ভয় নেই, আর ভালবাসবোনা

শিখা কর্মকার
কবিতা
Bengali
ভয় নেই, আর ভালবাসবোনা

বলা হয়নি

যতবার নড়ে ওঠে একটি করে নক্ষত্র ঝোড়ো রাত্তিরে, ততবার ঝরে পড়ে নির্জনতায়, গাছপাকা পীচ। যত দুরেই থাকি আমি, যতই বিরলে, তবু ফোনে, বা চিঠিতে ঠিক পেয়ে যাই দুঃসংবাদ, ঘুরে ফিরে কমে আসে বন্ধুদের মুখ। দশদিক জুড়ে বাজে জেদি নিঃসঙ্গতা, বেড়ে ওঠে অনুভুতি কেবলি শূন্যতার, চেনা অক্ষরেখা জুড়ে ।

বলা হয়নি তোমাকেও, যে বছর চলে গেছো বন ও নদীর ডাক পরোয়া না করে, হাট করে খুলে রেখে মায়ার দরজা; চেয়ে দেখোনি আকাশের ছলছলে চোখ, দিনান্তের বুক-চাপা-ব্যথা, সেদিনই ছিঁড়ে গেছে আঁশহীন সুতোর মত প্রাণের বন্ধন। উড়ে গ্যাছে মথ ও প্রজাপতি দক্ষিণ দিগন্তের দিকে, ফিরবেনা কোনদিন জেনে।

হয়ত দেখনি তুমি সন্ধেবেলা উঠে এলে কালপুরুষ, ফিরে এলে প্রিয় ঘরে কর্মক্লান্ত মানুষ, বনের গভীর থেকে উঠে আসে স্নিগ্ধ হরিণেরা । মাঠের ওধারে যে খাল, একবুক আকাশ নিয়ে স্থির হয়ে শুয়ে থাকে শান্ত স্নেহের মত, তারা এসে জল খায়, শিশুকে চেনায়, দুচোখ ভরে দেখতে থাকে, আকাশপাতাল জুড়ে, দিশেহারা কুচি কুচি, আলো জোনাকির।

হতে পারে

আবার তো পথ হারিয়ে যেতে পারে। টুকরো হয়ে পড়ে থাকতে পারে কম্পাস ও ঠিকানা । পাকা ভুট্টাক্ষেতের গোলকধাঁধায় আটকে দেখতে পারি শেষবারের মত অপূর্ব সূর্যাস্তের অনন্য বর্ণ, নিয়তির মত নিভে আসা দিন। দেখতে পারি রাশি রাশি কাকাতুয়ার উড়ে আসা সন্ধের প্রাক্কালে এবং জলাশয়ে স্নান সেরেই শূন্যতাকে অধিক করে, উড়ে যাওয়া । নির্বান্ধব এই দিনান্তে মনে পড়তেই পারে তোমার মুখ। প্রিয় মুখ। ক্ষুধার্ত ভালুক বা নেকড়ে আসতেই পারে। একমাইল দূর থেকে গন্ধ পায় ওরা আনাড়ি শিকারের।

হতে পারে সেটাই আমার শেষ রাত এই পৃথিবীর বুকে। নতুন পোষাকে কোনদিন আর ফিরবোনা বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মনে পড়বে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি ভেবে তোমার অতুলনীয় আদরের আবেশ। মনে থাকবে এত্ত এত্ত ভালোবাসা; দিন নেই, রাত নেই, সকাল দুপুর নেই, এত্ত এত্ত হাসি; সহজ সরল, অনাড়ম্বর, আলোময় উচ্ছল দিন। খুব মন খারাপ হলে হয়ত আগামী দিনে রেনপাখি হয়ে এসে হাজারবার গেয়ে যাবো সুইটগামের ডালে বসে। হতে পারে শেষবারের মত আর একবার আসবো তোমাকে দুচোখ ভরে দেখে যেতে ।

বল্কল বৃষ্টি

সারাদিনরাত ধরে, সুইট-গামের, উত্তুরে-পাইনের আর হানি-ওকের আঙ্গুলের প্রান্ত থেকে ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টিফোঁটারা । বাকলের ফাঁকে, ফাটলের ভেতরে ঝরে পড়ে মটরশুঁটির দানার মত আলোমগ্ন বরফকুচিরা। গত একমাস ধরে গুমসে থাকা আকাশ থেকে, ফাঁপতে থাকা মাটির তলা থেকে ঘাসেদের গা বেয়ে উঠে আসে ঘন কুয়াসা। সন্ধের আগেটিতে ঝরতে থাকে হলহলে বৃষ্টিজল ।

জানি যে তুমি সরে যাচ্ছ তিলে তিলে মুছতে থাকা প্রিয় গানগুলির মত। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বুঝি, স্বপ্নের ভেতরে তুমি তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছ আমাকে, আমিও খুঁজছি তোমার অস্তিত্ব আমার সত্তায়, অথচ এক পিচ্ছিল অহংকারের অন্ধত্ব আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে দৃষ্টি ও অনুভব। শুধু খাতার পাতায় জেগে থাকে মায়াবী অক্ষরের দৃষ্টি ও চেতনা। জেগে থাকে নীরব এক বেমানান আকুলতা।

