বোরকার মিছিল

দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
বোরকার মিছিল

নব্বই দশকের ঘটনা। ভোটের সময়। বামপন্থীদের রমরমার ওই আমলেও বিহার-ঝাড়খন্ড ঘেঁষা কয়লাখনির শিল্পাঞ্চল আসানসোলের বহু জায়গায় বামেরা কোনঠাসা। হ্যাঁ আমরা, কেননা তখন বামপন্থী রাজনীতি করি। আমি তখন শহরের এক কানা গলির তস্য কানাগলির ভেতরে অবস্থিত এক স্কুলের বুথের সামনে। ওখানে দাঁড়িয়েই খবর পেলাম আমার এক দাদা কাম নেতা কমরেডকে খুব পিটিয়েছে বড় রাস্তার ওপর। মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলো এরকম গলিসর্বস্ব হয় কেন? যাতে কোনো গাড়ি ঢুকতে না পারে তার জন্য কি? দূর্ভেদ্য সেই গলির ভেতরে আমি তখন অভিমন্যূ। এক মুসলিম কমরেড (আমাদের দেশে বামপন্থীরা নিছক কমরেড কোনোদিনই হন না) বলল, দিপু তুম নিকাল যাও। নিকাল যাও বললেই কি নিকালো যায়? আমি পুলিশদের বগল দিয়ে টুক টুক করে এগোচ্ছি। এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন, বেটা মেরা সাথ আ যাও। ভদ্রমহিলা ওই দীর্ঘ গলিপথ তাঁর নিজস্ব সুরক্ষাবলয় দিয়ে আমাকে পৌঁছে দিলেন বড় জনশূন্য রাস্তায়। সেদিন বোধহয় কৃতজ্ঞতা জানানো হয় নি। ফিরে গিয়েছিলাম নিজস্ব বৃত্তে।

আচ্ছা ভদ্রমহিলা কি বোরকা পরেছিলেন? না। সেই স্নেহময়ী মাতৃমুখটি যে আমার এখনো মনে আছে।

এ এক আজব শহর! এই এত মিলমিশ পরক্ষণেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। যদিও শহরটা এরকম ছিল না অন্তত আমাদের ছোটোবেলাগুলোতে বা বড় হয়ে ওঠার সময়গুলোতে। মাঠে ময়দানে, সিনেমা হলে, ধর্ম নয় বিনোদন-ক্রিয়া – এগুলোই প্রধান হয়ে উঠতো। এখন হিন্দু মুসলিম উভয়ই ধোঁয়াধূলো থেকে বাঁচতে মুখ ঢেকে ঘুরে বেড়ায়, – তখন কিন্তু এত বোরকার রমরমা ছিল না। বাঙালি মুসলিমরা তো পরতই না, বিহার, ইউপির মুসলিমরাও কম পরত।

ঘটনাচক্রে আমি একজন দোকানদারও। যে রাস্তায় আমার দোকান তার কাছেই বাঙালি-অবাঙালি মুসলিমদের দু’দুটো মহল্লা। মায়েরা আসে, মেয়েরা আসে, আমি তাদের নাম জানি, মুখ চিনি। তারা হাসলে বুঝতে পারি, রাগ করলেও বুঝতে পারি। হ্যাঁ, চিনি কণ্ঠস্বরও। এক প্রগতিশীল মুসলিম ভদ্রলোক, কর্পোরেশনের কর্মী, বামপন্থী ইউনিয়ন করতেন। তাঁর দুই মেয়ে, এক ছেলে। সোনার টুকরো ছেলেমেয়ে সব। দারুণ পড়াশোনায়। নম্র ভদ্র এবং সুন্দর। ছেলেটি হঠাৎ দেখলাম লম্বা দাড়ি রেখেছে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। তখন মৌলবি শিক্ষা নিচ্ছে। কলেজে পড়তে পড়তে মেয়ে দুই জনারও বিয়ে হয়ে গেল। ভদ্রলোকও তখন কর্পোরেশন থেকে রিটায়ার করে লম্বা দাড়ি রেখেছেন। এর পরবর্তী সময়ে আমি দোকানে বসতাম না। কর্মচারী ছিল। আমি বেশ কয়েক বছর তখন মুদ্রণ ব্যবসা আর সিকিমে হোটেলের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার পর দোকানে আবার নিয়মিত হই। একটি বোরকা পরা মেয়ে তার বাচ্চাকে সাথে নিয়ে আসে, এটা ওটা কেনাকাটা করে, দু’চার কথা হয়, আমার ভালোমন্দ জানতে চায়। জিজ্ঞাসা করি, তোর কোথায় বিয়ে হয়েছে? বলে, বার্ণপুরে। তারপরেই প্রশ্ন করে, বলতো আমি কে? আমাকে ভাবতে হয় না। বলি, শিউলি। চিনলে কী করে? ওকে কী করে বোঝাই কণ্ঠস্বর কি বোরকা দিয়ে ঢাকা যায়!

