ভ্রমণ শেষে

মহসীন হাবিব
গল্প, পডকাস্ট, রম্য রচনা
Bengali
ভ্রমণ শেষে

একটা কাঁথাগায়ে শুয়ে আছি। গায়ে বেশ জ্বর। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে হু হু বাতাস। কিছুই ভালো লাগছে না। কেমন একটা বিষন্ন অবস্থা। একটু আগে বিদ্যুৎ চলে গেছে। সবকিছু কেন সন্ধ্যাবেলা ঘটে কে জানে! সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ যায়, ঝড়-বৃষ্টি বাড়ে, কারো ব্যাথা থাকলে বাড়ে। সন্ধ্যাবেলা ধম্ম-কম্মও বেশি মাথা চারা দিয়ে ওঠে। আমার ছোট টিনের ঘরের দুটো জানালাই খোলা। জানালা দিয়ে বাতাসের কারণে বৃষ্টির ছিটা এসে ঘরটিতে পড়ছে। পড়ুক, উঠে বন্ধ করতে ইচ্ছা করছে না। শুয়ে শুয়ে বৃষ্টিভেজা কালো আকাশ দেখছি।

আমার ঘরটি ফাঁকা একটি জায়গায়। ইরিধান ক্ষেতের পাশে।  আশেপাশে বিশেষ জনবসতি নেই। তাতে অসুবিধা নাই। অবিশ্বাসীর লিস্টে নাম নাই। তাই খুন-খারাবির ভয় নাই। নিয়মিত নামাজ রোজা করি। অনেক সুবিধা। কাছেই একটা ডিপটিউবওয়েলের ছোট্ট ঘর আছে। আমার ঘরটার সমান। কাছেই যেখানে পাকা রাস্তা সেটা ধরে আগালে একটা মসজিদ আছে। তার আশেপাশে কয়েকটি বাড়ি আছে। এই বৃষ্টির মধ্যেই মসজিদে আযান শুরু হল বিকট শব্দে। ধান ক্ষেতের ভেতর থেকে কয়েকটি শেয়াল ডাকছে। গায়ের জ্বর, বৃষ্টি, অন্ধকার, আযানের শব্দ, শেয়ালের ডাক সবকিছু মিলে কেমন যেন কেয়ামত-আখেরাত-মৃত্যু বিষয়ক ভয় আমার মধ্যে জড়ো হতে থাকল। মনে হল চারদিকে প্রেতাত্মারা ঘোরাফেরা করছে। আমি সেই ভয় নিয়েই কেমন তন্দ্রায় চলে গেলাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো, নিঃশ্বাস গভীর হল। আমি বোধ করি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপরই এক অদ্ভূত স্বপ্নের মুখোমুখি হলাম।

বিস্তৃত এক মরুভূমি হেঁটে পার হয়েছি। তপ্তমরুর বালুতে হেঁটে হেঁটে প্রচ- ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু আরো হাঁটতে হবে। আমি ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি না। মরুভূমি পার হয়েছি বলা যায় না। আরো কিছুদূর হাঁটতেই আমি একটি প্রাচীর দেখতে পেলাম। প্রাচীরের উচ্চতা দেখতে আমি উপরের দিকে তাকালাম। মনে হল প্রাচীর সাত আসমান ভেদ কে মোকামে কা’বা কাওসাইনে উঠে  গেছে। আমিমহতাশ হয়ে প্রাচীরের ডান পাশ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। কতদূর যেতে হবে কে জানে! হয়তো এ প্রাচীরের কোনো শেষ নেই। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো। কিছুদূর যেতেই প্রাচীরের গায়ে একটা বিশালাকৃতির ফটক দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছে সোনা রূপা দিয়ে বানানো ফটক। সোনার রং আমার কোনোদিন ভালো লাগে না। সোনার রঙের সঙ্গে আমি মানুষের মলের রঙের মিল দেখতে পাই। রূপাও তাই। চকচকে, কিন্তু আমাকে টানে না। তাছাড়া এসব ধাতুর সঙ্গে আমার বিশেষ বৈরিতা আছে।  সোনা-রূপা-জহরত হলো ধনী, অত্যাচারী, সামন্তবাদী এবং শোষকদের প্রিয় সহচর। আর দরিদ্রের দুঃস্বপ্ন।  আমি সোনারূপার মধ্যে কোনো স্নিগ্ধতা খুঁজে পাই না। ওসব ধাতু আমার কাছে ভয় আর আতঙ্ক।

