মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

কৃষ্ণা গুহ রায়
প্রবন্ধ
Bengali
মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার গভীর উপস্থিতিগুলোকে শব্দ চয়ন করে প্রকাশ করলেন প্রগাঢ় অনুভূতির জীবন্ত দলিল তিনি মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজী৷

দৌলত কাজী (কাজী দৌলত নামেও পরিচিত), ছিলেন মধ্যযুগের একজন বাঙালি কবি। তিনি ১৭শ শতাব্দীর প্রারম্ভে কোন এক সময় চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে সুলতানপুরের কাজী পাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি আরাকান রাজসভার কবি ছিলেন, যদিও তার লেখার ভাষা ছিলো বাংলা। মধ্যযুগের অন্যান্য কবিদের মত তার কাজে তার পৃষ্ঠপোষক সম্পর্কে বর্ণনা থাকলেও নিজের সম্পর্কে তিনি কিছুই লিপিবদ্ধ করে যাননি। তিনি “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনা করে বাংলার শক্তিমান কবিদের মাঝে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। বাংলা কাব্যে ধর্মনিরপেক্ষ প্রণয়কাহিনীর তিনি পথিকৃৎ। সম্ভবত ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। গবেষকদের মতে আরাকান রাজ্যের আকিয়াবের কোনো এক স্থানে তার কবর রয়েছে।

দৌলত কাজী অল্প বয়সে নানাশাস্ত্রে সুপন্ডিত হয়ে উঠেন। নিজের দেশে স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তিনি আরাকানে ভাগ্য অন্বেষনে যান। সে সময়কালে চট্টগ্রামবাসী জীবিকা অর্জনের জন্য আরাকানে যেতেন। আরাকান রাজসভায় তখন বহু কবি এবং জ্ঞানী লোকের ভিড় ছিল। রাজার প্রধান উজির আশরাফ খান একদিন হিন্দি ভাষার কবি মিয়া সাধন রচিত “সতী ময়না” কাহিনী শুনতে চান। দৌলত কাজী পাঞ্চালীর ছন্দে সতী ময়নার কাহিনী বর্ণনা করে সকলের প্রশংসা অর্জন করেন এবং আরাকান (রোসাঙ্গ) রাজ দরবারে কবিদের সভায় মধ্যে গৃহীত হন এবং সেখানে মর্যাদা লাভ করেন।

দৌলত কাজী আরাকান রাজসভার আশরাফ খানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। ১৬২২ হতে ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে আশরাফ খান আরাকানের তৎকালীন অধিপতি থিরিথু ধম্মা বা শ্রী সুধর্মার নস্কর উজির বা সমর সচিব পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।দৌলত কাজী ও আশরাফ খান, দুই জনেই সুফী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আশরাফ খানের আগ্রহে কবি “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনা করেন। এই কাব্যের শুরুতেই তিনি থিরিথু ধম্মা এবং আশরাফ খানের প্রশংশায় লিখেছেনঃ

কর্নফুলী নদী পূর্বে আছে এক পূরী

রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে যুদ্ধাচার
নাম শ্রী থুধম্মা রাজা ধন অবতার।।
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।
দেব গুরু পুজ এ ধর্মেতে তান মন
সে পদ দর্শনে হএ পাপের মোচন।।
পূণ্যফলে দেখে যদি রাজার চরণ
নারকীও স্বর্গ পাএ সাফল্য জীবন।।
…………………………………
মুখ্য পাত্র শ্রীযুক্ত আশরাফ খান
হানাফী মোজাহাব ধরে চিস্তিয়া খান্দান।।
……………………………………
শ্রীযুক্ত আশরাফ খান লস্কর উজীর
যাহার প্রতাপ বজ্রে চুর্ণ আর শির।।

মিয়া সাধন নামক একজন হিন্দি ভাষী মুসলিম কবি রচিত “মৈনাসত” (কাব্যটি আসলে ‘ঠেট গোহারি’ বা একধরনের গ্রাম্য হিন্দি ভাষায় লেখা) নামক কাব্যই ছিল কবি দৌলত কাজীর “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনায় আদর্শ। এই কাব্যের সঠিক রচনাকাল জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হয় ১৬২২ থেকে ১৬৩৮ সালের মধ্যে এই কাব্য রচনা করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মহাকাব্য সমাপ্ত হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবির মৃত্যুর ২০ বছর পরে ১৬৫৯ সালে কবি আলাওল(আনুমানিক ১৫৯৭-১৬৭৩) কাব্যের শেষাংশ রচনা করেন।

জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ প্রেমের মায়াজালে আবদ্ধ। কারণ, প্রেমের স্বরূপ চিরন্তন। প্রেম নায়ক-নায়িকার জীবনে কখনও অমৃতের স্বাদ এনে দেয়, আবার কখনও প্রেমের অগ্নিকণাই তাদের জীবনকে বিষের জ্বালায় জর্জরিত করে তোলে – দু’য়ে মিলেই প্রেমের সার্থকতা। আবার দাম্পত্য জীবনেও প্রেমের একটা ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। আদর্শ পুরুষরা যেমন স্ত্রীকে কখনও ঠকান না তেমনি আদর্শ নারীরাও না। এক্ষেত্রে নারীদের সতীত্ব রক্ষার ব্যাপারটা সংসার জীবনে একটা বড়ো ভূমিকা পালন করে। বিষয়টি দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, যার রেশ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষত উপন্যাসে দেখা যায়।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যিনি প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে মাটির মানুষের কথাকে নিজের রচনার মধ্যে স্থান দিলেন তিনি আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভার সম্বর্ধিত কবি দৌলত কাজী। তিনি আরাকান রাজ থিরি-থু-ধম্মার (শ্রীসুধর্মার) শাসনকালে (১৬২১-১৬৩৮) রাজার সমর সচিব আশরাফ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় ও নির্দেশে ১৬২২-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনও এক সময়ে সাধন নামক এক হিন্দি কবির ঠেট-গোহারী (গ্রাম্য হিন্দি) ভাষায় রচিত ‘ময়না কো সত্’ কাব্য অবলম্বনে ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যটি রচনা করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় দৌলত কাজী কাব্যটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি, কবি সৈয়দ আলাওল ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটির অসমাপ্ত অংশের সম্পূর্ণ রূপ দেন।

