মরীচিকা খেলাঘর

শাহীদ লোটাস
কবিতা
Bengali
মরীচিকা খেলাঘর

মৃত মানব

এখানটা খুব নির্জন।
ভৌতিক আধার ছেয়ে থাকে সব সময়,
এখানে সচরাচর কেও আশে না,
বাঁশঝাড় বাইরের পরিবেশ থেকে এখানটা করে রেখেছে খুব আলাদা,
এখানে আরো আছে জংলা গাছ,
দিনের বেলাতেও এখানে কেউ আসে না,
এখানে পুরানো সাপ শেয়াল বা অন্যসব বন্যপ্রাণী ও পাখির বসবাস।
মাঝে মাঝে এখানে দলবেঁধে মানুষ আসে যখন কেউ মারা যায়
সেই মৃত মানুষকে সমাধিস্থ করতে এখানে আসা হয় তাদের।
শুধু মৃত্যুদের জন্যই যেন এই জায়গাটা।
আচ্ছা,
আমিতো কাদামাটি কখনই শুয়ে থাকিনি,
একা ঘুমাতে আমার ভয় বা নির্ভয় যাই হতো
আমি এমন নির্জনতায় কখনই থাকিনি!
তবে কেন এমন করে রেখে গেলে আমায়?
শাপ বিচ্ছু গর্ত করে রেখেছে আমার চারপাশ!
বৃষ্টি হলেই পানিতে উপচে উঠে
আমার ছোট এই কবরের ভেতর খানি!
আর আমি ভাসতে থাকি জলকাদা পানিতে।
আমার চারিপাশে শাপ ব্যাঙ বিচ্ছু পোকামাকড়,
তারা আমার উপর হাটে দাঁত ফুটায়,

 

কিছু কথা

আমি তোমাকে বলেছিলাম
‘পৃথিবীটা অদৃশ্য হয়ে যাবে ‘
তুমি বলতো,
জীবন কি দৃশ্যমান?
হৃদয় কি দৃশ্যমান?
আবেগ,
অনুভূতি,
হিংসা,
ঈর্ষা কি দৃশ্যমান?
আর আমার প্রতি বা তোমার প্রতি এই যে ভালোবাসা
এই যে প্রেম প্রেম অভিনয় এও কি দৃশ্যমান?
তাহলে তুমি কোন যুক্তিতে বলতে পারো পৃথিবী দৃশ্যমান?

হাওয়া

আমরা সবাই মাটিতে মিশে যাবো
হাওয়া উড়ে যাবে প্রাণ
যেমন লক্ষকোটি বছর যাবত অসংখ্য প্রাণেরা হাওয়া উড়ে যায়।
যে প্রেমিকার হাত ধরে অনন্ত সকাল বেচে থাকার কথা ছিলো
তার প্রাণও আজ হাওয়া বেড়ায়,
হাওয়া উড়ে আমার দাদা জান দাদী-জান,
হাওয়া ভাসে আমার স্বজন, বন্ধু , প্রিয়তমা, প্রিয়তম।
আমরাও একদিন হাওয়া উড়ে বেড়াবো অনন্তকাল।

মরীচিকা খেলাঘর

এখানে বিষণ্ণ এক নদী ছিলো ছিলো সাগরের গহিন!
ছিলো নির্জন বাগানে পাখির কলরব।
এখানে একাকীত্ব ছিলো ছিলো ফিরে পাওয়া সুখ,
আমি কতকাল এই নদীর স্রোতে নিজেকে হারিয়েছি
গহিনে দেখেছি স্বপ্ন।
আমি কতকাল বিষণ্ণ নদীতে পাখির গান শুনে
দেখেছি হাওয়া বেসে যাওয়া পাখির ডানা,
দেখেছি চকচকে রোদে কি করে চিল বিষণ্ণতা ছড়ায়!
দেখেছি কি করে পথিক তাকিয়ে থাকে বহুদূর কোথাও।
তুমি কতকাল আমাকে রেখে আকাশে উড়ে;
হও মহীয়ান রূপসীর মতো নারী।
আমি আজো বিষণ্ণ নদীর স্রোতের পাশে
মন্থর ভেসে যাওয়া শ্যাওলা দেখে উপরে দৃষ্টি রাখি,
আকাশে ছাতক আছে আছে শঙ্খচিল আরও আছো তুমি!
আমি তোমাকে ভেবে অনন্তকাল ভেসে যাই বসে থাকার অভিনয়ে।
ভেসে যাই শুষ্ক নদীর স্রোতে,

