মল্লিকা বিশ্বাসের কবিতাগুচ্ছ

মল্লিকা বিশ্বাস
কবিতা
Bengali
মল্লিকা বিশ্বাসের কবিতাগুচ্ছ

অণুকাব্য

গাছের ডালে কালো কোকিল কহু কহু ডাকে
তোমার তরে মনটা আমার উদাস হয়ে থাকে।

২.

তুমি আর আমি
আমি আর তুমি
ভালোবাসি তাই
ভালোবেসে যাই
দিবস যামী।

৩.

তোমারি সঙ্গে বেধেঁছি প্রাণ
তোমার সাথেই গেয়ে যাই
তাই জীবনের জয়গান।

৪.

আঁখির মাঝে তুমি ওগো আঁখিতারা
এতো কাছে আমার মাঝেই লুকিয়ে থাকো,
তবু তোমায় খুঁজে ফিরি
সারা জগত পাগলপারা।

৫.

কোজাগরী পূর্ণিমাতে
জ্যোৎস্নাধারায় জগত ভাসে,
রূপালী চাঁদের স্নিগ্ধ আলোর ধারায়
মনটি আমার আকাশ গাঙ্গে হারায়।

ভালোবাসা কারে কয়?

(কাহলিল জিবরানের প্রতি)

আমরা তাঁর কাছে জীবনের নিগূঢ় সত্য
এবং ভালোবাসার কথা জানতে চাইলাম।
তিনি বললেন জীবন যাপনেই
জীবনের নিগূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসার পথ বন্ধুর।
তবে এ পথে ছলনা, কপটতা
আর বক্রতার কোনো স্থান নেই
এ পথ ঋজু।
এ পথ শুধু অনুসরণ করে যেতে হয়।
ভালোবাসায় দেবতা কিউপিড অন্ধ
এবং তাঁর তূণে অজস্র বাণ আছে।
আমরা ভালোবাসার কাছে নিজেদের সর্মপণ করবো।
ভালোবাসার কথা অন্তরে আলো জ্বেলে রেখে
গভীর বিশ্বাসের সাথে শ্রবণ করতে হয়।
যদিও ভালোবাসার শরের আঘাতে
হৃদয় ও স্বপ্ন বিদীর্ণ হতে পারে
সাজানো বাতাস ধ্বংসও হতে পারে।
তবুও ভালোবাসাই আমাদের
বৃক্ষের মতো বর্ধিত করে,
পত্রে পুষ্পে শোভিত করে
মাটির গহীনে শিকড়কে প্রোথিত করে।
ভালোবাসা আমাদের শস্যের মতো পরিপক্ক করে
রৌদ্র ও শিশিরের মতো নমনীয় করে
আগুনে পুড়িয়ে পবিত্র শুভ্রতা দান করে।
ভালোবাসায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে
সুখের মতো ব্যাথা অনুভব করতে হয়।
ভালোবাসা বহতা নদীর মতো
ঠিক পথ চিনে ঠিকানা খুঁজে নেয়।
ভালোবাসা সুক্তিতে মুক্তোর মতো
ভালোবাসা অধরা মাধুরী সম।
ভালোবাসা জীবনে পূর্ণতা দেয়
আর ভালোবাসা, সেতো ভালোবাসাতেই পূর্ণ।

তুষারাবৃত বসন্ত

আজ এখানে তাপমাত্রা চৌত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বসন্তেও যেনো ঝলসানো রোদ।
অথচ মেসেন্জারে, ফেসবুক লাইভে দেখছি
আমেরিকায় তুষারাবৃত বসন্তের চিত্র।
চারিদিকে পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো বরফ
পত্রশুণ্য বৃক্ষ হীমশীতল হাওয়া।
আমেরিকা থেকে ছবি পেলাম
সারারাত তুষারপাতের পর
সকালের ঝলমলে রোদে শ্বেতশুভ্র প্রকৃতিতে
যেনো হীরের দ্যুতি।
সবাই ওভারকোট গায়ে
এক হাঁটু তুষারে দাড়িয়ে
বেশ হাসি হাসি মুখে সেলফি তুলছে
আর ছবিতে ক্যাপশন দিচ্ছে, ‘হ্যাপি স্প্রিং।’
বান্ধবীর ফুল গাছে কেবলই মাত্র
আজালিয়া ফুল ফুটেছে।
অর্কিডে শুধু একটি মাত্র সাদা ফুল,
তাতেই অপার আনন্দ যেনো।
দীর্ঘ শীতের ঋতু শেষে
ক্ষণস্থায়ী অথচ তীব্র আনন্দময়
বসন্তকে বরণের বাসনায় সকলে অপেক্ষমান।
জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের ছয় ঋতুর দেশে
এখন কেবল চারটি ঋতুই দৃশ্যমান-
দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, নাতিদীর্ঘ শীতকাল
আর রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী বসন্তকাল।
আমরা আমাদের ঐতিহ্য,সংস্কৃতি,ভালোবাসা,আবেগ
আর মূল্যবোধের সাথে ঋতুবৈচিত্রও হারাতে বসেছি।
পরিযায়ী পাখীর সংখ্যা কমছে দেশে
ওরা গতিপথ পরিবর্তন করে যায় কি অন্য কোনো দেশে!
ওই পাখিদের সাথে দেশ ছেড়ে যায় কি উড়ে
শান্তি-আনন্দ,আবেগ,অনুভব-অনুভুতি
আর যা কিছু সুন্দর।