গল্পের অডিও শুনুন এখানে:

কিন্তু এই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না। আমার নিজের ঠিকানা খুঁজতে হবে। কোনো গার্ড দেখছি না। সম্ভবত ডিউটি ফাকি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি টুক করে ঢুকে পড়লাম গেট দিয়ে। কেউ বাধা দিল না। ঢুকেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো হাওয়াটা অন্য্যরকম। মরুভূমির তপ্ত গরম নেই, আবার ফিনল্যান্ডের মত বরফ ঠান্ডা নেই। বাতাসে পাকিস্তানি আতরের গন্ধ ভাসছে। একটা গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। চারদিকে অনেক মানুষ দেখা যায়। এশিয়ার এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ। এখানে ওখানে ঝরণা, ফোয়ারা, জলপ্রবাহ। তবে সবই যেন কৃত্রিম মনে হল। যে গাছটির নীচে দাঁড়িয়েছিলাম সেটার দিকে মাথা তুলে তাকালাম। একটি পাতাও নড়ছে না। আরেকটু ধাতস্থ হতেই বুঝলাম গাছটি রূপার। পাতাগুলো সোনার। আবার আমার অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। গাছ যদি হয় ধাতুর, তাহলে তার নীচে দাঁড়িয়ে লাভ কী?

এখন বর্ষার শুরু। এখানে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ থাকলে কত ভালো হতো! লাল ফুলে গাছ ছেয়ে থাকতো। বাতাস এলে লাল পেরে শাড়ি পরা বউয়ের মত দুলতে থাকতো। ভাবতে ভাবতে ডানদিকে তাকালাম। মানুষের স্বভাব এদিক-ওদিক তাকানো। দেখলাম দশ হাত দূরে একজন মানুষ। শ্যামবর্ণ, মাঝারি সাইজ লোকটি। পরণে আরবি পোশাক, কিন্তু দেখে বাঙালি মনে হচ্ছে। এই দুনিয়ার সবচেয়ে কুৎসিত ড্রেস-আপ হলো বাঙলির গায়ে আরবী পোশাক। একটু এগিয়ে যেতেই তিনি আরবীতে কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথায় আমি শুধু মারহাবা, জান্নাতুল ফেরদৌস শব্দ দুটি ধরতে পারলাম। ইতোমধ্যে লোকটিকে আমার চেনা চেনা লাগতে শুরু করেছে। তার বকবকানি কিছুই বুঝতে পারছি না। এক পর্যায়ে অস্থির হয়ে বললাম- আপনি সেই আবুল কালাম ভাই না? বোমা ফেটে মারা গেলেন! বাংলায় কথা বলেন ভাই!

তিনি একটু থামলেন। কিছুক্ষণ থমকে থেকে আমার হাত ধরে বললেন, তুই ঠিকই ধরছিস। আমি আবুল কালাম। এখানে আসলে বাংলা বলাটা ঠিক না। বাংলা হিন্দুর ভাষা। আরবী হইল আল্লাহর ভাষা, মুসলমানের ভাষা।

এইটা কোন জায়গা, এখানে আপনি কী করেন? এইটাই তো জান্নাতুল ফেরদৌস, বুঝোস নাই? এইখানেই তো আমি বসবাস করি। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। তাঁর কথা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।

না নড়বে ক্যামনে। ধাতু দিয়া বানানো পাতা… কিন্তু আপনি এইখানে আসলেন ক্যামনে?

গেছিলাম কিছু নাছাড়া হত্যা করতে। দশ-এগারোটা মরছে। সেই সঙ্গে আমিও মরলাম। আলহামদুলিল্লাহ, দেখি অটোমেটিক বেহেস্তে দাখিল হইছি!

আপনারে বেহেস্তে দাখিল দিল?

দিবে না? আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়া মরছি না? তোর কোনো আইডিয়া আছে? আমরা হইলাম আল্লাহর পথের শহীদ। এইখানে আমাদের মর্যাদাই আলাদা। চল তরে ঘুইরা দেখাই। ওই সামনেই আমেরিকার টুইনটাওয়ারে বোমা মারা ১৯ জনও আছে।

কী করে তারা?

