বয়াতি

সাজ্জাদ সাঈফ
কবিতা
Bengali
বয়াতি

বয়াতি

(রাশেদ রেহমানকে উৎসর্গ)

সমস্ত গানের ভিতর
এক এক করে ঢুকে যাচ্ছে রাস্তার হর্ন-
আর, যেদিকটাতে ঘাস ও বিচালির ঘরদোর
যেদিকে সামার গিয়ে দম নিতেছে বসে
সেই পাথারে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বপ্ন, খুলে ফেলছে হেডফোন!

কেননা, এখানে হাওয়া নিজেই নিরন্ন বয়াতি
যার কাছে ভাটিয়ালি আর পল্লীর সরবতা এসে বুক খুলে দেখিয়ে দিচ্ছে
ক্ষত ও স্রোতের নিদান!

সমস্ত জলবায়ু তাকিয়ে রয়েছে
দক্ষিণের জানালা খুলে, তুমি কি তরঙ্গ-মিথ চাও? নাকি ঐশ্বর্যের কৃপা?

নাকি, পৃথিবীকে সুপার শপে হাঁটতে দেখে ফন্দি আটছো কোনো?
হাওয়ার ভিতর বাধ দিয়ে, সমস্ত রঙ-পেন্সিল তুমি কেড়ে নেবে নাকি, গ্রামের?

 

আত্মপক্ষাঘাত

(কবি রুদ্র হককে)

ঘুরে-ফিরে আসে অন্ধত্বের স্মৃতি, অহমিকা-ঢেউ লেগে অতিভাসমান তরী-
যেনো বুক থেকে ছুটে আসা বিরান হাওয়ার তোড়ে, ঝাউপাতা নড়ে গিয়ে
আড়াল করছে চাঁদ!

এইখান থেকে বেরোতে পারি না আমি, দিল-দরোজার সামনে থেকে;
কান পাতলেই নিস্কৃতিহীন রাত-জাগরণ ডাকে, পৃথিবীর দিক থেকে ডাকে স্মৃতির
পশলা!

জ্বর ঘিরে থাকা অথৈ পুষ্পকাল
শিশিরে স্নিগ্ধ করে, আমাদের, ত্রিদিক শূন্য করে-
সব যেনো বালুঝড়ে ঢাকা, ফিরে আসে পিতার ভ্রূ-কুটি;

আর, যতসব মিথ্যাকে মগজ থেকে এনে, দাঁড় করে রাখো সত্যের মতো
সরু ও সবাক ধমনীতে! যতো হাসি-করতালি, কান্নাকে মুছে ফেলা রিং-টোনে
বাজে, ততোদূর নিরাময় নাকি?

ঘুমাক সকলে, এইসব ভেবে তুমি পাথর ভরেছো বুকে?

শেষমেশ দেখো, ভুলে থাকা ভাণের ধাক্কা লেগে
সারে নাকি আত্মপক্ষাঘাত?

 

জন্মদিনের কবিতা

(কবি সুলতান স্যান্নালকে)

এই জন্ম ও জন্ম-জারক রাত্রি
টেনে ধরে আছে শেষতম নক্ষত্রকে;
ঢেউ খুলে দেখে নিলো কেউ, দেউড়ি নদীর-

এ-রকম কোনো এক রাতে, মাকে ডেকেছিলো
হাওয়া-নিরক্ষর; পণ করে যেনো খামচে ধরেছি আমি, জরায়ু-ধমনী মায়ের।
এই জন্ম ও জন্মবিধৌত স্বপ্নকে ডেকে
হৃদয়ে চেয়ার পেতে বসতে দিয়েছেন বাবা-

আমি নির্বোধ, থমথমে; যেনো কোনো ঝড়ে বিষুবতলায়, জমেছে আয়ুর মেঘ!
বাবা ডাকছেন, জন্মকে একটি একটি করে স্মৃতি বুঝিয়ে দিয়ে;

বাবা ডাকছেন, বুকের ভিতর হতে
আলপথ বের করে, ছুড়ে দিচ্ছেন এইদিকে, এই দিকটায় আমি;

এই ত্রিদিক মেঘের ভিতর মাকে
দেখি নাই হাস্যোজ্জ্বল, দেখি নাই কতকাল!

চলে তো যাবোই

(কবি জাহিদুর রহিমকে)

যাবার কথা হিলহিলিয়ে, যেনো শনপাপড়ির বাকশোভর্তি লাল-
এইদিকে যাত্রাপথ, মুখ ঘুরিয়ে কান্না লুকায় নাকি?

গাল বেয়ে নামে রোদ, ফিরে যায় বাগানে আবার-
কোথাকার জল আমি, কোথায় নেমে, গড়িয়ে গিয়েছি ভেসে!

কেনো বলো তবে আধাআধি বাঁচা? করুণাগাত্রে হাত?
চলে তো যাবোই, চোখ তুলে দেখতে পাবে না স্মৃতি?
চাপকল-পাড়, রেডক্লিফ-পেন, ঘুণ ধরে গিয়ে আলগা লাগছে আকাশ!

