মন্দাক্রান্তায় কয়েকটি কবিতা

ঋতো আহমেদ
কবিতা
Bengali
মন্দাক্রান্তায় কয়েকটি কবিতা

‘লাবণ্য’-কে

বলো কি’ বলো নি, সে আমি জানি না— আমি তো বলেছি, “অনন্যা,
এই যে দিনকাল পড়েছে আজকাল ভাবো তো চলে কি’ চলেই না।
তবুও রোজকার করছি রোজগার যতোটা সম্ভব আমার তা।”
তুমিও ওইদিন করেছো সঙ্গিন নিজের‌ই সংসার— তোমার যা।

মাটি বা আকাশে ‍দ্যাখো যা¬¬— যা আছে, তা নিয়ে আমরা জীবন্তের
জন্মে ও যাপনে কোনো এক স্বপ্নে, এঁকে বেঁকে প্রণয়ে দুরন্তের।
কী এমন দোষ হয় যদি নদ বেগে যায়— দুর্বার দুর্জয়— অনন্তের
মাঠ-ঘাট প্রান্তর পেরিয়ে তেপান্তর সমাপন মোহনায়— সমুদ্রের!

তবে কি এভাবেই পৃথিবীর নিয়মেই রয়ে যাবে অধরা লাবণ্য?
বাংলার এই নদ মিলবে না কোনো দিন— মাঝপথে আশ্রয় অনন‍্য
বনলতা কতোকথা বলেছি কি’ বলিনি অথবা সুরঞ্জ না— শোভনা—

কোনো এক সন্ধ্যায় নেমে এলে রাত্তির মনে কোরো আমাকে— ধূসর ঘোর
একদিন ঘোড়াগুলি জোৎস্নায় চিরদিন চলাচল মহাকাল— আমার তার।
বলো কি’ বলো নি আমি তা বলি নি;— আমারো প্রাণ চায়— বোঝোই-না!

মেট্রোপলিটন

ঝঞ্ঝার দৃষ্টির ভাবনার আগুনে দগ্ধ দৃশ্যের শহর এই
সন্ধ্যার আন্ধার নেমে এলে বাতাসে আমি তার বৈভব পেরুই যেই
চরাচর গুড়গুড় শব্দের হুংকার দিয়ে ওঠে অকস্মাৎ এমন দিন
কবেকার বহমান রাত্তির আত্মার দৈহিক পৃথ্বীর আকাশ খান—

বিদ‍্য‌ুৎ বজ্রের বিদ্যুৎ খুলে দাও রাস্তায় রাস্তার আলোর মুখ।
অন্ধের বি‍দ্যায় তোলপাড় সস্তার বানোয়াট সম্ভার প্রকট রোগ;
পলিটন মেট্রো স্বপ্নের স্বার্থের গড়ে তোলা অট্টা- লিকার হাত
আষ্টে-পৃষ্ঠে ধরছে জাপটে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস— ভয়াল রাত—

যেন কোন আউসে আন্ধার আবেশে উড়ন্ত সূর্যের অনল বাণ
চিরে ফেরে কলিজা দেখি না বা দেখে তা বলি কার দ্বন্দ্বের উদল কান
পুড়ে যায় পুড়ে ছাই—ওই দেখ এই দেশ নৈতিক পাতালের অতল তাস—

তবু এই দেয়ালের ওপাশেই শুনেছি একদিন সৃষ্টির ধ্বনির গান
দেখছি রাজপথ দেখছি আগামী চলেছে দুর্বার— ‘বদলে যান,,
পাল্টান এ-শহর পাল্টান আপনার দৃষ্টির বক্র— বদ-অভ্যাস’।

জীবন গুণ

নৌকার ছয় তার টেনে যায় মাল্লার, দিক তার নৈঋত— জীবন ভর
স্বপ্নের গন্ধের মৃন্ময় আবদার, বুক তার উন্মন— কোথায় ঘর
কোন দেশ কোন পথ ঠিক নেই কোন দিন এই জল ঐ চর— চলাই এক—
সোচ্চার বল তার টেনে তুলে সব দাঁড় ঐহিক হালটার— আশাই বেগ

ছয় গুন এক গুন সম্ভোগ নয় রোগ কাম তার নাম যার—সামাল নাও
রূপ রস গন্ধের শব্দের স্পর্শের— এইসব দরকার— প্রণয়, তাও
ক্রোধ আর হিংসার কুত্তার শেয়ালের তার-মুখ পাল্টাক— জানুক আর—
মোহ মদ/দম্ভের লোভ থাক স্বল্পের— নৌকার পাল কি— অবজ্ঞার

পাল তুলে হালটায় হাত রেখে বলকায় ঘনঘোর জলটায়— নিষাদ বান
তবু এই উত্তাল ভরবেগ রাখ তাল গান ধর ভাটিয়াল— বিষাদ তান
ছ‌ই ঘর ছারখার ঐ ঝড় তান্ডব,— নৌকার নৈতিক— হিসেব খোল—

তারপর ফের ভোর ফের যুগ ফের টান, নৌকার ছয় গুন— বিষম প্রায়
টেনে যায় আরবার কারবার মাল্লার, চরাচর বিশ্বের— বিশাল নায়
পৌঁছার স্বপ্নের দৃষ্টির সীমানায় রোজকার আশ্রয়— আকাশ তল—

ব্যবচ্ছেদ

গল্পের খসরায় প্রান্তিক নৈরাশ, অদ্ভুত রঞ্জন— নিরঞ্জন
উৎকট দগ্ধের স্বপ্নের সংহার, নিঃশ্বাস বন্ধের— উপক্রম
বন্ধুর মনটায় মৃত্যুর শীৎকার, ভাঙচুর অগ্নির— হিরন্ময়—
দুঃসহ চুম্বন মুক্তির হিমস্রোত, ব‌ইছে এইবার— আরক্তিম

