ভাবনাগুলো ঘুরপাক খায়

সোমনাথ ঘোষাল
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
ভাবনাগুলো ঘুরপাক খায়

কবিতা কেন পড়ি? এই বিষয় বলতে গেলে, বারবার মনে হয় সেইসব কবি বা মৃত কবিদের ছায়ার কথা!

আমি ভাত কেন খাই? আমি কেন ঘুমোই? আমি কেন লাগাই? আমি কেন হাগি? ভনিতা ছাড়া বলতে গেলে এর একটাই উত্তর, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন তাই। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য সত্যিই কী কবিতা পড়ার দরকার? একজন অক্ষর বা শব্দের শ্রমিক হিসাবে মনে হয়, খুব দরকার। সেটা আমার নিজের বেঁচে থাকার জন্য। তার জন্য বই পড়ার দরকার নেই। দৈনন্দিন বেঁচে থাকার মধ্যেই কবিতা লুকিয়ে থাকে। যদি সে, কবিতা খুঁজতে চায়! তবেই। তাই কবিতা আমাদের বেঁচে থাকার মধ্যেই বেঁচে থাকে। আমার কাছে কবিতা নয় বারবার লেখাই মনে হয়েছে। অনেক লেখা পড়ে অথবা না পড়ে এটাই উপলব্ধি তুমি যেটা যাপন করছো সেটাই লেখা।

ট্রামলাইনে আস্তে আস্তে কিছু ধুলোবালি গা ঠেকিয়ে আছে। এক দূরের পথচারী সেটা মাড়িয়ে, তার যাওয়ার দিকে এগিয়ে যায়… এই হাতপা নাড়া শহরটা মুখবেঁধে আছে। মৃত্যুভয়ে। তবুও বাসি পেটে লাথি মেরেও সকাল হয় না। রাত হয় না। শুধু গুটিকয়েক মানুষের চামড়া ঝুলে থাকে।

ছোটবেলা থেকেই মায়ের আঁশবটিতে শোল মাছ কাটা দেখতাম। বাবার জন্য। আমিও খেতাম। দিদিরাও খেত। ভাগ হয়ে যেত যৌনতা। বাবা মায়ের জন্য মাছ নিয়ে আসতো। ঘুলঘুলি দিয়ে দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সিনেমা সিনেমা মনে হয়। বাড়ির সবাই চরিত্র। আমি একা সিনেমা বানিয়ে যাচ্ছি রোজ। বারান্দা দিয়ে মায়ের শাড়ি রোদে শুকোতে থাকে। তাঁতের শাড়ি। সেখানে পাখিদের ছাপ পড়ে থাকে। পাখিরা বিকেলে উড়ে যায়। মা যখন শাড়িটা শরীরে জড়িয়ে নেয়। আমি তখন প্লেন প্লেন খেলি। জীবন বিজ্ঞানের পাতা দিয়ে। পাশের বাড়ির বাবুদের ছাদে যায় সেই প্লেন! তারপর মায়ের সাদা শাড়ি হয়। মা ছোট হয়ে আসে। শামুকের মতন!

দুপুরের ভাতঘুম সেরে শুয়ে আছে আলস দুপুর। চুল্লিতে সাজিয়ে নিচ্ছে একের পর এক অতীত। দেহগুলোর গায়ে পালক লাগিয়ে পাখি করে দেওয়া হবে। পাখি অর্থাৎ যে উড়তে পারে। সেই সময় ডোমেদের ঈশ্বর মনে হয়। তাই দেহগুলোকে যেভাবেই হোক ছাই করে, পাখির মতন আকাশে ওড়াতে হবে। সেইদিন বাবাও পাখি হয়েছিল। রতনবাবুর ঘাটে। ভাতের ঢেঁকুর তুলে যারা ছিল, তারা আসলে পরিযায়ী চিমনি। হ্যাঁ করে ধোঁয়া ছাড়ে গঙ্গার বুকে। গায়ে গায়ে লেগে থাকা শব্দরা ডেকে ওঠে। সোঁ সোঁ করে মা ঘুরে যায়। বন্ধ লঞ্চের মতন। মায়ের তখন যৌনতার প্রয়োজন নেই। মা তখন কারোর আর স্ত্রী নয়। মা হয়ে গেছে।