দৌলত কাজী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও হিন্দুর সামাজিক আচার-ব্যবহার, জীবনাদর্শের মতো নানা তথ্যকে যেভাবে কাব্যটির মধ্যে স্থান দিয়েছেন তা সত্যিই অভিনব। আসলে কবির পূর্বপুরুষেরা হিন্দু বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।১ তাই ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’র মতো রোমান্টিক আখ্যানকাব্য রচনার সময় কবি যে পূর্ববর্তী সময়ের হিন্দুর বৈষ্ণবধর্মাশ্রিত রোম্যান্টিক কাব্যকে কিছুটা অনুসরণ করেছেন তা বলাই বাহুল্য। তবে বৈষ্ণব ধর্ম নয়, পদাবলী সাহিত্যের রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের ভাব-ঐশ্বর্যই দৌলত কাজীর মনকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল। আসলে দৌলত কাজী একজন মর্ত্যভূমির জীবনরসিক কবি। এজন্য কাব্যটির কাহিনি পরিকল্পনায় এবং চরিত্রের মন-মনন-মেজাজ-মানসিকতার টানাপোড়েন উদঘাটনে কবি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। আর এই ‘ভিন্ন পন্থা’টাই উনিশ শতকে সূচনা পর্বের বাংলা উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে প্রভূত সহয়তা করেছে বলে মনে হয়।

‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ রোমান্টিক আখ্যানকাব্যটির যে অংশটুকু দৌলত কাজী রচনা করেছেন তাকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। এক – লোর-চন্দ্রাণীর আকর্ষণ-বিকর্ষণ ঘটনা সমন্বিত বিষামৃত প্রেমকাহিনি; দুই – স্বামী বিরহে কাতর হওয়া সত্বেও ময়নার সতীত্ব রক্ষার মাধ্যমে আদর্শ নারী হয়ে ওঠার কাহিনি । একটি মাত্র কাব্যের মধ্যে দুটি কাহিনির বিচরণ বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম নয়। কিন্তু দৌলতের কাব্যটির একটি বিশেষ দিক – এখানে দুটি কাহিনি নানান কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে ভিন্ন দুই বিপরীত মুখে এগিয়ে গেছে।

দৌলত কাজীর কাব্যটির কাহিনি সংক্ষেপ এইরকম : গোহারী দেশের রাজা মোহরা। তাঁর অপূর্ব সুন্দরী কন্যা চন্দ্রাণীর সঙ্গে ভাগ্যদোষে এক নপুংসক বামনের বিয়ে হয়। এতে চন্দ্রাণী দুঃখে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে। অপরদিকে, নৃপতিনন্দন রাজা লোরকের সঙ্গে সতীসাদ্ধী ময়নাবতীর বিয়ে হয় এবং তারা সুখে দিন কাটাতে থাকে। ঘটনাক্রমে রাজা লোরক বনে মৃগয়ায় গিয়ে এক যোগীর কাছে চন্দ্রাণীর প্রতিকৃতি দেখে বিমুগ্ধ হয়ে তাকে লাভ করার জন্য গোহারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এবং সেখানে গিয়ে একে অপরকে দেখে আকৃষ্ট হয়। এরপর লোর-চন্দ্রাণী দেবী মন্দিরে সাক্ষাৎ করে এবং উভয়ে মিলিত হয়। এসব ঘটনা দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বামন একসময় শুনতে পেলে লোরকের বিনাশ ঘটাতে সে বনপথ রোধ করে ধরে। এসময় বামন ও রাজা লোরকের মধ্যে যুদ্ধ হয়, বামনের পরাজয় ঘটে ও সে মারা যায়। এরই মধ্যে চন্দ্রাণীর সর্পাঘাতে মৃত্যু ঘটলে যোগীবর তাকে বাঁচিয়ে দেয়। রাজা লোরক তখন চন্দ্রাণীকে বিয়ে করে গোহারী দেশের রাজা হয়ে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে এবং ময়নার কথা একেবারেই ভুলে যায়।

এদিকে স্বামী বিরহে ময়না অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে। ময়নার জীবনের এই দুঃখ-যন্ত্রণা দৌলত কাজী বারমাস্যার মধ্য দিয়ে নানা চিত্রকল্পের সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্বামী সম্পর্কে ময়নার কিছুই ধারণা নেই, তাই সে নিত্য হরগৌরীর পূজা করে। এসময় মালিনীর মাধ্যমে ছাতন ময়নাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও ময়না নিজ সতীত্ব দৃঢ়ভাবে বজায় রাখে। এই পর্যন্ত লিখেই দৌলত কাজী মারা যান। আমার আলোচনার বিষয় এই পর্যন্ত।

