মহামারী রোগ ডায়াবেটিস

জুঁই ইয়াসমিন
প্রবন্ধ, বিজ্ঞান
Bengali
মহামারী রোগ ডায়াবেটিস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৯৮০ সালে ১০৮ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০১৪ সালে ৪২২ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে এবং এর প্রাদুর্ভাব উন্নত বিশ্বের গণ্ডি পেরিয়ে মধ্য ও নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বিপদজনক হারে বেড়ে চলেছে। তবে সচেতনতা পারে এর ভয়াবহতা থেকে রোগীকে মুক্ত করতে। বলার সুবিধার্থে ডায়াবেটিসকে রোগ বলা হলেও ডায়াবেটিস আসলে কোন একটি রোগ নয় বরং কতগুলো ক্রনিক রোগের সমাহার। সাধারণত সেই রোগগুলোকে ক্রনিক বলা হয় যেই রোগগুলো দীর্ঘসময় (তিন মাসের বেশী) ধরে বর্তমান থাকে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগগুলোর সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয় না তবে জীবন-যাপনে পরিবর্তন এনে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় সুস্থ জীবন-যাপন সম্ভব হয়।

আমরা জানি যে, আমাদের শরীর আমাদের গ্রহণকৃত খাবার হজম ও শোষণপূর্বক শরীরের সমস্ত কোষের প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেয়। এই সিস্টেমটি ঠিকমত কাজ করতে না পারার ওপর ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত  হওয়া নির্ভর করে। যখন আমরা কোন খাবার খাই তখন খাবারের মধ্যে বিদ্যমান কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা পাকস্থলীতে পৌঁছে ডাইজেস্টিভ সিস্টেম দ্বারা ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিণত হয়। আমাদের শরীরের গ্লুকোজ প্রয়োজন, কারণ এটি আমাদেরকে শক্তি দেয়। এই গ্লুকোজ তখন পাকস্থলীর প্রাচীর দ্বারা শোষিত হয়ে রক্ত স্রোতে গিয়ে মিশে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকস্থলীর নিচে অবস্থিত অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয় যা শরীরকে খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন করতে সাহায্য করে। এই ইনসুলিন এবং গ্লুকোজ তখন রক্তস্রোতের মাধ্যেমে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায়, যেখানে প্রতিনিয়ত শক্তি প্রয়োজন। ইনসুলিন, গ্লুকোজকে কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এখানে ইনসুলিন অনেকটা চাবির মতো কাজ করে, যা গ্লুকোজ এর জন্য কোষের দরজা খুলে দেয়; অর্থাৎ ইনসুলিন ছাড়া গ্লুকোজ কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তি উৎপাদন করে কোষের শক্তির চাহিদা পূরণ করে এবং অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে রেখে দেয় ভবিষ্যতে ব্যবহার করবার জন্য।