লিখতে গেলে বারবার মনে হয়েছে, নিজের বেঁচে থাকাগুলোকে প্রতি মুহূর্তে খুঁড়ে নেওয়া খুব দরকার। নিজেকে বিপন্ন না করলে শব্দ তোমাকে ধরা দেবে না। তাই ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি এই উৎসবের যাপনকেই আদর করে গেছি। সমস্ত লেখার কাছে নতজানু হয়ে থাকি। নিজের অক্ষরের হরিণখানায়। দাগ স্পষ্ট হয়। ঘুমহীন রাতে। এক আদিম উন্মাদের মতন ছুটে যাই সেই বৃত্তে।

চাঁদকে তখন চাকা বানিয়ে, কিল্লার বাবা কিল্লার বাবা কিল্লার বাবা বলতে বলতে দৌড়তে থাকি। সেই পোঁদ খোলা বন্ধু বুবাইয়ের মতন! লক্ষ লক্ষ কবির বুকপকেট থেকে মৃত লেখার জন্ম হয়… আমি কবিতা পড়তে থাকি। এক আজন্ম উল্লাসে।

কবিতা কেন লিখি:

এই জানলা দিয়ে মানুষটা উড়ে
যেতে পারত, কোনো হুইসেল ছাড়া
কারখানার গা বেয়ে যে বিকেলটা ঘাপটি
মেরে বসে থাকে এক পায়ে রোদ
আর এক পায়ে বরানগর লাগিয়ে
আমার জন্মদিন বলে ওঠে রোববার

কিছু শূন্যতা দিয়ে হাঁটলে মনে হয় মানুষের ছায়া
সংগ্রহ করে জামার ভেতর সেলাই করবো
যেভাবে আমার এক একটা শব্দেরা
মায়ের হসপিটাল থেকে স্বপ্নের
পোয়াতি শিশুর আমি ডাক শোনে

এখন বার তারিখ কিছুই মনে থাকে না। বন্ধ সময়ে। ঘুলঘুলি দিয়ে পায়রার মতন তাকিয়ে থাকি। মানুষ এখন অসহায়। না ঠিক তাও নয়। মৃত্যু ভয়ে। সব মানুষের নয়। যাদের মরার কথা আছে, তারা মরবে। রাষ্ট্র সেইভাবে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা মরবে। গরীব চাষি, শ্রমিক, দিনমজুর মরবে। আদিবাসী মরবে। জঙ্গলের মানুষ। হ্যাঁ যেভাবে রোজ আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ গাছ হত্যা হয়। লেখাতে সময়ের ছাপ পড়ে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। একজন কবি বা লেখক বা শিল্পী আলাদা কোনো মানুষ নয়। সে বলতে চায়। সেই কাজে সময়টা ঠিক ধরা পড়ে। একটা অনিশ্চিত সময়ে এগিয়ে যাচ্ছি। এই বন্ধ জীবন যখন ছাড়া পাবে, তখন আরও একটা বন্ধ আলোবাতাসে ঢুকে যেতে হবে। যেভাবে তুমুল বৃষ্টির পর, জলের ছাপ থাকে। সেইভাবে চাপা চাপা মৃত্যুর ছাপ জমে থাকবে প্রতিটা ছাপাখানায়।