কাহিনির আলোচনা সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, কাব্যটি মানবিক প্রেম দ্বন্দ্বের কাহিনি। এর একদিকে রয়েছে চন্দ্রাণী ও অপরদিকে ময়নাবতী – এই দুই চরিত্রের মধ্যস্থলে রয়েছে রাজা লোরক। তবে চন্দ্রাণীই প্রধান নায়িকা। সে যৌবন পরিপূর্ণা এক রূপসী নারী। কাব্যটিতে রাজা লোরকের সঙ্গে তারই প্রেমের চড়াই-উতরাই নানান কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে এবং উভয়ে প্রেমের বিষামৃত স্বাদ গ্রহণ করেছে। চন্দ্রাণী বীর্যশালী বামনের স্ত্রী, কিন্তু বামন নপুংসক হওয়ার কারণে কামকেলিতে অসমর্থ –

“সর্বগুণে সম্পূর্ণ যৌবন বীর্যবল।
রতিরসহীন মাত্র কিংশুক কেবল।।” (যোগীর আগমন)

এজন্য চন্দ্রাণী বামনের বীরত্বের কথা মাথায় রেখেও নিজের কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্য বাড়ির দরজা ডিঙিয়ে প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে পরপুরুষকে ভজেছে – সামাজিক নীতিকে এক মুহূর্তের জন্যও তোয়াক্কা করেনি। তার কাছে প্রেম শুষ্ক মরুভূমি নয়, ভোগের মধ্য দিয়েই সে প্রেমের স্বাদকে পেতে চেয়েছে। তাই চন্দ্রাণীর স্বামী থেকেও নেই –
“স্বামীহীন নারীর কি ফল সংসার।
বিফলে বঞ্চয় নিশি রমণী যাহার।।” (চন্দ্রাণীর খেদ)

তার কাছে এটা সত্যিই ভাগ্যের বিড়ম্বনা, কিন্তু সে কখনোই দুর্ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। চন্দ্রাণী এখানে আদর্শকে দলিত করেছে এবং বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার মতো কলঙ্কের ডালি মাথায় তুলে নিয়েছে। চন্দ্রাণী চরিত্রের এই কার্যকলাপ অনেকটাই আধুনিকা নারীর পরিচয় বহন করে।

মানুষকে বাদ দিয়ে যেমন সমাজ গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি দেহকে বাদ দিয়ে প্রেম পূর্ণতা পায় না। চন্দ্রাণীর প্রেম এই দেহনির্ভরই ছিল। এর মূল কারণ চন্দ্রাণীর পেটের খিদে মিটলেও দেহের খিদে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে থেকেই যেত। এজন্য রাজা লোরকের সঙ্গে তার দেহনির্ভর প্রেমেরও একটা মূল্য রয়েছে। বলা হয়, লোরকের সঙ্গে চন্দ্রাণীর প্রেমের মূলে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু কাব্যটিকে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে চন্দ্রাণীর প্রেমের পেছনে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে রয়েছে তার মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব। পাশাপাশি সামাজিক নীতির দিক থেকেও সে বেশ সচেতন। চন্দ্রাণী চরিত্রের নানান উক্তি – প্রত্যুক্তির আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয় –

“তিল সুখ লাগিয়া হারাইলুঁ জাতিকুল।
ঘাটেত বসিয়া নৌকা ডুবাইলুঁ মূল।।”(লোরচন্দ্রানীর পলায়ন)

আবার, বামনের সঙ্গে রাজা লোরকের যুদ্ধ, বামনের পরাজয় ও মৃত্যু – এসব ঘটনা চন্দ্রাণীর সম্মুখে ঘটলেও নিজের বঞ্চিত জৈববৃত্তির তাড়নার ফলেই সে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করেছে। কিন্তু এসব ঘটনার ফলে তার অন্তরাত্মা একটু হলেও কেঁপেছিল। স্বাভাবিকভাবেই লোর-চন্দ্রাণীর প্রেমের আকর্ষণ-বিকর্ষণ কখনও তাদের জীবনে অমৃতের স্বাদ এনে দিয়েছে, আবার কখনও সেই প্রেমেরই নানান কার্যকলাপ তাদের জীবনকে বিষের জ্বালায় জর্জরিত করে তুলেছে। ফলে ‘লোরচন্দ্রাণী’ কাব্যের কাহিনি এক বিষামৃত প্রেমদ্বন্দ্বের কাহিনি হয়ে উঠেছে।

চন্দ্রাণীর পাশাপাশি ময়নাবতীও দৌলতের কাব্যের নায়িকা। রাজকুমারী ও রাজকুলবধূ হিসেবে তার রূপ ভুবনবিজয়ী –

“রাজার কুমারী এক নামে ময়নাবতী।
ভুবনবিজয়ী কন্যা রুপেত পার্বতী।।”

কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজা লোর বনবিহারে গিয়ে চন্দ্রাণীকে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয় এবং তাকে বিয়ে করে সেখানেই রয়ে যায়। এরূপ অবস্থায় ময়নাবতীর যে খেদ, যে বিরহজ্বালা ও আর্তির কথা আমরা জানতে পারি তা তার উক্তি-প্রত্যুক্তি, আচার-ব্যবহারেই ধরা পড়েছে। আষাঢ় মাস থেকে ময়নার বিরহ-জ্বালার চিত্রকে দৌলত কাজী তুলে ধরেছেন –

“প্রথম বারিষা দেখ প্রবেশে আষাঢ়।
বিরহিণী বিরহ বাড়য় অতি গাঢ়।।”

ক্রমে শ্রাবণ মাস এসেছে, কিন্তু তবুও ময়নার বিরহের কোনো প্রশমন ঘটেনি‌। এভাবে প্রতিটি মাসে ময়নার বিরহ-বেদনাতুর হৃদয়ের কথা কবি ‘সতীময়না’ কাব্যে তুলে ধরেছেন। কার্তিক মাসের ঘটনা সম্পর্কে মালিনী
ময়নাকে বলেছে –
‘কার্তিকেত কান্ত তোর গেল দিগন্তর।’

