ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ (পর্ব – ২)

শামসুজ্জোহা মানিক
প্রবন্ধ
Bengali
ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ (পর্ব – ২)

() সিন্ধু সভ্যতায় ধর্মের স্থান

এখন সিন্ধু সভ্যতায় ধর্মের অবস্থান সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। ঋগ্বেদ এবং সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি থেকে আমি কয়েকটি সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে করি।

প্রথমত, সিন্ধু সভ্যতায় পুরোহিত শ্রেণীর অবস্থান ছিল গৌণ। বিশেষত রাষ্ট্রশাসনে তাদের খুব বেশী হলে অধীনস্থ এবং সহায়কের বেশী কোনও ভূমিকা ছিল না। ধর্ম এবং পুরেহিত শ্রেণীর ভূমিকা বৃদ্ধি সভ্যতার বস্তুগত সঙ্কটের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ নদী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ক্ষয় বা বিপর্যয়ের ফলে সভ্যতায় যে সঙ্কট বা বিপর্যয় ঘটে তার ফলে ধর্ম ও পুরোহিত শ্রেণীর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আমার লেখা ‘সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রদর্শন’এ সভ্যতা নির্মাণে বলপ্রয়োগের সঙ্গে ধর্মের উত্থান বা বিকাশের সম্পর্কের উপর আলোচনা করেছি। সেটারই জের টেনে এখানে বলতে চাই যে, সঙ্কটের সময়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শাসকদের নিকট ধর্মের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফলে ধর্মের পাশাপাশি পুরোহিত শ্রেণীরও শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয়ত, সিন্ধু সভ্যতার যে ধর্ম থেকে বৈদিক ধর্মের উত্থান সেটা যে ছিল নিরাকারবাদী এবং মূলত একেশ্বরবাদী তেমন একটা সিদ্ধান্ত ঋগ্বেদের পাঠ থেকে অনায়াসে নেওয়া চলে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’য় কিংবা অন্যান্য রচনায় করায় এখানে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা নিষ্প্রয়োজন। তবু এখানে এ প্রসঙ্গে এটুকু বলি যে, সিন্ধু সভ্যতায় বৃহৎ মূর্তির অনুপস্থিতি এবং ঋগ্বেদে তথা বৈদিক ধর্মে মূর্তিপূজার অনুপস্থিতির গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

এটা নিশ্চয় তাৎপর্যপূর্ণ যে, আর সব প্রাচীন সভ্যতায় যেখানে রাজা ও দেবতাদের বৃহৎ কিংবা অতিকায় মূর্তির ছড়াছড়ি সেখানে সিন্ধু সভ্যতায় একটিও বৃহৎ মূর্তি বা প্রতিমা নাই। সেটা না রাজা বা সম্রাটের না দেবতার। যেসব ক্ষুদ্র বা ছোট মূর্তি পাওয়া গেছে সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করে এক কথায় বলা যায় যে, অত বৃহৎ সভ্যতার রাজকীয় বা দেবদেবীর মূর্তি কখনই অত ছোট অথবা অযত্নে নির্মিত হতে পারে না। কারণ সভ্যতার নায়করা তথা শাসক শ্রেণী তাদের শক্তি ও সম্পদের বহিঃপ্রকাশ অবশ্যই ঘটাতে চাইবে তাদের যে কোনও বস্তুগত নির্মাণের মধ্য দিয়ে। সুতরাং যেটাকে কেউ কেউ পুরোহিতরাজা বলতে চান সেটা যে কোনও রাজার মূর্তি যেমন নয় তেমন নৃত্যরত নারীর ব্রো্ঞ্জ মূর্তি কিংবা অযত্নে নির্মিত পোড়া মাটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাতৃমূর্তি যেগুলিকে বলা হয় সেগুলি যে সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্র কিংবা যদি রাষ্ট্র কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত বা সরকারী কোনও ধর্ম থেকে থাকে তবে তার সঙ্গে যে সম্পর্কিত নয় সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

এমতাবস্থায় সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রশাসন এবং সরকারী ধর্ম থেকে দূরবর্তী স্থানে রেখেই এসব মূর্তির সঠিক অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করাটা যুক্তিসঙ্গত হবে। ক্ষুদ্র এবং অযত্নে নির্মিত পোড়া মাটির নারী মূর্তিগুলি হয়ত খেলনা অথবা সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসের স্মারক। এর বাইরে এগুলির আর কোনও গুরুত্বই থাকবার কারণ নাই।

এখন আমরা যে প্রশ্নের সম্মুখীন হই সেটা হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতায় আদৌ কি অলোকবাদে তথা অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ধর্মের স্থান ছিল? সত্যি বলতে কী যদি ঋগ্বেদ না থাকত তা হলে হয়ত সহজেই আমরা ঈশ্বর কিংবা দেবতায় বিশ্বাসহীন, অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাসহীন এবং লোকবাদ বা বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী একটা সভ্যতার অস্তিত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতাম। যে সভ্যতার প্রবল শক্তি, বিপুল সম্পদ ও বিশাল আয়তনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রূপ এবং আয়তনের দেবদেবীর প্রতিমা নাই, মন্দির হিসাবে চিহ্নিত করা যায় এমন কোনও গৃহ নাই সেই সভ্যতায় ধর্মবিশ্বাসের অস্তিত্ব ছিল এমন সিদ্ধান্ত টানাটা কি খুব কঠিন হয়ে পড়ে না? হ্যাঁ, বলা হবে বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র সিলের কথা যেগুলিতে বিভিন্ন প্রাণী কিংবা অনুমেয় দেবতার চিত্র আছে। বলা হয় এগুলির অন্তত কিছু সংখ্যক ধর্মবিশ্বাসের স্মারক।

সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে সিল নিয়ে অনেক রহস্য রয়েছে। সিলগুলিতে লিপির খোদাই ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীর চিত্রও রয়েছে। শিংবিশিষ্ট মানুষের এমন চিত্র আছে যেটাকে অনেক পণ্ডিত পশুপতি কিংবা শিবের সম্ভাব্য আদিরূপ হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। যাইহোক, সিলের ব্যবহার এবং তাৎপর্য নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে এবং যতদিন সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার না হবে ততদিন হয়ত এ সকল প্রশ্ন রইবে। তবে একটা বিষয় অনুমান করা চলে যে, বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে এগুলির ব্যবহার ছিল। হতে পারে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক স্বাক্ষরের কাজেও সিলের ব্যবহার ছিল। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর প্রকাশও কিছু সংখ্যক সিলে থাকতে পারে।

হয়ত সেটা ছিল খুব ক্ষুদ্র পরিসরে দেবতার প্রতীক নির্মাণের প্রতি অনুমোদনের প্রকাশ। অর্থাৎ এভাবে খুবই সীমাবদ্ধ এবং ক্ষুদ্র আয়তনে দেবতার প্রতীককে স্থান দান। যদি এখানে ধর্মের কোনও সম্পর্ক থাকে তবে সেটাকে কঠোরভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, বিভিন্ন উপজাতির ভিতরে দেবতার ধারণা বিকাশ লাভ করলে উপজাতীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক হিসাবে উপজাতিসমূহের স্বতন্ত্র দেবতার মূর্তি দেখা দিবে। এটা বৃহত্তর সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে দুর্লঙ্ঘ বাধা সৃষ্টি করে। অন্যান্য সমাজে এই সমস্যার সমাধান করা হয় যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অন্যান্য উপজাতিকে পরাস্ত করে জয়ী উপজাতির দেবতাকে প্রধান দেবতা হিসাবে সবার চাপিয়ে দিয়ে এবং পরাজিত উপজাতিদের দেবতাসমূহকে ক্ষেত্রবিশেষে বৃহত্তর ধর্মের কাঠামোর ভিতরে অধঃস্তন দেবতা হিসাবে গ্রহণ করে। সিন্ধু সভ্যতায় যুদ্ধের ভূমিকা একেবারে ছিল না এটা ভাবাটা অযৌক্তিক হবে বলেই মনে হয়। তবে সেটা থাকলেও তা যে খুবই গৌণ ছিল সেটা প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত। সুতরাং এখানে সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য দেবতাদের মূর্তিবিহীন পূজানির্ভর ধর্ম গড়ে তোলা হয়েছিল। বরুণকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা এই নিরাকার দেবতাদের উপাসনার মধ্য দিয়ে ক্রমে একেশ্বরবাদী ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এটা ছিল শান্তিপূর্ণভাবে সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলায় সহায়ক। রাষ্ট্রশাসকরা এই কারণে এই ধরনের একটি ধর্মকে হয়তবা অনুমোদন কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল।