ধরো, তোমাদের প্রজন্মের দিকে এসে, দেয়ালে হেলান দিয়ে, ধার করছি আগুন;
অন্ন ও কাধের চাদর, তা’ও; এতোসব মায়া ও মোলায়েম ধানের গোছা, এমনিতে যেতে দেবে?
এরই ভিতর, দৃশ্য জুড়ে ক্ষত ও খরার দাগ, বিধিবাম!
এতোসব আধাআধি বাঁচার গ্রামার, নিঃস্বতা, কাছে এসে হাত চেপে ধরে!

সবকিছুকেই চিহ্ন-বন্দী রেখে যাবো ভাবি, জানো?
সব চিহ্নের ক্যালিওগ্রাফি, নিত্য কালেমা-সহ
নাম-ফলকে, লিখে-লিখে রেখে, কোথাকার জল যেনো
কোথাও গড়াবো, বিরাম-বিহীন, আজান শোনাবে গ্রহ?

মরচুয়ারির ফাটল

(কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজকে)

হ্যাংলা গায়ে ঠান্ডা হাওয়ারা এসে
ঢুকছে বুকের কেজটার আশেপাশে;
শীতের গল্পেরা কতো কতো দিন ঘুরে
ঢুকে যাচ্ছে, নিজেরা নিজের ঘরে-
শীতে কতোভাবে কাঁপতেছে চাঁদ একা;
ভাজ ভেঙে নামে আকাশ-বলাকা!

রেল-গুমটির কাছে এলে দেখি লোকে
চুপচাপ দ্যাখে, চারপাশ, প্রাঞ্জল
ট্রেনের ছাদে, জুয়ার আসরে বসে
গোমড়া সবাই, এর পরে শোরগোল-

শীতের বাতাসে রোদ পায় নাকি দ্বিধা!
দরোজায় এসে, কাঁপছে খাঁচার পাখি
একা দাঁড়িয়ে, ঝাঁকায় ঘুম আর ধাঁধা;
সাইরেন ডাকে, ট্রেন-শিশুকাল-স্মৃতি!
কবে যে কোথায় তুমি, লিখেছিলে প্রেমপত্র
ফুলের জড়তা, কেটে এসে সারা রাত্র?
আজ কেনো বলো, হাড়ের জানালা খুলে
বেজে ওঠে জ্বর? চরে আটকায় ভুলে!

কুয়াশায় ঢাকা শান্ত গানেরা কপাট
খুলে ঢেকে দেয় মরচুয়ারির ফাটল!
দেখে নাকি আগুনে, পতঙ্গ ‘পুলসিরাত’?
মনে ফুলের গিমিক-ছায়াও শীতল!

ছায়াযোগ হলে একা, মানুষের একা মন
স্মৃতি-ঘাই-দিশা টের পায় গায় নাকি?
ডাল-ভাঙ্গা ঝড়ে, রাত্রি করাল-মুখর
ঘাস-ফুলেদের দেখা পাবে জোনাকী?

ছিমছাম নিচে, তারো কতো নিচে
পায়চারি করে ঝরে, মৃদু হাসে-
তোমার কবিতা, যেনো বৃন্দাবন;
বানের উজানে, ডুবছে শীতল মন!

আজ, কোনোক্রমে এক প্রখর দুপুর এসে
চোখে ডাকছে ধুলোট ছায়া, অহেতু সাঁতার-নদী?
কোথাও বিরল শান্ত দীঘি, কোথাও হাঁপর-ঘাসে
শূন্যতা নামলে ঝেঁপে, গাছের গীতিকা বাঁধি!
আজ, মনে-মনে ঝরে ইয়াসিন-সুরা-ভোর
আয়াতের মাঝে এসে, শান্ত হচ্ছে রুকু
মা’কে ডাকে এক নিরালা ভাঙার শোর
বাতাস জানে না, পাতা-স্নান, ঝিরিটুকু!

সম্পর্ক

এই যে সম্পর্কের নাম করে নুড়ি ও পাথর
কলি ও কাকলি এসে, হৃদয়ে একত্রিত, সুন্দর লাগে-

এইসব বোঝাপড়া জুড়ে নকশা-আঁকা রোদ, মানুষের মুখের ভঙ্গিমা
সারা দুনিয়াতে আর কিছুতেই পাবে না তুমি, সম্পর্কই ত্রিশূল, কোরানবাদ্য!

এই যে ক্রমাগত জোড় বেঁধে
পরিযায়ী হাসির ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে দাম্পত্যের রেল;
আমি তাকে এ-পিঠ ও-পিঠ ফেলে দেখেছি, পানির মতোই পাত্রনিরপেক্ষ-
ব্যাথার বাসনা থেকে শিস দিয়ে ডাকে জতুবর্ণিল পাখি!

সাজ্জাদ সাঈফ। কবি ও চিকিৎসক। জন্ম- জুন ১৯৮৪, বাংলাদেশের ঢাকায়। পেশাগত জীবনে তিনি সাইকিয়াট্রিক অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাবিউজ ম্যানেজমেন্ট ফিজিশিয়ান। পাশাপাশি সম্পাদনা করেন 'নীহারিকা' (রম্যপত্রিকা) 'ঈক্ষণ' (ছোট কাগজ), 'ক্ষেপচুরিয়াস ওয়েবজিন' (সহ-সম্পাদক)। তিনি 'কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা' কাব্যগ্রন্থের জন্য বঙ্গভূমি বর্ষসেরা কবি-২০১৯ সম্মানে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..