ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ (পর্ব – ৩)

শামসুজ্জোহা মানিক
প্রবন্ধ
Bengali
ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ (পর্ব – ৩)

() সিন্ধু সভ্যতায় অভিন্নতা এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের রূপ

সিন্ধু সভ্যতার অভিন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছু আলোচনা করেছি। সেখানে যে কথা উল্লেখ করেছি তার কিছুটা পুনরুক্তি করে বলি যে, বিশাল অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত সভ্যতার সর্বত্র একই ধরনের নগর পরিকল্পনা, একই ধরনের ওজন, মাপ, ইটের ব্যবহার, একই সিল এবং একই লিপির ব্যবহার এবং বেশ কিছু উপকরণের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য সমগ্র সভ্যতায় বিস্ময়কর সমরূপতা বা ঐক্যের বিষয়টিকে সবার সামনে নিয়ে আসে। এ কথা ঠিক, এত বিশাল ভূভাগ জুড়ে সবকিছু এক রকম হতে পারে না। ফলে অঞ্চল ভেদে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পদ্ধতি এবং তৈজসপত্র ইত্যাদির ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সভ্যতার অভিন্ন বহু বৈশিষ্ট্যই সিন্ধু সভ্যতার অভিন্নতার দিকটিকে সামনে তুলে ধরে। অভিন্নতা যে সভ্যতার প্রধান বৈশিষ্ট্য সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নাই।

এখন প্রশ্ন যে, একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কীভাবে সেই যুগে এত দূরবিস্তারী সভ্যতায় এভাবে সমরূপতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটা তো কোনও কালেই সম্ভব নয়। সুতরাং এটা বোধগম্য যে, একটা খুবই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সভ্যতা বা রাষ্ট্রকে পরিচালনা করত। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি থেকে এটা স্পষ্ট যে, যুদ্ধ নির্ভর না হওয়ায় কোনও সামরিক শক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে সিন্ধু সভ্যতার নেতৃত্ব বা পরিচালনা ভার ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য এবং ঋগ্বেদ থেকে এটা স্পষ্ট যে, কোনও ধর্মীয় তথা পুরোহিত শ্রেণীর হাতেও সিন্ধু সভ্যতার নেতৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

এটা স্পষ্ট যে, প্রাচীন আর সব সভ্যতা থেকে এ ক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা এমন এক সভ্যতা যেখানে যুদ্ধ এবং ধর্ম অন্তত প্রাধান্যে ছিল না। বরং এই দুইয়েরই অবস্থান যে সভ্যতার প্রান্তে ছিল তেমন সিদ্ধান্তেই এখন আমরা পৌঁছাতে পারি। অর্থাৎ সভ্যতা মূলত অহিংসা বা শান্তি এবং লোকায়ত চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

এই সিদ্ধান্ত থেকে আমরা এখন অনায়াসে এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, প্রচলিত অর্থে ধর্মবিশ্বাসমুক্ত তথা লোকায়তপন্থী একটি অসামরিক নেতৃত্বকারী শ্রেণী সিন্ধু সভ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই শ্রেণীর রূপ বুঝবার জন্য চঞ্চল এবং আমি আমাদের পূর্বেকার বিভিন্ন লেখায় আলোচনা করেছি। বিশেষত আমার লিখা ‘সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রদর্শন’এ এ সম্পর্কে কিছু বিশদ আলোচনা করেছি। সুতরাং এখানে এ বিষয়ে নূতন করে আলোচনা করব না। তবে খুব সংক্ষেপে এটুকু বলি যে, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, কারখানা মালিক, ভূস্বামী এবং বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবীরা যে সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্র ও সমাজের মূল নিয়ন্তা ছিল আমরা এমনটা অনুমান করতে পারি। জটিল নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতার কারণে কারিগরি বা প্রকৌশল বিদ্যায় লোকজনের প্রভাব ও গুরুত্ব যে এই সভ্যতায় খুব বেশী ছিল সেটা মনে করার সঙ্গত কারণ আছে। একইভাবে নদীনিয়ন্ত্রণের মত অত্যন্ত জটিল এবং সুউন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় উচ্চশিক্ষিত ও পণ্ডিত শ্রেণীর যে বিশেষ মর্যাদা ছিল সে কথাও মনে করার কারণ আছে।

সভ্যতা যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত সে ব্যাপারে সন্দেহ করার কারণ নাই। কারণ গোটা সভ্যতায় ক্ষমতা এবং সম্পদের অতিকেন্দ্রীভবনের চিহ্ন নাই। বরং নগর পরিকল্পনা এবং বসতিগুলি সম্পদ ও ক্ষমতার মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টননির্ভর একটা সমাজের চিত্র উপস্থিত করে। ফলে মিসরের পিরামিড, মেসোপটেমিয়ার জিগ্গুরাট ও প্রাসাদ এবং চীনের রাজপ্রাসাদ বা রাজার সমাধিগৃহের সমতুল্য বিরাট আয়োজন এখানে নাই। বুঝা যায় অন্যসব সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি শ্রেণীর হাতে এই সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ ছিল। এই শ্রেণী যে ধরনের হোক জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হত। হয়ত তারই জের বা ধারাবাহিকতা হিসাবে আমরা প্রাকব্রিটিশকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিদ্যমান গ্রাম পঞ্চায়েতের অস্তিত্ব দেখতে পাই। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের বাইরে ভারতীয় সমাজের স্বশাসনের ব্যবস্থা ছিল পঞ্চায়েত।