ফূর্তি করে। আমরা সবাই ফূর্তি করি। বাংলাদেশের কত ইমাম, কত মোল্লারা আছে! চল, দেখবি।

আমি তার সঙ্গে হাঁটতে থাকলাম। বললাম, ফূর্তি ছাড়া আর কী করেন?

আল্লা-বিল্লা করি, ফলফলাদি খাই।

আর ফূর্তি ক্যামনে করেন?

এই শরাবুন তহুরা পান করি, হুরপরিদের নিয়া নাচানাচি করি, মজা করি। যখন যারে ইচ্ছা ঘরে নিয়া যাই। অনন্তকাল ধইরা তাই করবো।

নাচানাচি করেন ভালো কথা। এখানে গানের ব্যবস্থা আছে?

আছে তো, চল দেখাই।

আমি কালাম ভাইয়ের সঙ্গে চললাম। বেশ কানিকটা দূরে গিয়ে দেখলাম একদল লোক হামদ, নাথ গাইছে। কোনো বাজনা নাই, তাল নাই। আরেকটু দূরে গিয়া দেখলাম কয়েকজন লোক বসে গাইছে ইয়া নবী সালামালাইকা, ইয়া হাবিব…

আমি খুবই আগ্রহ নিয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম। আল্লাহ-রসুলের গান। কিন্তু কোনোরকম মন বসাতে পারলাম না। কেমন যেন মিলাদ মাহফিলের মতো মনে হলো। আমি দেখতে চেয়েছিলাম জলসা। বললাম চলেন হাঁটি।

সামনেই দেখলাম আরবী চেহারা, পাকিস্তানী চেহারার মোটা মোটা মানুষরা এদিক-সেদিক যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে এক-দুইজন ১০-১২ বছরের সুস্বাস্থ্যবান বালক। বাচ্চাগুলোর ত্বক কেমন যেন প্লাস্টিকের মত, উজ্জল, চকচকে। মুখে মানবশিশুর কোনো অভিব্যক্তি নেই। মনে হয় অদ্ভুত সুন্দর জাপানি পুতুল। বললাম, কালাম ভাই, বেহেস্তে কী পারিবারিক জীবন আছে?

নাহ! ওইসবের বালাই নাই।

তাহলে ওই যে লোকগুলো বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরছে?

হারে বোকা! ওরা হইল কচি গেলমান। প্রচুর সাপ্লাই। যারা বেহেস্তে আসার জন্য আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করছে, তাদের আবার এই গেলমানগুলা খুবই পছন্দের।

ওই যে পর্দা দেওয়া হাজার হাজার ঘর দেখা যায়, ওইখানে কী?

বেহেস্তবাসীরা যার যখন খুশী ওইখানে হুর নিয়া, গেলমান নিয়া ফূর্তি করতেছে।

কালাম ভাই, এইখানে ইতিহাসচর্চা, দর্শন চর্চা, শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র নাই?

তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, ওই সব নাই। ওগুলা দিয়া এইখানে কী হবে! অনন্তকাল এইখানে খাবার আছে, ফূর্তি আছে তাইলে ওগুলা দিয়া মানুষ কী করবে? ওইসব ঝামেলায় মানুষ যাবে ক্যা?

কিন্তু মানুষের আবিস্কারের, জ্ঞানচর্চার নেশা আছে না?

ওইসব নেশা-ফেশার লোক বেহেস্তে রাখা হয় না। বেহেস্ত ছাড়াও তো অন্য ব্যবস্থা আছে। যা, এখন তোর মত তুই ঘুর গিয়া। আমি এখন দুইটা হুর নিয়া ফূর্তি করবো!

ভাই, একটা কথার উত্তর দিয়া যান। ওই যে একটা জায়গায় অনেক মানবী, অনেক হুরপরী ভীড় করে আছে, ওইখানে কী?

ওইখানে একজন মহাপুরুষ। বেহেস্তেও তিনি নারীকূলের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

ভাই, আপনেরাও কি মহাপুরুষদের মতো সুযোগ-সুবিধা পান?

