ব্যাঞ্জো

অনসূয়া যূথিকা
গল্প
Bengali
ব্যাঞ্জো

জ্যোৎস্নায় প্লাবিত হচ্ছে চরাচর, শ্রাবণ মাসের জ্যোৎস্না৷ চাঁদ বানু জানেনা এই দিনের গুরু পূর্ণিমার ইতিহাস। সে কেবল আচ্ছন্ন হয়ে ডুবে আছে ঘর ভেসে যাওয়া জোছনার বানে৷ যেন কোন চন্দ্রাহত যোগিনী! সে জানেনা এখন সময় কতো, রাত না দিন। জানে না দিনের হিসেব, দিন-ক্ষণ-বারের হিসেব রহিত হয়ে পড়ে আজ শয্যায় দিনের পর দিন।

চাঁদ বানু, জানে না সে যে স্বপনে বিভোর। সে গভীর থেকে গভীরে ডুবে গিয়ে শুনছে ব্যাঞ্জোর আলাপ৷ এই চাঁদনি পসর রাত্রিতে কে যেন ব্যাঞ্জোতে ঝালা বাজাচ্ছে! কে সে? কে ওই যোগী তাপস! সে কি সেজো কাকা! ব্যাঞ্জোতে কী রাগ বাজাচ্ছে বুঝতে পারছে না চাঁদ। কেবল দেখতে পাচ্ছে একজন পাগড়ি পরে বসে আছে উল্টো দিকে ফিরে, আধো আলো আধো ছায়াতে কেবল দেখতে পাচ্ছে সে কে একজন নিমগ্ন হয়ে বাজিয়ে চলেছে ব্যাঞ্জো৷ চাঁদ তা দেখছে আবার দেখছে না কেবল শুনে বুঝতে পারছে কি বাজনা সেটা। চাঁদ স্বপ্নের ভিতরেই আরেক জগতে চলে যায়। ভেসে আসে ছোটবেলাকার দিন, তার বাপের বাড়ি।

সুরমা পাড়ের কাঠের দোতলা বাড়ি, মেহগনি আর হিজলের ছায়া ঘেরা বাড়িটা। তার আজন্মের নীড়! শীতের সকালের মিঠা রোদে পিঠ মেলে বসে এস্রাজ বাজাচ্ছেন বাবা! এখুনি মা আসবেন নীল সাদা শাড়ির আঁচল নাড়িয়ে, সব যেন মুখস্ত, যেন ছায়াছবি। হালকা নড়ে উঠে ছায়াছবি, মা আসছেন৷

চাঁদ স্বপ্নের ভিতরেই তাঁকে দেখে চমকে জেগে ওঠে। ব্যাঞ্জো আর এস্রাজের শব্দ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যায়!

প্রচন্ড কষ্টে ককিয়ে উঠে চাঁদ, আমাদের চাঁদ বানু৷ চন্দ্রাণীর বদলে চাঁদ, অধিকারী বাড়ির বদলে খোনকার বাড়ির ভিতর মহলের নাসিকা গর্জন শুনতে পায় চাঁদ। সে যে কখনো চন্দ্রাণী ছিল তা আজ বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে যেন উঠে আসতে চাইছে। নিজের অক্ষম হাত-পাগুলোকে যদি গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যেতো মৃত্যুর দিকে তাই ভাবে৷ ভাবে আর কাঁদে কাঁদে আর ভাবে।কী দেখলো সে স্বপ্নের ঘোরে, কাদের দেখলো! ইহজনমে আর তো দেখা হবে না তাঁদের সাথে। গতকালই খবর পেয়েছে চাঁদ, দূরের এক খুড়তুতো দাদা ফোন করেছিলেন চাঁদ ওরফে চন্দ্রণীকে খবরটা জানাতে৷ জেনেছে চন্দ্রা তার সেজকা মারা গেছেন। ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছিল কিন্তু বাঁচানো গেলোনা তাঁকে। একদিন পরে লাশ এনে সুরমার তীরের সেই বাড়ির শ্মশানে ঠাঁই পেঁয়েছেন সেজকাকা। আর কখনো কোনদিন যার হাতে ব্যাঞ্জো উঠবে না৷ তবুও কেন তিনি স্বপ্নে এলেন!

চাঁদ বানু জানে না কেন গত জন্মের স্মৃতির মতো জেগে ওঠে আরেকটা জন্মের স্মৃতি মনে, কেন আসে তারা তার স্বপ্নে!? এক পৃথিবীর বাসিন্দা হলেও তাদের ভূবন আজ ভিন্ন ভিন্ন!