উঠছে সেইসব প্রশ্নের কল্লোল, কিঙ্কর উন্মন— অজান্তার
তুমিও বলো নি কেন তা ঘটবেই, বিস্ময় ধন্দ— আজন্ম‌ই
চিত্তের মিথ্যে প্রশ্রয় মুখ তার, মুখ নয় মৃত্যুর— আরাধ্যর—
নৈরাজ বিশ্বের নিঃস্ব আশ্বাস, কুর্নিশ বিশ্বাস— অপাত্রেই

চিন্ময় কঙ্কাল চিন্তার ভাস্কর, হাঁটতে হাঁটতেই— শতাব্দীর
নাগ্নিক প্রান্তর পেরুবার সংঘাত, আত্ম সত্তায়— রূপান্তর
উৎসের সামনে ভাসছে আখ্যান, জ্বলছে ক্লান্ত— অলঙ্কার

নিঃশ্বাস হিঁচড়ে নির্ভাষ নির্বেদ, খুলতেই স্পর্শের— সমন্বয়
স্বস্তির অক্ষর খুঁজতে খুঁজতেই, মনুষ্য ভাবনার— অজস্রয়
অস্থি-র স্পন্দন শুনতে শুনতেই, স্বতন্ত্র শস্যের— জগজ্জয়।

অভিজ্ঞান

এই যে পিত্তি আর এই অগ্নি, জ্বলছে সংযোগ— পরস্পর
আর সব বাষ্প— ভঙ্গুর বিদ্যুৎ, যোগফল শূন্যের রোমন্থন—
বিস্বাদ অস্তির হর্ষক আব্দার, মৃত্যুর তলপেট— ও ঈশ্বর,,
ভরপুর পাপ দাও— প্যাঁচ দাও ঊর্ণীর, ক্লিন্ন খিন্ন অভিক্ষণ

উত্তর দক্ষিণ দুর্বার পশ্চিম, টুকরো টুকরো— অকথ্যের
বাস্তব মুচড়ে উঠবার ইঙ্গিত, ভাঙবার চেষ্টায়— অভিজ্ঞান
আঁকতে আঁকতে খুঁজব নিশ্চয়, দেখব প্রেক্ষিত— অশান্তির—
রুক্ষ মন্থর দীর্ঘ স্থানকাল, কষ্টের বিষফোঁড়— অধিষ্ঠান

সত্তার শূন্য— ব্যর্থ, বন্দি;— স্বত্ব নির্মাণ— নঞর্থক
এমনি দিনকাল উজবুক দেশটায়, স্বার্থের রূপটাই— সমার্থক

দ্বান্দ্বিক যুক্তির যৌথ যৌবন, দর্শন বিজ্ঞান— আহাম্মক
কর্মের চিন্তায় শিল্পের মাধ্যম, সৃষ্টির মিথ্যেয়— সদর্থক

বন্ধ চোখটায় সূর্যের গন্ধ, খুলবে যেইদিন— অকস্মাৎ
অগ্নির শৃঙ্খল ভাঙবার শক্তি, দগ্ধ রক্তের— ভবিষ্যৎ।।

ব্যত্যয়

(হিম-মুখ রূপ কী আত্ম-ধ্বংসী!,— দগ্ধ নিঃশ্বাস,— দারুণ-শ্লথ;
চিন্তার ফাঁদ এক—; মন আর মন নেই; কবেকার প্রত্যয় ধুলিস্বাৎ—
চোখ তার শেষ দিন দেখবার জন্য‌ই ছোঁয় এক নাগ্নিক মরণ-পথ;
পথ আর পথ কি, সবটাই ভাবনার কাজ আর আন্ধার— ভবিষ্যৎ—)

উত্তল আয়নায় আত্ম ব্যত্যয় দেখবে দুস্তর প্রয়াসকেই
লিখতে লিখতে লিখবে উত্তাপ,— লিখবে চিত্র,— গহিন ঘোর—
শিখবে দেখতে আত্ম-দর্শন— আত্ম/আপনার প্রয়াণকেই
আত্ম-সঙ্কট মানবে দুর্যোগ— ভিন্ন সঞ্চার,— ব্যাপক ভার—

রুদ্ধ রাস্তার ক্লান্ত দৃশ্য দেখতে দেখতেই— অস্বেচ্ছায়
সান্ধ্য আঘ্রাণ ব্যগ্র দৃষ্টির সামনে পড়তেই— যথেচ্ছায়
শুঁকবে বিশ্বাস, ঝুঁকবে তুচ্ছ, ঝরবে রক্ত— অবজ্ঞায়।

শুদ্ধ অন্তের কল্পে বিস্তার আস্ত সূর্যের— আগুন-ঝড়
মিথ্যে শব্দের হুমড়ি হুংকার আর্ত চিৎকার— স্বয়ম্বর—
ছিন্ন ভিন্ন— অস্তি অন্য— অন্য—উত্তর— শতাব্দীর।

ঋতো আহমেদ। কবি ও প্রকৌশলী। পৈতৃক বাড়ি মুর্শিদাবাদ। জন্ম ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি বাইলেন, কর্মসূত্রে ঢাকায় বসবাস। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট থেকে শিল্প প্রকৌশলে স্নাতক। বর্তমানে একটি টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: 'শতাব্দীর অপার প্রান্তরে', 'ভাঙনের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