তিনি নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, কিন্তু মহাপুরুষদের স্পেশাল। যেমন এই মহাপুরুষকে নাবালিকা হুরপরী দেওয়া হয়। স্পেশাল অর্ডারে তৈরি। আমারও একটা চেয়ে দেখতে হবে। মাদ্রাসায় থাকতে আমারও নাবালিকা পছন্দ ছিল।

কালাম ভাই দৌড়ে চলে গেলেন। যেন তর সইছে না। আমি হাঁটতে থাকলাম। ইচ্ছে করেই মহাপুরুষের ভীড়ের কাছে গেলাম। একটি হুর আমার পাশ দিয়ে মহাপুরুষের দিকে গেল। দেখলাম তার গা এত স্বচ্ছ যে শরীরের ভেতরের সব দেখা যায়। শুনেছি দুনিয়ায় একধরনের পুতুল পাওয়া যায় স্ত্রী বা গার্লফ্রেন্ডের বদলে কাজ চালানোর জন্য। তার সঙ্গে এই হুরগুলোর পার্থক্য কী বুঝতে পারলাম না। তাছাড়া হুরগুলো তো জাতিতে নারী। যে নারী অর্ডার দিলেই বিনা বাক্যব্যয়ে পাওয়া যায়, সে কী আনন্দ দেবে?

বাঁ’দিকের একটি ফুলের বাগানের মধ্য দিয়ে হাঁটতে থাকলাম।

আসসালামু আলাইকুম।

আমি চমকে সেদিকে তাকালাম। দেখলাম শশ্রুমণ্ডিত, আলখাল্লা গায়ে একজন ষাটোর্ধ ব্যক্তি একটি বেদির উপর বসে ঝিমাচ্ছেন।

আপনি এখানে কী করছেন ভাই?

শরাবুন তহুরা পান করছি।

আপনার পাশে ওই পিপার মধ্যে কী?

এর মধ্যেও শরাবুন তহুরা।

বেহেস্তে তো সাকীর অভাব নেই, আপনি চাইলেই সাথে সাথে হাজির। তাহলে পিপা নিয়ে বসেছেন কেন?

আমি তাই করছি। একেকজন হুর এসে একেকবার দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পিপা রেখেছি, চোখের একটা ক্ষুধা আছে না?

দুনিয়ায় থাকতে খেয়েছেন?

লোকটির চোখমুখ অন্যরকম হয়ে গেল। বললেন, আহা! কত ইচ্ছা করছে! কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে সামলেছি। দুনিয়ার বুকে কয়েকদিন খেয়ে কি শেষে অনন্তকাল খাওয়ার সুযোগ হারাবো নাকি! আমি এত বোকা নই!

তিনি বাঁ হাত সামান্য একটু নাড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে দু’টি হুর হাজির হল। পতিতালয়ের রমণীরা যেমন খরিদ্দারদের সন্তুষ্ট করার জন্য গা ঘেষাঘেষি করে ছলাকলা করে, তেমনি লোকটির দু’পাশে বসে ছলাকলা করতে থাকল। কিন্তু লক্ষ করলাম তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তিনি বাঁ পাশেরটাকে জড়িয়ে ধরে অন্যটিকে বললেন, শরাব লেকর আও!

আমি বললাম, ভাই, এই আদেশটা উর্দূতে দিলেন কেন?

তিনি বললেন, সব কথা সব ভাষায় জমে না। খতম কর দো, লাড়কি কাঁহা, শরাব লেকর আও এইসব কথা উদূর্তে ভালো শোনায়। এখন যাও, বিদায় হও! ফূর্তি করতে দাও!

লাস্ট একটা কথা জিগাই ভাই। শরাবুন তহুরা খাইতে কি চোলাই মদের মত না হুইস্কির মত?

লোকটি নির্লীপ্ত চোখ তুলে তাকালেন। বললেন, স্কচ হুইস্কি কখনো খাওয়া হয় নাই। দেখি অর্ডার দিয়া, পাওয়া যায় কি না!

আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কেউ একটু সময় দিতে চায় না। যাদের হাতে অনন্তকাল সময় পড়ে আছে, যাদের কোনো কাজ নেই, জীবনের বৈচিত্র্য নেই… কেবলই একটা বড় জেলখানায় বসবাস, তারা একটু গল্পে আগ্রহ পায় না, প্রশ্নে আগ্রহ পায় না। কেবলই ইন্দ্রীয়সুখে বিভোর। কী অসম্ভব শক্তি ইন্দ্রীয় সুখের!