চন্দ্রাণী অধিকারীর বদলে চাঁদ বানু এখন খোনকার বাড়ির প্রবাসী ছেলের বউ৷ সেই ছেলের টাকার গরমে তার সব কুকীর্তি আজ ঢাকা পড়ে গেছে৷ সকলে ভুলে গেছে এককালের তুখোড় সন্ত্রাসী, সিলেট শহরের কুখ্যাত ওয়াগনব্রেকার জসিমের নাম।

এখন সে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, দুবাই থেকে পাঠানো পেট্রোডলারে গ্রামে উঠেছে পাকা দালানের চকচকে কাঁচের টালি বসানো মসজিদ। লোকে ভুলে গেছে জসিমের বিগত দিনের ইতিহাস। ভুলে গেছে হিন্দু বাড়ির মেয়েকে বিয়ের লগ্নে বিয়ে বাড়ি থেকে তুলে এনে ধর্ষণের ঘটনা! গ্রামীণ শালিসে বিচার চেয়েছিলেন এলাকার নামকরা গায়ক, অধিকারী বাবু। কিন্তু ফয়সালা তিনি পেলেন বড় মজাদার। মেয়ে যখন লগ্নভ্রষ্টা হয়েই গেছে, তাদের কথামতো যখন সে ধর্ষিতাও তখন যার সাথে ঘটনা সেই জসিমের সাথে বিয়ে হোক! । গ্রাম্য শালিসের ফয়সালা মতে চন্দ্রাণী হয়ে গেলো জসিমের বউ, নতুন জন্ম হলো চাঁদ বানুর।

খোনকার বাড়ির বড় পুকুরটাও চন্দ্রার জীবনের জ্বালা জুড়াতে পারলো না। দুইবার নিজের জীবন শেষ করতে চেষ্টা করেছিল সে, পারলো না। জগদ্দল পাথরের মতো ভারী জীবনটাকে একা একাই টানতে বাধ্য হলো সে। ভুলে গেলো গান, ভুলে গেলো প্রাণের এস্রাজ, ভুলে গেলো হাসি। সে কেবলই যেন বাচ্চা তৈরী করবার একটা মেশিনে পরিণত হলো! একে একে ছয়টা মৃত বাচ্চার জন্ম দিলো চাঁদ। বছরের পর বছর ধরে অগন্তি দিন ধর্ষিত হতে হতে নিজেকে মানুষ ভাবতে ভুলে গেলো চাঁদ বানু! খোনকার বাড়ির ভিতরের খিড়কির দুয়ারের পাশে থাকা পুকুরটা ভরা পানাতে। তারই পাশে বাঁশ ঝাড় লাগোয়া কবরগাহ।

তাতে একে একে জায়গা হলো চাঁদের মতো ফুটফুটে কিন্তু নিথর ছয়টি দেহের। চাঁদের সন্তানেরা কেউই পৃথিবীর আলোতে চোখ মেলে না, শ্বাস নেয় না। পৃথিবীর পথে আসতে আসতেই স্রষ্টার দেয়া শেষ দমটুকু তাদের ফুরিয়ে যায়, মা বলে ডাকবার তাকে দেখবার শক্তিটুকুও তাদের থাকে না।

যে বাপ তাদের দুনিয়ায় আনতে এতো তাড়াহুড়ো করে তার আছাড়ি পিছাড়ি কান্দনের আহাজারিটুকু দেখবারও যেনো ফুরসত নাই তাদের।

রাতের বিছানায় জল্লাদের মতো কঠোর রূপ যেই পুরুষের দিনের আলোতে সেই কাঁধে হাজি রুমাল জড়ানো জসিম উদ্দিন খোনকার। আজো নিঃসন্তান, বছর বছর মৃত সন্তানের জন্ম দেয়া চাঁদ বানুর সহর, তার স্বামী তার ইহকাল পরকালের মালিক। লোকটার কান্না দেখে আর চাঁদ বানু ভাবে আটকুড়া বেটার এখনো ফরজনের এতো সখ! পরিবার গঠনের জন্য সে আরেকটা বিয়ে করলেও বরং চাঁদ বানু শান্তি পেতো। এরকম বছর বছর তাকে মৃত সন্তান প্রসব করতে হতো না৷ লোকটা ডাক্তারের কাছেও যাবেনা।

একটা সন্তানের জন্ম এবং মৃত্যুর ধকল না সামলাতেই আরেকটাকে দুনিয়াতে আনতে চায় চাঁদ বানুর স্বামী, জসিম উদ্দিন খোনকার। এই ধকলে চাঁদ বানু শয্যা নেয় তবুও তার ছুটি নাই। সাত নম্বর বাচ্চা পয়দা করতে কট্টর অবস্হান নেয় জসিম খোনকার, বাচ্চা তার চাইই চাই এবং ছেলেই হতে হবে। ভিতর মহলে যথেষ্ট তম্বিহ করে খোনকার সাব। সকলকে জানান দেন তার মনের খায়েশ। মোটামুটি চাঁদ বানুর খাওয়া খোরাকির অবস্হা কিছুটা ভালো করে তার শাশুড়ি আম্মা। তবুও বিধির বিধান কে খন্ডাতে পারে!