শুধু বেঁচে থাকা

কাকে বলে বেঁচে থাকা
এনিয়ে অযথা যুক্তিতর্কে না গিয়ে
সুগভীর পরিব্যপ্ত সুখে দুঃখে
রৌদ্রছায়ায় আলোকে
ধীর স্থির অনাবিল ভাবে
শুধু বাঁচতে,
শুধু বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
এইতো বৃষ্টি ভিজিয়ে দেয়,
ছুঁয়ে যায় হাওয়া,
পাখিরা শোনায় গান,
স্নাত হই রৌদ্রে ও জ্যোৎস্নায়।
গাছের নিবিড় সবুজ পাতারা
প্রতিনিয়ত গভীর আন্তরিকতায়
যেনো উচ্চারণ করে,
‘বাঁচো, শুধু বেঁচে থাকো।’
উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ রোগ
আপাতত নিয়ন্ত্রণে,
শরীরে ক্লান্তি, চলাফেরা শ্লথ হয়ে আসে,
রোগ শোক ইত্যাকার সমস্যা সত্ত্বেও
গভীর ভাবে বাঁচার কথাই ভাবি।
মেঘ বা মহাশূণ্যের ওপারে নয়
এখানেই, এই সংসারে
কেউ সতৃষ্ণ প্রতীক্ষায় থাকে,
তার জন্য, পাখির গানের জন্য
ফুলের সুগন্ধের জন্য
গানের সুরের জন্য
কবিতা আর পৃথিবীর মায়ায়
শুধু বাঁচতে ইচ্ছে করে।

 

স্বপ্নাশ্রয়ী

অবাক হয়ে ভাবি মন্দ ভালোয়
অর্ধশতাব্দী কেটে গেলো।
পৃথিবী এখনো খুব সজীব সুন্দর,
ভোর বেলা নবীন সূর্য্যরে আলো সোনারঙ,
নীলাকাশে ফুল্ল সারস ওড়ে ডানা মেলে,
গৃহস্থের উঠানে শিশুর খেলা জমে
অপরাহ্নে রোজ,
ফুল ফোটে
পাখি গায় যেমন
সহস্র বছর আগেও গেয়েছিলো।
নিশুতি রাতে স্বপ্ন আসে
স্মৃতির আভাসে কিংবা ভবিষ্যৎ কল্পনায়।
পৃথিবী আনন্দময় এখনো
যেমন ছিলো সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে।
মাঝে মধ্যে তাল কাটে বলে মনে হলেও
আন্দোলিত আনন্দের সুর
প্রবহমান প্রকৃতির সর্বত্রই,
হৃদয় তাই স্বপ্নাশ্রয়ী হয়ে
অমরত্বের গান গেয়ে যায়।

 

শিরোনামহীন -১

খুব সহজ হওয়া বা
খুব সরলভাবে ভাবা
সবসময় ঠিক নয়।
সবকিছু সরলীকরণ করাও যৌক্তিক নয়।
বনের সরল, অবক্র বৃক্ষটি সবার আগে কাটা হয়।
দীঘল ঋজু বৃক্ষরাজিকে সইতে হয়
তীব্র ঝড়ের তান্ডব আর বজ্রাঘাত।
আজকাল মতামত প্রকাশে উচ্চভাষী না হওয়াই ভাল।
প্রকৃতি পাঠ করে আগে থেকেই খনার মতো
অনুমান করে নেয়া উচিত
সুসময় কিংবা দুঃসময়।
যেমন শীতের পাখিরা পরিযায়ী হয়,
পিঁপড়েরা বৃষ্টির আগাম আভাস পেলে
ডিম মুখে নিয়ে মাটির গর্তে থেকে উঠে আসে
ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষায়।
সব মানুষ সরীসৃপের মতো কিংবা তেলাপোকার মত
খোলসের পর খোলস বদলাতে পারে না।
তাই তারা পাখির মত পরিযায়ী হয়,
শিকড় উপড়ে অভিবাসী হয়।
তবুও বিশ্বগ্রামে মাটির অনেক নিচে শিকড় কাঁদে
মাতৃভূমির জলকণার জন্য।

 

শিরোনামহীন- ২

তুমি বহুদর্শী কৃষক বলেই
জানো অনাবাদি অথচ উর্বর ভূমিতে
স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা ও বিশ্বস্ততার
জল সিঞ্চন করে চাষাবাদ করতে হয়।
সুপুষ্ট হবার আগে নিড়িয়ে নিতে হয়
উৎপাটিত করে ফেলতে হয়
অবাঞ্চিত আগাছা সব সমূলে।
সুফলা জমির পাশে ছায়া থাকতে নেই
তাই অসময়ে বৃষ্টির আগেই কেটে নিতে হয়
পয়মন্ত ফসলের মাঠে বিস্তৃত ছায়া।
বিশ্বাস করি,
বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ জানলে মানুস দরিদ্র থাকে না।

 

শিরোনামহীন – ৩

সারারাত রাধারমণ
সারারাত যাপিত জীবন।
সারারাত ক্লান্ত শরীর
ঝরে পড়ে নিশির শিশির।
সারাদিন শহরে গ্রামে ও হাটে
মানুষের বেশে যেনো
পাথর খায় খেটে।
দিন শেষে হিসাব মিলাই
চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে
কোনই যে মিল নাই।

মল্লিকা বিশ্বাস। কবি ও চিকিৎসক। উচ্চশিক্ষা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে, বর্তমানে বাংলাদেশের কুমিল্লায় সনোলজিস্ট ও শিক্ষকতায় নিয়োজিত। কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবামূলক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠনের সাথে জড়িত। নারীদের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংগঠন ইনার-হুইলের সাথেও যুক্ত। প্রবন্ধ ও গদ্য লেখার পাশাপাশি...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