সিন্ধু সভ্যতায় কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ পঞ্চায়েত জাতীয় কোনও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভবত সভ্যতার প্রতিনিধিত্বিকারী ব্যক্তিদের যৌথ সিদ্ধান্তে রাষ্ট্র পরিচালিত হত। রাষ্ট্র যে সহিংস ছিল না সে প্রশ্নে নূতন করে বলবার প্রয়োজন নাই। অর্থাৎ জনমত নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধান পদ্ধতি বলপ্রয়োগ ছিল না। ফলে বলপ্রয়োগের ব্যবস্থার অনুষঙ্গ হিসাবে ধর্মও ছিল না। সেক্ষেত্রে এটা সহজেই বোধগম্য যে, রাষ্ট্রকে তথা শাসক শ্রেণীকে রাষ্ট্রে ঐক্য ও সংহতি রক্ষার জন্য ভাষা ও সংস্কৃতির অভিন্নতা অর্জনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়েছিল। সুতরাং সভ্যতার সর্বত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনুরূপতা।

সম্ভবত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল অভিন্ন ভাষা প্রতিষ্ঠার উপর। অর্থাৎ রাষ্ট্র সর্বোচ্চ জোর দিয়েছিল তার অধিকারভুক্ত বিশাল ভূভাগের সর্বত্র একটি মাত্র ভাষার প্রচার ও প্রসার ঘটাবার উপর। কারণ ভাষার অভিন্নতা যে কোনও জাতি ও সমাজের অভিন্নতা রক্ষার জন্য সবচেয়ে সহজ এবং টিকসই হাতিয়ার। আজ আমরা অনুমান করতে পারি ঋগ্বেদ যে ভাষায় রচিত হযেছে আজকের বৈদিক হিসাবে কথিত সেই ভাষা ছিল সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রভাষা। শত শত কিংবা হয়ত প্রায় সহস্র বৎসর ধরে শাসক শ্রেণী সভ্যতার বিপুল সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করেছিল রাষ্ট্র যেখানেই প্রসারিত হয়েছিল সেখানেই এই ভাষার প্রসার ঘটাবার উপর। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ভাষায় লিখতে এবং পড়তে শিখেছিল। বৈদিক বিশেষত পরবর্তী কালে তার কিছু পরিবর্তিত রূপ সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে যারা কিছু ধারণা রাখেন তারা জানেন এই ভাষায় নিখুঁত উচ্চারণের উপর কতটা জোর দেওয়া হয়। সামান্য অকার আকার উচ্চারণেও অর্থ পরিবর্তন ঘটতে পারে। একই মন্ত্রের সামান্য ভুল উচ্চারণেও উল্টা অর্থ হতে পারে; যে ভুল উচ্চারণে মন্ত্র পাঠ করবে তার জন্য ভয়ঙ্কর বা মারাত্মক ফল হতে পারে। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী দেবতা ত্বষ্টার পুত্র বৃত্রের শত্রু দেবতা ইন্দ্রকে বধের উদ্দেশ্যে রচিত ত্বষ্টার মন্ত্রের একটা শব্দের ভুল উচ্চারণের ফলে ইন্দ্রের পরিবর্তে ইন্দ্রের হাতে বৃত্র নিহত হয়।

বৈদিক ভাষা যে সিন্ধু সভ্যতার প্রচলিত ভাষা এ সমম্পর্কে ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ আলোচনা ভগবান সিং তার The Vedic Harappans-এ করেছেন। বস্তুত একপাশে বৈদিক ভাষার বিপুল সমৃদ্ধি এবং সুউন্নত নগর সভ্যতার স্মারক বিশাল শব্দ ভাণ্ডার এবং অপর পাশে বিশালায়তন ব্যাপী বিস্তৃত সুউন্নত সভ্যতার অধিকারী সিন্ধু সভ্যতাকে পাশাপাশি রাখলে যে চমৎকারভাবে উভয়ের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় ভগবান সিং সেটা এই গ্রন্থে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন। ঋগ্বেদের অসংখ্য শব্দ বিচার করে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সেগুলি সিন্ধু সভ্যতার মতো একটা অত্যন্ত উন্নত নগর সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে সিন্ধু সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে ঋগ্বেদকে স্থাপন করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের পর ঋগ্বেদের পটভূমি অন্যত্র খোঁজার চেয়ে হাস্যকর ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না। এরপরেও যদি কেউ প্রশ্ন তুলে বলেন যে, ঋগ্বেদে বর্ণিত গ্রাম, কৃষি ইত্যাদির ব্যাখ্যা কী হবে তবে তার সহজ উত্তর হবে সভ্যতা শুধু নগর নিয়ে নয়। সেখানে গ্রামও থাকে, থাকে কৃষি, থাকে পশুপালনও। আর সবচেয়ে বড় কথা নগর সভ্যতার ক্ষয় এবং গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে ঋগ্বেদ মূলত রচিত হয়েছিল। সুতরাং সিন্ধু সভ্যতার সেই ক্ষয় এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পটভূমিতে ফেলেই তাকে বিচার করতে হবে।

যাইহোক, আমাদের ধারণা বৈদিক ভাষা সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রভাষা ছিল। সেই ভাষার প্রকৃত নাম কী ছিল তা অন্তত এখন পর্যন্ত আমাদের জানা নাই। সুতরাং ঋগ্বেদের ভাষার নাম বৈদিক দেওয়ায় এটাকে বৈদিক হিসাবেই আমরা অভিহিত করতে পারি। এটা এখন বোধগম্য যে, রাষ্ট্রের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে শাসক শ্রেণী ভাষাগত নিয়ন্ত্রণের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে এই ভাষা চর্চার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল। অনুমান করি সভ্যতা যেখানেই বিস্তার লাভ করেছিল সেখানেই এই ভাষা শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষিত লোকদেরকে পাঠানো হত। ফলে বিশাল অঞ্চলব্যাপী সভ্যতার সর্বত্র ভাষা শিক্ষাদানের জন্য এক বিশাল শিক্ষক শ্রেণী গড়ে উঠেছিল। যে ভাষার চর্চাকে রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দিত বিশাল সভ্যতার সর্বত্র যাতে তার পঠন, পাঠন, লিখন ও উচ্চারণে এতটুকু বিচ্যুতি বা হেরফের না ঘটে রাষ্ট্র নিশ্চয় সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখত।