আজ সাতদিন হলো চাঁদ বানু প্রসব করেছে। এবার আবারও কন্যা সন্তান তবে মৃত সন্তানের বদলে এবার জমজ কন্যা সন্তান৷ একটা অবশ্য জন্মের সাথে সাথে কেঁদেছে, তারপরে শেষ। আরেকটা পেটেই ছিল। গ্রামের দাঈমা তার যথাসাধ্য করেছেন। ফুল মুচড়ে ধরেছেন, গরম জলে কচলেছেন। তবু বাঁচানো গেলো না কেঁদে উঠা চাঁদ বানুর চাঁদের কণার মতো কন্যাকে। এরপরে হুলুস্থুল পড়লো পেটে থাকা আরেকজনকে নিয়ে। সে পেটেই মরা আর ছিল উল্টোভাবে। দাঈ বারবার করে বলাতে জসিম খোনকার অগত্যা চাঁদ বানুকে চনগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে রাজি হলেন। পথেও দাঈ তার চেষ্টা অব্যাহত রাখলো। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর আগে আগে পথেই চাঁদ বানু তার গর্ভস্হ মৃত সন্তানের হাত থেকে নিস্তার পেলেন৷ জসিম উদ্দিন খোনকারের খায়েশ মিটিয়ে চাঁদ বানু পুত্র সন্তানের জন্ম হলো। কিন্তু মরা, এক হাত ভাঙা ঘাড়টাও গ্রামের নামী দাঈ এর কল্যাণে মটকানো।

জসিম উদ্দিন খোনকার, ফের বিয়ে করবেন বলে পাত্রী দেখছেন। পাত্রীকে স্বাস্হবতী হতে হবে, একই সঙ্গে সুন্দরীও। বছর ঘুরতেই যেনো খোনকার বাড়িতে পুত্র সন্তানের কান্না শোনা যায়। চাঁদ বানু শুনেছেন সব, জসিমের বিয়ে নিয়ে বাড়ির শোরগোলও তার জানা। কেবল জানেনা সে কবে সুস্হ হবে। শেষবারের প্রসবের জটিলতা নিয়ে এ বাড়ির কেউই চিন্তিত না। চাঁদ বানু কষ্টকর প্রসবের পরে অজ্ঞান ছিল। সে জানেনা কেমন করে তার প্রস্রাবের রাস্তা যোনির সাথে মিশে গেছে। সারাদিন ধরে তার কাপড় ভিজে থাকে, প্রস্রাবের বিকট কটু গন্ধে সে ডুবে থাকে। জসিম খোনকারের মতো প্রেমিক পুরুষও আর তার কাছে ভিড়ে না।

গ্রামের স্বাস্থ্য কর্মী একবার দেখে গেছে চাঁদ বানুকে। বলে গেছে বড় ডাক্তার দেখাতে। চাঁদ বানু জানে না তার এই অসুখের নাম ফিশ্চুলা।

প্রসবের সময় দাঈ মহিলার অস্বাভাবিক কান্ডের কারণে তার এই হাল। জানেনা UNFPA এর ২০১৬ সালের জরিপ অনুসারে সারা বাংলাদেশের মোট ২০ হাজার রোগী ফিশ্চুলা আক্রান্ত, প্রতি বছরই যা বাড়ছে।

চাঁদ বানু কেবল ভাবে, জসিম উদ্দিন খোনকার যেনো তাকে এই ঘরে একটু জায়গা দেন। একটা কেন আরো একাধিক বিয়ে তিনি করুন কিন্তু চাঁদের সাথে এইটুকু সহৃদয়তা তিনি যেনো দেখান৷ চাঁদের বাপ নাই মা নাই নাই কুল! এখনতো সেজকাকাও নাই কে তারে আশ্রয় দেবে। চিকিৎসা করতে অনেক অনেক টাকা খরচ হবে, তা যদি জসিম নাও করেন তবুও অন্তত তাকে একটু ঠাঁই দিন ঘরের এককোণে।

সপ্তাহ যাবৎ জসিম খোনকার নতুন বিয়ে করে বউ ঘরে এনেছেন, পনেরো বছরের ফুল বানু। মৃতবৎসা, সারা গায়ে প্রস্রাবের গন্ধ মাখা চাঁদ বানুকে তিনি বাপের বাড়ি পাঠান নাই। চাঁদের জায়গা হয়েছে গোয়াল ঘরের পাশের খালি ঘরে! রাত গাঢ় হতে হতে আরো গভীর হলে চরাচার ব্যপী জ্যোৎস্নার প্লাবনে ডুবতে ডুবতে চাঁদ সেজকার বাজানো ব্যাঞ্জোর ঝালা শুনতে পায়! তখন সে চাঁদের সঙ্গে দেয়ালি করে, চাঁদ বানু থেকে ফের চন্দ্রাণী হয়ে যায়!

অনসূয়া যূথিকা। লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। জন্ম ও নিবাস বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..