মূলত এই ধরনের বক্তব্য চঞ্চল এবং আমি The Aryans and the Indus Civiliztion এবং ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’য় দিয়েছি। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমাদের মনে হচ্ছে এই পৃষ্ঠপোষকতা সেভাবে যদি এসে থাকে তবে সেটা এসেছে অনেক পরবর্তী কালে। যখন নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্কটজনিত কারণে সভ্যতার শক্তি ক্ষয় হয়েছে তখন শাসক শ্রেণী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার জন্য ক্রমে ধর্মের প্রয়োজন অনুভব করেছে। ফলে এ্ই ধরনের বরুণ কেন্দ্রিক নিরাকারবাদী কোনও ধর্ম গড়ে তোলায় পুরোহিত শ্রেণীকে উৎসাহ দিয়েছে অথবা যদি সমাজের প্রান্তে তেমন ধরনের কোনও ধর্ম ভ্রূণ আকারে কিংবা দুর্বল বা ক্ষীণ ভাবে থেকে থাকে তবে তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইকেল জ্যানসেনের মন্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। মহেঞ্জোদাড়োর নগরদুর্গের ‘গ্রেট বাথ’ যেটাকে বলা হয় সেটা যে মূল কাঠামোগত পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় সে কথা তিনি বলছেন। তিনি বলছেন যে, এটা ২৩০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের আশপাশে নির্মিত হয়েছিল (Michael Jansen, “Mohenjo-Daro, Indus Valley Civilization: Water Supply and Water Use in One of the Largest Bronze Age Cities of the Third Millennium BC,” in, eds, Terje Tvedt and Terje Oestigaard, A History of Water, A, Series III, Vol. 1: Water and Urbanism, I.B. Tauris, 2014, pp. 60-63.{Available from internet})

গ্রেট বাথকে’ প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাধারণত বিদ্যমান ধর্মের অংশ হিসাবে অনুমান করেন। হতে পারে যে, কৃত্রিম উপায়ে জলকপাট, বাঁধ ও বিরাট বিরাট জলাধারযু্ক্ত নদীনিয়ন্ত্রণভিত্তিক সভ্যতা নির্মাণের কয়েক শত বৎসর পরই তাতে সঙ্কট দেখা দিচ্ছিল; ফলে জনমানস নিয়ন্ত্রণের সহজ হাতিয়ার হিসাবে ধর্মের গুরুত্ব দেখা দেয়। সুতরাং মহেঞ্জোদাড়োর জলাধারটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

() প্রাচীন ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক

প্রাচীন এমন একটি সভ্যতার দৃষ্টান্ত কি দেওয়া যাবে যেখানে ধর্ম কিংবা ধর্মের অংশ হিসাবে দেবদেবীর মূর্তি পূজার আয়োজন ছিল না? সুতরাং ছিল না দেবদেবীর প্রতীক স্বরূপ তাদের প্রতিমা এবং তাদের প্রতিমা রাখবার জন্য মন্দির? না, এমন একটি সভ্যতার চিহ্নও আমরা আজ অবধি পাই নাই একমাত্র সিন্ধু সভ্যতা ব্যতিরেকে। তবে কি বলব যে সিন্ধু সভ্যতায় অলৌকিক শক্তি নির্ভর কোনও ধর্মই ছিল না?

তবে সে প্রশ্নের উত্তরে যাবার আগে এ প্রশ্ন করা যাক, প্রাচীন পৃথিবীতে সিন্ধু সভ্যতা ব্যতিরেকে আমরা এমন আর কি কোনও সভ্যতার চিহ্ন খুঁজে পেয়েছি যেখানে একটা রাষ্ট্রের উপযোগী সেনাবাহিনী কিংবা যুদ্ধ নির্ভরতার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না? কিংবা আসা যাক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে। দশ থেকে বারো কিংবা সাড়ে বারো লক্ষ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত একটা রাষ্ট্র একজন রাজা বা সম্রাট ছাড়া কীভাবে শাসিত হত, কীভাবে তার রাষ্ট্রীয় ঐক্য বা অখণ্ডতা রক্ষা করত? সমকালীন মিসর কিংবা মেসোপটেমিয়া এমনকি কিছু পরবর্তী কালের প্রাচীন চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজতন্ত্রের সঙ্গে কি সিন্ধু সভ্যতাকে মিলানো যায়?

যুদ্ধ নির্ভর রাজতন্ত্র নয়, ধর্মীয় শক্তি তথা পুরোহিত শ্রেণীও নয়। তা হলে সিন্ধু সভ্যতার মত এক মহাকায় সভ্যতার নির্মাতা বা নায়ক কারা? তারা যারাই হোক তারা যে এক অতুলনীয় সভ্যতা নির্মাণের কৃতিত্বের দাবীদার তাতে কোনই সন্দেহ নাই। সমগ্র সভ্যতার প্রাপ্ত বসতি ও নগরগুলির উপর যেটুকু খননকাজ হয়েছে তা থেকে যে বিষয়টি সবচাইতে বেশী চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে বিশাল সভ্যতার সর্বত্র একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের উপস্থিতি। অথচ নির্দিষ্ট কোনও নগর, বাসগৃহ বা ভবনে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু তার পরিকল্পনা এবং পরিচালনার প্রায় অভিন্ন রূপের মাধ্যমে সর্বত্র তা যেন এক অদৃশ্য শক্তিরূপে অস্তিত্বমান ছিল।

বিশাল অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত সভ্যতার সকল নগর বা বসতিগুলিকে চেনা যায় তাদের পরিকল্পনা এবং কিছু বৈশিষ্ট্যের অভিন্নতা দিয়ে। নগর পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অনেকটা সময় লাগবে। আজকের এই আলোচনার জন্য আমি সেটাকে খুব দরকারীও মনে করছি না। এ নিয়ে অনেক পণ্ডিত অনেক আলোচনা করেছেন। এখানে এ প্রসঙ্গে এটুকু বলি যে, প্রায় অভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরগুলি নির্মিত। প্রায় সোজা রাস্তার দু’পাশ দিয়ে পাকা বাসগৃহ তৈরী। সকল নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহার্য জল সরবরাহের ব্যবস্থা, নগরের সকল বাসগৃহ থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনের সাহায্যে পয়োনিষ্কাশনের নিখুঁত ব্যবস্থা, নগরগুলির পরিচ্ছন্নতা রক্ষার নিয়মিত বন্দোবস্ত ইত্যাদি প্রমাণ করে অন্তত অধিকাংশ নাগরিকের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি রাষ্ট্র কতখানি মনোযোগী ছিল সেটা। কোনও নগরে বস্তির চিহ্ন পাওয়া যায় না। প্রাম ও নগরে বৈষম্য নিশ্চয় ছিল। মানুষের পুষ্টিমানের বিচারে সেটা যে আকাশপাতাল ছিল না সেটা অনুমান করা যায় সিন্ধু সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত বেশ কিছুসংখ্যক নরকঙ্কালের উপর বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা থেকে। অন্যান্য সভ্যতার ধনীদরিদ্রদের কঙ্কালের পরীক্ষা থেকে পুষ্টিমানে যে ধরনের পার্থক্যের চিহ্ন পাওয়া যায় সে ধরনের পার্থক্য সিন্ধু সভ্যতার নরকঙ্কাল থেকে পাওয়া যায় না।

সকল নগরে নগরদুর্গ বলা হয় এমন একটি আলাদা প্রাচীর ঘেরা স্থান আছে। অনুমান করা যায় এখানে নগর বা রাষ্ট্রের প্রশাকদের বাসস্থান এবং কার্যালয় ছিল। কিন্তু সেটা সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে নগরকর্তৃত্বের বিরাট ব্যবধানের চিহ্ন বহন করে না।

যাইহোক, নগর পরিকল্পনার অভিন্ন রূপ একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে। এই অভিন্নতা শুধু নগর বা বসতির পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ নয়। সমস্ত সভ্যতার বিশাল অঞ্চল জুড়ে সর্বত্র একই বাটখারা বা ওজন, একই মাপ এবং এমনকি একই মাপের ইটের ব্যবহার, একই ধরনের সিল এবং একই ধরনের লিপির ব্যবহার এবং একই ধরনের বিভিন্ন দ্রব্যের ব্যবহার খুবই লক্ষণীয়। এগুলি দ্বারা বিশাল অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত একটি সভ্যতাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ অসাধারণভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সুসংহত এবং এককেন্দ্রিক শাসক বা কর্তৃত্বকারী শ্রেণী সিন্ধু সভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করত, যার ছাপ পড়েছে সুবিশাল সভ্যতার সর্বত্র অভিন্ন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে। অবশ্য এর মানে এ কথা আমি বলছি না যে, সভ্যতায় বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা ছিল না। অঞ্চল ভেদে বহু ধরনের ভিন্নতার ছাপই সেখানে পাওয়া গেছে। তাছাড়া সব নগরের মাপ যেমন এক নয় তেমন পরিকল্পনায় অনেক অভিন্নতা থাকলেও সবকিছুই হুবহু এক রকম বা অভিন্ন নয়। তবে সিন্ধু সভ্যতার সব বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে যে তার অভিন্নতার দিকটি সামনে উঠে আসে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। এ থেকে আমরা একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ দৃঢ়তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