এ বিষয়ে সন্দেহের কারণ না্ই যে, সিন্ধু সভ্যতার বিশাল ভূভাগে যেমন ছিল বিপুল সংখ্যক উপজাতির বাস তেমন ছিল বহুসংখ্যক ভাষারও অস্তিত্ব। একটি ভাষা বাদ দিয়ে কি আর সব ভাষা অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল? সেটা সম্ভব না হলেও তাদের প্রান্তিক দশা আজ অনুমান করা চলে। যতদূর মনে হয় শেষ পর্যন্ত বৈদিক ভাষার মধ্যে অধিকাংশ ভাষাই বিলীন হয়ে তার আরও সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে। হয়ত এর পরেও টিকে থাকা ছোট ছোট ভাষাগুলিও রাষ্ট্রের ভাষা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।

আজ যখন সমগ্র পৃথিবীর বিস্তীর্ণ ভূভাগে ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষাগুলির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায় তখন সিন্ধু সভ্যতার ভাষার শক্তির প্রচণ্ডতাকে সহজেই অনুভব করা যায়। অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চল থেকে উত্তরপূর্ব ভারত, ইরান, মধ্য এশিয়া এবং সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত ভূভাগে যে যেখানে গেছে তারা প্রায় সবাই সাথে করে নিয়ে গেছে একটি অভিন্ন ভাষা হিসাবে ঋগ্বেদ যে ভাষায় লিখা হয়েছিল সেই ভাষাকে। নিশ্চয় অধিকাংশ অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার অভিবাসীরা ছিল স্থানীয় জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত সংখ্যালঘু। এই সংখ্যালঘুরা সভ্যতার ভিত্তিভূমি হারালেও সংস্কৃতি ও ভাষায় ছিল তুলনায় অনেক উন্নত। সুতরাং তারা স্থানীয়দের জীবনকেও প্রভাবিত করেছে নিজেদের উন্নততর সংস্কৃতি ও ভাষা দিয়ে। স্থানীয়দের সঙ্গে কালক্রমে তাদের অনেক সংমিশ্রণ হলেও তারা যে একেবারে বিলীন হয় নাই বরং স্থানীয় সমাজজীবনকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ হচ্ছে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপী ইন্দোইউরোপীয় ভাষাসমূহের আবির্ভাব। বাংলা ও হিন্দীসহ সমগ্র উত্তর ভারতবর্ষের সকল প্রধান ভাষা যেমন বৈদিক ভাষার উত্তরসূরি হিসাবে বিকশিত হয়ে ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবারভুক্ত হয়েছে তেমন ইরান, আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ারও এক বিরাট অঞ্চলের ভাষাগুলি এবং সমগ্র ইউরোপের সমস্ত প্রধান ভাষাই ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবারভুক্ত ভাষা হিসাবে বিকাশ লাভ করেছে। পৃথিবীর এক বিশাল ভূভাগকে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ধ্বংস হবার পরেও সিন্ধু সভ্যতা কীভাবে তার সংস্কৃতি বিশেষত ভাষা দিয়ে প্রভাবিত করেছে এটা তার প্রমাণ। এ থেকে ধারণা করা যায় একটি ভাষার প্রতি রাষ্ট্রের কী পরিমাণ মনোযোগ এবং পরিপোষণ ছিল। এ থেকে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির পরিমাণ সম্পর্কেও সহজেই কল্পনা করা যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা একটি রাষ্ট্রের অবলম্বন হারিয়ে নূতন আবাসের সন্ধানে যখন দেশে দেশে ভ্রাম্যমাণ যাযাবরের মতো অনিশ্চিত জীবন যাপন করছিল তখনও তারা তাদের ভাষার উত্তরাধিকারকে হারিয়ে ফেলে নাই। এ ক্ষেত্রে সভ্যতার শক্তি তো বটেই বরং তার চেয়েও বেশী করে দেখা দেয় ভাষার শক্তি, যার পিছনে ঐ রকম এক দুর্গত অবস্থায় রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি কিংবা বস্তুগত শক্তি কোনটাই ছিল না।

অনুমান করা চলে ভাষা শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চার জন্য বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলি সাম্রাজ্যের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটা নিশ্চয় অনুমান করা ভুল হবে না যে ধর্মীয় আবরণে সিন্ধু সভ্যতার ভাবপ্রেরণা ধারণকারী জৈনধর্মের মতো বৌদ্ধধর্মও জ্ঞানচর্চার এই ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে। সুতরাং আমরা ঐতিহাসিক কালের বৌদ্ধ মঠগুলিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিস্তার দেখতে পাই। বখতিয়ার খলজীর নেতৃত্বে বহিরাগত মুসলমান আক্রমণকারীদের হাতে ধ্বংসের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এমনই এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এমনই এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে দেশবিদেশ থেকে প্রতিবছর আগত হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভাষা, ইতিহাস, গণিত, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করত। এখানে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় সে সম্পর্কে সঠিক চিত্র পাওয়া খুব কঠিন, যেমন তার সঠিক সময় নিয়েও বিভিন্ন মত আছে। বিভিন্ন বিবরণ থেকে অনুমান করা চলে ধ্বংসের সময় ১১৯৩ থেকে ১২০৬এর মধ্যে যে কোনও একটা সময় হবে। বিভিন্ন বিবরণ থেকে এটাও অনুমান করা চলে হানাদার মুসলমানদের হাতে শুধু মঠের নিরস্ত্র বৌদ্ধ শ্রমণরা নয়, উপরন্তু প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী এবং আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার শিক্ষক নিহত হন। এরা সকলেই ছিলেন নিরস্ত্র। বখতিয়ার খলজীর নেতৃত্বে নৃশংস ও কাপুরুষোচিত গণহত্যার পর নালন্দার বিশাল গ্রন্থাগারটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কথিত আছে গ্রন্থাগারটির প্রায় নব্বই লক্ষ পাণ্ডুলিপি ভস্মীভূত হতে তিনমাস সময় নেয়। হয়ত এই সময়টা আরও বেশী ছিল। সেই হত্যা ও ধ্বংসের সঠিক ও বিস্তারিত বিবরণ না পাওয়ায় এখন এগুলির অনেক কিছুকেই অনুমানের উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নাই। তবু বিভিন্ন সময়ের ছাড়া ছাড়া বিভিন্ন বিবরণ এবং ধ্বংসস্তূপের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি থেকে আমাদের সামনে পরিস্ফুট হয় এক অতুলনীয় জ্ঞানতীর্থের অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মর্মন্তুদ ধ্বংসের চিত্র্র। এ ছিল ইতিহাসের এক অতীব ঘৃণ্য হত্যা ও ধ্বংস যজ্ঞ। এভাবে ভারতবর্ষে সিন্ধু সভ্যতার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সাধনার ধারাবাহিকতায় যে অবশিষ্ট আলোকবর্তিকাটুকু কোনও ক্রমে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল মুসলিম হানাদাররা সেসবই নিভিয়ে দিয়ে ভারতবর্ষকে সুদীর্ঘ কালের জন্য অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করল।