অগ্রহায়ণে রাধার হতাশা –
‘অন্তরে আগুন দিয়া দিগন্তরে কান্ত।’

তবু ময়না অন্য কোনো পুরুষের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারেনি। কারণ, তার কাছে পতিভক্তিই প্রধান। এজন্য মালিনীর মাধ্যমে ছাতনের পাঠানো প্রস্তাবকে ময়নাবতী ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মালিনীকে বলেছে –

“মালিনী না বোল অনুচিত বাণী।
ধরম না চাহসী তেজি সতীত্ব মতি
লোর প্রেমে করাওসি হানি।।”

শুধু তাই নয়, মালিনীকে ‘পাপিনী’, ‘পাতকী’, ‘ঘাতকী’ বলতেও ময়না কুণ্ঠাবোধ করেনি। এতকিছুর পরেও মালিনী যখন নাছোড়বান্দা তখন ময়না নিচু সুরে নিজের অন্তর বিদীর্ণ ভাবের কথাই জানিয়েছে –
“মালিনী মোর মনে আন নাহি তায়।
নয়নের জল দিয়া সে পদ ধোলাইমু গিয়া
যদি বিধি সে বন্ধু মিলায়।।”

ময়নার এই উক্তি থেকে স্বামীপ্রেমের প্রতি তার একাগ্রতার পরিচয় পাওয়া যায়।

স্বামী বিচ্ছেদের কারণে প্রতিটি নারীহৃদয় দুঃখের যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়। এরূপ অবস্থায় সেই দুঃখের অগ্নিকুণ্ডে যদি কেউ ঘি ঢেলে দেয় তাহলে সেই নারীর বিরহ-জ্বালা আরও শতগুণে বেড়ে ওঠে। এসময় কোনো নারীর পক্ষে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ময়নার জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটেছিল, দুঃখের দাবানলে মালিনী ঘি ঢেলেছিল। কিন্তু ময়না তবুও টলেনি – সেইরকম চরম মুহূর্তেও সে অটল থেকেছে এবং বছরের প্রতিটি মাসে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও স্বামী লোরকের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনেছে। ময়নাবতীর এহেন কার্যকলাপ দেখে মনে হতে পারে সতীত্ব রক্ষা করাই তার প্রধান কাজ – আসলে তা নয়। তার হৃদয়েও প্রেম রয়েছে, কামনা বাসনা রয়েছে, স্বামীহীন অবস্থায় সে-ও মদনজ্বালায় ছটফট করেছে। কিন্তু সবকিছুই সে সংযমের মাধ্যমে পেতে চেয়েছে। “যৌবন-বেদনা তার আছে; স্বামীসঙ্গ তার কাম্য; আবার সতীত্বধর্ম আছে; এর জন্য সে জীবনপাত করতে প্রস্তুত কিন্তু বিপথগামিনী হতে রাজী নয়।”২

দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যের কাহিনি এবং চন্দ্রাণী ও ময়নার চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেল যে, চরিত্র দুটির মন-মনন-মেজাজ-মানসিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চন্দ্রাণীর প্রেমে কামনা বাসনাই বড়ো হয়ে উঠেছে। কারণ, শক্তিশালী স্বামী বামন থাকলেও সে চন্দ্রাণীর মদনজ্বালা প্রশমিত করতে অক্ষম। তাই সমাজকে পেছনে ফেলে বাড়ির দরজাকে অতিক্রম করে সে রাজা লোরকে সাদরে গ্রহণ করেছে। চন্দ্রাণী চরিত্রের এই স্বভাববৈশিষ্ট্য আধুনিক সাহিত্যের যেকোনো নায়িকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনীয়।

ভারতীয় সমাজে একজন বধূর বিনা অনুমতিতে ঘোরা-ফেরার অধিকার থাকে বাড়ির দরজা পর্যন্তই। বাড়ির বাইরে বের হতে গেলে তাকে স্বামী বা অন্য কোনো গুরুজনের কাছে অনুমতি নিতে হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বের হতেই দেওয়া হয় না। সমাজে আদর্শ নারীরূপে যাঁরা পরিচিত তাঁরা বাড়ির দরজাকে ডিঙিয়ে পরপুরুষ তো দূরের কথা অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজেও বিনা অনুমতিতে বাড়ির বাইরে যায় না। ময়না এরকমই বাঙালি ঘরের এক ‘আদর্শ সতীনারী’। তার সতীত্বের কারণেই কাহিনির অগ্রগতি এখানে সম্পূর্ণভাবে গৃহমুখীন হয়ে পড়েছে।

ড. মহুয়া ষন্নিগ্রহী সম্পাদিত ‘লোরচন্দ্রাণী ও সতীময়না’ কাব্যের ‘প্রবেশক’ অংশে অধ্যাপক রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন – “লোরচন্দ্রানী’ মানবিক প্রেমদ্বন্দ্বের কাহিনি।… অনেকটা একালের উপন্যাসের মতো। নেহাৎ পদ্যে লেখা, নইলে এটিকে মধ্যযুগের ভালো প্রেমমূলক উপন্যাস বলে চালিয়ে নেওয়াই যেত৷

মানব সভ্যতার ঊষা লগ্ন থেকে ক্ষুধা নিবৃত্তি, মাথা গোজার জন্য আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা আর শরীরের জৈবিক চাহিদা পূরণ — এই তিনটি প্রাথমিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারা প্রবহমান৷

সভ্যতার গতি প্রকৃতি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন ভালবাসার মোড়কে শৃঙ্গার রসের সাহিত্য আজও প্রবহমান৷

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার গভীর উপস্থিতিগুলোকে শব্দ চয়ন করে প্রকাশ করলেন প্রগাঢ় অনুভূতির জীবন্ত দলিল তিনি মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজী৷