চকচকে হিরা মুক্তা দিয়ে বাঁধানো রাস্তায় চলতে শুরু করলাম। রাস্তায় রীতিমতো চেহারা দেখা যায়। দেখলাম এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে একটা ঠেলা গাড়ি। নিচু ঠেলাগাড়ি। অদ্ভূত সুন্দর হিরামুক্তা খচিত চারটি চাকা। ঠেলাগাড়ির ওপরে গদি মোড়ানো আসনে বসে আছে ছোটখাটো একজন মানুষ। গায়ের রঙ কালো।  পেছনে হাতল ধরে ঠেলে নিয়ে আসছে একটি হুর।  লোকটি মুখ সামনের দিকে বাড়িয়ে বলছে লাইলাহা ইল্লাল্লাহ…আর সঙ্গে সঙ্গে লোকটির সামনে রাখা একটি বাটিতে পাঁচশ’ টাকার একটি নোট পড়ছে। আবার বলছে, আবার পড়ছে।  আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম ভাই, মাজেজা কী!

লোকটি মুচকি হাসছে। এই হাসির মধ্যে একটা বিজয়ের আভা আছে। বলল, দুনিয়ায় ভিক্ষা করতাম। অভ্যাসটা রাইখা দিলাম। এ-ই-যে পাবলিকের হাতে-পায়ে ধরছি একটা টাকার জন্য। ৫০ জনের কাছে কান্নাকাটি করলে একজন ১ টাকা বাইর কইরা দিত। তারপর আবার এমুন ভাব করতো যে গরিবের ওপর তার বিরাট দয়া, এই নে দিলাম! এখন দ্যাখ, মুখ ভালো কইরা না তুলতেই পাচ শ’ ট্যাকার নোট!

বেহেস্তে আসলেন কীভাবে?

ভালো প্রশ্ন করছেন। দুনিয়ায় ভিক্ষা করতে গিয়া আল্লাহ আর রসুলরে এত ডাকছি যে বেহেস্তে পাশ না হইয়া যায় নাই। আইচ্ছা আসি। আমি আবার ভিক্ষা-টিক্ষা সাইরা একটু মতিউর হুজুরের আস্তানায় যাবো। তাছাড়া এই হুরটারেও অনেকক্ষণ ধইরা আটকায়া রাখছি।

বেহেস্তে আবার আস্তানাও আছে নাকি?

আছে না? যে যা চায় সবই আছে। ইসুপগুলের ভূষি, যার যা মনে খুশি। লা ইলাহা ইল্লাল্লা…

আরো অনেক মানুষের দেখা পেলাম। একজন দেখলাম শুয়ে আছে। তার সারা শরীরে তেল মালিশ করে দিচ্ছে বেহেস্তের সেবকরা। তিনি আরাম করে মালিশ খাচ্ছেন। আমার দিকে চোখ পড়তেই মিষ্টি করে হাসলেন। আরেকজনকে দেখলাম বড় সাইজের প্লেটে পোলাও-মাংস নিয়ে বসেছেন। পাশে একটি প্লেটে ইলিশ মাছ ভাজা। বুঝলাম ইনিও বাঙালি। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, ভাই, মেনু কী আজ?

লোকটি ধমকে উঠল। মেনু কারে কয়! এইডা কী জেলখানা নি, না এতিম খানা! নাকি মেসবাড়ি!

না, আমি জানতে চেয়েছিলাম কীসের মাংস দিয়ে খাচ্ছেন?

এবার তিনি হাসলেন। বললেন, অনেক ধরনের মাংস আছে। দুনিয়ার বুকে জেলখানায় দেখছি এক টুকরা গরুর মাংস দিয়া চালায় দেয়। সেই মাংস এত ছোট যে খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না। মনে হইতো মসল্লার জলে ডুইবা আছে। আর এইখানে? হরিণ, কইতর, খরগোশ থিকা শুরু কইরা সব আছে যা খাইতে চান। একটা মাংস আনাইছি আইজ নতুন। পাখির নাম পেঙ্গুইন। কালা পাখনা, সাদা বুক। মনে হয় গায়ে কোট পড়ছে। বরফের মইধ্যে দিয়া মানুষের মত হাঁটে। দুনিয়ায় থাকতে কত শখ হইছে একটু খাইয়া দেখতে! পারি নাই। এইবার তুমি কুথায় যাবা কোট গায়ে পাখি!