এরপর একপাশে থাকল খাইবার গিরিপথ দিয়ে অব্যাহত ধারায় আসা মুসলিম হানাদারদের স্রোত যারা ভারতবর্ষে অবিরাম ধারায় তাদের ধর্মের সঙ্গে বহন করে নিয়ে এল অবর্ণনীয় বর্বরতার অব্যাহত চর্চা, অপর পাশে থাকল ভারতবর্ষের দিগন্ত বিস্তারী অরণ্য এবং দুর্গম পাহাড়পর্বত থেকে অব্যাহত ধারায় সভ্য সমাজে আগত পশ্চাৎপদ ও আদিম উপজাতিসমূহকে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বে সংগঠিত ক’রে অব্যাহতভাবে হিন্দু ধর্ম ও সমাজের নির্মাণ এবং পুনর্নির্মাণ। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। মুসলিম আগ্রাসনে ভারতবর্ষ ভেঙ্গে পড়ল এক দীর্ঘ কালের জন্য। কিন্তু সেটা অনেকটা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষিতের বিচারে। কিন্তু ভারতবর্ষের জনসমাজের বিশাল অংশ হিন্দু ধর্মকে আঁকড়ে ধরে তাদের সংস্কৃতির অনেক বৈশিষ্ট্যকেই রক্ষা করল। প্রায় সর্বত্র মুসলমান আগ্রাসীরা সফল হলেও ভারতবর্ষে তাদের সাফল্য হল খুবই খণ্ডিত। এটা হিন্দু ধর্মের অবদান। আমার ধারণা এই সাফল্যের খুব বড় উৎস ভারতবর্ষের অরণ্যচারী আদিম সমাজের মানুষরা, যারা অব্যাহত ধারায় সভ্য সমাজে এসে এবং হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ভারতবর্ষকে সভ্যতার বিচারে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া কিংবা উত্তর আফ্রিকার মতো একেবারে দেউলিয়া বা নিঃস্ব হবার হাত থেকে রক্ষা করেছে। সুতরাং এ কথা বলতে হবে যে, বহু ধরনের আদিমতা ও পশ্চাৎপদতায় নিক্ষেপ করলেও হিন্দু ধর্ম সভ্যতা ও চেতনার বিচারে ভারতবর্ষকে ঊষর মরুতে পরিণত হবার হাত থেকে রক্ষা করেছে। আর এভাবে ঠিক বৌদ্ধদের মতো করে না হলেও আর একভাবে হিন্দু ধর্ম সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকারের অনেক কিছুকে রক্ষা করেছে।

হিন্দু এবং ইসলাম এই উভয় ধর্মকে আমি মাঝে মাঝে একটা উপমা দিয়ে বুঝতে চাই। হিন্দুধর্ম যদি আরণ্যক বা বন্য জীবনের আবেষ্টন হয় তবে ইসলাম যেন ঊষর মরুজীবনের আবেষ্টন। প্রথমটা হয়ত মানুষের চেতনাকে অনেকাংশে অরণ্যের আদিমতায় নিতে চায়, কিন্তু দ্বিতীয়টা নিতে চায় মরুর শুষ্কতা ও রুক্ষতায়। কষ্টসাধ্য হলেও অরণ্যের জঙ্গল কেটে কৃষি কাজ করা বা সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব। কিন্তু মরুতে চাষ করা অসম্ভব না হলেও অতীব কষ্টসাধ্য।

যাইহোক, ভাষার প্রশ্নে ফিরে বলি যে, সিন্ধু সভ্যতায় আমরা যে সমরূপতা দেখি তার পিছনে শাসক শ্রেণীর যেসব আয়োজন ছিল সেগুলির মধ্যে ভাষা একটি। সমস্ত সভ্যতায় একটি অভিন্ন ভাষার প্রবর্তন ছিল সভ্যতার জন্য অপরিহার্য। আমাদের বুঝতে হবে যে বিশাল অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত সভ্যতা নিশ্চয় একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। একটি কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে সভ্যতার সম্প্রসারণ হয়েছে। এটা হয়ত এক বা একাধিক উপজাতির কনফেডারেসির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। সভ্যতার বিস্তারে যুদ্ধ যদি থেকেও থাকে তবে তার ভূমিকা যে খুব গৌণ ছিল অন্তত প্রত্নতত্ত্ব সেই সাক্ষ্য দেয়। এটা বুঝা যায় যে, সভ্যতার শান্তিপূর্ণ বিস্তারের মূল হাতিয়ার ছিল নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সহজে খাদ্য লাভের প্রেরণা বিশাল অঞ্চলব্যাপী বসবাসরত উপজাতিসমূহকে সহজে একটা কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় নিয়েছে। যেহেতু বলপ্রয়োগ সভ্যতা প্রসারের প্রধান হাতিয়ার ছিল না সেহেতু উপজাতিসমূহের স্বেচ্ছাসম্মতির অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যারা সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হত তাদেরকে অর্থাৎ তাদের প্রতিনিধিদেরকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তথা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের জায়গায় নিতে হত। অন্যদিকে, নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রক্ষা ও পরিচালনার জন্য যেমন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ তেমন বিভক্তির শক্তি যাতে মাথা চাড়া দিতে না পারে সেদিকে সভ্যতার নেতাদেরকে সদাসতর্ক দৃষ্টি রাখতে হত। কারণ সভ্যতায় সামরিক শক্তি বা বলপ্রয়োগের ভূমিকা গৌণ থাকায় সহজেই সমাজে বিভক্তির শক্তি প্রবল হতে পারত। আর সে রকমটা ঘটলে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়তে পারত। অবশ্য একবার নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হলে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়াও কঠিন ছিল। কারণ সামগ্রিক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে রক্ষা করাই সম্ভব ছিল না।