দৌলত কাজী (কাজী দৌলত নামেও পরিচিত), ছিলেন মধ্যযুগের একজন বাঙালি কবি। তিনি ১৭শ শতাব্দীর প্রারম্ভে কোন এক সময় চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে সুলতানপুরের কাজী পাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি আরাকান রাজসভার কবি ছিলেন, যদিও তার লেখার ভাষা ছিলো বাংলা। মধ্যযুগের অন্যান্য কবিদের মত তার কাজে তার পৃষ্ঠপোষক সম্পর্কে বর্ণনা থাকলেও নিজের সম্পর্কে তিনি কিছুই লিপিবদ্ধ করে যাননি। তিনি “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনা করে বাংলার শক্তিমান কবিদের মাঝে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। বাংলা কাব্যে ধর্মনিরপেক্ষ প্রণয়কাহিনীর তিনি পথিকৃৎ। সম্ভবত ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। গবেষকদের মতে আরাকান রাজ্যের আকিয়াবের কোনো এক স্থানে তার কবর রয়েছে।

দৌলত কাজী অল্প বয়সে নানাশাস্ত্রে সুপন্ডিত হয়ে উঠেন। নিজের দেশে স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তিনি আরাকানে ভাগ্য অন্বেষনে যান। সে সময়কালে চট্টগ্রামবাসী জীবিকা অর্জনের জন্য আরাকানে যেতেন। আরাকান রাজসভায় তখন বহু কবি এবং জ্ঞানী লোকের ভিড় ছিল। রাজার প্রধান উজির আশরাফ খান একদিন হিন্দি ভাষার কবি মিয়া সাধন রচিত “সতী ময়না” কাহিনী শুনতে চান। দৌলত কাজী পাঞ্চালীর ছন্দে সতী ময়নার কাহিনী বর্ণনা করে সকলের প্রশংসা অর্জন করেন এবং আরাকান (রোসাঙ্গ) রাজ দরবারে কবিদের সভায় মধ্যে গৃহীত হন এবং সেখানে মর্যাদা লাভ করেন।

দৌলত কাজী আরাকান রাজসভার আশরাফ খানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। ১৬২২ হতে ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে আশরাফ খান আরাকানের তৎকালীন অধিপতি থিরিথু ধম্মা বা শ্রী সুধর্মার নস্কর উজির বা সমর সচিব পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।দৌলত কাজী ও আশরাফ খান, দুই জনেই সুফী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আশরাফ খানের আগ্রহে কবি “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনা করেন। এই কাব্যের শুরুতেই তিনি থিরিথু ধম্মা এবং আশরাফ খানের প্রশংশায় লিখেছেনঃ

কর্নফুলী নদী পূর্বে আছে এক পূরী

রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী।।
তাহাতে মগধ বংশ ক্রমে যুদ্ধাচার
নাম শ্রী থুধম্মা রাজা ধন অবতার।।
প্রতাপে প্রভাত ভানু বিখ্যাত ভুবন
পুত্রের সমান করে প্রজার পালন।।
দেব গুরু পুজ এ ধর্মেতে তান মন
সে পদ দর্শনে হএ পাপের মোচন।।
পূণ্যফলে দেখে যদি রাজার চরণ
নারকীও স্বর্গ পাএ সাফল্য জীবন।।
…………………………………
মুখ্য পাত্র শ্রীযুক্ত আশরাফ খান
হানাফী মোজাহাব ধরে চিস্তিয়া খান্দান।।
……………………………………
শ্রীযুক্ত আশরাফ খান লস্কর উজীর
যাহার প্রতাপ বজ্রে চুর্ণ আর শির।।

মিয়া সাধন নামক একজন হিন্দি ভাষী মুসলিম কবি রচিত “মৈনাসত” (কাব্যটি আসলে ‘ঠেট গোহারি’ বা একধরনের গ্রাম্য হিন্দি ভাষায় লেখা) নামক কাব্যই ছিল কবি দৌলত কাজীর “সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী” কাব্য রচনায় আদর্শ। এই কাব্যের সঠিক রচনাকাল জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হয় ১৬২২ থেকে ১৬৩৮ সালের মধ্যে এই কাব্য রচনা করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মহাকাব্য সমাপ্ত হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবির মৃত্যুর ২০ বছর পরে ১৬৫৯ সালে কবি আলাওল(আনুমানিক ১৫৯৭-১৬৭৩) কাব্যের শেষাংশ রচনা করেন।

জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ প্রেমের মায়াজালে আবদ্ধ। কারণ, প্রেমের স্বরূপ চিরন্তন। প্রেম নায়ক-নায়িকার জীবনে কখনও অমৃতের স্বাদ এনে দেয়, আবার কখনও প্রেমের অগ্নিকণাই তাদের জীবনকে বিষের জ্বালায় জর্জরিত করে তোলে – দু’য়ে মিলেই প্রেমের সার্থকতা। আবার দাম্পত্য জীবনেও প্রেমের একটা ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। আদর্শ পুরুষরা যেমন স্ত্রীকে কখনও ঠকান না তেমনি আদর্শ নারীরাও না। এক্ষেত্রে নারীদের সতীত্ব রক্ষার ব্যাপারটা সংসার জীবনে একটা বড়ো ভূমিকা পালন করে। বিষয়টি দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে, যার রেশ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষত উপন্যাসে দেখা যায়।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যিনি প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে মাটির মানুষের কথাকে নিজের রচনার মধ্যে স্থান দিলেন তিনি আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভার সম্বর্ধিত কবি দৌলত কাজী। তিনি আরাকান রাজ থিরি-থু-ধম্মার (শ্রীসুধর্মার) শাসনকালে (১৬২১-১৬৩৮) রাজার সমর সচিব আশরাফ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় ও নির্দেশে ১৬২২-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনও এক সময়ে সাধন নামক এক হিন্দি কবির ঠেট-গোহারী (গ্রাম্য হিন্দি) ভাষায় রচিত ‘ময়না কো সত্’ কাব্য অবলম্বনে ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যটি রচনা করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় দৌলত কাজী কাব্যটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি, কবি সৈয়দ আলাওল ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটির অসমাপ্ত অংশের সম্পূর্ণ রূপ দেন।