দুনিয়ায় জেলখানায় ছিলেন?

ছিলাম কিছুদিন।

জেলখাটা মানুষ বেহেস্তে আসলেন কীভাবে?

তিনি হাসলেন। বললেন, আল্লাহর লীলা, বুঝা দায়!

খেয়ে উঠে কী করবেন?

লোকটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, খেয়ে উঠে আবার খাবো! তারপর আবার খাবো। প্রচুর খাবার। অরুচি নাই।

রাস্তায় হাটার সময় আমরা দু’পাশের গাছের ঝিরঝির পাতা নড়তে দেখি। ফুলে ফলে ভরে থাকতে দেখি। সেই প্রকৃতি কখনো বৈরি হয়ে ওঠে। আমরা যুদ্ধ করি প্রকৃতির বিরুদ্ধে। আবার যখন শান্ত হয়ে আসে, আমরা উপভোগ করি। প্রকৃতি তখন মাতৃস্নেহ দেয়। দুশ্চিন্তা কখনো গ্রাস করে বলে আনন্দের সময়টা আমাদের জন্য উপভোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এইখানে যেন প্রকৃতি নেই। সবকিছু যেন এক্যুরিয়ামবদ্ধ। ডোবার কাদাজলের মাছকে স্বচ্ছ লাল নীল পাথরে রাখলে মাছগুলোর ভালো লাগতে পারে না। আমি বেহেস্ত থেকে দৃঢ় পায়ে হেটে বের হয়ে এলাম।

প্রাণভরে দম নিলাম। বাতাসে ধানের গন্ধ। এখন আর আমি কোনো মরুভূতিতে নেই। মেঠো পথ সামনে। একটা কাঠ বিড়ালি চিচি করতে করতে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গেল।

দূরে কোথায় যেন বাউলের একতারার টংটং শব্দ ভেসে আসছে। আমি হাঁটছি, জীবনের গন্ধ পাচ্ছি।

স্বাগতম! স্বাগতম!

আমি পাশ ফিরে তাকালাম। আরবীয় পোশাক গায়ে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। ভাবলাম আবার সেই আলখাল্লা! তিনি বললেন, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমার নাম মকরম। আপনি আমাকে চেনেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কোন মকরম?

এই নামে আমাকে চেনেন না। আমার আরেক নাম ইবলিস। আপনারা আমাকে ইবলিস শয়তান বলে ডাকেন। দেখলাম বেহেস্ত পরিদর্শন করে পৃথিবী গ্রহের বাংলাদেশ নামক দেশের দিকে নেমে আসছেন। ভাবলাম বেচারা বেহেস্ত দেখলেন, কিন্তু দোযখ দেখলেন না। এতে জ্ঞান অপরিপূর্ণ থেকে গেল না? তাই আপনাকে অনুরোধ করতে নেমে এলাম, চলুন, দোযখটাও একটু দেখে যাবেন। সবাই তো দোযখকে ভয় পায়। আপনার যদি অন্য অনুভূতি হয়!

না ভাই, বেহেস্ত দেখেই মন খারাপ হয়েছে। দোযখ দেখার আর দরকার নেই।

ইবলিস হাসলেন। বললেন, খুবই খুশী হলাম যে আপনার বেহেস্ত দেখে মন খারাপ হয়েছে। যাদের বেহেস্ত দেখে মন খারাপ হয়, তাদের দোযখ দেখলে ভালো লাগে। এটি একটি পরিপূরক বিষয়। তাহলে কোনটা দেখবেন, জাহান্নাম, নাকি লাজা? জাহান্নাম সবচেয়ে বড় আর ভয়ানক, লাজা সবচেয়ে ছোট।

আমি যাবো কিনা চিন্তা করে বললাম, দেখবই যখন বড়টা দেখাই ভালো। চলেন জাহান্নামই দেখি।

ইবলিস আমাকে এক পলকে জাহান্নামে নিয়ে গেলেন। আমি ভেতরে প্রবেশ করেই হতবাক হয়ে গেলাম। চারদিকে শুধু সাপ আর সাপ! ইবলিস বললেন, কী, ভয় পাচ্ছেন?