সুতরাং একদিকে নদীনিয়ন্ত্রণের অন্তর্ভুক্ত হবার পর বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যেমন তাকে রক্ষার প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে চেয়েছে তেমন সভ্যতার সর্বত্র ঐক্য ও অভিন্নতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে অধিকতর নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে চেয়েছে। সুতরাং আমরা এ ব্যাপারে অনুমান করতে পারি কেন সিন্ধু সভ্যতায় অভিন্নতার এত প্রভাব। আসলে এইভাবে সভ্যতা নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছে।

আমার মনে হয় এ প্রসঙ্গে আমরা সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলির প্রাচীর নিয়ে একটু কথা বলতে পারি। নগর প্রাচীর একটা রহস্য হয়ে আছে। নগরপ্রাচীরের গঠন প্রণালী থেকে এগুলি যুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নির্মিত বলে মনে হয় না।

এই কারণে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুমান করেন যে, বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য নগরপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু আরও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিকদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে সম্প্রতি একটি বক্তৃতায় মিশেল ড্যানিনো একটা ভিন্ন সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তিনি বলছেন যে, বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীর নির্মাণ করা হতে পারে:

তার অনুমান অনুযায়ী নগরের ভিতরে এবং বাইরে পণ্য গমনাগমনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে। এ কথা সবার জানা যে বাণিজ্য সিন্ধু সভ্যতায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। সুতরাং ড্যানিনোর অনুমানে যুক্তি আছে। এছাড়া কোনও কোনও পণ্ডিতের একটি মতের কথাও তিনি বলছেন যাদের মতে নগরপ্রাচীর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হতে পারে।

কিন্তু আমি আর একটা সম্ভাবনার দিকেও দৃষ্টিকে নিতে চাই। সেটা হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতায় মানুষের জীবন ও চেতনা নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক একটা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে এইসব প্রাচীর নির্মাণ কিনা। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি অনুযায়ী এই সভ্যতায় মানুষের চেতনা ও জীবন নিয়ন্ত্রণের উপর যেভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা অনুমান করা যায় তা থেকে এটা অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না যে, নগরের মানুষের জীবনযাপনের উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষার প্রয়োজন থেকে এই প্রাচীর দেওয়া হত। এর ফলে শাসকদের পক্ষে নাগরিকদের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হত। উপরন্তু এটা একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নগরের প্রসারকেও অসম্ভব করত। অর্থাৎ নগর সর্বদা থাকত নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ। এটার শুধু বস্তুগত দিক যে থাকা সম্ভব তা নয়, সেই সঙ্গে এটার মনস্তাত্ত্বিক দিকও থাকা সম্ভব। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট ছকে মানুষকে আবদ্ধ রাখা — বস্তুগতভাবে এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবেও। হয়ত শুধু নগর নয়, সমগ্র সভ্যতার সকল বসতি এবং গৃহ নির্মাণেও ছিল সুপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ এমন একটা সভ্যতা আমরা পাচ্ছি যেখানে প্রায় সমস্ত কিছু পূর্বপরিকল্পিত, সুনিয়ন্ত্রিত এবং অপরিবর্তিত। সভ্যতায় যে সব বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয় সেগুলি প্রায় সবই সিন্ধুর নগর সভ্যতা নির্মাণ পূর্ববর্তী তথা আদি হরপ্পান কালে এবং সিন্ধুর নগর সভ্যতার ধ্বংস বা বিদায়ী হরপ্পান কালে। পরিণত হরপ্পান তথা সিন্ধুর পূর্ণাঙ্গ নগর সভ্যতা বা পরিণত হরপ্পান সভ্যতার কাল হচ্ছে সভ্যতার একটা মোটামুটি অপরিবর্তনশীলতার কাল। সভ্যতা একই রকমভাবে প্রসার লাভ করেছে। কিন্তু নূতন উদ্ভাবন ও সৃষ্টির কাল এটা নয়। সভ্যতার বিরাট বিস্তার ঘটলেও এটা তার রক্ষণশীলতারও কাল। এতে সন্দেহ নাই যে, এই রক্ষণশীলতার মূল কারণ ছিল অতীব স্পর্শকাতর নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। সভ্যতার শক্তির যেটা অফুরন্ত উৎস ছিল সেটাই এক সময় তার রক্ষণশীলতা, অনড়তা এবং দুর্বলতার উৎসে পরিণত হয়েছিল।

