কোত্থেকে? মা যে বেঁচে নেই।

তখন রাত আনুমানিক দুটো বাজে। সকলে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে,বাড়ি অন্ধকার। এত রাতে ঘুমানোর বদলে আর্তনাদ কিসের? বাবুল ভাই তো বাড়িতে নেই। তবে? আর্তনাদের করুন সুরে ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়। ওর বয়স ষোল কি সতের হবে।

অনেকক্ষণ ইতস্তত করে দরজা খুলতে যাবে এমনি গা শিউরে উঠে কয়েকবার। কিছুক্ষণ পর সেটা ভালো করে টের পেয়ে শেষকালে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। দরজা খুলে মৃতপ্রায় একটা লোককে বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখল। সাহস করে এসে বলল,বাবুল ভাই,বাবুল ভাই? ও মা! কথা বলছো না যে? কি হলো তোমার? গা ছুঁয়ে দেখল শরীর ভীষণ ঠান্ডা। বাবুল কোন কথা বলল না। শুধু চোখ মেলে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ও কি করবে বুঝতে পারে না। ভয়ে মা,মা বলে চিৎকার দেয়।

ওর মা হকচকিয়ে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই। দরজা খুলে দেখে শিবলু কথা বলতে পারে না। শুধু হাতের ইশারায় ডাকছে। মা দৌড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। কি হয়েছে তোর? শিবলু শুধু হাতে ইশারা করল। ওর মা বাইরে এসে দেখে বারান্দার এক কোণে বাবুল ঘাড়টা কাত করে জিহ্বা বের করে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। ওর মুখ দিয়ে ফেনা ঝরছে। চোখ দুটো বের করে তাকিয়ে আছে। দেখে যে কেউ ভয় পেয়ে যেতে পারে। শিবলু তাই করল। ও ভয় পেল। মা, মা বলে চিৎকারও করল।

তিনি ব্যাপারটা আঁচ করলেন। গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে দু’হাতের আঙ্গুলের ডগাগুলো একত্র করে বাবুলকে দেখতে লাগলেন। মোটাসোটা হাসিখুশি ছেলেটা দুদিনে যেন শুকিয়ে গেছে। চাহনি একটু উদ্ভ্রান্ত। কেমন জানি খাপছাড়া হয়ে গেছে।

তড়িঘড়ি করে পাশের ঘর থেকে তেলের শিশিটা নিয়ে আসলেন। ভিজে ভিজে করে মাথায় সরষে তেল দিলেন। পিতলের চামচে সামান্য তেল আর কয়েক কুয়া রসুন নিয়ে কুপিবাতির আগুনে গরম করলেন। হাতেপায়ে মালিশ করলেন। তখনি তার চোখে ভেসে উঠল দু’হাতের কব্জিতে দড়ির কালো কালো দাগ। একই রকম দাগ পায়েও দেখতে পেলেন।

অনেকক্ষণ পর ও হুশ ফিরে পেল। মিটমিট করে তাকাল। হঠাৎ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,কাকীমা, সত্যি করে একটা কথা বলবেন, আমি কি মরে যাব?

ফিরোজা বেগম ওর গায়ে শান্তনার হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মৃত্যু কি মুখের কথা রে বাবা? জীবন মরনের মালিক আল্লাহ। তিনি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

পরক্ষণে অস্ফুট স্বরে বলল,আমায় ক্ষমা করো কাকিমা। এই বলে কেঁদে ফেলল।

অমন কথা বল না,বাবা। আচ্ছা,তোমার কি হয়েছে? খুলে বল তো শুনি।

বাবুল ঢোক গিলে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেপে বলল,সেদিন কলেজ থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলাম। আমার পাশেই বসেছিলেন এক ভদ্রলোক। আমি জানালার ধারের সিটে ছিলাম। হঠাৎ করেই তিনি থুথু ফেললেন। কয়েক ফোটা থুথু এসে আমার মুখে পড়ল। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,একি করলেন!

ভদ্রলোক বিনীত স্বরে বললেন,মাফ করবেন। ভুল হয়ে গেছে। এই বলে প্যান্টের পকেট থেকে রুমালটা বের করে মুছে দিয়ে আমার নাক ঘেঁষে নিলেন। উত্তেজক পদার্থের একটা ঝাঁঝাল গন্ধ পেলাম। হয়তো ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু আগে থেকেই স্প্রে করা ছিল।

সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। তারপর আর কিছু জানি না। জ্ঞান হতে ফিরে দেখি অদ্ভুত ধরনের ক’জন লোক আমাকে ঘিরে বসে রইল। গাড়িটা বুঝি থামল। একজন আমার নাকের কাছে কি জানি একটা ধরল।

ভয়ে ওর শরীর কাঁপছে। কথা বলার শক্তিটুকু পাচ্ছে না। ফিরোজা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,অজ্ঞান হয়ে গেলে?