আজকাল রোজ বিকেলে আকাশ দেখি। পাখি গোনার চেষ্টা করি। বাড়ির পেছনের দেয়ালে সদ্যোজাত গাছ দেখি। আনন্দ হয়। জানি, এই গাছটা বড় হলে বাড়িটা আস্তে আস্তে খেয়ে নেবে। কিন্তু তাও ভালো। ততদিনে আমি থাকলে হয়। চা খেতে খেতে পায়চারি করি। সিগারেট ধরাই। মানুষ অনেকদিন নিয়ম পালন করেনি। কিন্তু এই নিয়মটা যাদের পেটে ভালো ভাবে খাবার জুটে যায়, তাদের জন্য। মেঘ করলে আজকাল ভালো লাগে। ছুটির বিরতি কাটাচ্ছে মানুষ। আর কোটি কোটি পরিযায়ী মানুষেরা এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত ছুটে যায় খাবাবের খোঁজে। কেউ কেউ মরে। কারণ ওদের মরতে হয়। আমরা কী কী আর করতে পারি। চারটে লাইন লিখতে পারি। সেই লাইনগুলো পড়ে নিজেরাই শান্তি পাই। দায় সেরে ফেলি। কবিতা পেট ভরাতে পারে না। খিদে পায় খিদে। তবুও এই বন্ধ সময় নিজেকে খুঁজে বেড়াই। নিজকে আরও একবার খুব কাছ থেকে চেনার তাগিদে কিছু লেখার চেষ্টা করি। কিছু বলার চেষ্টা করি। এখনও প্রয়োজনে রাস্তায় নামি। জানি, শিল্প সাহিত্য করে নিজের মন ভরতে পারে। পেটও পারে। কিন্তু এইসব দিয়ে ওই প্রান্তিক মানুষের ঘটিতে জলও পড়বে না। তাও লিখি। নিজের মনের খিদে মেটানোর জন্য। কিছু বলার আছে। নিজের মতন করে। সেটাই রোজ মনে হয়…

পা চেপে শুয়ে আছে
জলাশয়ে বাঁধা জলের ইতিহাস
মুখভরতি পাখিদের দিন ফুরিয়ে আসছে
কীসের ঘর কেমন পাতা
তুমি মাথা ঢাকতে চাও
গাছের আকারে ছায়াপর্যায়ে

দুই) 

এখানে মেঘ জমে থাকে
মেঘের আয়তনে পড়ে কেউ
তাকে আমি দেখিনি বহুদিন
দরজায় দেখতাম তালাতে শিশুপাতা
হয়ে আছে, তাই মনে হত

গাছের খবর তো মাটি জানে
আমার মাটি নেই

মা আছে একখানা

তিন)

বাড়ির গা বেয়ে স্নান করতে করতে
যে গাছগুলো কথা রেখেছে
তারাই এখন এদিক ওদিক লাফাচ্ছে
পাখিদের পাড়ায়, বেপাড়ায় ধুলোপালক
জানলার ছবি নিয়ে ঘর লিখছে
নিভন্ত আলো আঁশের মতন সূর্য কিশোর
সেই কবেকার ভাবনায়
বাবা মা’র পুতুল খেলা

জলের মুহূর্ত তুলে স্নান করে নিচ্ছে রোদ
যেন বাড়িগুলো কোনো এককালে
পাখিদের পোশাক পরত

চার)

নীরবতার ঘর থেকে
যে লোকটি বেরিয়ে গেল
দূর কোনো এক ঘরের খোঁজে
তার কোনোদিন গাছ ছিল না
আকাশ ছোট ছিল জানলায়
কিছু জোনাকি আর বনফুল ফুটতো বৃষ্টিতে

নীরবতার অন্ধকারে যে
লোকটি দূরপাল্লার পাখির
ঘর খুঁজতে যাবে সেও
জানতো না…

পাখির তো গাছ লাগে
হালকা উচ্চারণে উড়ে যেতে পারে

লোকটির মাটি ছিল না
তাই গাছ হওয়া হয়নি কোনোদিনই

একই ভাবনাগুলো এখন ঘুরপাক খেতে থাকে। এই বন্ধঘরে। যতটুকু চলতে পারি। পাঁচিল টপকে যায় শব্দ। গাছ। পাখি। আর আমি…

সোমনাথ ঘোষাল। কবি।  ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতার বরানগরে জন্ম। ২০০২ থেকে লেখালিখি। এখনও পর্যন্ত ১২টি বই। তার মধ্যে ২টো উপন্যাস। মূলত কবিতা নিয়ে কারবার। নিজের মতন খুঁজে যেতেই ভালো লাগে। প্রশ্রয় দিয়ে যান নিজেরই যাপনের উৎসবকে।  এখনও অব্দি দুটো শর্ট ফিল্ম।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