মকর পরব

মীনাক্ষী লায়েক
প্রবন্ধ
Bengali
মকর পরব

গত সংখ্যায় মানভূমের ‘টুসু পরব’ নিয়ে লেখার শেষে লিখেছিলাম মানভূমে টুসু পরবের পরিধি আরও ব্যাপক। আজ সেই কথা বলি। টুসু পরবকে ‘মকর পরব’ বলেন এখানকার লোকজন। অনেকে পিঠা পরবও বলে থাকেন কারণ, মকর সংক্রান্তির আগের দিন মানভূমের প্রতিটি ঘরে গড়গড়্যা পিঠা হয়, কেউ কেউ এই পিঠাকে উঁদি পিঠাও বলে থাকেন। চালগুড়ির খোল (গুড়িমাখা) তৈরী করে ছোট ছোট বল (লেই) কেটে তার ভেতর পাক দেওয়া তিলগুড়, নারকেলের পুর দিয়ে সেটির মুখ বন্ধ করে জলের বাস্পে সেদ্ধ করা হয়। অনেকে সোজাসুজি জলেও এই পিঠাকে সেদ্ধ করেন। হয়ে গেল গড়্গড়্যা পিঠা, তারপর খেজুর গুড় দিয়ে পরিবেশন। এই পিঠা সরস্বতী পূজার পর আর তৈরী করার রীতি নেই। তাই এই কটা দিন মানভূমীদের কাছে পিঠা অমৃত আস্বাদন এক অনির্বচনীয় আনন্দ নিয়ে আসে।

আজ গ্লোবালাইজেশনের যুগে মানভূমীরা পিঠার বিশ্বায়ন ঘটাতে গড়গড়্যা পিঠা নিয়ে হাজির হয় পিঠে উৎসবগুলিতে। সাবেকি গড়গড়্যা পিঠাকে আধুনিক করতে নানা ভেরিয়েশন আনা হয় পিঠার ভেতরে পুরের ক্ষেত্রে, যেমন মিষ্টি পুরের পরিবর্তে ঝাল কলাইয়ের পুর অথবা কোন আমিষ পুর। মকর সংক্রান্তির আগের দিন বিকেলদিকে পিঠে তৈরী করা হয়, সেদিনই আবার ‘বাঁউড়ি’ অর্থাৎ গ্রামের পরিবারগুলি খড় দিয়ে কুচুড়ি (মরাই) তৈরী করেন ধান রাখার জন্য। অর্থাৎ লক্ষ্মী দেবীকে বন্ধন করা হয়। বাঁউড়ির আগের দিন গ্রামের মেয়ে বউ ঢেঁকিশালে চাল কূটে গুড়ি করেন। সব বাড়ীতে ঢেঁকি না থাকায় পাড়ার মেয়ে বউরা জড়ো হয় যাদের বাড়ীতে ঢেঁকি আছে সেখানে — অনেক মেয়ে এক জায়গায় জড়ো হবার কারণে হাসি-মস্করাও চলে সমান তালে। কখনো নিছক মজায় এ ওর গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে, কখনো ধাঁধা, চুটকি এসব চলতে থাকে। একজন পা দিয়ে ঢেঁকি পাহার (ঢেঁকিকে ওপরে তোলা ও নামানো) দেন, অন্যজন ঢেঁকির মুখের কাছে বসে  চালের গুড়ো করে তাকে চালুনি দিয়ে চেলে পিঠার জন্য গুড়ি প্রস্তুত করেন। এরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্য মেয়ারা তাদের স্থানে কাজে লেগে যান। সমবেতভাবে কাজ করার ফলে এই আনন্দের মাঝে একতার বোধটিও গড়ে ওঠে।

ইদানীং যন্ত্রের যুগে ঢেঁকি বিরল, চালগুড়ো করা হয় মেশিনে। চালগুড়ো করার আগের দিন ওই মেয়েরাই দুপুরবেলায় স্থানীয় নদী, পুকুরে যান চাল ধুতে। পিঠে তৈরীর আগে এ কাজগুলি মকর পরবের আনন্দের এক মেজাজ নিয়ে আসতো যা আজ অনেকটাই বিরল।