উপস্থিত থেকেও তোমার এই তীব্র অনুপস্থিতি, চিতা ধুয়ে ফিরে আসা শোকার্ত শ্মশান-বন্ধুদের নীরবতার চেয়েও ম্লান দেখে, যে জীবনে সুতীক্ষ্ণ একাকীত্ব ছাড়া আর কিছু মনে নেই, সেই চোরাবালি অন্ধকারের সম্মুখে দাঁড়াই । খুলে যায় রাত্রির মগ্ন হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য। আমি তার হাতে তুলে দিই আমার বাঁচামরার প্রাণভোমরা, শব্দব্রহ্ম, জীবনের সমস্ত সুস্থির ও অস্থির সময়ের তরঙ্গ-দলিল ।

আমার জীবনের আকাশ হারিয়ে যাওয়ার গান বুকে নিয়ে উড়ে যায় নিঃসঙ্গ পাখিটি । তবু ফিরে ফিরে আসে ভয়ার্ত ছায়ারা, ফিরে আসে আত্মার ভেতর লুকিয়ে-জড়িয়ে-পাকিয়ে-শুকিয়ে রাখা বুক ফেটে যাওয়া কান্নারা, অন্য জন্মের মর্মপ্লাবী আকুলতা, তোমাকে সর্বস্ব দিতে চেয়েও না পারার ধুসরতা। সারাদিনরাত ধরে অন্তর ফেটে যাওয়া কান্না বুকে নিয়ে চলে কেউ মেঘের মত, জীবন থেকে জীবনান্তরে, ঝড় ও বৃষ্টির ছদ্মবেশে ।

ভয় নেই, আর ভালবাসবোনা

ঠিক করেছি একতিল সংবাদের জন্য আর উন্মুখ হয়ে থাকবনা। সিদ্ধান্ত নিয়েছি মনকে বন থেকে সদ্য ধরে আনা তেজী বাঘিনীর মত শক্ত করে বেঁধে ফেলে রাখবো অন্ধকারে, চাবুক মেরে ভাঙবো তার পাঁজর, যদ্দিন না তড়পানি কমে।

ভেবে দেখেছি এই ভালো ।অন্ত্যেষ্টি কার্যের মত, সবকিছু একেবারে চুকেবুকে যাওয়া ভালো । সমস্ত আবেগ টান মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া ভালো । ভালোবাসাকে শ্মশানে দাঁড়িয়ে থেকে পুড়িয়ে ছাই করে হাওয়ায় মিশিয়ে দেওয়া ভালো । যাতে তার এক কণাও অস্তিত্ব কোথাও না থেকে যায় এই পৃথিবীতে ।

মৃত্যুর চেয়েও ঘন এক অন্ধকারে নিজেকে শেষ করে দিতে দিতে জেনেছি তোমাকে আর ভালবাসবোনা । কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যেও দুর্বলতায় কাঁপতে দেবনা বুক। চমকে উঠতে দেবনা চরাচর। রোমাঞ্চ হতে দেবনা সারাদেহে। মন ভরে দেওয়া নিবিড় আনন্দঘন মুহূর্তে স্মৃতির গল্পকথা, প্রিয় শব্দে দুলে ওঠা একসমুদ্র আদর…এ জীবন ছুঁয়ে ছেনে আনা জন্মান্তরের পুণ্যফল…সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে চলে যেতে যেতে জানবো তোমাকে নিজের করে চাইবোনা আর কোনোদিন ।

চেয়ে দেখবনা শেষবারের মত তোমার চলে যাবার মুহূর্ত, ফেলবনা একটিও দীর্ঘশ্বাস । দুচোখের জল আটকে রাখবো, মুছে দেবো আমার অস্তিত্ব, তোমার পৃথিবী থেকে । দিগন্তের দিকে তাকিয়ে, তোমার পথ চেয়ে হবোনা অন্ধ। কাঁচের বাসন হয়ে ভাঙবনা হাজার টুকরোয়।

বেআইনি

এমন করে ভালোবাসায় ভেসে যাবো, কে জানতো ? যে মুহূর্তে তুমি চোখ তুলে তাকাও, আমার সব স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায় ।

জানি তোমার নদীর আকাঙ্ক্ষার স্রোত বইছে অন্যদিকে। আমার প্রাণের নিভৃত নিষ্ঠা, একাগ্রতা তোমাকে ছোঁয়না । তবু যদি ভুল করে দেখা হয়েই যায় এ জীবনে কোনদিন আমাকে ভেবে নিও এক পাথর। সেই পাথর যে নির্লজ্জের মত ছুঁতে চায় সেই কবিতার হৃদয় যা তোমার উথালপাথাল জীবনের অঝোর রক্ত দিয়ে লেখা।

অকারণে প্লাবনের মত এমন ভালবেসে ফেলাটা বেআইনি, তাও জানি। তোমার জন্য প্রতিদিন মন খারাপ হওয়াটাও অসংগত । কল্পনা করা তো ধর্তব্যের বাইরে। তবু, মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়। হয়নাকি, তুমিই বলো?

শিখা কর্মকার। কবি। জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে, বর্তমান নিবাস উত্তর আমেরিকার আটলান্টা, জর্জিয়া। পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় ফটোগ্রাফার, ও ভালোবাসায় কবিতা। পনেরো বছরের অধিককাল স্বেচ্ছাসেবিকা বিভিন্ন স্কুল ও লাইব্রেরিতে। দশ বছরের অধিক জর্জিয়াতেই সঞ্চালিকা ও মুখপাত্রী একটি বিশিষ্ট...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..