বিষ সংক্রান্তি

সৌরভ বর্ধন
কবিতা
Bengali
বিষ সংক্রান্তি

বিষ সংক্রান্তি

ভ্রাম্যমান ডানার মতো এক সকাল
নেপচুনকে অতিক্রম ক’রে ক্রমশ আমার দিকে ছুটে আসে
আমার সমস্ত হাতের লেখায় ওর বিচরণ আমি টের পাই
এমনকি চুম্বনরত অবস্থায়ও
গোঁফের চুল একটা একটা করে সরিয়ে
আমাকে আরও তোমার মধ্যে ঠেসে দেয়, মাঝেমাঝে দম
বন্ধ হয়ে এলে চারিদিকে দু-একটা গাছের ফুসফুস
খুব সন্তর্পণে ছিদ্র করতে দেখেছি ওকে – এতটা ডেডিকেটেড!
খুব কম দ্যাখা যায় এমন সকাল এবং আমার দ্যাখা
যেকোন ধ্রুবতারার চেয়ে কম উজ্জ্বল নয় এই সত্য!

যখনই একটা অক্ষর, ধরো প অথবা ফ পাখা মেলে, ডানা ঝাপটিয়ে
আমার খাদ্যনালীতে ফলিডল ছড়িয়ে দেয়, আমার তো কিছুই
করার থাকে না তেমন, আমি সারারাত মরতে
.                                                                মরতে।                    মরতে।
.                                                               এতটা কষ্ট পাই যে
আমার মুখ দিয়ে দূর সমুদ্রের সফেন বেরিয়ে আসে, আমার চোখ দিয়ে
ভীষণ প্রতিজ্ঞার মতো দেবব্রত বেরিয়ে আসে, শরসজ্জায় শায়িত থাকে
আমার নাসারন্ধ্র, আমি রাতভর কন্ঠনালীতে মুক্তির প্রলেপ লাগাই…

মুক্তি! মুক্তি! মুক্তি পেতে আমি খুঁজে বেড়াই তোমাকে
আমি বিশ্বাস করি তুমি বিষহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা…

তোমার একটা চুম্বন
আমার বিষাক্ত পাকস্থলীকে স্বয়ং মলদ্বার দিয়ে পৃথিবীর বুকে
নিক্ষেপ করতে পারে ও সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা ব্রহ্মাণ্ডে
যেখানে অসংখ্য জ্যোতিপুঞ্জের সাথে লড়তে লড়তে আমার
দু ডানায় অবসন্নভাব স্থায়ী হতে চলেছে

অথচ কোনো বিরাম নেই এই ছুটে চলার
অথচ কোনো নিশ্চয়তা নেই এই ভাবে বেঁচে থাকার

তবু সারাটা রাত আমাকে এখানেই কাটাতে হয়
সকালের আসতে আসতে ভোর হয়ে যাবে, ততক্ষণ আমার শির অরণ্যে
বিলি কেটে দেবে কে? কে আমার বুকের ওপর বেঁধে দেবে বিশল্যকরণী?
কে বা কারা কোন্ মাহুতের থেকে এনে আমার পিঠে আমার শেষ ইচ্ছা মতো
সাজিয়ে দেবে সুসজ্জিত সেই আসন
যেখানে ঘূর্ন্যমান সকালটিকে বসিয়ে আমি ঐরাবত হবো!
কিংবা জ্বলন্ত লৌহ চাকতি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে
আমার নিস্তেজ দুই পায়ে দুই হাতে জোড় করে পরিয়ে দেবে?
আমায় আরব দেশের কোনো হাটে বেচে দেবার ফন্দি করবে কোন্ পার্টি লিডার!

এসব গুটিকয় ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমার কপালের ভাঁজ শান্ত হতে থাকে,
চোখের নীচে কালোস্পট থেকে নিরাসক্ত ব্যাকরণ ছেড়ে যায় শরীর,
মুখ থেকে স্বপ্নের মতো গড়িয়ে পড়ে প্রাণ, তবু অপেক্ষা সেই সকালের

রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি মরে যেতে আমার একদম ভালো লাগবে না,
আগে সূর্য উঠুক, রোদের তেজে শুকিয়ে যাক এই অসহ্য গন্ধের সফেন-রাজ্য
যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমার মুক্তির আসল কারণ
যাতে কেউ ধরতে না পারে বিষের বিশেষত্ব

সকাল এলে ঠিক আমাকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে আসবে ছাদে
যেখানে সূর্য দেখতে পাবে গতরাতের সংগ্রামে আহত ডানায় কক্ষপথ
থেকে ছিটকে যাওয়া এক অজুহাতের মৃতদেহ!
যদিও আমার কোনো কক্ষপথ নেই, কখনো ছিলও না
আমার নাকে দড়ি বাঁধা থাকত এতটাকাল, আমি আকর্ষের ঢঙে জড়িয়ে ধরতাম
স্যাটেলাইটের ধাতু নির্মিত ডানা, আমার অজুমুখে থাকতো
র‍্যাফ্লেসিয়া আর্নল্ডের প্রতিকৃতি আর গ্রহাণুরা পার্থিব ভেবে
আমাকে জায়গা ছেড়ে দিত মহাকাশে…