জার্মানির বার্লিন থেকে অংশুমালীর সম্পাদক ও প্রকাশক জোবায়েন সন্ধি ভাই নারী দিবস নিয়ে লিখতে বলেছিলেন, তাও ক’টার সময়! ভারতীয় ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে-বারোটা একটা। মৌতাতে ছিলাম – ঘুমও আসছে – এই অবস্থায় হ্যাঁ তো করে দিলাম। মানে বললাম, চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার মতো একজন কনফার্ম ব্যচেলারের পক্ষে এই বিষয় নিয়ে লেখা যে কতটা কঠিন যদি বুঝতেন সন্ধি ভাই!

আরে ভাই সেই ছোট থেকে আমাদের যৌথ পরিবারে অনেক নারী। কমবয়সে স্বামীহারা, জ্যেষ্ঠ পুত্রহারা আমার ঠাকুমাকে দেখেছি ঈশ্বরের পরিবর্তে নিজের স্বামী-বাবা-মা-শ্বশুরদের প্রণাম করতে। একটা চব্বিশ জনের পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী হয়ে দাপটের সঙ্গে সংসার চালাতে। সংসার চালাতে মানে নির্দেশ দিতে। আর মাত্র ন’বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া সেই মানুষটা যখন প্রকৃত অর্থেই বুড়ি হয়ে ছোট্ট একটা মানুষ, প্রাণ আছে অস্পষ্ট চেতনা নিয়ে, সেইসব দিনরাতে পাশের খাটে আমি। প্রত্যক্ষ করছি বুড়ি চেতনায় আর তার শ্বশুর বাড়ির সাথে সাথে গাছকোমর করে পরা শাড়িতে তার বাপের বাড়ির কুলগাছে। এক কুয়াশাচ্ছন্ন প্রাচীন নারী শরীর যখন অন্তিম যাত্রায় তখন নিভৃতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে বাড়ি, বাগান, উঠোন…

মাকেও দেখেছি নিঃশব্দে চব্বিশ জনের হাঁড়ি ঠেলতে, বিধবা জেঠিমাকে দেখেছি স্বামী-পুত্রদের ওপর রাগ করে না খেয়ে, না খেয়ে নিঃশব্দে জীবন ত্যাগ করতে, অন্য জাতে বিয়ে করা পিসিমাকে দেখেছি সংসার চালাতে কী সঙ্কোচে ভায়েদের কাছে থেকে গোপনে অর্থ নিতে, চাকুরিরতা কাকিমাকে দেখেছি কী কৌশলে নিজেরটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে। কিন্তু এসবই প্রাচীন কথা, সময় এর থেকে অনেক বেশি দ্রুতগামী। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নারী তার স্বাধীন ইচ্ছেগুলোকে কি সত্যিই ডানা মেলে দিতে পারছে। অথচ পুরুষও তো ঠিক আগের মতো নয়। রেগে গেলে বাবার কাণ্ডজ্ঞান থাকত না খাবার থালা ছুঁড়ে ফেলতে দু’মূহুর্ত ভাবত না। সেই তথাকথিত পুরুষসিংহও তো নেই। নারী তো এখন শিক্ষায় দীক্ষায় সর্বোচ্চ শিখরে। সংসারও তার মুঠোয়। তাহলে সংকটটা কোথায়?

সংকটটা আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চেতনায়, এবং যা আছে নারীর চেতনাতেও সেও পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণাকে লালন করতে ভালোবাসে। সামাজিক, ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান যা নারীকে হেয় বা নিম্নস্তরে প্রতিস্থাপন করেন সেইসব কর্ম প্রতিষ্ঠিত নারীও মেনে চলেন। কেন না, তাঁরা ধর্ম মেনে চলেন, সেই ধর্ম যা সেই প্রাচীনকালের বদ্ধ ভাবনা চিন্তার ফসল। আর তাই অন্য জাত বা ধর্মে বিয়ে করলে কন্যা সন্তানকে জ্বালিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না, ধর্ষিতা কন্যা মারা গেলে ঘরের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