আমাদের সংসার

আমার বাড়ি যাওয়া মানেই আম্মার কাছে যাওয়া।
বাসে যখন উঠবো তার আগে বেশ কয়েকবার আম্মা আমাকে ফোন দিতো,
বাস থেকে নামার আগেও ফোন আসতো আম্মার,
বাড়ি পৌছাতে একটু দেরী হলেই আম্মা বার বার ফোন দিয়ে বলতো
‘ কোন পর্যন্ত আইছস, এত দেরী অইতাছে কে?’
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি ঘরে পৌঁছতাম ততক্ষণ পর্যন্ত আম্মা জেগেই থাকবো,
ঘরে গিয়ে দেখতাম আম্মা আমার অপেক্ষায় বসে আছে
অনেক কিছু রান্না করে রেখেছে।
কোন প্রকারে ফ্রেশ হয়ে আমি যখন খেতে বসতাম
তখন আম্মা আমার সামনে বসে থাকতো নয়ত সামনেই থাকতো দাড়িয়ে।
আমি আম্মার দিকে তাকিয়ে দেখতাম
খুশিতে ঝলমল করছে আম্মার মুখ,
আমি সব খাবার খেতে পারতাম না,
আম্মা খুব জোরাজুরি করতো রাগা রাগিও করতো কম খেতাম বলে
আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আম্মা এটা ওটা জোর করে পাতে তুলে দিতো আমার।

এখন বাড়ি যাই!
এখন আমাদের ঘর সব সময় তালা লাগানো থাকে,
ঘরে কেউ থাকে না, খুব নির্জন থাকে বাড়িটা,
আমি কবে আড়ি যাবো, কখন বাসে উঠবো, কখন বাস থেকে নামবো,
তা জানার জন্য কেউ আমাকে আর ফোন করে না,
বাড়ি যেতে যত রাতেই হোক কেউ বলে না ‘ এত দেরী অইতাছে কে?’
বাড়িতে কোন খাবারো রান্না থাকে না আমার জন্য।
কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে না রাত জেগে।
বাড়ির চারপাশ গুট-ঘুটে অন্ধকার থাকে এখন
যখন আমি বাড়ি যাই।
আমি অন্ধকারেই একা একা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করি,
মোবাইলের ক্ষীণ আলোতে সুইচ গুলো খুঁজি,
আলো জালাই,
হাতমুখ ধুয়ে না খেয়ে শুয়ে পড়ি,
কারণ আমার জন্য কিছু রান্না হয় না এখন আমাদের ঘরে।
শোবার পর ঘুম আসে না আমার,
শোয়ে শুয়ে ভাবি আম্মা এখন কি করছে?
আম্মা কি কবর থেকে দেখছে আমাকে?

প্রেমের মতো অন্য কিছু

একি শ্রাবণ নাকি বৃষ্টির অশ্রু প্লাবন?
নাকি এ বকুলের সুগন্ধি শুঁকনো মালা?
একি প্রতীক্ষার পর প্রিয়তম চুম্বন,
অভিমান তাকিয়া থাকা অভিমানী হাসি
নাকি এ কান্নার মতো
ভালোবেসে নীরবে ফেলা সুখ?

তোমার চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবি
ঐ চোখে কি এত মায়া!
কি স্বপ্ন-সমুদ্র ব্যথা নিয়ে প্রেম জাগায়,
জাগায় করুণায় প্রেম।
এতো তবে প্রেম নয়, ভালোবাসার মতো অন্য কিছু
অন্য কোন মায়ায় নিজেকে ভাসানো খেলা
মিথ্যে অভিনয়।
তোমাকে ভেবে আমিতো নিজেকে কখনই হারাই না
তোমার প্রেম স্রোতে ভাসি না জীবন স্বপ্ন নিয়ে
তবে কি করে এ ভালোবাসা হয়? হয় এ প্রেম?
প্রেম তো এমন নয়,
প্রেম হলো তোমাকে পেয়েও তোমাকে হারানোর ভয়।

 

শিরোনামহীন কবিতা

এক.

