ভুলে যাওয়া ডাকনামে

শ্রীপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
ভুলে যাওয়া ডাকনামে

জীবন -২

পালানো সহজ নয়
বুকের দরজা খুলে বসে থাকি
অদৃশ্য কালো থাবা, তীক্ষ্ণ নখর
রাজার ঐশ্বর্য ছাড়িয়ে বসে আছি
বুকের ভিতর অ্যাম্বুলেন্স ডাক দিয়ে যায়

শান দিয়ে রাখি গোপন ধারালো
সমাজ কী ভাবে খবর রাখি না
কথার ধরতাই নেই বলে অসামাজিক
অ্যাসফল্টে চলকে পড়ছে রাতের নিয়ন
প্রতিদ্বন্দ্বী না পেয়ে নিজেকেই খুন প্রতিরাতে

 

অনুভূতিহীন বুকের গভীরে

বর্মহীন বুকের ভিতরে উৎসব
হয় না অনেকদিন
বালিয়াড়ি ভেঙে মরুঝড়
অঝোর বৃষ্টিপাত হয়নি বহুকাল
তুমি ভয় পেলে
সেই থেকেই আমার একলা থাকা
রক্তাক্তযাপনে অনুভূতিহীন কালাতিপাত
জলে আর গরলে কোন তফাৎ দেখি না
সোনালি সাপের ঠোঁটে
প্রজাপতি রাখি না সাহসে

রাতের শরীর জুড়ে লৌকিক কুয়াশা
কুয়াশায় মরা হিম
হিমের মতো হৃদয়ে শুধু জমাট পিপাসা
তৃষ্ণার্ত জিভের নীচে
শুধু এক পুরনো সকাল
স্বাদহীন রোদে অনাবিল পুড়ে যায়
না ফেরা জবাবি চিঠির মতো।
নতমুখ নীরব অক্ষর
উৎসবমুখর এই যাবার বেলায়
ঐশ্বর্যবিলাসী তুমি
অন্তহীন স্বপ্নের ভিতর জেগে থাকো।

বেঁচে আছি

আমার তো কিছু চাওয়ার নেই
অষ্টপ্রহর বা নগরকীর্তনে
কোনো ঈশ্বরের কাছে
নতজানু হতে হয়নি কখনো
অর্থ বা পরমার্থ পলান্নের ভোগে
লালায়িত থাকিনি
বিশ্বাস -এর মাধুকরী যাত্রা করি না
দু-বেলা দু-মুঠো শাকান্নের যুগী
পদ্য লেখার জন্য ঔরসজাত
যৎকিঞ্চিত পরমায়ু, বহাল তবিয়তে
বেঁচেবর্তে আছি
সচেতনে এই বোধ একাত্ম করে রাখে
পরকাল রসাতলে দিয়ে
ইহকাল মেপে চলা জীবন-ব্যপারী
মানুষের পাশে বিবাদে-খেউড়ে
মাতাল, ভাঁড়, চোরেদের সাথে
রৌরব নরকের কালনেমি আঁচড়কামড়
সভ্যতার দারুচিনি আতর সুবাসে
ডালে – ভাতে
দিব্যি বেঁচে আছি
নিজের কাছে নতজানু হয়ে।

 

স্বপ্নময় বিস্মরণে

এক আততায়ী প্রিয়মুখ
আমায় হত্যা করে যায় প্রতি রাতে।
এক অশরীরী ছায়া ক্রমাগত
আমায় অন্ধকারে নামায়।
সূর্যের গর্ভজ্বলা অমল আগুনে
সরে না সেই অন্ধকার,
হৃদকমলে সে আলোর কোনো প্রতিভাস নেই।

ওপারেই বনটিয়া দ্বীপ।
প্রতারক মাছরাঙা শ্যামল গহীনে
ঠোঁটের ভালোবাসা ঢেলে মৌরলা খোঁজে।
হাতে বাড়ালেই ছুঁয়ে দেওয়া যায়
তোমার ওষ্ঠপ্রান্তে শ্রাবস্তীর দাগ।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন, স্বপ্নের মধ্যে তুমি,
তুমি এলে বিস্মরণে কোজাগর রাত।
শ্রাবণী চাঁদের মতো ঘুমহীন।

পর্ণমোচী অরণ্য প্রান্তরে
বুকের বোতাম খোলা হাওয়া,
প্রিয়তম ঋণ হাতড়ায় শরীরের ঘ্রাণ
অলীক আকাশ থেকে নেমে আসা
পার্থিব আলোর চাঁদমালা
তমসার মায়াজাল কাটাতে পারে না।
বিস্মরণে তোমায় জাগিয়ে রাখে
ইচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়।

ভুলে যাওয়া ডাকনামে

কোথাও যাবার কোনো তাড়া ছিল না
বহুকাল ভুলে যাওয়া
ডাক নামে কেউ যেন পিছনে ডেকেছে।
পিছনে ভাঙা দরদালান
শ্বেত পাথরের নগ্ন পরি,
দু -হাত বাড়িয়ে মায়াময় অন্ধকার ডাকে
পূর্বপুরুষের ঐশ্বরিক গন্ধ।
ভাঙা মন্দিরে মগ্ন প্রেমে নিবিষ্ট কপোত
জগৎ চরাচরে তারাই পুরুষ ও প্রকৃতি।
যাওয়া তো যাওয়াই?
মুনিয়ার ঠোঁটে ভোর, বুকজলে গাঙচিল
বৃষ্টিজলে আকুল দাদুর,
বিষন্ন মুঠোফোনে ব্যাকুল কিশোরী
ঝুমকো নুপুরে চেপে ধরে মগ্ন গোড়ালি।
অকারণে কত চলে যাওয়া
স্মৃতির দেউল পাট খুলে।
গুহামুখে অন্ধকার গাঢ় হলে
ইচ্ছামৃত্যু বেছে নেয় ঝরনার মতো
পূর্বপুরুষের রৌদ্রচ্ছটা মেখে কংকালসার অস্থি,
বহুকাল ভুলে যাওয়া
ডাকনামে পিছনেতে ডাকে।

কাছে যেতে হয়

কাছে পেতে গেলে কাছে যেতে হয়
আনাড়ি মন ভালোবাসার মানেই বোঝেনি।
একলা ঘরে রইল বসে
যাবার আর সময় হল না।
ঠাস বুনোট বাসনা দু-হাতে সরিয়ে
উলের বলের মতো গড়িয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা,
বৈতরণীর দিকে। পাথর ছুঁয়ে, জল ছুঁয়ে,
আনাড়ি হৃদয় ছুঁয়ে, রেখে গেল
না বোঝার মতো কিছু জলছবি।

যাবার আর সময় হল না।
অনেক কিছু ছিল, যা রাখার মতো,
আধার ছিল না। টুকিটাকি বলে
যা অবজ্ঞায় ফেলে দেওয়া হল, তার সঙ্গে
চলে গেল অনেক মেধাবী উজ্জ্বলতা।
কররেখায় মুখ দেখা দর্পণের মতো।
আলাতচক্রে ধুয়ে গেল আলপনা।
শূন্য স্থান ভরে দিল
এলোচুলে ছুটে আসা দখিনা হাওয়া।
পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর হয়তো ছিল
আনাড়ি মন ভালোবাসার মানেই বোঝেনি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