আর ঠিক এই জায়গাতেই রাজনীতির কথা আসে। আজ দুই বাংলার প্রধান মহিলা, অথচ নীচের প্রত্যেকটি স্তরে বিপূল শূন্যতা। যারা আছেন তারা এসেছেন অমুকের বোন, অমুকের বৌ, ইত্যাদি রেফারেন্সের সৌজন্যে। কলেজে যারা নেত্রীরূপে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তাদের অনেককে পরবর্তী সময়ে আমি খুঁজে পাইনি। মহিলা সংরক্ষণের ফলে যারা ক্ষমতা পেয়েছেন তাদের অনেকের কাছে নারীর মুক্তির থেকে অনেক বেশী গুরুত্ব পেয়েছে সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য – কারণ তারা কোন ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন নি।

ভারতে হিন্দু নারী আর মুসলমান নারীর চালচিত্র এক নয়। আমার শহরে সেই অর্থে মুসলিম নেত্রী তো আমি দেখিনি। যাঁরাই ক্ষমতাই এসেছেন তাঁরা অমুকের বউ অথবা…।

বাবরি মসজিদ ঘটনার পরবর্তী সময়েও বোরকার প্রচলন বাড়েনি এ শহরে। এর প্রচলন মাত্র দশ বছরের ঘটনা। ধর্মের আকচা-আকচি বাড়ার সাথে সাথে, মন্দির মসজিদের শ্রীবৃদ্ধির সাথে সাথে, গৈরিক আর সবুজ পতাকায় শহর ঢেকে যাওয়ার সাথে সাথে, জুলুস, শোভাযাত্রা, ঘণ্টাধ্বনি আর আজানের ডেসিবেল বাড়ার সাথে সাথে শহরটাও বোরকায় ঢেকে গেল।

এ শহরে তিরিশ শতাংশ মুসলিমের বাস। স্বাভাবিকভাবেই এন.আর.সি, সি.এ.এ. নিয়ে আন্দোলন হবে এটাই স্বাভাবিক। যদিও এই আইনগুলো ‘যতটা তড়পায় ততটা বর্ষায় না’ গোছের। যা নিয়ে কারো দুঃশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এদেশে আইন প্রণয়ন হয়, আইন ভাঙার জন্য এবং শেষমেষ যথাযথ পালন হয় না বা জনসংখ্যার চাপে সবই বিসর্জনে যায়। আর এই আইন তো চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক আইন – যার একমাত্র লক্ষ্য আগামী পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম ও হিন্দু ভোটকে বিভাজিত করা। আর ভীত মুসলিমকে কেন্দ্রীয় শাসকদলের ছাদের তলায় আসতে বাধ্য করা। নইলে দেশবিভাগের এতোকাল পরে এই আইন প্রণয়নের কোন প্রয়োজনই পড়ত না। বিরোধীরাও শাসকের এই ফাঁদা পাতে পা গলিয়েছে যেমন দিল্লির দাঙ্গায় কেজরিওলাল।

যাইহোক জিটি রোডের ধারে অবস্থান আন্দোলন চলছিল। হিন্দি, উর্দুতে পুরুষকণ্ঠের তুমুল বক্তৃতা। যাওয়ার পথে যেটুকু কানে আসে শুনি, একদিন শুনি মেয়েরা শ্লোগান দিচ্ছে – কানহাইয়া কুমারের আজাদির শ্লোগান। মিডিয়া, ইন্টারনেটে বহুল প্রচারিত শ্লোগান। ভাবলাম এরা সেই অনুকরণ করেই যাবে। যাক তাও তো মেয়েরা অবস্থানে বসছে। এটাই অনেক পাওয়া। আর একদিন দাঁড়িয়ে গেলাম – একটি কম বয়সি মেয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। জ্বালাময়ী কণ্ঠস্বর। মন ভরে গেল। আর একদিন অনেকগুলি মেয়ে। তারপর এল সেইদিনটি যেদিন আমি প্রত্যক্ষ করলাম, আমার একান্ন বছর জীবনে প্রথমবার, কোনো রাজনৈতিক কারণে মুসলিম মহিলারা নেমে এসেছেন রাস্তায়… এক দীর্ঘ মিছিলে … বোরকা পরা এবং বোরকা ছাড়া – শ্লোগানে মুখর এক দীর্ঘযাত্রায়…

দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। কবি লেখক ও সম্পাদক। জন্ম ও নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