এভাবে ইনসুলিনের সহায়তায় রক্তের গ্লুকোজ কোষে চলে যাবার কারণে রক্তস্রোতে গ্লুকোজের মাত্রা কমে আসে। এর প্রতিক্রিয়ায় অগ্নাশয় থেকে গ্লুকাগন নামে আর একটি হরমোন নিঃসৃত হয় যা যকৃতে সঞ্চয়কৃত গ্লুকোজ অবমুক্তের মাধ্যমে রক্তস্রোতে গ্লুকোজের মাত্রা আবার বাড়িয়ে দেয়। তার প্রতিক্রিয়ায় আবার ইনসুলিন নিঃসৃত হবে এবং সেই ইনসুলিন আবার ও রক্তস্রোতের মধ্যে দিয়ে সেই গ্লুকোজকে দেহ কোষে পৌঁছে দেবে। শরীর সব থেকে ভালো কাজ করে যখন রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় (ড়ঢ়ঃরসঁস ষবাবষ) থাকে। দেহে গ্লুকোজের মাত্রা খুব বেশী বেড়ে যাক বা খুব বেশী কমে যাক তা শরীর কখনও চায়না। সাধারণত, দেহে একটি পরিক্রমা আছে যার মাধ্যমে গ্লুকোজের মাত্রা ও ইনসুলিন এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। আর এটি অর্জিত হয় গ্রহণকৃত খাবার, অগ্নাশয় এবং লিভারের সমন্বিত ক্রিয়াকলাপের মাধ্যেমে। যাই হোক, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই সিস্টেমটি কাজ করে না। এর ফলশ্রুতিতে, তাদের ডায়াবেটিস দেখা দেয়। দুই ধরনের ডায়াবেটিস আছে, টাইপ-১, টাইপ-২ ডায়াবেটিস।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শরীর মোটেও কোন ইনসুলিন উৎপাদন করে না । সেটা একটা অটোমেটিক রেসপন্স এর কারণে হয় যেখানে ইমিউন সিস্টেম অগ্নাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষকে ধ্বংস করে। আমরা এখনও পরিষ্কারভাবে জানিনা ঠিক কী কারণে কারো কারো ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে আবার অন্যদের ক্ষেত্রে ঘটে না। একশজনের মধ্যে দশজন রোগীরই টাইপ-১ ডায়াবেটিস। এটি বেশী দেখা যায় চল্লিশের কম বয়সীদের মাঝে এবং এখন পযন্ত শিশুদের মধ্যে এই প্রকার ডায়াবেটিসই বেশি দেখা যায়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শর্করা জাতীয় খাবার পাকস্থলীতে হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। তারপর সেই গ্লুকোজ রক্তস্রোতে মিশে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় গ্লুকোজকে দেহকোষের মধ্যে প্রবেশ করানোর জন্য এসময় শরীর ইনসুলিন উৎপন্ন করে। কিন্তু টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কোন ইনসুলিন তৈরি হয়না বলে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে পারেনা আর তার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। শরীর এই গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে চায়, কারণ নির্দিষ্টমাত্রা অপেক্ষা কম বা বেশীতে শরীর ঠিকমত কাজ করতে পারেনা তা আমরা আগেই জেনেছি। তাই কিডনি দিয়ে অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করে দিতে চায়। যার কারণে যাদের আনডায়াগনজ্ড টাইপ-১ ডায়াবেটিস আছে তারা ঘনঘন বাথরুমে যান। যেহেতু কিডনি গ্লুকোজকে রক্ত থেকে বের করে আনে, এর সাথে পানিও বের হয়ে যায়। ফলে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু ইউরিনে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকে, তাই এটি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে জেনিটাল ইচিং দেখা যায়। একইভাবে রক্তেও গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকে বলে শরীরের ক্ষত শুকাতে সময় লাগে। এছাড়া গ্লুকোজ চোখের লেন্স এ জমা হয়ে লেন্স এর মধ্যকার তরলকে ক্লাউডি করে, ফলে উক্ত ব্যক্তি ঝাপসা দেখতে পারেন। যেহেতু গ্লুকোজ কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনা এবং শক্তি উৎপাদন করতে পারেনা ফলে ব্যক্তি সবসময় ক্লান্ত বোধ করেন। কিন্তু স্বাভাবিক কাজের জন্য শরীরের শক্তি প্রয়োজন। এ অবস্থায় শরীর চর্বিকোষ ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদন করে বলে ব্যক্তি ওজন হারান। সুতরাং টাইপ-১ ডায়াবেটিস এর প্রধান লক্ষণ হলো- ঘনঘন বাথরুমে যাওয়া, তৃষ্ণা, জেনিটাল ইচিং, ক্ষত দেরীতে শুকানো, চোখে ঝাপসা দেখা, ক্লান্তি এবং ওজন কমা। এই লক্ষণগুলো সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেখা দেয় এবং ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করা হলে লক্ষণগুলো চলে যায়।