মকর সংক্রান্তির দিন দক্ষিণায়নের শেষ দিন। ঊষাকালে এই মহাবিষুবের দিনে স্নানে নাকি পূন্যলাভ হয়। মানভূমে একে ‘মকর সিনান’ বলে। নদী বা জলাশয়ের ধারে পাতা-খড়কূটো-কাঠ স্তুপ করে (মকর কুমা) রাখা হয় আগের রাত্রিতে। ভোরে শীতল নদী বা পুকুরে ডুব দিয়ে সেই ‘কুমা’-য় আগুন জ্বালিয়ে, আগুন সেঁকে নিয়ে ঘরে ফেরে পূন্যার্থীরা। নতুন বস্ত্র পরিধান করে তারা। তারপর সারাদিন ধরে চলে স্ফূর্তি-আনন্দ। ঘরে খিচুড়ি, মাংস খাওয়া,  নদী বা জলাশয়ের ধারে মেলায় যাওয়া, মোরগ লড়াই এইসব সেদিনের রুটিন।  মানভূমে থেকে মকর মেলায় অংশ গ্রহণ না করলে সে জীবন বৃথা। এ মেলা অন্য সব মেলা থেকে পৃথক। ভেঁপু, নদীর জলে দাপাদাপির কলরোল, বেলুন, বাঁশি, চপ-ভাবরা ভাজা, হাব্বা-ডাব্বা, ঝান্ডি-মুন্ডি (জুয়া), টুসু গানের লড়াই, নদীর ভেজা বালিতে দু-পায়ের পাতার বসে যাওয়া ছাপ, একটু দূরে মাইকে তারস্বরে মোরগ লড়াইয়ের পুরস্কার ঘোষণা,  দু-চারটি ফিতা-ক্লিপ-আয়না-চিরুণির পসরা নিয়ে বসা দোকানি — এইসব নিয়ে সারাদিন হইহই মেলা। স্বঘোষিত  ভদ্র লোকেরা তখন বন্য। আনন্দের আতিশয্যে মেঠো গন্ধ তাদের আচরণেও। যত লোক দেখানো সভ্যতা, এটিকেট, পয়সার দেমাক সেদিন টা-টা, বাই-বাই। সবাই আনন্দের অংশীদার।

কিছু কিছু মকর মেলায় চৌডল (টুসু মা-এর ঘর) প্রতিযোগিতা হয়। যে চৌডলে টুসু বিসর্জন হয় এ সে চৌডল নয়, ভালো ভালো জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে আরও সুদৃশ্য করে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। আর হয় টুসু গানের (টুসু গান সম্পর্কে আগের সংখ্যায় লিখেছি) প্রতিযোগিতা। মকর মেলায় লোকজীবনের নার্ভ খুঁজে পাওয়া যায়। মোরগ লড়াই, স্থানীয় ভাষায় ‘মুরগা লড়াই’ যেন এক নেশা। এই নেশা মানভূমের চলমান জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। মকর এবং তারপরের দিনগুলিতে ফাঁকা মাঠে প্রচুর কালো কালো মাথা একত্রে দেখলে ধরে নিতে হবে ‘মুরগা লড়াই’ চলছে। হয়তো মাইকের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে আপনি বহুদূর থেকে শুনছেন’ — এবার যে মুরগা লড়বে তার মালিকের নাম অমুক, অমুক…’। সাথে সাথে ক্রিকেট ধারাবাহিকের মতো ‘এ দেখ্, দেখ্ দেখ্, দিল দিল দিল’ এসব চীত্কার। কখনও শুনবেন পুরস্কার ঘোষণা হচ্ছে ‘ফার্স্ট প্রাইজ একটি ভেড়া অথবা ঘড়ি অথবা নগদ টাকা’।

