ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের দু’টো অণুগল্প

ব্রতী মুখোপাধ্যায়
অণুগল্প
Bengali
ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের দু’টো অণুগল্প

ডিপেন্ডেবল

ইলোরা স্থির করতে পারেনি আর্টস না সায়েন্স, রোগা আর লম্বা না গোলগাল আর মাঝারি, আনসেভড না ক্লিনসেভড, এটাকিং না ডিফেন্সিভ, লেফট আউট না রাইট আউট,
পার্থ না দেবাশিস।

সমস্যা দুজনেরই। ইলোরার যেমন, তার বাবা সুধন্যরও তেমনি। তবে সমস্যা একই রকম না।

সুধন্য নেতাজী গ্রাউন্ডে ফুটবলের কোচ। কোচ, তবে অবৈতনিক। স্বেচ্ছাশ্রম বা আনন্দশ্রম বলা যায়।

সুধন্যকে কেউ নেতাজী গ্রাউন্ডের দায়িত্ব নিতে বলেনি, নিজেনিজেই নিয়েছে, তাও যখন পার্থ বা দেবাশিসরা ক্লাস সিক্সের ছাত্র ছিল।

আরও অনেক বাচ্চা রোজ বিকেলে মাঠে আসত। পার্থ আর দেবাশিসকে আলাদা করা যেত। ফুটবলের জন্যে তাদের ইনবর্ন প্যাশান ছিল, কলকাতা মাঠের খবর জানত, ইংল্যান্ড মাঠের খবরও জানত, ওয়ার্ল্ড কাপেরও।

সুধন্য দুজনকেই ভালোবাসত। দুজনেরই তার ঘরে বিনা বাধায় প্রবেশের অধিকার ছিল। সুধন্যের স্ত্রী সাধারণ মা-মাসি যেমন। ইলোরা সুধন্যদের মেয়ে।

পার্থ আর দেবাশিস এইচ এস দিয়েছে। দুজনকে সবাই বলত জিগরি দোস্ত।

সুধন্য পড়েছে বিপদে। খেলার মাঠে দুজনে আর সেম সাইডে খেলছে না। চান্স পেলেই ফাউল করছে। বল ছেড়ে পায়ে মারছে। তবে এমন মারবে যে দেবাশিসকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, পার্থ দেবাশিসকে হাসপাতালেও দেখতে আসবে না, সুধন্য এতদূর ভাবতে পারেনি।

সামনেই ইনটার-ডিস্ট্রিক্ট, সুধন্য কল্পনায় দেখতে পায় পার্থ লেফট দিয়ে এটাকে যাচ্ছে, দেবাশিস রাইট দিয়ে এটাকে যাচ্ছে, চমৎকার বোঝাপড়া, সিওরফায়ার, আর তারপরই অপ্রতিরোধ্য
গো-ও-ও- ও-ও-ও-ল!

দেবাশিস জিজ্ঞেস করল— পার্থ আসেনি?
সুধন্য বলল— আমি নিজে কল করেছি।
দেবাশিস বলল— বলুন আমি ডেকেছি। অনেক হয়েছে।

ইলোরা সব শুনছিল। ফিমার বোন ভেঙেছে। হাসপাতাল থেকে কালই ছেড়ে দেবে। দেড় মাসের ধাক্কা।

সুধন্যর মাথা এখনো কালো। সেখানে মাঝেমাঝে হাত চলে যায়, যায় যখন চিন্তায় পড়ে।

পার্থ এসে দাঁড়িয়েছে। দেবাশিস টের পেয়েছে। ইলোরা ফ্যানের নিচে ঘামছে।

সুধন্য বলল— রাইট আউট বসে গেল। এখন আমি ডিপেন্ডেবল আরেকজন পাই কোথায়?

ডিপেন্ডেবল!