সাধারণত ৯০%  ডায়াবেটিসই টাইপ-২ ধরনের। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব বেশী। আর এই টাইপটি অপেক্ষাকৃত জটিল। এক্ষেত্রে হয় শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপন্ন করতে পারেনা অথবা পর্যাপ্ত উৎপন্ন করলেও সেই ইনসুলিন ঠিকমত কাজে লাগাতে পারে না। কারণ কোষগুলো ইনসুলিনের উপস্থিতিতে নিয়মমাফিক দরজা খোলে না। এই বিষয়টিকে বলে কোষের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স যার সঠিক কারণ আজো জানা সম্ভব হয়নি। তবে, শরীর মুটিয়ে যাবার কারণে অর্থাৎ শরীরে অতিরিক্ত চর্বি সঞ্চয়ের ফলে হতে পারে। কেননা, সঞ্চিত চর্বি ইনসুলিনকে ঠিকভাবে কাজ করতে দেয়না। তবে সঠিক ওজনসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ঘটে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শর্করা জাতীয় খাদ্য ডায়জেসটিভ সিস্টেম দ্বারা স্বাভাবিকভাবে ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজ তখন রক্তস্রোতের মধ্যদিয়ে অগ্নাশয়ে যায়। অগ্নাশয় তখন ইনসুলিন উৎপন্ন করে যা গ্লুকোজের সঙ্গে রক্তস্রোতের মধ্য দিয়ে সেই সমস্ত কোষে পৌঁছে যেখানে শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্লুকোজ প্রয়োজন। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্লুকোজ কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনা। কারণ, কোষের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এর কারণে ইনসুলিন ঠিকমত কোষের দরজা খুলতে পারেনা।

সুতরাং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনবরত বাড়তে থাকে। যেহেতু রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশী, তাই অগ্নাশয়ও বেশি বেশি ইনসুলিন উৎপন্ন করতে থাকে। এভাবে একদিকে গ্লুকোজ বাড়ে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় রক্তে ইনসুলিনও বাড়ে এবং এই অবস্থা আরও জটিল হয় যখন, যেসব কোষের শক্তি প্রয়োজন তারা যকৃত এ ইমার্জেন্সি সিগন্যাল পাঠায় যে, ‘সঞ্চিত গ্লুকোজ অবমুক্ত করো’। যকৃত তখন গ্লুকোজ অবমুক্ত করে। এভাবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশী থেকে বেশিতর হতে থাকে এবং তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ইনসুলিন। এভাবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে করতে অগ্নাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বেটা কোষগুলো এক পর্যায়ে অকেজো হয়ে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো হলো ঘনঘন বাথরুমে যাওয়া, তৃষ্ণা পাওয়া, জেনিটাল ইচিং, ওজন হারানো, ক্লান্তি এবং চোখে ঝাপসা দেখা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো খুব ধীরে ধীরে আসে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মোটেই কোন লক্ষণ থাকেনা। এ কারণে অনেক সময় ১০ বছর ধরে টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকার পরেও অনেকে বুঝতে পারেনা যে তার টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে। বিভিন্নভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এর চিকিৎসা করা যায়। প্রথমদিকে খাদ্যাভাস পরিবর্তন, কায়িক পরিশ্রম বা ওজন কমানোই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু টাইপ-২ ডায়াবেটিস একটি প্রোগ্রেসিভ কন্ডিশন এবং বেশিরভাগ লোকেরই কোন না কোন প্রকার মেডিকেশন প্রয়োজন।

সাধারণত, দুই ধরনের বলা হলেও এ বছরের শুরুতে স্বনামধন্য জার্নাল ‘দি লানসিট ডায়াবেটিস অ্যাণ্ড এন্ডোক্রাইনোলজি’-তে প্রকশিত একটি গবেষণাপত্র দাবী করছে ডায়াবেটিস আসলে ৫ ধরনের। এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগে সুইডেনে লুন্ড ইউনিভার্সিটি ডায়াবেটিস সেন্টার ও ফিনল্যান্ডের ইনস্টিটিউট ফর মলিকুলার মেডিসিনের গবেষকগণ ১৪,৭৭৫ জন রোগীর রক্ত ও অন্যান্য মেডিকেল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেন, যার মধ্যে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন, জেনেটিক ইত্যাদিকে বিবেচনায় নেয়া হয়। তারা ডায়াবেটিস রোগীদের ৫টি ক্লাস্টারে ভাগ করতে সমর্থ হন, যাদের জেনেটিক প্রোফাইল, জটিলতা এবং রোগ অগ্রগতির ধরনে একে অন্যের থেকে ভিন্ন।