আমি ইউ.এফ.ও. হিসাবে ঘুরে বেরিয়েছি এই মাল্টিভার্সের সময়যোনিতে
আমি রাহু ভেবে কত নিরীহ জ্যোতিষ্কের ক্ষতিসাধন করেছি তার ইয়ত্তা নেই
তারপর এই সকাল আমার হাতে বেঁধে দিল শ্রীফলের বীজ নিঃসৃত আঠা
সেই আঠার সাথে আমার তরুনাস্থি গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হলো প্যাকেটে,
আমি কোষ্ঠকাঠিন্য সারাতে পারি না তবু আমায় আমার প্রিয় পোষ্যের খাবারে
মিশিয়ে খাওয়ানো হলো, পরদিন সকালে প্রাতঃকৃত্যের সময় দুই দামাল ছেলে
আংটার মতো আটকে ধরলো তাদের কেনে আঙুল…

কোনো উপায় না দেখে এক সংবাদপত্রের সম্পাদককে চিঠি লিখতে যাবো
অমনি হাত থেকে খসে পড়লো পেন
অন্ধকার চৌকির নীচে তাকে খুঁজতে গিয়ে আমার সারা শরীরে সম্প্রসারিত
আঠার সাথে একাত্ম হয়ে গেলো মাকড়সার জাল
অদ্ভূত এক কিম্ভূতকিমাকার জায়মান মাকড়সারূপে বেরিয়ে এলাম

হাতে উন্মুক্ত রিফিল

কিন্তু পরিচিত সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমাকে না চেনার ভান করে
ছড়িয়ে পড়লো একান্ন পিঠে আর ধূলিকণাকে আশ্রয় করে আমি
উঠতে থাকলাম উপরে — ট্রপোমণ্ডল স্ট্র্যাটোমণ্ডল ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ঠান্ডা বাতাস
আমাকে সম্পৃক্ত করল, আরও অজস্র জলকণা আমার সাথে এক দেহে লীন হলো,
আমি বাড়তে থাকলাম আরে… বহরে… উচ্চতায়…
খুউব ইচ্ছা ছিল একদিন এখানেই, একদিন তুমি যখন খোলাছাদে
আমি হঠাৎ এসে লিপগার্ড ভেদ করব, তুমি পালিয়ে যাওয়ার আগেই
তোমার গেঞ্জিতে তোমার কেপ্রিতে প্রসিদ্ধ আশ্রয় নেবো, তারপর একটু একটু করে
.                                                                                          অন্তর্বাস, মানে সম্মোহন!

ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে বাথরুমে ঝুলতে ঝুলতে দেখে নেবো
তোমার লোকলজ্জার আস্তরণ, সেখানে কোনো ধৃষ্টতা আমার পোষাবে না
কারণ প্রেমের জন্য পাগলা ষাঁড়কে দেখে আমি খুলে ফেলেছিলাম লাল টি-শার্ট
আর তা পরিয়ে দিয়েছিলাম বোধিবৃক্ষে, নইলে দুই শিং-এর সেই যে ক্ষিপ্রতা
আমায় গতরাত্রের স্মৃতিকে আবার উসকে দিতো, আমার পেট থেকে আবার
জন্ম নিতো এক ভিসুভিয়াস — শিরা উপশিরায় উত্তপ্ত ম্যাগমার প্রবাহ যে
কতটা অমানুষিক! তার উদাহরণ যদি দিতে বলো
তাহলে আমার একটা আঙুল চলে যাবে সূর্যের দিকে সমস্ত
মাধ্যাকর্ষণ আইন না মেনেই, আমার বুড়ো আঙুল প্রাণপন চেষ্টা করবে
বাকি তিনজনকে কোনো রকমে ধরে রাখার,
হাতের তালুতে মুখ গুঁজে রাখার যাতে না তারা বিশ্ববাসীকে জানাতে পারে
সূর্যের দিকে আঙুল তোলার সুসাহস দ্যাখানো কোনো মূঢ় অর্বাচীনের পরিচয়

যাতে না তারা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিতে পারে
জগতের অন্তরসত্য উন্মোচিত করার অভিসন্ধি থেকে বিরত রাখতেই একদা
আমাকে পাঠানো হয়েছিল ওজোনস্তরে, সেই প্রমোদভ্রমণে স্বয়ং CFCকে
প্রেরণ করা হয়েছিল আমার দেহরক্ষী হিসেবে, বলা হয়েছিল শান্তির বার্তা,
শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে সমস্ত গ্যাসীয় পরিবারে