() সভ্যতার অনুরূপতা তথা ঐক্যের মূল শক্তি

এখন আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি কোন্ শক্তি সভ্যতাকে ঐক্যবন্ধনে এত দীর্ঘ সময় বেঁধে রেখেছিল? যদি ধর্ম না হয় এবং সামরিক শক্তিও না হয় তবে কী সেই শক্তি যা একটা নেতৃত্বকে এতটা সক্ষমতা দিয়েছিল? অন্যান্য সভ্যতায় ব্যাপক জনগণকে বহুবিধ মানবিক অধিকার থেকে, খাদ্য থেকে বঞ্চিত রেখে একটা সংখ্যালঘু শাসক শ্রেণী রাষ্ট্র এবং সভ্যতা গঠন করেছিল। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ছিল মূলত শাসক শ্রেণী বা উচ্চবর্গের নিরাপত্তার জন্য এবং সভ্যতা প্রয়োজনীয় ছিল এই উচ্চবর্গের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখভোগের জন্য। ফলে এই সকল সভ্যতায় ব্যাপক সংখ্যক জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সামরিক শক্তি বা সেনাবাহিনীর গুরুত্ব ছিল অপরিমেয়। শুধু বহিরাক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নয়, অধিকন্তু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং অধীনস্থ জনগণকে ভয়প্রদর্শন পূর্বক শান্ত রাখার জন্যও সামরিক শক্তি ছিল অপরিহার্য। কিন্তু শুধু সামরিক শক্তিতে কুলাত না। সুতরাং জনমত তথা জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আর সব সভ্যতায় অলোকবাদী ধর্মের ছিল অপরিমেয় গুরুত্ব। সেনাবাহিনী এবং ধর্ম এই দুইটি হাত ধরাধরি করে আর সব সভ্যতায় থেকেছে। এর কোনও ব্যতিক্রম নাই। সেটা মিসর, মেসোপটেমিয়া, চীন অথবা আমেরিকার আজটেক, মায়া এবং ইনকা সভ্যতা ইত্যাদি যেটাই হোক। সিন্ধু সভ্যতায় যে সেটা হয় নাই সেটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদির দিকে দৃষ্টি দিলে বুঝা যায়।

এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছু কথা বলেছি। তবু বলি, শুরু থেকে স্বেচ্ছাসম্মতির ভিত্তিতে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সাহায্য নিয়ে বাঁধ ও জলকপাট যুক্ত নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নির্মাণ এবং সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের ব্যবহারিক বা বৈষয়িক চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে সভ্যতার নির্মাণ শুরু থেকেই জবরদস্তির প্রয়োজনকে গৌণ করেছিল। কিছু বলপ্রয়োগ না থাকবার কারণ নাই। তবে সেটার তেমন একটা প্রয়োজন না হবার একটা বড় কারণ হয়ত ছিল জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শক্তির ব্যবহার। পরবর্তী ভারতবর্ষে অবাধ্য বা সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে যাওয়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দমন করার জন্য যেমন সমাজচ্যুত করা হত এবং সেই সঙ্গে সাধারণের জন্য নির্দিষ্ট সর্বজনীন কূপ বা পুকুরের জল ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত হয়ত তেমনভাবে সমাজচ্যুত এবং জলবঞ্চিত করা হত। সে যুগে সমাজচ্যুত কিংবা জল ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা অনেক সময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সমতুল্য হত। কিন্তু এ ধরনের শাস্তি তো ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ তাতে বঞ্চিতরা নিজেরা বৃহৎ সমাজ বা গোষ্ঠী গঠন করে এ ধরনের শাস্তির উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে ফেলবে। সমাজচ্যুত কিংবা জলবঞ্চিত করে বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিকে কিংবা খুব ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে শায়েস্তা করা সম্ভব, তার বেশী না।

এটা স্পষ্ট যে, সিন্ধু সভ্যতায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং অলোকবাদী ধর্মের প্রয়োজন হয় নাই সম্পদের মোটামুটি সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর গুরুত্ব দেওয়ায়। সমাজে ধনবৈষম্য প্রকট ছিল না। সকলের প্রয়োজন যতটা সম্ভব পূরণের প্রতি রাষ্ট্র যে মনোযোগী এই বোধও রাষ্ট্র নিশ্চয় তার নাগরিকদের মধ্যে রক্ষা করতে পেরেছিল। সুতরাং নদীনিয়ন্ত্রণ যতদিন কার্যকর ছিল ততদিন নাগরিকদের দিক থেকে রাষ্ট্র মূলত নিরাপদ ছিল। রাষ্ট্র নানানভাবে যে জনগণকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনেই অব্যাহত জনসংযোগের উপর অসাধারণ গুরুত্ব দিত সেটাও মনে হয়। আজকের যুগের মত করে না হলেও সে যুগের মতো করে জনসংযোগের একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল সেটা অনুমান করা চলে। হয়ত শিক্ষার অব্যাহত চর্চা ও বিস্তারের পাশে জনমতকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার জন্য অব্যাহতভাবে জনসংযোগ করা হত। এর ফলে রাষ্ট্রও জনগণের চাহিদা এবং জনমতের গতিধারাকে বুঝতে সক্ষম হত। সম্ভবত এমন একটা শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যাতে করে অব্যাহতভাবে বিশাল রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে এবং প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে চক্রাকারে মতামত সঞ্চালিত হত। হৃদযন্ত্র যেমন রক্ত সঞ্চালনের চক্রকে অব্যাহত রেখে দেহকে সজীব রাখে এটাও হয়ত তেমনভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সজীব এবং গতিশীল রাখত। হয়ত সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে পঞ্চায়েতের মতো জনপ্রতিনিধিত্বমূলক কোনও ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। আমার ধারণা বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা পঞ্চায়েত ব্যবস্থার শিকড় সিন্ধু সভ্যতাতেই প্রোথিত ছিল।