দৌলত কাজী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও হিন্দুর সামাজিক আচার-ব্যবহার, জীবনাদর্শের মতো নানা তথ্যকে যেভাবে কাব্যটির মধ্যে স্থান দিয়েছেন তা সত্যিই অভিনব। আসলে কবির পূর্বপুরুষেরা হিন্দু বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।১ তাই ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’র মতো রোমান্টিক আখ্যানকাব্য রচনার সময় কবি যে পূর্ববর্তী সময়ের হিন্দুর বৈষ্ণবধর্মাশ্রিত রোম্যান্টিক কাব্যকে কিছুটা অনুসরণ করেছেন তা বলাই বাহুল্য। তবে বৈষ্ণব ধর্ম নয়, পদাবলী সাহিত্যের রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের ভাব-ঐশ্বর্যই দৌলত কাজীর মনকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল। আসলে দৌলত কাজী একজন মর্ত্যভূমির জীবনরসিক কবি। এজন্য কাব্যটির কাহিনি পরিকল্পনায় এবং চরিত্রের মন-মনন-মেজাজ-মানসিকতার টানাপোড়েন উদঘাটনে কবি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। আর এই ‘ভিন্ন পন্থা’টাই উনিশ শতকে সূচনা পর্বের বাংলা উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে প্রভূত সহয়তা করেছে বলে মনে হয়।

‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ রোমান্টিক আখ্যানকাব্যটির যে অংশটুকু দৌলত কাজী রচনা করেছেন তাকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। এক – লোর-চন্দ্রাণীর আকর্ষণ-বিকর্ষণ ঘটনা সমন্বিত বিষামৃত প্রেমকাহিনি; দুই – স্বামী বিরহে কাতর হওয়া সত্বেও ময়নার সতীত্ব রক্ষার মাধ্যমে আদর্শ নারী হয়ে ওঠার কাহিনি । একটি মাত্র কাব্যের মধ্যে দুটি কাহিনির বিচরণ বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম নয়। কিন্তু দৌলতের কাব্যটির একটি বিশেষ দিক – এখানে দুটি কাহিনি নানান কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে ভিন্ন দুই বিপরীত মুখে এগিয়ে গেছে।

দৌলত কাজীর কাব্যটির কাহিনি সংক্ষেপ এইরকম : গোহারী দেশের রাজা মোহরা। তাঁর অপূর্ব সুন্দরী কন্যা চন্দ্রাণীর সঙ্গে ভাগ্যদোষে এক নপুংসক বামনের বিয়ে হয়। এতে চন্দ্রাণী দুঃখে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে। অপরদিকে, নৃপতিনন্দন রাজা লোরকের সঙ্গে সতীসাদ্ধী ময়নাবতীর বিয়ে হয় এবং তারা সুখে দিন কাটাতে থাকে। ঘটনাক্রমে রাজা লোরক বনে মৃগয়ায় গিয়ে এক যোগীর কাছে চন্দ্রাণীর প্রতিকৃতি দেখে বিমুগ্ধ হয়ে তাকে লাভ করার জন্য গোহারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এবং সেখানে গিয়ে একে অপরকে দেখে আকৃষ্ট হয়। এরপর লোর-চন্দ্রাণী দেবী মন্দিরে সাক্ষাৎ করে এবং উভয়ে মিলিত হয়। এসব ঘটনা দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বামন একসময় শুনতে পেলে লোরকের বিনাশ ঘটাতে সে বনপথ রোধ করে ধরে। এসময় বামন ও রাজা লোরকের মধ্যে যুদ্ধ হয়, বামনের পরাজয় ঘটে ও সে মারা যায়। এরই মধ্যে চন্দ্রাণীর সর্পাঘাতে মৃত্যু ঘটলে যোগীবর তাকে বাঁচিয়ে দেয়। রাজা লোরক তখন চন্দ্রাণীকে বিয়ে করে গোহারী দেশের রাজা হয়ে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে এবং ময়নার কথা একেবারেই ভুলে যায়।

এদিকে স্বামী বিরহে ময়না অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে। ময়নার জীবনের এই দুঃখ-যন্ত্রণা দৌলত কাজী বারমাস্যার মধ্য দিয়ে নানা চিত্রকল্পের সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্বামী সম্পর্কে ময়নার কিছুই ধারণা নেই, তাই সে নিত্য হরগৌরীর পূজা করে। এসময় মালিনীর মাধ্যমে ছাতন ময়নাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও ময়না নিজ সতীত্ব দৃঢ়ভাবে বজায় রাখে। এই পর্যন্ত লিখেই দৌলত কাজী মারা যান। আমার আলোচনার বিষয় এই পর্যন্ত।

কাহিনির আলোচনা সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, কাব্যটি মানবিক প্রেম দ্বন্দ্বের কাহিনি। এর একদিকে রয়েছে চন্দ্রাণী ও অপরদিকে ময়নাবতী – এই দুই চরিত্রের মধ্যস্থলে রয়েছে রাজা লোরক। তবে চন্দ্রাণীই প্রধান নায়িকা। সে যৌবন পরিপূর্ণা এক রূপসী নারী। কাব্যটিতে রাজা লোরকের সঙ্গে তারই প্রেমের চড়াই-উতরাই নানান কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে এবং উভয়ে প্রেমের বিষামৃত স্বাদ গ্রহণ করেছে। চন্দ্রাণী বীর্যশালী বামনের স্ত্রী, কিন্তু বামন নপুংসক হওয়ার কারণে কামকেলিতে অসমর্থ –