সীজনের আগে গ্রামের হাটগুলিতে চড়া দামে লড়াইয়ের মোরগ বিক্রী হয়। তারপর সেটিকে যত্ন করা কিছুদিন, তারপর লড়াইয়ের মাঠে মোরগের পায়ে ছুরির মতো ধারালো ‘কাইত’ বেঁধে যুদ্ধে পাঠানো। মোরগ লড়াইয়ে জিতলে মালিকের বুক গর্বে ফুলে ওঠে। প্রাইজের দিকে হাঁ-হাঁ করে লোভাতুর হয়ে ছুটে যাওয়া নয়, তার লক্ষ্য তখন নিজের মোরগ কেমন আছে সেদিকে এবং ‘পাহুড়’- এর দিকে। যে পরাজিত মোরগটি কাইতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত অথবা ময়দান ছেড়ে পালিয়েছে তাকে বলা হয় পাহুড়। এই মোরগ লড়াইকে ঘিরে বাজি রাখা হয়। যুক্তির জাল বুনে মোরগ লড়াইকে অনেকে অমানবিক অ্যাখ্যা দিয়েছেন, মানভূমের অধিবাসীরা এ যুক্তির ধার ধারে না। মোরগ লড়াইকে ঘিরে তাদের উন্মাদনাকে বলি দিতে তারা নারাজ। মকর, আখান, সরস্বতী পুজো- এই দিনগুলোতে সর্বাধিক মোরগ লড়াই হয় মানভূমে।

মকর সংক্রান্তির পরের দিন আখান দিন। আখ্যান বা আখান মানে সূচনা, কৃষিবর্ষের প্রথম দিন। গ্রামে গ্রামে গ্রামদেবতা বা গেরামথানে পূজা দেয় গ্রামবাসীরা। পূজার বিধি সর্বত্র এক। কোন ব্রাহ্মণ নয়, গ্রামের নিম্নবর্গীয় মানুষ পুরোহিত। ভেড়া, ছাগল, হাঁস বলি দেওয়া হয় সেদিন। আবার কোনো কোনো গ্রামে ঠাকুরথানে মাটি ফেলার বিধিও আছে। মকর সংক্রান্তির দিন কাঁসাই, শিলাই, কুমারী, দ্বারকেশ্বর প্রভৃতি নদীর চরে যেমন মেলা হয়, আখান যাত্রার দিনও মেলা হয় মানভূমের বিভিন্ন গ্রামে যেমন- আড়ষার ঝুঁঝকা, অযোধ্যার মাঠা, বলরামপুরের পতিডি প্রভৃতি গ্রামে। গ্রামদেবতার পূজাকে কেন্দ্র করে সরস্বতী পুজা পর্যন্ত এক-দুদিন করে মেলা চলতেই থাকে বিভিন্ন গ্রামে। মূলতঃ গ্রাম্য মেলা এগুলি, তাই মণিহারী দ্রব্যের সাথে সাথে রোজকার ব্যবহৃত দ্রব্য মেলাগুলিতে পাওয়া যায়, তেমনই কোথাও কৃষিজ যন্ত্রপাতি, গবাদি পশুও বিক্রী হয়। মেলাগুলির আরেক বৈশিষ্ট্য যা পুর্বেই বলা হয়েছে তা হলো মোরগ লড়াই ও ঝান্ডি-মুন্ডি খেলা।

মানভূমের মানুষের সহজ সরল জীবনে চাওয়া-পাওয়া খুব সামান্যই। এরা পাওয়া এবং পাইয়ে দেবার রাজনীতি অত বোঝে না, শুধু বোঝে এই ক্ষুদ্র জীবনে আনন্দকে কিভাবে নিংড়ে নিতে হয়, শত দুঃখ দারিদ্রেও কিভাবে সতেজ থাকতে হয়, নিজের আনন্দের সাথে কিভাবে অন্যকেও সামিল করে আনন্দের ভাগীদার করতে হয়। পরিশীলিত সংস্কৃতির সূক্ষ্মতা নিয়ে কাজ কারবার নয়, তাদের কারবার সহজ, সরল, অকপট, স্থূল, চাতুর্যবর্জিত জীবনবোধ।

মীনাক্ষী লায়েক। লেখক ও সম্পাদক। জন্ম নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের পুরুলিয়ায়। তিনি 'বর্ডার লাইন দি' নামক সংবাদপত্র এবং 'মহুয়া' সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা কাজে যুক্ত।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