না,একেবারে অজ্ঞান হয়ে যাইনি। অবশ্য আচ্ছন্নের মত শুয়ে ছিলাম। আমাকে ধরাধরি করে অন্য একটা গাড়িতে তুলল। গাড়িতে আমার মত আরো কয়েকজন ছিল। ক’জন ঠিক জানি না। সকলেই আমার মত।

একটু দূরে নির্জন স্থানে গাড়িটা পার্কিং করল। লোকগুলো মোড়ের কোন এক দোকানে চা পান করতে গেল। খেয়াল না করেই মাইক্রোবাসটার দরজা খোলা রেখে চলে যায়। আমার হাতপা বাঁধা ছিল। তবু এখান থেকে বের হয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। মাথা দিয়ে ঠেলে দরজাটা একটু ফাঁক করে হামাগুড়ি দিয়ে কোনমতে গাড়ি থেকে মাটিতে নেমে পড়লাম। তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার একপাশে গাছগাছালি আর ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। ভেবেছিলাম হয়তো আমি বেঁচে যাব। কিন্তু না!

বর্ণনার এখানে পৌঁছে বাবুল শিউরে চুপ করে গেল। তার মুখ আরো বেশি ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। দু’চোখ আতঙ্কিত। কথা বলার ভঙ্গি পর্যন্ত কেমন খাপছাড়া হয়ে গেছে।

তারপর?

অনেক খুঁজাখুঁজির পর লোকগুলো আমাকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখল। একজন তো এসেই কোমড়ে খুব জোরে লাথি মারল। আমি মা,মা বলে কেঁদে উঠলাম। দয়া তো দূরের কথা উল্টো আমার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। মনে হয় পাঁচটা আঙ্গুল দেবে গেছিল। এত জোরে চড় দিয়েছে যে আবার আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে গেছে।

জ্ঞান হতে দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি। পচা রক্ত আর মরা মানুষের উৎকট দুর্গন্ধ ঘরটাকে যেন ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে। অনেকগুলো মাথার খুলি,হাড়,কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখলাম। ঘরে জ্যান্ত মানুষের চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। হিংস্র মানুষগুলো কোথায় গেছে কে জানে। ভয়ে বুক কাঁপছে,ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু হাত পা যে বাঁধা। সমস্ত শরীর হঠাৎ কেমন অস্থির অস্থির করতে লাগল। দেহের ভিতর কি যেন প্রবেশ করে আমাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে তুলছে। ভয়ের জন্য শরীর এরকম অস্থির অস্থির করতে পারে সেটা সামান্য ব্যাপার। তারপরেও এখান থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেবল এই চিন্তাটাই মনে ঘুরপাক খেতে লাগল।

রাত তখন কয়টা বাজে জানি না। এক রকম জোর করেই বিছানা হতে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেলাম। শরীরটা অবশ্য খুব খারাপ হয়ে আছে। মেঝেতে ধাক্কা যেখানে লেগেছিল মাথার সেখানটা ফুলে টনটন করছে। কিন্তু জ্ঞান ছিল।

মাথা ঠেলে দরজাটা একটু ফাঁক করে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। আলোটা আড়াল করে অন্ধকারে মিশে গেলাম। হামাগুঁড়ি দিতে দিতে পথ চলছি যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ মনের সে শান্তি টিকল না। বড় একটা বাজারে পৌঁছামাত্র পেছন থেকে একটা জিপ আলো জ্বেলে আসছে। আমি ততক্ষণে নর্দমার ড্রেনে পড়ে নিরাপদ আশ্রয় নিলাম।

প্রচন্ড শীতে এখানে কতটুকু কষ্ট করতে হয়েছে তা বাবুলের শিহরণ থেকে স্পষ্ট টের পাওয়া যায়।

ভোররাতে মৌলভী সাহেব তাহাজ্জুতের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে হাঁটছিলেন। আমার কান্নার আওয়াজে এগিয়ে আসলেন। মানুষের ছায়াটা আমার চোখে পড়ল। তাতে বুকটা ধড়াস করে উঠল। কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু ইশারা করছিলাম হাতপায়ের গেরো খুলে দেবার জন্যে। চাদরের মত রুমালটা দিয়ে আমার গায়ের ময়লা পানি মুছে দিলেন। বাঁধন খুলে তার গায়ের চাদরটা যেই জড়িয়ে দিতে গেলেন তখনি দিলাম দৌঁড়। এরপর থেকে আমি পাগলের মত হয়ে গেছি। সারাদিন শুধু একটা কথাই ভাবি আর নিজেকে প্রশ্ন করি,কিভাবে বেঁচে গেলাম হিংস্র মানবের হাত থেকে? সেই মৃত্যু আর অন্ধকার রাতের কথা মনে পড়লে আমি আর ঠিক থাকতে পারি না। আমার ভয় কেবল ঐ মানুষরূপী জানোয়ারগুলোকে। কিন্তু কাকীমা, ‘আমি এখানে’ বলে হঠাৎ করেই ও থেমে যায়। ও থামেনি,চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে।

মৃত্যু বড়ই নিষ্ঠুর!

শরীফুর রহমান। গল্পকার। জন্ম ও বাস বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..