রাষ্ট্র সহিংসতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলবার উপর গুরুত্ব দিত বলে আমরা ধারণা করতে পারি। ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রচারের উপরও রাষ্ট্র জোর দিত বলে ধারণা করি। তবে রাষ্ট্র জবরদস্তি এড়াতে পছন্দ করত বলে সম্ভবত ধর্মের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রচারমূলক। যতদিন সভ্যতায় সঙ্কট দেখা দেয় নাই ততদিন ধর্ম সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রান্তিক বা একেবারে গৌণ অবস্থানে ছিল বলে ধারণা করি। যেমনটা অনুমান করা চলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রয়োজনে যুদ্ধ ও সেনাবাহিনী থাকলেও তা ছিল সভ্যতার প্রান্তবর্তী। বিশেষত সভ্যতার বিপুল সম্পদ পার্শ্ববর্তী কিংবা কিছু দূরবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতি কিংবা জনগোষ্ঠীর মানুষদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারত। প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা একেবারে না রাখা মানে তাদেরকে সভ্যতার উপর আক্রমণে প্ররোচিত বা উৎসাহিত করা। সুতরাং অন্ততপক্ষে বহিরাক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সামরিক ব্যবস্থা সভ্যতা নিশ্চয় রেখেছিল। হয়ত সভ্যতার প্রান্তবর্তী এলাকাসমূহে প্রতিরক্ষার এমন ব্যবস্থা ছিল যেটা এখনও আমাদের অজানা।

যাইহোক, ঋগ্বেদের নির্মোহ এবং সাহসী পাঠ এবং সিন্ধু সভ্যতার এ পর্যন্ত প্রাপ্ত নিদর্শনাদির উপর মনোযোগী দৃষ্টিপাত দ্বারা আমারা সহজেই সিন্ধু সভ্যতার অনন্যতা ও মহিমার মূল উৎস হিসাবে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করতে পারি। এ বিষয়ে সন্দেহের কারণ নাই যে, যে মানুষগুলি এমন একটা কালব্যতিক্রমী ব্যবস্থার উদ্ভাবন এবং প্রয়োগ ঘটিয়েছিল তারা এক অর্থে নিজেরাই ছিল কালব্যতিক্রমী মানুষ। নদীর দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ দ্বারা নদীর গতিধারাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা অন্যান্য সভ্যতায়ও অপ্রচলিত বা অভাবিত ছিল না। কিন্তু নদীর দুই পাশে বাঁধই শুধু নয়, অধিকন্তু নদীর মাঝখানে আড়াআড়িভাবে জলকপাটযুক্ত বাঁধ নির্মাণ দ্বারা সমগ্র নদীর জলপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ বা শাসন করা আধুনিক যুগের পূর্ব পর্যন্ত অন্য সকল সভ্যতাতেই অকল্পনীয় ছিল। এমনকি সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পর আধুনিক কালের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষেও আর কখনও এমন একটা নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের কল্পনা কেউ করে নাই।

যাইহোক, নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একদিনে গড়ে উঠে নাই। ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’য় আমরা এ বিষযে আলোচনা করেছি। সুতরাং এ সম্পর্কে আলোচনা করব না। তবে এটুকু বলা যেতে পারে এই রকম ব্যবস্থা গড়ার উপযোগী হিসাবে দীর্ঘকাল ধরে লোকবাদী তথা অন্ধবিশ্বাসমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন একদল অনন্যসাধারণ মানুষকে গড়ে উঠতে হয়েছে। প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে ক্রমে একদল দুঃসাহসী এবং কালব্যতিক্রমী মানুষের উদ্ভব ঘটেছিল। যেহেতু মানুষের স্বেচ্ছাসম্মতির উপর তাদেরকে নির্ভর করতে হয়েছিল সেহেতু সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় তারা ক্রমশ প্রথার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল। এ সম্পর্কে আমি আমার লেখা ‘সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রদর্শন’এ আলোচনা করেছি। ধর্ম এবং বলপ্রয়োগনির্ভর আইনের পরিবর্তে ক্রমে প্রথা বা সামাজিক নিয়ম হয়ে উঠেছিল সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ তথা জনগণকে নিয়ন্ত্রণেরও প্রধান পদ্ধতি। অর্থাৎ সহজ করে বললে নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পাশাপাশি গড়ে উঠা প্রথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার শান্তিপূর্ণ বিকাশ, বিস্তার ও স্থিতির অন্যতম মূল ভিত্তি।

সবশেষে বলতে চাই এমন একটা জনকল্যাণবাদী সভ্যতায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পনার যে ছাপ আমরা দেখতে পাই তা থেকে সেখানে এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব সম্পর্কে অনুমান করাটা মোটেই অযৌক্তিক হবে না। হয়ত গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজতন্ত্র কিংবা সামাজিক গণতন্ত্রের একটা আদিরূপ সেটা ছিল। ব্যক্তিমালিকানা ছিল বৈকি। তা না হলে বাণিজ্যের এমন বিকাশ সম্ভব হত না। কিন্তু সেসবই যে কঠোর সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে ক্রিয়াশীল ছিল তেমনটা আমরা ধারণা করতে পারি। এর ফলে কোনও ব্যক্তির পক্ষেই অপরিমিত অর্থবিত্তের অধিকারী হওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে তার প্রকাশও ঘটে নাই বাসগৃহ নির্মাণে কিংবা অন্য কোনও বস্তুগত নির্মাণে। শত শত কিংবা সহস্র বৎসর কিংবা ততোধিক কাল সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের ভিতরে থেকে ব্যক্তির উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে হয়। মধ্যযুগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের জনসমাজে বিদ্যমান পঞ্চায়েতমূলক শাসনব্যবস্থার মধ্য থেকে আমরা হয়ত সিন্ধু সভ্যতায় বিদ্যমান ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্কের একটা আদিরূপ খুঁজে পেতে পারি।