মনে রাখতে হবে যুগটা ঘোড়ার যুগ নয়, বরং পায়ে হেঁটে যাতায়াত এবং গরুমহিষগাধা দিয়ে টানা গাড়ী আর নদী থাকলে নৌকায় যাতায়াতের যুগ। অর্থাৎ খুবই ধীরগতির যোগাযোগের কাল সেটা। সেই রকম এক কালে আফগানিস্তানের দক্ষিণপূর্বাংশ থেকে বর্তমানের সমগ্র পাকিস্তান এবং ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লীর নিকটবর্তী অঞ্চল, রাজস্থান এবং গুজরাটসহ এক বিশাল অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত এক রাষ্ট্রে এমন অভিন্নতা অর্জন এবং রক্ষা করা কীভাবে সম্ভব? আজকের এত দ্রুতগতির যান্ত্রিক যুগে উপমহাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে কী মনে হবে?

পুনরায় প্রশ্ন আসবে কী ছিল সেই শক্তির উৎস যা সমগ্র সভ্যতায় এভাবে ঐক্য বা অভিন্নতা এনেছিল এবং সেই সঙ্গে সভ্যতাকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দীর্ঘস্থায়ী হবার শক্তি যুগিয়েছিল। ধর্ম যে সেই শক্তি নয় সেটা বুঝা যায় সিন্ধু সভ্যতার দিকে দৃষ্টি দিলেও। এ সম্পর্কে কিছু আগে বলেছি। তবু বলি শুধু যে মূর্তি বা প্রতিমার অভাব আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে নেয় তাই নয়, অধিকন্তু মন্দির বা পূজাগৃহ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় এমন কিছুরও অভাব আমাদেরকে এই সিদ্ধান্তে নেয়। শুধু এইটুকু নয়। এবার আমরা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের অনেক পরবর্তী ঐতিহাসিক কালের দিকে একটু দৃষ্টি দিই আমাদের প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য। সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করি সিন্ধু সভ্যতার অন্তত সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলধারায় কি অলৌকিক সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ধর্মের অস্তিত্ব ছিল? ঐতিহাসিক কালের সাক্ষ্য আমাদের কী বলে?

আমরা বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধের কালে যাই। যদি খ্রীষ্টপূর্ব ১৯০০ অব্দকে পরিণত হরপ্পান সভ্যতা তথা সিন্ধুর নগর সভ্যতার অবসানের সময় ধরা হয় তবে বুদ্ধের সময়টা তার প্রায় সোয়া এক হাজার বছর পর। অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসকাল সূচনার প্রায় সোয়া এক হাজার বছর কাল পর খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৬০০ সালের মধ্যে কোনও এক সময় বুদ্ধ জীবিত ছিলেন এবং তার ধর্মমত প্রচার করেন। বুদ্ধের ধর্মমতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য অহিংসা, ইংরাজীতে যেটাকে nonviolence বলা হয়। অপর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিরীশ্বরবাদ অর্থাৎ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং জগৎস্রষ্টা হিসাবে কোনও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস। এখানে অলৌকিক সত্তা হিসাবে আত্মার যে ধারণা আছে সেটাকে খ্রীষ্টান কিংবা ইসলাম ধর্মের আত্মার সঙ্গেও মিলানো যায় না। এখানে আত্মা জীবের বাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই কারণে পুণ্যকর্মের মাধ্যমে এবং বাসনা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারলে মানুষ জন্মান্তরের চক্র থেকে এবং ফলত জীবনের দুঃখ থেকেও মুক্তি লাভ করতে পারে। এটাই হল নির্বাণ। বুদ্ধের চেতনায় দুঃখ একটা বড় জায়গা অধিকার করে আছে। তিনি বলছেন, সব্বং দুক্খং। অর্থাৎ সবকিছু দুঃখময়। এই দুঃখময় জীবনচক্র থেকে মুক্তির উপায় হল নির্বাণ লাভ, যা সম্ভব পুণ্যকর্ম এবং বাসনা থেকে মুক্তিলাভের মাধ্যমে। বুদ্ধের ধর্মমতে প্রচলিত অন্যান্য প্রধান ধর্মগুলির মত ঈশ্বর ধারণা পাই না। একইভাবে পাই না বিশেষত খ্রীষ্টান এবং ইসলাম ধর্মের মতো স্বর্গনরক সম্পর্কে ধারণাও।

ভারতবর্ষে এক সময় বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিস্তার সম্পর্কে আমরা জানি। পরাক্রান্ত মৌর্য সম্রাট অশোক (শাসনকাল : খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৮ – ২৩২) এক সময় বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তার সময়ে ভারতের বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটে। তার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল উপমহাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধধর্মের এই বিস্তারে। সিংহলে তার পুত্র মহিন্দা (মহেন্দ্র) এবং কন্যা সংঘমিত্রার নেতৃত্বে মিশনারী দল যায় সেখানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য। পরবর্তী কিছু কালের মধ্যে এই ধর্ম মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ, সিংহল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোচীন এবং চীন, জাপান পর্যন্ত এক বিশাল ভূভাগে বিস্তৃত হয়। তবে এই প্রচার ও প্রসারের শক্তির মূল উৎস ছিল ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক জনভিত্তি তথা জনপ্রিয়তা। অর্থাৎ স্বভূমির শক্তি তাকে এভাবে বিস্তারের শক্তি যুগিয়েছিল।

বহুদিন পর্যন্ত যে বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষে প্রবল প্রতাপে টিকেছিল তার প্রমাণ হচ্ছে উত্তর ভারতের শক্তিশালী সম্রাট হর্ষবর্ধন (শাসনকাল : ৬০৭ খ্রীষ্টাব্দ – ৬৪৭ খ্রীষ্টাব্দ) কর্তৃক এই ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা দান। বাংলার পরাক্রমশালী পাল রাজবংশ যে বৌদ্ধ ছিল সে কথা সবার জানা। ৭৫০ খ্রীঃ থেকে ১১৭৪ খ্রীঃ পর্যন্ত মোটামুটি ৪২৪ বৎসর স্থায়ী তাদের সাম্রাজ্য একটা পর্যায়ে প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতব্যাপী বিস্তৃত ছিল। রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগ বা সমর্থন যে প্রজাসাধারণের একটি খুব বড় এমনকি গরিষ্ঠ অংশের বৌদ্ধ ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াই কি যৌক্তিক নয়?

এখন যে প্রশ্ন আসবে সেটা হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পর সমাজের যে পশ্চাৎপদ যা্ত্রা শুরু হয় তাতে কী করে সেই পশ্চাৎপদ অবস্থায় বৌদ্ধধর্মের মতো একটা নিরীশ্বরবাদী ধর্মমতের এত বিপুল জনসমর্থন লাভ সম্ভব, যদি না পূর্ব থেকেই তার জন্য একটি খুবই শক্তিশালী জনভিত্তি না থাকে? একইভাবে বুদ্ধের অল্প কিছু পূর্বে খ্রীষ্টপূর্ব ৬ শতকে আবির্ভূত জৈন ধর্মও আমাদের্ নিকট তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেয়। এটিও বৌদ্ধধর্মের মত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বস্রষ্টা হিসাবে ঈশ্বর ধারণায় অবিশ্বাসী। সুতরাং জৈনধর্মও নিরীশ্বরবাদী। এবং এটিও পুণ্যকর্মের মাধ্যমে জন্মান্তরের চক্র থেকে মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাসী। অন্যদিকে এটিও অহিংসাবাদী। তবে বৌদ্ধধর্মের চেয়েও এটি আরও অনেক বেশী অহিংসার উপর গুরুত্ব দেয়। এ ব্যাপারে জৈন ধর্মকে চরমপন্থী বলতে হবে। এক সময় বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি জৈন ধর্মও ভারতবর্ষে জনপ্রিয় ছিল। এমনকি কোন কোন রাজা বা সম্রাটও জৈন ধর্মের অনুসারী ছিল। এখনও ভারতে এক কোটির বেশী মানুষ জৈন ধর্মাবলম্বী। যাইহোক, জৈন এবং বৌদ্ধ এক সময়ের এই দুই জনপ্রিয় ধর্ম কর্তৃক অহিংসা এবং নিরীশ্বরবাদ এই দুই বিষয়কে গুরুত্বদানের কারণ নিশ্চয় সমকালীন জনসমাজের ভিতরই নিহিত রয়েছে। এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখ করা উচিত হবে যে, জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাবীরকে এই ধর্মের ২৪তম ও শেষ তীর্থঙ্কর বলা হয়। অর্থাৎ জৈন মতে তিনি এই ধর্মের ঠিক প্রবর্তকও নন, বরং তিনি হলেন এই ধর্মের সর্বশেষ সংস্কারক। জৈনধর্ম মতে ঋষভ হলেন এই ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্কর। তবে কি এই ধর্মবিশ্বাসের উৎসে পৌঁছাতে হলে আমাদেরকে সিন্ধু সভ্যতাতে পৌঁছাতে হবে?