“সর্বগুণে সম্পূর্ণ যৌবন বীর্যবল।
রতিরসহীন মাত্র কিংশুক কেবল।।” (যোগীর আগমন)

এজন্য চন্দ্রাণী বামনের বীরত্বের কথা মাথায় রেখেও নিজের কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্য বাড়ির দরজা ডিঙিয়ে প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে পরপুরুষকে ভজেছে – সামাজিক নীতিকে এক মুহূর্তের জন্যও তোয়াক্কা করেনি। তার কাছে প্রেম শুষ্ক মরুভূমি নয়, ভোগের মধ্য দিয়েই সে প্রেমের স্বাদকে পেতে চেয়েছে। তাই চন্দ্রাণীর স্বামী থেকেও নেই –
“স্বামীহীন নারীর কি ফল সংসার।
বিফলে বঞ্চয় নিশি রমণী যাহার।।” (চন্দ্রাণীর খেদ)

তার কাছে এটা সত্যিই ভাগ্যের বিড়ম্বনা, কিন্তু সে কখনোই দুর্ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। চন্দ্রাণী এখানে আদর্শকে দলিত করেছে এবং বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার মতো কলঙ্কের ডালি মাথায় তুলে নিয়েছে। চন্দ্রাণী চরিত্রের এই কার্যকলাপ অনেকটাই আধুনিকা নারীর পরিচয় বহন করে।

মানুষকে বাদ দিয়ে যেমন সমাজ গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি দেহকে বাদ দিয়ে প্রেম পূর্ণতা পায় না। চন্দ্রাণীর প্রেম এই দেহনির্ভরই ছিল। এর মূল কারণ চন্দ্রাণীর পেটের খিদে মিটলেও দেহের খিদে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে থেকেই যেত। এজন্য রাজা লোরকের সঙ্গে তার দেহনির্ভর প্রেমেরও একটা মূল্য রয়েছে। বলা হয়, লোরকের সঙ্গে চন্দ্রাণীর প্রেমের মূলে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু কাব্যটিকে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে চন্দ্রাণীর প্রেমের পেছনে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে রয়েছে তার মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব। পাশাপাশি সামাজিক নীতির দিক থেকেও সে বেশ সচেতন। চন্দ্রাণী চরিত্রের নানান উক্তি – প্রত্যুক্তির আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয় –

“তিল সুখ লাগিয়া হারাইলুঁ জাতিকুল।
ঘাটেত বসিয়া নৌকা ডুবাইলুঁ মূল।।”(লোরচন্দ্রানীর পলায়ন)

আবার, বামনের সঙ্গে রাজা লোরকের যুদ্ধ, বামনের পরাজয় ও মৃত্যু – এসব ঘটনা চন্দ্রাণীর সম্মুখে ঘটলেও নিজের বঞ্চিত জৈববৃত্তির তাড়নার ফলেই সে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করেছে। কিন্তু এসব ঘটনার ফলে তার অন্তরাত্মা একটু হলেও কেঁপেছিল। স্বাভাবিকভাবেই লোর-চন্দ্রাণীর প্রেমের আকর্ষণ-বিকর্ষণ কখনও তাদের জীবনে অমৃতের স্বাদ এনে দিয়েছে, আবার কখনও সেই প্রেমেরই নানান কার্যকলাপ তাদের জীবনকে বিষের জ্বালায় জর্জরিত করে তুলেছে। ফলে ‘লোরচন্দ্রাণী’ কাব্যের কাহিনি এক বিষামৃত প্রেমদ্বন্দ্বের কাহিনি হয়ে উঠেছে।

চন্দ্রাণীর পাশাপাশি ময়নাবতীও দৌলতের কাব্যের নায়িকা। রাজকুমারী ও রাজকুলবধূ হিসেবে তার রূপ ভুবনবিজয়ী –

“রাজার কুমারী এক নামে ময়নাবতী।
ভুবনবিজয়ী কন্যা রুপেত পার্বতী।।”

কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজা লোর বনবিহারে গিয়ে চন্দ্রাণীকে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয় এবং তাকে বিয়ে করে সেখানেই রয়ে যায়। এরূপ অবস্থায় ময়নাবতীর যে খেদ, যে বিরহজ্বালা ও আর্তির কথা আমরা জানতে পারি তা তার উক্তি-প্রত্যুক্তি, আচার-ব্যবহারেই ধরা পড়েছে। আষাঢ় মাস থেকে ময়নার বিরহ-জ্বালার চিত্রকে দৌলত কাজী তুলে ধরেছেন –

“প্রথম বারিষা দেখ প্রবেশে আষাঢ়।
বিরহিণী বিরহ বাড়য় অতি গাঢ়।।”

ক্রমে শ্রাবণ মাস এসেছে, কিন্তু তবুও ময়নার বিরহের কোনো প্রশমন ঘটেনি‌। এভাবে প্রতিটি মাসে ময়নার বিরহ-বেদনাতুর হৃদয়ের কথা কবি ‘সতীময়না’ কাব্যে তুলে ধরেছেন। কার্তিক মাসের ঘটনা সম্পর্কে মালিনী
ময়নাকে বলেছে –
‘কার্তিকেত কান্ত তোর গেল দিগন্তর।’

অগ্রহায়ণে রাধার হতাশা –
‘অন্তরে আগুন দিয়া দিগন্তরে কান্ত।’