আশাহত জীবনে তুমি বসন্তের পাখি
হুদয় জ্বালাবে বলে এসেছিলো এমন!
তোমার হাসি কান্না বিক্ষিপ্ত কষ্ট যে প্রেম দিয়েছে আমায়
সেই অশুদ্ধ প্রেমে আজো অপচয় হয় আমারেই আবেগ
অপচয় হয় নিটোল ভালোবাসা
আমারেই হুদয়ের পাশে,
তবোও
তোমারেই গান গেয়ে যাই আজো,
অন্ধকারে!

দুই.

মগজে কি এক বিবশ বিষণ্ণতা
খেলা করে হৃদয়ের মতন!
শিখার লালায়িত মায়ায় যেন ভেসে থাকো তুমি
প্রতিমা,
প্রেম,
প্রতীক্ষ্যয় প্রতারক পরী।

তিন.

বেদনার মত যত ব্যথা আছে
কষ্টের ভেতর কেঁদে উঠে অন্তর আত্মা
নোনা প্লাবনের পর!
তখনো তুমি জেগে থাকো আমার স্মৃতিতে,
মনে,
ভালোবাসায়,
হারানো ব্যথায়;
তুমি বেদনার মহামায়া ভালোবাসা নাও
কাদাও,
তবে একেই কি বলে প্রেম?
বলে প্রিয়তমা হারানোর ব্যথা?

চার.

এখন প্রতিদিন নীবির সন্ধ্যায়
খুব মনে পড়ে তোমায়;
নথ ফুলে তাকিয়ে আছ তুমি এই,
কপালে কালো টিপ,
চোলে প্রেম প্রেম সৌরভ!
এখন
প্রতিটি সকাল শূন্যতায় আমাকে জাগায়
তুমি নেই!
অথচ
তোমার মুখের ঘ্রাণ,
ঠোটরে পরশ,
গোছানো বেণিতে
মনে হয় এই বুঝি তুমি এলে।

পাঁচ.

পৃথিবীতে কত কোলাহল;
ট্রেন বাস বায়ুযান কত জান চলে
কত কত সুখের মহড়ায় উল্লাসিত হয় প্রকৃতি
কত বেদনার পর ফিরে আসে প্রেম
কত বিরহের পর দেখি যুগলের মিলন মেলা
অথচ,
তুমি আর আমি দুই মেরুর
বহুদূর দুই দিক।

ছয়.

আমি কতকাল তোমার চোখে চোখ রাখি না
রাখি না হৃদয়ে হৃদয়।

সাত,
যার বুকে মাথা রেখে শান্তি পাও
তুমি তার কাছেই যাও
শান্তিতে ঘুমাও!

আট.

আমি বহুকাল পরে দেখছি তোমায়!
ততদিনে মর্দনে উলঙ্গ প্রেমে তুমি মেতেছ বহুবার;
তোমার সব লজ্জা ফানুস করে
কারো দেহে করেছ খরচ।
আমি মাতাতে পারিনি যে প্রেমে
সেই প্রেমে তুমি মেতে আছো
যুগ যুগ ধরে অশ্রুতে,
বীর্যে,
বহু বেদনায়।

নয়.

তোমায় নিয়ে
শূন্যে ভাসি
শূন্যে উড়ি
প্রজাপতির মত!

দশ.

শুকনো চারপাশ নিকুঞ্জ আমার
এখানে ঘুমিয়ে থাকো,
তারারা ঘুমিয়ে আছে;

এগারো.

একটি রাতের মতোই রাত ছিলো আমাদের,
একটি রাতের মত রাত ছিলো তোমার,
একটি রাতের মতই প্রেম ছিলো
পৃথিবীর অন্ধকারে!

বারো.

তোমায় আমি এমন করে চাই,
তোমার মাঝে আমি ছাড়া
যেন অন্য কেহ নাই।

তেরো.

আমিও আজ মৃত্যুর মত সুন্দর
দূর হতে বহু দূরে পথিকের মত কেউ!

চৌদ্দ.

কতকাল এভাবেই হারায় পোড়া মাটি হৃদয়!
হারায় বৃষ্টিতে,
মেঘের পালকী চড়ে
যে দেবতা আসে
আমাদের মননে,
এমনি বিক্ষিপ্ত হাসিত!

শাহীদ লোটাস। বাংলা ভাষার লেখক, বাংলাদেশ-এর নেত্রকোনা জেলায় মোহনগঞ্জ থানায় ৩০ মে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতে শাহীদ লোটাস-এর বেশ কয়েকটি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে উৎসাহবোধ করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