বুদ্ধের সমসাময়িক আরও যেসব দার্শনিক মতবাদের কথা আমরা জানতে পারি সেগুলিও কি একই দিকে ইঙ্গিত দেয় না? এই সময়কার বিভিন্ন নিরীশ্বরবাদী দার্শনিকের মধ্যে অজিত কেশকম্বলীর কথা উল্লেখ করা যায়। সাংখ্যবাদী দার্শনিকরাও যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন, যারা ভাববাদী হলেও নিরীশ্বরবাদী। তাদের দর্শনের মূল বিষয় পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুই সত্তায় জগতের বিভাজন। পুরুষ প্রকৃতপক্ষে এমন চেতনা যা প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া কিছুই করতে পারে না। আর প্রকৃতিও পুরুষ ছাড়া অচল। এমনভাবে চেতনা ও বস্তু এই দ্বৈতসত্তার মিলনে জগৎসংসার চলমান। চেতনাকে স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবে ধারণা করায় ভাববাদী হলেও সাংখ্যদর্শনকে সর্বশক্তিমান সত্তা হিসাবে ইশ্বর ধারণায় বিশ্বাসী বলবার কারণ নাই।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল চার্বাক কিংবা লোকায়ত দর্শনের অস্তিত্ব। প্রাচীন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা সঙ্গত কারণে এই দর্শনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ‘জিহাদ’ পরিচালনা করেছেন। বস্তুজগতের বাইরে আর কোনও চেতন সত্তায় সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাসী চার্বাক বা লোকায়ত দর্শনের অনুসারীরা। সুতরাং তারা দেবতা কিংবা ঈশ্বর, দেহাতীত আত্মা, পরকাল কিংবা পরজন্ম, স্বর্গ এবং নরকের ধারণার সম্পূর্ণ বিরোধী। তাদের মতে অলোকবাদে তথা অলৌকিক সত্তা ও অলৌকিকতায় বিশ্বাসী সকল চিন্তা কিংবা মত বা ধর্মই ভুল।

এখন আমার মনে যে প্রশ্ন খুব বেশী করে আসে সেটা হচ্ছে এমন একটি সুউন্নত বস্তুবাদী কিংবা লোকবাদী দর্শন চিন্তার নাম কী করে লোকায়ত দেওয়া হয়েছিল? লোকায়ত শব্দ দেওয়া হয়েছে এই অর্থে যে এটি লোক সমাজে প্রচলিত বা জনপ্রিয়। সংস্কৃত লোকেষু আয়ত থেকে লোকায়ত। তাহলে কি এই দাঁড়ায় না যে এক সময় জনসমাজে বহুল প্রচলিত দর্শন হিসাবে লোকায়ত দর্শন নামটা দেওয়া হয়েছে?

সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি এবং পরবর্তী কালে নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিস্তার এবং সেই সঙ্গে এক কালে প্রচলিত বস্তুবাদী এবং লোকবাদী দর্শনকে লোকায়ত নামে উল্লেখকে এখন আমাদের নূতনভাবে বিচার করতে হবে।

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই যে, সভ্যতার পশ্চাদগতির অবস্থায় যখন প্রতিক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীলতার কাল চলছে তখন নূতন করে নিরীশ্বরবাদ কিংবা উন্নত লোকবাদী বা বস্তুবাদী দর্শনের বিকাশ সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ সকল দার্শনিক ধারণা যে পূর্ববর্তী সিন্ধু সভ্যতার গৌরবময় কালের জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বা অবশেষ মাত্র তাতে কোনও সন্দেহ নাই।

সিন্ধু সভ্যতার বস্তুগত মৃত্যু ঘটলেও তার ভাবগত মৃত্যু যে ঘটে নাই তারই প্রমাণ হচ্ছে এ সকল ধর্মীয় এবং দার্শনিক মতবাদ। ভাবগত মৃত্যু ঘটতে খ্রীষ্টপূ্র্ব ৬ শত কিংবা ৫ শত বৎসর কালপর্বের পরেও আরও বহু শতাব্দী কিংবা সহস্রাধিক বৎসর লেগেছে। অবশ্য সিন্ধু সভ্যতার মতো মহাসভ্যতার পরিপূর্ণ মৃত্যু কখনই ঘটে না। তার সাক্ষ্য দেয় আজকের ভারতবর্ষ তার ভাষা এবং সংস্কৃতির বহু উপাদানের মধ্য দিয়ে। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেকার স্বস্তিকা চিহ্ন আজও কল্যাণ বা মঙ্গলের প্রতীক হিসাবে ভারতের সর্বত্র ব্যবহৃত। আরও বহু কিছুর উল্লেখ করা যায় যেগুলি সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেক আলোচনা আছে।

এমনকি সিন্ধু সভ্যতার ভাষা তো আজও তার উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে জীবিত। যেগুলিকে আমরা ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবারভুক্ত বলি সেগুলি যে সবই সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রভাষা বৈদিক ভাষার উত্তাধিকারী এ বিষয়ে আমার সামান্য সন্দেহও নাই। চঞ্চল ও আমার যৌথভাবে ইংরাজীতে লিখা Decline of Indus Civilization and Vedic Upheaval-এ সিন্ধু সভ্যতার ভাষার প্রশ্নে আলোচনা করেছি। কিছু পরে বিষয়টা নিয়ে পুনরায় কিছু আলোচনা করব। কারণ ভাষার প্রশ্ন সিন্ধু সভ্যতাকে বুঝবার ক্ষেত্রে প্রভূত পরিমাণে সহায়ক হতে পারে। এর জন্য সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধারের প্রয়োজন নাই। বৈদিক এবং তার পরবর্তী রূপ সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা থাকলে সিন্ধু সভ্যতার ভাষাগত বৈশিষ্ট্যকে বুঝা সম্ভব হতে পারে।

আমরা যে আলোচনায় ছিলাম সেখানে ফিরে প্রশ্ন করা যাক আসলে কি সিন্ধু সভ্যতায় অলোকবাদী ধর্মে বিশ্বাস ছিল? যদি চার্বাকপন্থী কিংবা লোকায়তের মতো বিভিন্ন নিরীশ্বরবাদী এবং বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারী জনগোষ্ঠী সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চল থেকে সভ্যতা ধ্বংসকালে পূর্ব দিকে গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলে এসে থাকে তবে আমাদেরকে এই সিদ্ধান্ত টানতে হবে যে, সিন্ধু সভ্যতার অন্তত মূলধারায় অলোকবাদী ধর্মের স্থান ছিল না। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে সিন্ধু সভ্যতা এমন সভ্যতা যা ছিল আজকের অর্থে ধর্মমুক্ত। সভ্যতা ধ্বংসের পরবর্তী সময়ে সমাজের পশ্চাদগতি তথা প্রতিক্রিয়ার অবস্থায় আত্মা, জন্মান্তর ইত্যাদি ধারণা উত্তর ভারতের গঙ্গা অববাহিকায় স্থানান্তরিত তথা অভিবাসী জনসমাজে বিস্তার লাভ করতে থাকে। আরও অনেক পরবর্তীকালে জৈন কিংবা বৌদ্ধ মতবাদ সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকার হিসাবে তখনও গভীর প্রভাব নিয়ে টিকে থাকা অহিংসা ও নিরীশ্বরবাদের ধারণার সঙ্গে জনসমাজে ক্রমে গড়ে উঠা আত্মা, জন্মান্তর ইত্যাদি ধারণাকে সংমিশ্রিত করে ধর্ম হিসাবে গড়ে উঠে।