কিন্তু আমি জানতাম না আমার তর্জনীর আঘাতে আগেই ফালাফালা হয়ে গ্যাছে
ওজন শরীর, সেই ফাঁক দিয়ে নিরন্তর লক্ষ লক্ষ অতিবেগুনি বুদ্ধি
প্রবেশ করে চলেছে পৃথিবীতে, আমার এই দেহকে রক্ষা করতে নয়
বিষিয়ে দিতে পাঠানো হয়েছে কার্বনের সেই সহোদরকে

আজ বিষাক্ত হয়ে যাওয়া শরীরে
প্রেমের লাল রং ধারণ করতে আমার ভয় হয়,
দীর্ঘকাল ধরে রক্ত গুনতে গুনতে
এই হাজার তিনেক বছর হলো আমি ছিঁড়ে ফেলেছি সমস্ত অবগুন্ঠন,
আদিমতায় বিশ্বাস করে দীর্ঘদিন কপোতাক্ষ নদের ধারে কাটিয়েছি
শুধুমাত্র গাছের শেকড় খেয়ে, তারপর শহুরে লোকজনের দয়াদাক্ষিণ্য
পছন্দ না হওয়ায় আমি ছুটে বেরিয়েছি বিশ্বের সমস্ত নামকরা জঙ্গলের
.                                                                                              মালিকদের কাছে
শেষে
প্রবল শ্বাসকষ্টের দরুন ফোকলা দাঁত নিয়ে কেলিয়ে পড়েছি
এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ; অসংখ্য যুক্তি আর মুক্তির ছক বানচাল করে
আমি ধরা দিয়েছি শুকনো কাঠ হয়ে, জ্বালানি হিসেবে ফিরে গেছি ঘরে ঘরে,
তোমাদের রন্ধনপ্রণালী সচল রাখতে নিজে হাতে করে আহুতি দিয়েছি
নিজের প্রতিটা প্রত্যঙ্গ এবং আবারও

সেই বিষ, কার্বনপোড়া বিষাক্ত সেই ধোঁয়া হিসেবে উড়ে গেছি পুরনো মহাকাশে
তবু কোনো সৌরজগত আমায় গ্রহণ করেনি, ছায়াপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে
কয়েকজন পথিককে ডেকে জিগ্যেস করে জেনেছি, কিন্তু
সঠিক পরিচয়পত্র না থাকায় আমায় জায়গা দেয়নি কোনো সরকারী আবাসন
বিষের ভয়ে বেসরকারি সব হোটেল মুখে মাস্ক পরে প্রত্যাখান করেছে আমায়,
শেষে ক্লান্ত অবসন্ন দুই ডানা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলাম পথের ধারে,
সকাল হবে, সূর্য উঠবে — এই আশা করতে করতে কখন যে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি
বুঝতে পারিনি, আর সেই মোক্ষম সুযোগে
আমার সকল নিশ্বাসকে জোড় করে টেনে হিঁচড়ে এনে সারা আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে
কোনো এক মাতাল দুষ্কৃতী, তার আঘাতে বিভিন্ন গ্রহে উপগ্রহে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে
যাকে কেউ কেউ কলঙ্ক বলে ডাকে আজকাল, পৃথিবীসহ আরও কয়েকটি গ্রহের
অরণ্যে লেগেছে দাবানল যার কারণে পৃথিবীর মতো উন্নত দেশের
সম্পত্তির ক্ষতি হলেও কিছু কিছু দেশের মানুষ দাবানল শেষে পশুর পোড়া মাংস খেয়ে
উল্লাসে ফেটে পড়েছে বলে শুনেছি

তবু সেসব খবর আমার কাছে পৌঁছে দেয়নি কোনো মহাকাশযান
বিষের ভয়ে কোনো পৌরসভাকর্মীও সরাতে আসেনি আমার দেহ
শুধু সকালের অপেক্ষায় ঘুমোতে ঘুমোতে তোমাকে জানানোই হয়নি
প্লুটোর সাথে আমার আনারস সম্পর্ক – খেলেই গাল চুলকায়

সত্যি কথা বলতে, এতদিন বলার সাহসও হয়নি, অথচ তোমাকে বিশ্বাস করেই
কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই
ওগুলো রক্ত হয়ে গেলো, আর আমি মানুষ!
সত্যি বলছি – ওগুলো আমারই হাসি, আমারই কান্না, আমারই নিঃশ্বাস,
ওগুলো উল্কাপাত নয়, তুমি ভুল ভাবছো…

সৌরভ বর্ধন। কবি। জন্ম ১৯৯৪ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়া জেলার শান্তিপুরে। স্কুলবয়স থেকেই কবিতা লেখার শুরু। যদিও সিরিয়াস কবিতাযাপনে অনেক পরে আসা। বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন লিটিল ম্যাগ ও ব্লগজিন, ওয়েবজিনের নিয়মিত লেখক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

অহমিকা

অহমিকা

অহমিকা আত্মগরিমায় আজ অন্ধ হয়ে আছো, বিবেকের দংশনে মননে নেই বিশ্বাস। কর্মে ব্যস্ততা সময়ের আবর্তে…..