হ্যা, ভয় পাচ্ছি! এমনিতেই সাপকে আমি খুব ভয় পাই!

আপনাদের পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে তারমধ্যে অন্যতম ভীতু প্রাণী হল সাপ। আর পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী মানুষ। সে জন্যই মানুষ দেখলে সাপগুলো অস্থির হয়ে ওঠে। ভয়ে সে ফনা ধরে আত্মরক্ষায়। জীবন বাঁচাতে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এটা আপনাদের বিজ্ঞানের কথা। কিন্তু দোযখের মানুষগুলোকে তারা ভয় পায় না। দোযখবাসীদের মতে সাপ হল নিরিহ প্রাণী। আপনি কি এখনো ভয় পাচ্ছেন?

না, এখন আর ভয় করছে না। কিন্তু কারা বাস করে দোযখে?

চলেন দেখবেন। এরা ধর্ম-কর্ম করেননি, আল্লাবিল্লা করেননি। এরা ছিলেন আবিস্কারের নেশায়, জ্ঞান বিজ্ঞানের নেশায়। শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের উৎকর্ষতার নেশায়। এদের কারণেই নাকী অধিকাংশ মানুষ ধম্ম-কম্ম ছেড়ে দিয়েছে।

আমি দোযখবাসীদের মধ্যে যেতে প্রথমেই পাথরের মত শক্ত হয়ে গেলাম। দোযখ ভরা যেসব মানুষ তাদের সামনে এই অপার্থিব জায়গায়ও আমার মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস নেই। দেখলাম অনতিদূরে একজন ভদ্রলোক কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ইবলিস সাহেব আমার চোখ লক্ষ করে বললেন, ওনার নাম লুই পাস্তুর। ইনি পৃথিবীতে জলাতঙ্ক এবং অ্যানথ্রাক্স-এর প্রতিষেধক আবিস্কার করেছিলেন। এখন আরো আবিস্কারের নেশায় বনে জঙ্গলে ঘুরছেন।

আচ্ছা এডিসন সাহেব কি এখানে থাকেন?

অনেক এডিসন এখানে আছেন, আপনি কার কথা বলছেন?

থমাস এডিসন?

অবশ্যই আছেন। শুধু আছেন না, মানুষের জন্য নরককে বসবাস উপযোগি করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। তিনি এখন এমন একটি রোবট আবিস্কারে হাত দিয়েছেন যে সেটি বেহেস্ত থেকে র’ মেটারিয়াল চুরি করে এখানে নিয়ে আসবে।

এটা কি অনৈতিক হবে না?

অবশ্যই না! এ জন্যই তো আপনারা আমাকে ভুল বোঝেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বার্থে আটকে রাখা উপাদান সরিয়ে আনা তো স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবীদের জন্য রসদ সরবরাহের মত!

কথা বলতে বলতে হঠাৎ বাঁ দিকে তাকিয়ে থমকে গেলাম। আইস্টাইন!

একি! উনি এখানে!

থাকবেন না! উনি তো জন্মেছেন ইহুদির ঘরে!

আমরা কাছে গেলাম। তিনি মোটেই লক্ষ করলেন না। আমি দাঁড়িয়ে আছি আইনস্টাইনের কাছাকাছি। স্বপ্নেও আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। বললাম, স্যার একটু দেখা করতে এলাম।

তিনি মাথা তুললেন না। বললে, দেখা করার কী আছে?

ইবলিস বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ইনি পৃথিবী নামক গ্রহের বাংলাদেশ নামক একটি দেশের একজন মুসলমান…

অ্যাঁ! আমাকে মারতে এসেছে, এখানে!

ইবলিস বললেন, নানা। মুসলমান হলেও হানাহানি করা মুসলমান না।

তিনি বিড়বিড় করে বললেন, মুসলমান… আমাকে মারবে না… বেশ ভালো কথা তো! তিনি আবার কাজে মনোযোগ দিলেন।

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়েই আমার চোখ উল্টে যাওয়ার অবস্থা হল। দেখলাম তিনজন বাঙালি জঙ্গলে বসে গল্প করছেন। প্রথমে হুমায়ূন আজাদ, মাঝখানে আহমদ শরীফ এবং বাঁয়ে আরজ আলী মাতুব্বর।

আমি প্রায় দৌড়ে কাছে গেলাম। উত্তেজনায় কাঁপছি!