এখন আমরা বৈদিক তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের উত্থান ও বিকাশ প্রক্রিয়াকে একটু বিচার করি। নদীনিয়ন্ত্রণ ধ্বংসে বৈদিক শক্তির সাফল্য তার দুর্বলতারও কারণ হয়েছিল বলে ধারণা করি। সিন্ধু সভ্যতায় যে বিপুল জনসংখ্যা ছিল সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনও কারণ নাই। সভ্যতার আয়তনের দিকে তাকালে মনে হয় দুই থেকে তিন কোটি কিংবা আরও বেশী সংখ্যক মানুষ এই সভ্যতায় বাস করত। নদীনিয়ন্ত্রণের ফলে সভ্যতার বিশাল অঞ্চলে জলসেচের সাহায্যে বিপুল খাদ্যোৎপাদন করতে পারায় বিশাল জনসংখ্যাকে ধারণ করা এই সভ্যতার পক্ষে সহজ ছিল। নূতন নূতন এলাকার নদীসমূহে জলকপাটযুক্ত বাঁধ দেওয়ার ফলে নূতন নূতন এলাকা কৃত্রিম উপায়ে জলসেচের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সভ্যতার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলে এইসব প্রান্তস্থ অঞ্চলে তাদের পুনর্বাসন করা হত বলে ধারণা করা চলে। যুদ্ধের ভূমিকা গৌণ থাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় মৃত্যু কম হত বলে ধারণা করার কারণ আছে। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনা থেকে যেভাবে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতার সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাতে এটা সহজবোধ্য যে, ব্যাধিতে এ সভ্যতায় মৃত্যু তুলনায় কম ছিল। সে কালে জন্মনিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি ছিল না। সুতরাং কৌমার্যব্রত কিংবা সন্ন্যাস ব্যতীত জনসংখ্যা রোধের আর কোনও সহজ পন্থা ছিল না। অন্যদিকে, নগর পরিকল্পনা এবং নরকঙ্কালে ধনীদরিদ্রে পুষ্টিমানের প্রায় সমতার উপস্থিতি ইত্যাদি থেকে অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় সম্পদের সুষম বণ্টনের চিত্র ফুটে উঠে। ফলে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনকারী, মোটামুটি প্রয়োজনীয় খাদ্যপুষ্টি লাভের সুবিধাভোগী এবং স্বাস্থ্য সচেতন জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যার তুলনামূলক বৃদ্ধি ছিল স্বাভাবিক। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যে নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলের উদ্বৃত্ত জনসংখ্যাকে রাষ্ট্রের প্রান্তে নূতন নূতন এলাকা বা অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হত সেটাই স্বাভাবিক মনে হয়।

তবে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সঙ্কট দেখা দিলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙ্গে পড়তে থাকে। সম্ভবত এই সঙ্কটের প্রাথমিক পর্যায়েই সিন্ধু সভ্যতার নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমার অনুমান সভ্যতার সূচনা থেকেই লোকবাদ এবং বস্তুবাদী জীবন দর্শনের পাশাপাশি ভাববাদী দর্শন এবং অলোকবাদী ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল। তবে বহুদিন পর্যন্ত ধর্ম যে খুবই প্রান্তস্থ এবং গৌণ অবস্থানে ছিল সেই অনুমানটাই এখন আমার নিকট যৌক্তিক মনে হয়। ব্যাপক জনগণ ছিল লোকবাদী তথা বস্তুবাদী জীবন দর্শনে বিশ্বাসী। রাষ্ট্র সেভাবেই তাদেরকে গড়ে তুলেছিল। অর্থাৎ অলোকবাদী ধর্মবিরোধী প্রচারে সুদীর্ঘ কাল রাষ্ট্রের উদ্যোগী এবং নেতৃত্বকারী ভূমিকা ছিল এমনটা অনুমান করা চলে।

তবে সভ্যতার সঙ্কট শুরু হলে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে বলে অনুমান করি। তখন স্বাভাবিক নিয়মে জনগণকে নিয়ন্ত্রণের সহজ হাতিয়ার হিসাবে ধর্ম গুরুত্ব অর্জন করতে থাকে। হয়ত এই সঙ্গে কিছু করে সশস্ত্র বাহিনী তথা যুদ্ধও গুরুত্ব অর্জন করতে থাকে। কারণ শুধু ধর্মবিশ্বাস দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে যদি সমান্তরালে বলপ্রয়োগের যন্ত্র তথা কোনও না কোনও রূপে সশস্ত্র বাহিনী না থাকে। অনুমান করা চলে সিন্ধু সভ্যতার এমন এক সঙ্কটের কালে জনগণের একাংশের মনে বিশেষত যারা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের মনে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নদীগুলিকে মুক্ত করার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। সুতরাং বিদ্যমান ধর্মের সংস্কারের মাধ্যমে যুদ্ধকে প্রাধান্য দান এবং নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হল।

আমরা অনুমান করি সভ্যতার পতনের পর্যায়ে যখন ধর্ম গুরুত্ব অর্জন করতে শুরু করেছে এবং বৈদিক সংস্কারের মাধ্যমে নদীনিয়ন্ত্রণকে ধ্বংসের লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন রাষ্ট্রের মূল শাসক শ্রেণী সমাজে বিদ্যমান অহিংসার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বরুণকেন্দ্রিক ধর্মে অপর একটি সংস্কারকে উৎসাহ বা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এভাবে হিংসা বা যুদ্ধকে শাসক শ্রেণীর দিক থেকেও ধর্মীয় বৈধতা দেওয়া হল। আবেস্তা হল এই ধর্মের গ্রন্থ। ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’য় এ সম্পর্কে আমাদের আলোচনা আছে। যাইহোক, একটা দীর্ঘকাল স্থায়ী যুদ্ধে সভ্যতার শাসক শ্রেণীর যে অংশ তখনও পর্যন্ত নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে ছিল তাদের পরাজয় হল এই অর্থে যে, তারা নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রক্ষায় ব্যর্থ হল। আমাদের অনুমান মূলত শাসক শ্রেণী নদীনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল। তবে শাসক শ্রেণীর মূল বা প্রধান অংশই যে নদীনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিল তেমনটাই অনুমান করি।

আজ থেকে প্রায় চার বা পৌনে চার হাজার বৎসর পূর্বে সিন্ধুসরস্বতী অবাহিকার বিশাল অঞ্চলে নদীনিয়ন্ত্রণের সমগ্র কৃত্রিম ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নদীগুলিকে মুক্ত করা গেল বৈকি, কিন্তু তার আগেই যেমন নদীর খাত পরিবর্তনের ফলে সরস্বতী মৃত্যু বরণ করেছিল তেমন কৃত্রিম জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবসানের ফলে প্রচুর খাদ্যোৎপাদনের সহজ ব্যবস্থারও অবসান হল। এর পরিণতি হল খাদ্যোৎপাদনের মূল ভিত্তি ধ্বংসের সঙ্গে জনসংখ্যার বিরাট অংশের ধ্বংস বা মৃত্যু এবং বাকী বিরাট অংশের স্থানান্তরগমন। সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চল থেকে চতুর্দিকে প্রাচীন পৃথিবীর বৃহত্তম অভিগমন বা অভিবাসন ঘটল। এটা এক মহাযাত্রা। পশ্চিম ও উত্তরে ইরান, আফগানিস্তান, মধ্যএশিয়া থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপ এবং এদিকে নিকটবর্তী পূর্ব ও দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিশাল ভূভাগে চলল এই গণঅভিবাসন। যে অঞ্চলগুলিতে এই অভিবাসন প্রবল ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছে সেগুলিকে আজ আমরা খুব সহজে ভাষাতত্ত্ব দিয়ে বুঝতে পারি। ইন্দেইউরোপীয় পরিবারভুক্ত ভাষাগুলি যেখানেই আছে বুঝতে হবে সেখানেই সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের এই অভিগমন বা মহাযাত্রা তার পদচিহ্ন রেখেছে।

যাইহোক, সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের পিছনে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা ভূমিকা রাখলেও এই ধ্বংসকে ত্বরান্বিত ও চূড়ান্ত করায় বৈদিক আন্দোলনের ভূমিকাই সর্বাধিক। আর সব সভ্যতার মতো সিন্ধু সভ্যতাও স্বাভাবিক নিয়মে এক সময় মৃত্যু বরণ করত। কারণ নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমনিতেই অকার্যকর হয়ে পড়ছিল। ফলে সভ্যতার ধ্বংস সময়ের ব্যাপার মাত্র ছিল। কিন্তু নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধ্বংস না করলে সিন্ধু সভ্যতা হয়ত আরও কিছুকাল টিকে থাকত, ফলে তা তার প্রভাব ও উত্তরাধিকারকে হয়ত আরও সময় নিয়ে চতুর্দিকে স্থানান্তরিত করে যেতে পারত। কিন্তু বৈদিক আন্দোলন সেই সুযোগ দেয় নাই।

নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধ্বংসের মাধ্যমে সভ্যতা ধ্বংসে বৈদিক আন্দোলন তথা বৈদিক ধর্ম সফল। কিন্তু এর মাধ্যমে বৈদিক ধর্ম তার মর্যাদাও নিদারুণভাবে হারিয়েছিল। কারণ সভ্যতা ধ্বংসের দায়ও তার উপরই বর্তেছিল। সম্ভবত এর ফলে উপমহাদেশে জনসংখ্যার বিরাট অংশের ভিতরে বৈদিক ধর্ম তেমন একটা জনপ্রিয় ছিল না। একদিকে সভ্যতা ধ্বংসের দায়, অন্যদিকে ব্যাপক জনসংখ্যার স্থানচ্যুতি ও স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে বৈদিক পুরোহিত শ্রেণীর যে মর্যাদাহানি ঘটে সেটা তাদেরকে গাঙ্গেয় উপত্যকায় বসতি স্থাপনের পর অনেক বেশী আপোসমুখী হতে বাধ্য করে বলে অনুমান করা চলে। ঋগ্বেদ থাকল। এর ধারাবাহিকতায় অন্যান্য বেদ ও ধর্মগ্রন্থসমূহ রচিত হল। কিন্তু বৈদিক ধর্মের শুদ্ধতা রইল না। যে বৈদিক ধর্মে প্রতিমার স্থান ছিল না সেখানে প্রতিমা পূজা প্রবর্তিত হল। বেদের মন্ত্র পাঠ করেই পূজার কাজ সম্পন্ন হতে থাকল। কিন্তু ক্রমে বৈদিক দেবতাদের পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবৈদিক দেবদেবী প্রধান উপাস্য রূপে দেখা দিল। সবচেয়ে বড় কথা বৈদিক সমাজে বর্ণজাতিভেদের জায়গা না থাকলেও সমাজকে তাত্ত্বিকভাবে চতুর্বর্ণ বা চার বর্ণজাতিতে ভাগের নামে শতসহস্র বা অগণিত ভাগে ভাগ করা হল। এভাবে বৈদিক উত্তরাধিকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে একটি নূতন ধর্মের বিকাশ ঘটানো হল। বৈদিক ঋষিদের তথা পুরোহিত শ্রেণীর উত্তরাধিকারী হিসাবে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বেই বেদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নূতন ধর্ম গঠনের এই সমগ্র কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হল। এটাই এখন আমাদের নিকট হিন্দু ধর্ম হিসাবে পরিচিত।

হিন্দু ধর্ম গঠনের এই জটিল গতিধারা বিশেষ আলোচনা দাবী করে যেটার সুযোগ এখানে নাই। তবে এখানে আমি এ সম্পর্কে যেটুকু বুঝেছি তার সামান্য কিছু ইঙ্গিত দিতে চাই। আমার ধারণা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পর বৈদিক পক্ষ প্রধানত অপেক্ষাকৃত উর্বর ও নিকটবর্তী গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলে অভিবাসন করে। এ কথা আমরা ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’তেও বলেছি। এ কথাও বলেছি যে ব্রাহ্মণরা এই অঞ্চলের আদিম ও পশ্চাৎপদ উপজাতিসমূহের সাথে মিথষ্ক্রিয়া এবং আপোসের মাধ্যমে ক্রমশ প্রতিমা পূজা এবং বর্ণজাতি প্রথা ভিত্তিক হিন্দু ধর্ম গড়ে তোলে।

কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমার ধারণা হয়েছে যে, সিন্ধু সভ্যতার মূল অধিবাসীবৃন্দ যারা বৈদিক পক্ষের মতো পূর্বউত্তর ভারতের দিকে বিশেষত গাঙ্গেয় উপত্যকায় বসতি স্থাপন করে তাদের বেশীর ভাগই বৈদিক ধর্ম বিরোধী ছিল এবং এরা ছিল সিন্ধু সভ্যতার ধর্মমুক্ত রীতিনীতিবিশ্বাসের অনুসারী। সুতরাং এরা ছিল মূলত লোকায়ত দর্শনের অনুসারী। একদিকে দেবতা তথা ধর্মে অবিশ্বাস, অন্যদিকে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণে বৈদিক পক্ষের নৈতিকতা ও মর্যাদার হানি এই বিরাট জনগোষ্ঠীর নিকট বৈদিক ধর্মের কোনও ধরনের গ্রহণযোগ্যতা রাখে নাই। ফলে বৈদিক পক্ষ বা ব্রাহ্মণরা নিজেদের শক্তিভিত্তি খুঁজে পেতে বিন্ধ্য ও গঙ্গার পাহাড়পর্বত ও অরণ্যসঙ্কুল অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের দিকে হাত বাড়ায়। কৃষিভিত্তিক সমাজের তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত জীবনের আশায় আদিম অধিবাসীরা যখন কৃষিসমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে রাজী হয়েছে তখন ব্রাহ্মণরা তাদের অনেক রীতিনীতি ও সামাজিক প্রথাকে গ্রহণ করে তাদেরকে নিম্নতর বর্ণজাতির অন্তর্ভুক্ত করে বৃহত্তর বৈদিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত করেছে এভাবে ব্যাখ্যা করলে হিন্দু সমাজের বিকাশকে বুঝতে সুবিধা হয়। এভাবে বর্ণজাতির কাঠামোতে স্থান পাওয়ায় আদিম সমাজের স্বাতন্ত্র্যবোধ যেমন রক্ষিত হয়েছে তেমন তারা ধীরগতিতে কৃষিসমাজে বিলীন হয়ে সভ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এর ফলে হিন্দু সমাজ ও ধর্মে স্থান পেয়েছে অবিশ্বাস্য গোঁজামিল, স্ববিরোধ, বিস্ময়কর অনেক আদিমতা। যেমন সতীদাহ এবং রাম কর্তৃক সীতার সতীত্বের প্রমাণ লাভের জন্য অগ্নিপরীক্ষার ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা অমানবিক প্রথাকে ধর্মীয় অনুমোদন দান। এ ছাড়া আছে জাতপাতের ভয়ঙ্কর ও কদর্য সব প্রকাশ। এখানে এর একটাই দৃষ্টান্ত দিই — নিম্নবর্ণের শূদ্র শম্বুক স্বর্গলাভের জন্য ধ্যান করায় রাম কর্তৃক তার শিরচ্ছেদ। এছাড়া মনুসংহিতা ইত্যাদি ধর্মীয় গ্রন্থের অনুশাসনাদি এবং বিশেষত ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কল্কিপুরাণ ইত্যাদি বহুসংখ্যক পুরাণগুলি থেকে যেসব হাস্যকর এবং নিকৃষ্ট সব কাহিনীর বিবরণ পাওয়া যায় তা থেকে সহজেই হিন্দু ধর্মের ভিতরকার আদিমতা ও অমানবিকতার চিত্র বেরিয়ে আসে।

এটা ঠিক যে, হিন্দু ধর্ম আপাতদৃষ্টিতে নির্বিরোধ এবং সহিষ্ণু। বহু মত ও পথের প্রতি তার অনুমোদনের কথাও বারংবার বলা হয়। কিন্তু এ সবই প্রযোজ্য শক্তিমানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। দুর্বলের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গী কিন্তু ভয়ঙ্কর হিংস্র ও অসহিষ্ণু। সুতরাং নারীর প্রতি অতীব নির্দয় এই ধর্মের বিধিবিধান। বিধবা নারীদের অগ্নিচিতায় জীবন্ত দগ্ধ হবার হাত থেকে রক্ষার জন্য এই সেদিন বিদেশী, বিজাতীয় এবং বিধর্মীদের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল। আর শূদ্র এবং বিশেষত হিন্দু সমাজ বহির্ভূত হিসাবে বিবেচিত অস্পৃশ্য বা বর্তমানে কথিত দলিতদের প্রতি এই ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গী কতটা সঙ্কীর্ণ এবং ক্ষেত্র বিশেষে কতটা হিংস্র হতে পারে হিন্দু সমাজ সম্পর্কে যাদের কিছু ধারণা আছে তারা জানেন। এখনও ভারতে ঘোড়ায় চড়ার অপরাধে দলিতকে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা পিটিয়ে হত্যা করে। কিংবা মোচ রাখার অপরাধে হামলার শিকার করে।