() বস্তুনির্ভর ইতিহাস পাঠের সমস্যা

ভারতবর্ষের তথা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস পাঠ প্রসঙ্গে আলোচনায় ইতিপূর্বের দুই পর্বে উপনিবেশিক এবং হিন্দুত্ববাদী পাঠের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বর্তমানে বিশেষত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতরাষ্ট্রে ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠে হিন্দুত্ববাদী পাঠ জায়গা করে নিতে থাকলেও এখন পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষে উপনিবেশিক পাঠই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে আছে। বিশেষত ঋগ্বেদের হাস্যকর ও বিকৃত পাঠ পরবর্তী কালের ইতিহাস পাঠকে যেমন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে তেমন আরও দূরবর্তী অতীতের সিন্ধু সভ্যতার পাঠেও অনেক সমস্যা তৈরী করে। বস্তুত ভারতবর্ষের ইতিহাস অনুসন্ধানে ঋগ্বেদ এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান যে তাকে এড়িয়ে গিয়ে ভারতবর্ষের ইতিহাস ও সমাজের কোনও পর্যায়েরই সঠিক কিংবা বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান বা পাঠ অসম্ভব।

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বহিরাগত আর্য আক্রমণ তত্ত্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটি প্রায় স্বতঃসিদ্ধ সত্যে পরিণত হয়েছিল এতকাল। এর বিরুদ্ধে একমাত্র যে তত্ত্ব ছিল সেটাকে আমরা হিন্দুত্ববাদী বলতে পারি যেটা সম্পর্কেও শিক্ষিত সমাজ প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল বলা চলে। ইদানীং কালে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক আবষ্কারগুলির ফলে বহিরাগত আর্য আক্রমণতত্ত্ব তার পায়ের নীচে মাটি হারিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস পাঠ। এই পাঠের দুর্বলতা নিয়ে আমি কিছু পূর্বে আলোচনা করেছি।

তবে যত দুর্বলতা থাক ইতিহাসের উপনিবেশিক পাঠ এখন পর্যন্ত সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসের প্রায় সর্বজনীন পাঠ হয়ে আছে। এর সবচেয়ে বড় উৎস হল যেটাকে ব্রিটিশ প্রবির্তিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা বলা হয় সেটার মর্মে অবস্থিত উপনিবেশিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী। এই ‍দৃষ্টিভঙ্গী বিশেষত উপমহাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকে ইউরোপীয়দের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দাসত্বের অবস্থানে নিয়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় জ্ঞানতত্ত্বের কোনও কিছুকেই চ্যালেঞ্জ করার সাহস এদের সাধারণত থাকে না। সুতরাং দাসত্বের এই দৃষ্টিভঙ্গীর সবচেয়ে বড় প্রচারক হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধ্যাপক, পণ্ডিত ইত্যাদি। এরই এক মূর্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে মার্কসবাদী অধ্যাপক, পণ্ডিতরা। ইউরোপের প্রাধান্যকারী জ্ঞানতত্ত্ব বা ধারণাকে প্রত্যাখ্যানের জন্য এদের লাগে ইউরোপ থেকেই আগত আর একটি তত্ত্বের অন্ধ অনুসরণ। ভারতে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের বয়ানকে খণ্ডন বা বিরোধিতা করতে গিয়ে এরা যেভাবে উপনিবেশিক বয়ানকে আঁকড়ে ধরে থাকেন তাতে এদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব এবং দারিদ্র্য দেখে এদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কিছুই জাগে না। সত্যকে গ্রহণ করবার মতো সাহস এদেরও নাই। সত্য যত নিষ্ঠুর হোক তাকে বুঝতে না পারলে যে মানুষের নূতন ইতিহাস নির্মাণ করা যায় না সেই সত্যই এরা বুঝেন না।

যাইহোক, দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমি যেটা বুঝেছি সেটা হচ্ছে এই যে, উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ উপমহাদেশের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানসমূহের ভিতর থেকে উপমহাদেশের ইতিহাসের সঠিক পাঠ আসবে না। বিচ্ছিন্ন দুই চারজন প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিত ইতিহাসের নূতন ও স্বাধীন পাঠ নির্মাণের কাজে হাত দিতে পারেন। কিন্তু আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে মূলত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও বিদ্যমান উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ প্রতিষ্ঠানসমূহের বাহির থেকে আসা এক দল নূতন ইতিহাস পাঠক ও লেখকের জন্য। ভারতবর্ষের বস্তুনির্ভর ইতিহাস পাঠ তখনই পূর্ণাঙ্গ রূপ নিবে। শুধু তাই নয়, তাদের মতো মানুষদের হাত দিয়েই নির্মিত হবে আগামী দিনের উপমহাদেশের স্বাধীন ও উন্নত চিন্তাচেতনার উৎকর্ষ সাধনে নিবেদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ।

————

এই রচনায় শামসুল আলম চঞ্চল এবং আমার উল্লেখিত কয়েকটি গ্রন্থ অথবা রচনার নাম এবং অনলাইন লিংক :

১। The Aryans and the Indus Civilization – Shamsuzzoha Manik and Shamsul Alam Chanchal

২। আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা – শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল

৩। Rediscovering Indus Civilization and Aryans: Journey to Our Renaissance: Shamsuzzoha Manik and Shamsul Alam Chanchal

৪। নূতন দৃষ্টিতে সিন্ধু সভ্যতা ও আর্যজন : আমাদের নবজাগৃতির উদ্বোধন – শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল

৫। সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্রদর্শন – শামসুজ্জোহা মানিক

৬। Decline of Indus Civilization and Vedic Upheavalশামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল

৭। কেসস্টাডি ঋগ্বেদ এবং পাশ্চাত্য ও ভারতবর্ষের মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তির স্বরূপ দর্শন — শামসুজ্জোহা মানিক

৮। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সম্পর্কে পুনর্মূল্যায়ন : সঠিক ইতিহাসের প্রয়োজন কেন?’ — শামসুজ্জোহা মানিক

৯। ভগবান সিং এবং শামসুজ্জোহা মানিকের মধ্যে দুইটি পত্রবিনিময়ের অনুলিপির

* ডঃ মোহাম্মদ রফিক মোগলের চিঠির অনুলিপি স্ক্যান করে নিম্নে দেওয়া হল :

শামসুজ্জোহা মানিক। গবেষক, লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক ও এক্টিভিস্ট। জন্ম ও বেড়ে ওঠা....

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