হুমায়ুন আজাদ রাশভারী মুখে বললেন, মূর্খদের কাছ থকে এসেছ?

স্যার, আপনাকে দেখে আমার চোখে পানি আসছে স্যার। আমি ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি বাংলাদেশের একজন মানুষ হিসাবে।

মনে হল তিনি একটু শান্ত হলেন। বললেন, যে বিষয়টি আর পঞ্চাশ বছর পর থাকবে না, যে বিষয়টি নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করবে- তাই নিয়ে আমাকে ওই সুন্দর প্রকৃতি থেকে সরিয়ে দিল। অথচ আরো কিছু কাজ ছিল। মাত্র ৮০ বছর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম! আমাকে গুরুতর আহত করার পরই ঘটনাক্রমে আমাকে এখানে চলে আসতে হল।

স্যার, মানুষ সর্বদা সত্যকে ভয় পায়। আপনি যেন আর সত্য বলতে না পারেন, সে জন্যই ওরা আপনাকে সরিয়ে দিয়েছে।

তাতে কী! বন্ধ ঘরের জানালা তো আমরা খুলে দিয়েছি। যাদের চোখ আছে, তারা তো মুক্ত আকাশ দেখে ফেলেছে।

স্যার, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে চলে যেতে হবে। আমি তো পৃথিবীতে থাকবো। একটু বলবেন, কোন ধরনের মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকা দরকার?

ভণ্ডদের কাছ থেকে।

ভণ্ড চিনবো কী করে স্যার?

ওদেশে অসংখ্য ভণ্ড। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ভণ্ড কালো চশমা পরিহিতরা।

স্যার, আমি নিজেও একটু-আধটু লিখি। আমাকে কিছু পরামর্শ দেন।

লিখবে নিজের জন্য। নিজের তাড়না থেকে। মানুষকে খুশী করার জন্য লিখবে না। মানুষকে খুশী করে লিখতে হলে মকসুদুল মোমেনিন লিখতে হবে। যদি সত্যিই লিখতে পারো, তা ৩০ বছর পর হলেও মানুষ পড়বে। আহমদ শরীফ বসে হাসছেন। হঠাৎ বললেন, হুমায়ুন লক্ষ করেছ, এখানে বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারি, উকিল আর সাংবাদিক প্রায় দেখাই যায় না। ওরা বোধ হয় কেউ দোযখে আসবে না।

আরজ আলী মাতুব্বর মাথা দুলিয়ে বললেন, ইস্রাফিল দীর্ঘকাল ধরিয়া শিঙ্গা হাতে লইয়া দাড়াইয়া আছে। ফু দিলেই কিছু আইয়া পরবে আনে।

আমি ইবলিসের দিকে তাকিয়ে বললাম, কথা দেন, আমাকে ভবিষ্যতে এইখানে, এই জাহান্নামে নিয়ে আসবেন?

ইবলিস মুচকি হেসে বললেন, যুগ যুগ ধরে তো আমি সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি।

ভোর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম আলো ফুটে উঠেছে। জানালার বাইরে নির্মেঘ আকাশ।

ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পথেই দেখলাম হাসান ভাই। মিষ্টি হেসে বললেন, কোথায় যান, চলেন সকালের প্রকৃতি দেখি। অনেককাল সকাল দেখা হয় না। চলেন ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে নেমে যাই। দেখবেন কী অপূর্ব জলীয় ঘ্রাণ!

আমি বললাম, চলেন, আমরা প্রকৃতির কাছে যাই।

মহসীন হাবিব। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক ও অনুবাদক। ১৯৬৫ সালের ১ এপ্রিল ফরিদপুরের টেপাখোলায় জন্ম। কর্মজীবন: বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক সমকাল, ডেসটিনি ও সর্বশেষ কালের কণ্ঠ-এ কাজ করেছেন সম্পাদকীয় বিভাগে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে লিখেছেন মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘শেকড়ের দাগ’। অনুবাদ...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..