হিন্দু ধর্ম মানুষকে এক ধরনের নৃশংস মানসিকতার অধিকারী করে। এটা নিদারুণ আত্মপীড়নেরও রূপ নিতে পারে। অনেকে জানেন ব্রিটিশ শাসন কালেও চড়কপূজার সময় পুণ্য অর্জনের আশায় অনেকে শরীরে বড়শী ঢুকিয়ে ঝুলত এবং এই বড়শী গাঁথা অবস্থায় তাদেরকে শূন্যে ঘুরানো হত। পুনরায় এ ধরনের অমানবিক ধর্মীয় প্রথা বন্ধের জন্য ‍ব্রিটিশ শাসকদের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল।

অনেকে জানেন হিন্দু ধর্মের অনুশাসনে অনুমোদন দেওয়া না হলেও এক সময় ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসাবে কীভাবে নরবলি বিশেষত শিশুবলি কতটা প্রচলিত ছিল। হিন্দু দেবতাদেরকে বিশেষত কালীকে তুষ্ট করার জন্য এটা একটা অলিখিত হলেও যথেষ্ট প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা ছিল। নিঃসন্দেহে এ ধরনের নৃশংস রীতিগুলির উৎস আদিম উপজাতীয় মানুষদের পশ্চাৎপদ মানসের মধ্যে ছিল। এভাবে ব্রাহ্মণরা আদিম উপজাতিসমূহকে শান্তিপূর্ণভাবে সভ্য সমাজে আত্মস্থ করতে গিয়ে নিজেরাও নানান ধরনের আদিমতায় অধঃপতিত হয়েছে।

আসলে বোকাদের নেতা হয় চালাক বা ধূর্তরা। বিশেষত যারা বোকা মানুষদেরকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় তারা হয় নিদারুণভাবে অনৈতিক এবং ধূর্ত। সিন্ধু সভ্যতার উন্নত চেতনার মানুষরা ব্রাহ্মণদেরকে মানবে কেন? সুতরাং পশ্চাৎপদ আদিম মানুষরা তাদের মূর্খতা ও অজ্ঞতা দিয়ে ব্রাহ্মণের ধূর্ততার সহজ শিকার হল। আমি সব ব্রাহ্মণকে দায়ী করছি না। কিন্তু তারা এই রকম পরিস্থিতিতে টিকবে কেন? মূর্খ, মূঢ় এবং অজ্ঞ আদিম মানুষদেরকে যারা সবচেয়ে সহজে প্রতারিত করতে পারবে তারাই নূতন কালের পরিস্থিতিতে নূতন পদ্ধতিতে নূতন সমাজ গঠনের নায়ক হবে।

যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উত্থান হলেও ব্রাহ্মণরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাজ গঠনের কলাকৌশল শিখে এসেছিল সিন্ধু সভ্যতা থেকে। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার বস্তুগত ভিত্তি ছিল এমন এক নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যা সভ্যতার প্রায় সবাইকে মূলত একই ছাঁচে ঢেলে সাজাতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পর নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল আর সম্ভব ছিল না। তার ব্যর্থতা মানুষের দেখা হয়েছে। আর বৈদিক পক্ষের উত্তরাধিকারী ব্রাহ্মণদের পক্ষে তো এমন আর একটা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না। কারণ এর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তাদের উত্থান।

এটা ঠিক যে, সিন্ধু সভ্যতায় যুদ্ধের যে শক্তি অনেকাংশে অবদমিত ছিল বৈদিক শক্তি তাকে মুক্ত করেছিল। পরবর্তী ঐতিহাসিক কালের ইতিহাস থেকে আমরা তার সাক্ষ্য পাই। কিন্তু পূর্ব ও উত্তর ভারতের আদিম উপজাতীয় সমাজগুলিকে জবরদস্তিপূর্বক সভ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের শ্রমশক্তির ব্যবহার যথেষ্ট কঠিন ছিল। কারণ এই অঞ্চলে গভীর অরণ্য এবং পাহাড়পর্বত ইত্যাদি যে কোনও জনগোষ্ঠীর পালানোর পথ খোলা রেখেছিল। ফলে ব্রাহ্মণরা আদিম মানুষকে এখানে কৌশলে সভ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত করার পদ্ধতি হিসাবে হিন্দু ধর্মের বিকাশ ঘটিয়েছে এভাবে ব্যাখ্যা করলে আমাদের পক্ষে হিন্দু ধর্মকে বুঝা অনেকটা সহজ হয়। অনুমান করি এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছিল সিন্ধু সভ্যতার শান্তিপূর্ণ আত্মীকরণ পদ্ধতি। তবে সিন্ধু সভ্যতা যেখানে জোর দিত বৃহত্তর সমাজের সর্বোচ্চ পরিমাণ ঐক্য, সমতা ও অভিন্নতা অর্জনের উপর সেখানে ব্রাহ্মণরা জোর দিয়েছে অসমতা, অনৈক্য ও বিভিন্নতার ভিত্তিকে রক্ষা করেই নিজেদের নেতৃত্বে এক ধরনের সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার উপর, যার মূলে রইল ধর্মীয় কিছু প্রথা ও বিশ্বাসের অভিন্নতা।

আমার এখন অনুমান ব্রাহ্মণরা সিন্ধু সভ্যতার গরিষ্ঠ অভিবাসীদের নিকট জনপ্রিয় হতে যেমন পারে নাই তেমন সিন্ধু সভ্যতার লোকায়ত দর্শনসহ বেশ কিছু ধারণা, প্রথা ও রীতিনীতি বহুকাল পর্যন্ত গরিষ্ঠ অভিবাসীদের মধ্যে দৃঢ়মূল ছিল। একটা দীর্ঘ কাল তারা তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা ও বিশ্বাস নিয়ে গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে উত্তর ভারতব্যাপী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের জীবন যাপন করেছিল। মহাবীর ও বুদ্ধের সমকালীন বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র তারই স্মারক। বলা হয় এরা ছিল ক্ষত্রিয় অর্থাৎ যোদ্ধা। যুদ্ধ করেই এসব প্রজাতন্ত্রকে টিকে থাকতে হলেও অহিংসার আবেদন যে তখনও তাদের মনের গভীরে ছিল তার প্রমাণ দুইটি প্রজাতন্ত্র যথাক্রমে জ্ঞাত্রিক ও শাক্য থেকে মহাবীর এবং বুদ্ধের উত্থান।

তারা উভয়ে নিরীশ্বরবাদী। মহাবীর চরম অহিংসাবাদী। মহাবীরের মতো চরমপন্থী না হলেও বুদ্ধও অহিংসাবাদী। অনেক বেশী প্রভাব বিস্তারকারী বুদ্ধ দুঃখবোধে ভারাক্রান্ত একজন সমাজসংসার ত্যাগী সাধক। এক দুঃখময় জীবন চক্র থেকে মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে চেয়ে তার ধর্মবাণী। তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সব্বং দুক্খং — সবই দুঃখময়। একটা অতীব গৌরবময় ও তুলনাবিহীন মহাসভ্যতার ধ্বংস ও মৃত্যুর বেদনা বহন করে যে জনগোষ্ঠী গাঙ্গেয় অববাহিকায় অভিবাসন করেছিল তাদের বেদনা ও হতাশা যেন বুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙ্ময় হয়েছে। সেই সঙ্গে সেই সভ্যতার কিছু স্মৃতিকে ধারণ করে বেঁচে থাকার প্রেরণা, যেমন অহিংসা এবং নিরীশ্বরবাদের ধারণা। এই জায়গায় অবশ্য বুদ্ধের সঙ্গে মহাবীরেরও মিল।

এটা অনুমেয় যে, একটা সুদীর্ঘ কাল লোকায়তসহ সিন্ধু সভ্যতার বস্তুবাদী বা নিরীশ্বরবাদী চিন্তাধারা এবং বৈদিক ধর্মীয় চিন্তাধারা নানান পরিবর্তন ও মোড়পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে ক্রিয়াশীল ছিল। যার কিছু ছাপ আমরা ব্রাহ্মণদের সাহিত্যে পাই। তবে সিন্ধু সভ্যতার মতো এক মহাসভ্যতার পতনের পর সেটা ছিল প্রকৃতপক্ষে সভ্যতার বিচারে প্রতিক্রিয়ার যুগ, পশ্চাদগতির যুগ। ফলে ধর্মেরও বিকাশ ও প্রাধান্যের যুগ। বস্তুগতভাবে সভ্যতার মৃত্যু হয়েছে। গাঙ্গেয় উপত্যকায় আর একটি সভ্যতার জন্ম বা উত্থান ঘটতে আরও দেরী। তবে গণতান্ত্রিকতা, জনকল্যাণ, শান্তিনির্ভরতা, সামাজিক ঐক্য ও সমতার বিচারে সেটা আর কখনও ‍সিন্ধু সভ্যতার সমতুল্য হবে না। তবু সিন্ধু সভ্যতার ভাবপ্রেরণা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ধর্মের আবরণ নিয়ে নিজেকে মূর্ত করে তুলল। সুতরাং এল বৌদ্ধ ধর্ম, যা আড়াইশ’ বছর পরই ভারতবর্ষের সীমানা পার হয়ে পরিণত হল একটি আন্তর্জাতিক ধর্মে।