ইলোরা।
দেবাশিসের চোখ দেখে বুঝতে পারছিল যেকোনো দিন ফুল হাতে হাঁটু মুড়ে বসবে, তবে পার্থর চোখমুখ ভাবভঙ্গিতে প্রশ্ন মুখ ফুটে বলতে হবে কেন।
পার্থ না দেবাশিস, কে বেশি ডিপেন্ডেবল, ইলোরা বুঝে উঠতে পারেনি।

বুড়োর গল্প

বুড়োকে নিয়ে নিখিলদের হয়রানির শেষ নেই। তার জ্বর আসে। সারাদিন যেমন তেমন, সন্ধে নামলেই জ্বর বাড়ে। নিখিলরা ডাক্তার দেখায়। ডাক্তার ওষুধ দেয়। তারপর একসময় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে।

বুড়োর ক্লাস টু। জ্বর হলেই বায়না ধরে— গল্প বলো।
নিখিল গল্প শোনায়। নিখিলের বউও গল্প শোনায়। ঠাকুরমার ঝুলি, লীলা মজুমদার, চাঁদের পাহাড়, সোনার কেল্লা…

একেকদিন পাশের বাড়ির হেমঠাকুরদা গল্প শোনাতে আসে। কপালে তখন জলপটি দিতে হয় না। গা-হাত-পা টিপতে হয় না। ইউটিউবের গানও শোনাতে হয় না। রানা প্রতাপের চেতক এক লাফে পাহাড়ি নদী পার হয়, ম্যান-ইটার শিকারীর বন্ধু হয়ে যায়, এলগিন রোডের বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্র উধাও…

বুড়োর একদিন ধুম জ্বর। অফিস থেকে বাবা ফিরছে না। ঝড়-বৃষ্টি তুমুল। এমন দুলছে আমগাছ, শালিখদের কাচা বাসা ভেঙে পড়বে।

তখন হেমঠাকুরদা বুড়োকে গল্প শোনাতে হাজির।
বুড়ো বলল— ঠাকুরদা! ভাগ্যিস তুমি এলে।

হেমঠাকুরদা গল্প শুরু করে। এক যে ছিল ছেলে। সে থাকত পিসেমশায়ের কাছে।

বুড়ো মন দিয়ে শুনছে। তার মা এক কাপ চা দিয়ে গেল।

পিসেমশায় চায় ছেলে পুঁথিপত্র পড়ে মস্ত পণ্ডিত হবে। এদিকে ছেলে পণ্ডিত হতে চায়ই না। সে চায় দইওয়ালা হবে। কাঁধে বাঁক নিয়ে গ্রামে গ্রামে দই দই ভাল দই বলে দুপুরভর ফেরি করে বেড়াবে।
বুড়ো ভাবতে থাকে পিসেমশায়কে বলে ইস্কুলটিস্কুল আর কখনও যাবেই না।

একটু পরে বুড়োর মা এসে গায়ে মাথায় হাত দিয়ে দেখে জ্বর নেমে গেছে।

হেমঠাকুরদার গল্পখানি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। পাঁচমুড়া পাহাড়, শ্যামলী নদী, পাহাড় থেকে নেমে আসছে ঝরনা, স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে জল থেকে উঠে আসছে মেয়েরা।
তারপর মোড়ল মশায়। ফাঁড়ির ঘণ্টা ঢং ঢং ঢং। ছেলের দল। ফুলবালিকা সুধা।

এইসময় বৃষ্টিতে কাক ভিজে বুড়োর বাবা।। হেমঠাকুরদাকে দেখে সে খুশি হয়। ভেজা কাপড় ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে বুড়োর পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গল্পে মন দেয়।

গল্পটিতে ততক্ষণে রাজকবিরাজ হাজির হয়েছে।

হঠাৎ কী যে হয়, বুড়োর বাবা হেমঠাকুরদার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বলতে গেলে কেঁদেই ফেলে— এই গল্প এইখানেই থাক, কাকাবাবু।

বুড়ো অবাক হয়— শেষ হয়নি, শেষ হয়নি, বাবা!

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