তবু ময়না অন্য কোনো পুরুষের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারেনি। কারণ, তার কাছে পতিভক্তিই প্রধান। এজন্য মালিনীর মাধ্যমে ছাতনের পাঠানো প্রস্তাবকে ময়নাবতী ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মালিনীকে বলেছে –

“মালিনী না বোল অনুচিত বাণী।
ধরম না চাহসী তেজি সতীত্ব মতি
লোর প্রেমে করাওসি হানি।।”

শুধু তাই নয়, মালিনীকে ‘পাপিনী’, ‘পাতকী’, ‘ঘাতকী’ বলতেও ময়না কুণ্ঠাবোধ করেনি। এতকিছুর পরেও মালিনী যখন নাছোড়বান্দা তখন ময়না নিচু সুরে নিজের অন্তর বিদীর্ণ ভাবের কথাই জানিয়েছে –
“মালিনী মোর মনে আন নাহি তায়।
নয়নের জল দিয়া সে পদ ধোলাইমু গিয়া
যদি বিধি সে বন্ধু মিলায়।।”

ময়নার এই উক্তি থেকে স্বামীপ্রেমের প্রতি তার একাগ্রতার পরিচয় পাওয়া যায়।

স্বামী বিচ্ছেদের কারণে প্রতিটি নারীহৃদয় দুঃখের যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়। এরূপ অবস্থায় সেই দুঃখের অগ্নিকুণ্ডে যদি কেউ ঘি ঢেলে দেয় তাহলে সেই নারীর বিরহ-জ্বালা আরও শতগুণে বেড়ে ওঠে। এসময় কোনো নারীর পক্ষে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ময়নার জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটেছিল, দুঃখের দাবানলে মালিনী ঘি ঢেলেছিল। কিন্তু ময়না তবুও টলেনি – সেইরকম চরম মুহূর্তেও সে অটল থেকেছে এবং বছরের প্রতিটি মাসে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও স্বামী লোরকের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনেছে। ময়নাবতীর এহেন কার্যকলাপ দেখে মনে হতে পারে সতীত্ব রক্ষা করাই তার প্রধান কাজ – আসলে তা নয়। তার হৃদয়েও প্রেম রয়েছে, কামনা বাসনা রয়েছে, স্বামীহীন অবস্থায় সে-ও মদনজ্বালায় ছটফট করেছে। কিন্তু সবকিছুই সে সংযমের মাধ্যমে পেতে চেয়েছে। “যৌবন-বেদনা তার আছে; স্বামীসঙ্গ তার কাম্য; আবার সতীত্বধর্ম আছে; এর জন্য সে জীবনপাত করতে প্রস্তুত কিন্তু বিপথগামিনী হতে রাজী নয়।”২

দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ কাব্যের কাহিনি এবং চন্দ্রাণী ও ময়নার চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেল যে, চরিত্র দুটির মন-মনন-মেজাজ-মানসিকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চন্দ্রাণীর প্রেমে কামনা বাসনাই বড়ো হয়ে উঠেছে। কারণ, শক্তিশালী স্বামী বামন থাকলেও সে চন্দ্রাণীর মদনজ্বালা প্রশমিত করতে অক্ষম। তাই সমাজকে পেছনে ফেলে বাড়ির দরজাকে অতিক্রম করে সে রাজা লোরকে সাদরে গ্রহণ করেছে। চন্দ্রাণী চরিত্রের এই স্বভাববৈশিষ্ট্য আধুনিক সাহিত্যের যেকোনো নায়িকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনীয়।

ভারতীয় সমাজে একজন বধূর বিনা অনুমতিতে ঘোরা-ফেরার অধিকার থাকে বাড়ির দরজা পর্যন্তই। বাড়ির বাইরে বের হতে গেলে তাকে স্বামী বা অন্য কোনো গুরুজনের কাছে অনুমতি নিতে হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বের হতেই দেওয়া হয় না। সমাজে আদর্শ নারীরূপে যাঁরা পরিচিত তাঁরা বাড়ির দরজাকে ডিঙিয়ে পরপুরুষ তো দূরের কথা অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজেও বিনা অনুমতিতে বাড়ির বাইরে যায় না। ময়না এরকমই বাঙালি ঘরের এক ‘আদর্শ সতীনারী’। তার সতীত্বের কারণেই কাহিনির অগ্রগতি এখানে সম্পূর্ণভাবে গৃহমুখীন হয়ে পড়েছে।

ড. মহুয়া ষন্নিগ্রহী সম্পাদিত ‘লোরচন্দ্রাণী ও সতীময়না’ কাব্যের ‘প্রবেশক’ অংশে অধ্যাপক রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন – “লোরচন্দ্রানী’ মানবিক প্রেমদ্বন্দ্বের কাহিনি।… অনেকটা একালের উপন্যাসের মতো। নেহাৎ পদ্যে লেখা, নইলে এটিকে মধ্যযুগের ভালো প্রেমমূলক উপন্যাস বলে চালিয়ে নেওয়াই যেত৷

মানব সভ্যতার ঊষা লগ্ন থেকে ক্ষুধা নিবৃত্তি, মাথা গোজার জন্য আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা আর শরীরের জৈবিক চাহিদা পূরণ — এই তিনটি প্রাথমিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারা প্রবহমান৷

সভ্যতার গতি প্রকৃতি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন ভালবাসার মোড়কে শৃঙ্গার রসের সাহিত্য আজও প্রবহমান৷

কৃষ্ণা গুহ রায় একজন সাহিত্যকর্মী৷

কৃষ্ণা গুহ রায়। লেখক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। পেশাগতজীবনে তিনি আকাশবাণী কলকাতায় উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত বই: ৩টি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