এভাবে বৈদিক ধর্মের পরিবর্তিত রূপ হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিপরীতে বৌদ্ধধর্ম দেখা দিল ভারতবর্ষের এক প্রধান ধর্ম রূপে। এই উভয় ধর্মের প্রবল প্রতিযোগিতা চলল কমবেশী প্রায় দেড় হাজার বছর জুড়ে। অষ্টম শতাব্দীতে আরব মুসলিম হানাদার কাসিমের সিন্ধু জয়ের পর মুসলিম অগ্রগমন অনেকটা সময়ের জন্য থেমেছিল। তখনও উত্তর ভারতে বৌদ্ধধর্ম যথেষ্ট প্রভাবশালী। দ্বাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নূতন উদ্যমে শুরু হওয়া মুসলিম আগ্রাসন ও বিজয়ের কিছু পূর্বে বৌদ্ধ রাষ্ট্রগুলির, যেমন বাংলায় পাল রাষ্ট্রের, পতনের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের বিজয় নিরঙ্কুশ হল তেমন মুসলিম বিজয়ও অনিবার্য হল।

বৌদ্ধ ধর্মের অবসান ছিল প্রকৃতপক্ষে সিন্ধু সভ্যতার ভাবপ্রেরণার অবশেষটুকুরও অবসান। এইবার নাগরিক চেতনার প্রতিনিধিদের শেষ অবশেষটুকুর জায়গা নিল বুদ্ধিমান কিন্তু ধূর্ত ব্রাহ্মণ শ্রেণীর নেতৃত্বে সংগঠিত আদিম, পশ্চাৎপদ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও কূপমণ্ডুক গ্রাম্য সমাজ। যে বৈদিক পুরোহিত শ্রেণী থেকে ব্রাহ্মণরা এসেছিল সেই শ্রেণীরও ছিল সিন্ধু সভ্যতার মতো একটা উন্নত নাগরিক সভ্যতার পটভূমি। সেটা তাদের বৈদিক ও পরবর্তী কালের ভাষা ও সাহিত্য চর্চার মান দিয়ে সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু গাঙ্গেয় উপত্যকায় এসে যে আদিম মানুষদেরকে সংগঠিত করে তারা তাদের ধর্ম পুনর্গঠিত করল তাদের আদিমতা, মূঢ়তা ও নিকৃষ্টতার অধীনস্থ অনেকাংশে তারা নিজেরা যেমন হল তেমন বৈদিক ধর্মের প্রতি মৌখিক আনুগত্য প্রদর্শন করে তারা যে নূতন ধর্ম গড়ল সেটিও বহু ক্ষেত্রেই হল আদিমতা, মূঢ়তা ও নিকৃষ্টতার মূর্ত প্রতীক। ব্রাহ্মণের বুদ্ধি, জ্ঞান ও অনেক উচ্চমার্গের চিন্তাশীলতা যেমন এখানে প্রতিফলিত হয়েছে তেমন অবর্ণনীয় পরিমাণে আদিমতা, মূঢ়তা, কুসংস্কার, নিকৃষ্টতা এবং অমানবিকতার সমাহার ঘটেছে এই ধর্মে। আমার এই মূল্যায়ন অনেকের নিকট রূঢ় ঠেকতে পারে। কিন্তু এর সত্যতা বুঝবার জন্য হিন্দু ধর্মের দিকে একটু মনোযোগী দৃষ্টিপাতই যথেষ্ট।

তবে এই হিন্দু ধর্ম যে সিন্ধু সভ্যতার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে গভীরভাবে ধারণ করে সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। এ ব্যাপারে শবদেহ সৎকারে দাহের আশ্রয় নেওয়া আমার নিকট খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ভারতের বাইরে প্রায় সকল অঞ্চলের মানুষরা সাধারণত শবদেহ সমাধিস্থ করে বা মাটিতে কবর দেয়। এর সঙ্গে মৃত্যু পরবর্তী জীবন তথা আত্মার ধারণা থাকে। ধরে নেওয়া হয় যে মৃত্যুর পর দেহান্তরিত আত্মা তার দেহে ফিরে আসে। অথবা মৃত্যুর পর আত্মা তার দেহকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় সমাহিত দেখতে চায়। যখন ধর্মের বিকাশ হয় নাই তখনও মানুষের মধ্যে এ ধরনের একটা চেতনা দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি আজ থেকে ৩০/৩৫ হাজার বছর আগে মানুষের কাছাকাছি প্রজাতি নিয়ান্ডারথলরা নির্দিষ্ট সমাধি স্থানে যত্নসহকারে তাদের মৃত সদস্যদের দেহ সংরক্ষণ করত। অথচ ভারতবর্ষে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ইত্যাদি সকল ধর্মাবলম্বী তাদের মৃতদেহ চিতার আগুনে পুড়ায়। আমি অনুমান করি এই প্রথা সিন্ধু সভ্যতা থেকে আগত। মানুষের আত্মায় বিশ্বাস না থাকায় মৃত্যুর পর শবকে আবর্জনা ছাড়া আর কিছু মনে করা হত না বলে এই প্রথার প্রবর্তন ও প্রচলন হয়েছিল এমন অনুমান করাটা কি অযৌক্তিক হবে?

এটা ঠিক যে, সিন্ধু সভ্যতায় শব সমাধিস্থও করা হত। আবার কিছু ক্ষেত্রে শব দাহ করে তার ভস্ম পোড়ামাটির পাত্রে সংরক্ষণও করা হত। প্রত্নতত্ত্ব থেকে এই দুই ধরনের মৃতদেহ সৎকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেহেতু শব দাহ করলে সচরাচর তার কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য পাওয়া সম্ভব নয় সেহেতু আমরা তার প্রচলনের সপক্ষে কোনও প্রমাণ পাচ্ছি না। মাটির জালায় সংরক্ষিত মৃতদেহের ভস্ম সংরক্ষণ ছিল সম্ভবত ব্যতিক্রমী ঘটনা। অবশ্য এটাও মৃতদেহে আত্মার প্রত্যাবর্তনের ধারণার ইঙ্গিত বহন করে না। ভারতবর্ষে ঐতিহাসিক কাল ধরে শবদাহের প্রচলন থেকে আমার এটাই অনুমান যে, এই প্রথার উত্তরাধিকার মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অবিশ্বাসী সিন্ধু সভ্যতা থেকেই এসেছে।

সিন্ধু সভ্যতা প্রকৃতপক্ষে বলপ্রয়োগনির্ভর ছিল না। সুতরাং বিভিন্ন বিশ্বাস এবং প্রথাও সেখানে সহাবস্থান করত। তার ফলে মৃতদেহ সৎকারের বিভিন্ন পদ্ধতি পাশাপাশি ছিল। তবে একটি পদ্ধতি যে সেখানে বহুল প্রচলিত ছিল তেমনটাই মনে হয়। সিন্ধু সভ্যতায় অভিন্নতার উপর যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হত তা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তই নিতে পারি। আমরা বার বার সিন্ধু সভ্যতায় অভিন্নতা অর্জনের সর্বাত্মক চেষ্টার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। আমার মনে হয় কিছু পুনরুক্তি হলেও বিষয়টাকে স্পষ্টতর করার জন্য এখন এ বিষয়ের উপর সংক্ষেপে হলেও কিছু কথা বলা দরকার। যেহেতু অভিন্নতা বা ঐক্য অর্জনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য সেহেতু এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণের স্বরূপ বুঝবার জন্য এখন সংক্ষিপ্ত আলোচনায় যাব।

পরের পর্ব: ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ (পর্ব – ৩) দেখুন এখানে:

শামসুজ্জোহা মানিক। গবেষক, লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক ও এক্টিভিস্ট। জন্ম ও বেড়ে ওঠা....

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নবজাগরণের সঙ্গে নারীর জাগরণ, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা, এবং নারীমুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে এই নবজাগরণের…..

বাংলাদেশের বইমেলায় পশ্চিমবঙ্গের বই-প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক বিতর্ক

বাংলাদেশের বইমেলায় পশ্চিমবঙ্গের বই-প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক বিতর্ক

বাংলা একাডেমি কর্তৃক ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী একাডেমি প্রাঙ্গন ও সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে আয়োজিত একুশে বইমেলা ২০২৩ শেষ…..