ক্লাস্টার-১ মূলত টাইপ-১ ডায়াবেটিস এর মত যা সাধারণত কম বয়সীদের হয়। দেখা যায় অন্য সবকিছুর বিবেচনায় এরা সুস্থ হলেও অটোইমিউনিটির কারণে ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না। ক্লাস্টার-২ এর রোগীরাও ক্লাস্টার-১ এর মত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না তবে সেটা অটোইমিউনিটির কারণে হয়না। এছাড়া, এদের রেটিনোপ্যাথি হবার হাড় বেশী। ক্লাস্টার-৩ এর রোগীরা তীব্রভাবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট হয় এবং অন্যদের তুলনায় কিডনির সমস্যা হবার সম্ভাবনা বেশী। ক্লাস্টার-৪ রোগীদের ডায়াবেটিস বেশী ওজনের সাথে সম্পর্কিত এবং ক্লাস্টার-৫ রোগীদের ডায়াবেটিস বেশী বয়সের সাথে সম্পর্কিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এখনও অনেক কিছুই অজানা থেকে গেছে। সারা পৃথিবীর মানুষকে জেনেটিক এবং পরিবেশের তারতম্য বিবেচনায় ৫০০টি উপগোষ্ঠীতে ভাগ করা যায়। এই বিপুল পরিমাণ পার্থক্য বিবেচনায় নিলে হয়তো ভবিষ্যতে আরো অনেক ধরনের ডায়াবেটিস শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যত ত্রুটিহীনভাবে একে শনাক্ত করা যাবে, তত নির্ভুলভাবে এর চিকিৎসা সম্ভব হবে।

ডায়াবেটিস-এর প্রকৃত কারণ অনেকটা অজানা এবং তর্ক সাপেক্ষ। তবে উভয়প্রকার ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেই কিছু রিস্ক ফ্যাক্টরকে নিরূপণ করা গিয়েছে। পরিবারে কারো টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে বা কারো দেহে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সাথে সম্পর্কিত জিনের উপস্থিতির কারণে এই ডায়াবেটিস হতে পারে। বয়স ও একটি ফ্যাক্টর। টাইপ-১ ডায়াবেটিস সাধারণত ৪০ বছর অপেক্ষা কম বয়সে হয়ে থাকে, বিশেষ করে ৪-৭ এবং ১০-১৪ বছর বয়সী বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশী হতে দেখা য়ায়। যদিও, যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে। এছাড়া, ব্যাক্তির ভৌগলিক অবস্থানের প্রেক্ষিতেও এ রোগের তারতম্য দেখা যায়। নিরক্ষীয় রেখা থেকে যত দূরে সরে যাওয়া যায় এ রোগের প্রাদুর্ভাবও তত বাড়তে দেখা যায়। তাই ধারণা করা হয় যে ঠান্ডা আবহাওয়ার সাথে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার, গ্রীষ্মকাল অপেক্ষা শীতকালে এ রোগে আক্রান্ত হবার সংখ্যা বেশী, এই বিষয়টিও ঠাণ্ডা আবহাওয়ার সাথে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সম্পর্ককে সমর্থন করে।

অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে যে রিস্ক-ফ্যাক্টরগুলোকে নিরূপণ করা সম্ভব হয়েছে তাদের মধ্যে ওজন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। অধিক ইনসুলিন নিঃসৃত হয় এরূপ খাবার গ্রহণ থেকে দেহকোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি রেজিস্ট্যান্ট হতে থাকে আর আমরা ইতোমধ্যেই জানি যে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স-ই টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ। শরীরে চর্বি সঞ্চারের ধরনও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের একটি রিস্ক-ফ্যাক্টর। যাদের ক্ষেত্রে চর্বি উরু বা নিতম্বে জমা না হয়ে বরং কোমরের চারপাশে জমা হতে থাকে তাদের এই ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ে। যে যত বেশী অলস জীবন-যাপন করে তার ক্ষেত্রে এই ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা তত বাড়ে। শারীরিক কসরত ওজনকে নিয়ন্ত্রণ করে, শরীরে বর্তমান গ্লুকোজ এর সঠিক ব্যবহারে সাহায্য করে এবং কোষগুলোকে ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। পরিবার ও একটি বড় রিস্ক-ফ্যাক্টর। পরিবারে কারো এই রোগ থাকলে অন্যদের সম্ভাবনাও বাড়ে। সকল জাতিগত গোষ্ঠীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের উপস্থিতি থাকলেও কিছু কিছু গোষ্ঠীতে এর হাড় বেশী যেমন-সাউথ এশিয়ান, মেক্সিকান, চাইনিজ। তবে এক্ষেত্রে মজার বিষয় হচ্ছে একটি বিশেষ জাতিগত গোষ্ঠীর যারা নিজেদের ঐতিহ্যগত খাদ্যাভ্যাস ও জীবন-যাপন থেকে দূরে সরে গিয়ে ওয়েস্টার্ন খাদ্যাভ্যাস ও জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়েছে, তারা এই ডায়াবেটিসে বেশী আক্রান্ত হয়েছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথেও এই ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ে। কেননা, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের পরিশ্রম করার প্রবণতা কমতে থাকে, এতে শরীরে মাংশপেশীর পরিমাণ কমে, চর্বির পরিমাণ বাড়ে। তবে গত এক দশকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব বহুগুণে বেড়ে গেছে। এছাড়া যাদের প্রিডায়াবেটিস রয়েছে অর্থাৎ যাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কিছুটা বেশী তবে তা ডায়াবেটিস বলে গণ্য হবার জন্য যথেষ্ট না তাদের পরবর্তীতে এই ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ে। পলিসিসটিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ও জেসটেশনাল ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে এমন মহিলারাও পরবর্তিতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত  হতে পারেন।

দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে রক্তে অতিমাত্রায় গ্লুকোজের উপস্থিতি বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া থেকে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্ট হয়। হাইপারগ্লাইসেমিয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ রক্তনালীর কারণেই সবচেয়ে বেশীসংখ্যক ডায়াবেটিস রোগী বিভিন্ন রোগে ভোগে এবং মারা যায়। হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারণে যখন বড় রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন তাকে ম্যাক্রোভাসকুলার জটিলতা বলে। অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্ত ও রক্তনালীর দেয়ালে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে যে ইন্ড প্রডাক্ট তৈরী করে তা রক্তনালীর দেয়ালের সর্ববাহিরের টিস্যুতে বেশকিছু পরিবর্তন ঘটায় যার প্রেক্ষিতে অ্যাথারোসক্লেরোসিস প্রক্রিয়াটি দ্রুত ঘটতে থাকে।

ডায়াবেটিস কীভাবে অ্যাথারোসক্লেরোসিস ঘটায় তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ সম্ভব না হলেও ডায়াবেটিস যে অ্যাথারোসক্লেরোসিস ঘটায় তা প্রতিষ্ঠিত সত্য। অ্যাথারোসক্লেরোসিস থেকে রক্তনালীতে প্লাক সৃষ্টি হয়। এই প্লাককে আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহিরাগত ব্যাকটেরিয়া মনে করে আক্রমণ করে। এর ফলে প্লাকের জায়গায় রক্তনালী ফুলে যায় এবং একসময় ফেটে যেয়ে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। হার্টের মাংশপেশীতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলে রোগীর বুকে ব্যাথা, হার্ট এ্যাটার্ক এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলে স্ট্রোক ঘটে। অন্যদিকে, হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারণে যখন অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন তাকে মাইক্রোভাসকুলার জটিলতা বলে। চোখের রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো নষ্ট হয়ে গেলে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কোষগুলো মারা যায়। এতে রোগীর দৃষ্টিশক্তি কমে যায় এবং একসময় অন্ধ হয়ে যায়। কিডনীর ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো নষ্ট হয়ে গেলে কিডনী অকেজো হয়ে যায়। হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারণে শরীরের পরিধির দিকে ক্ষুদ্র স্নায়ুকলা অকেজো হয়ে পড়ে বলে ডায়াবেটিক পুরুষের পুরুষত্ব নষ্ট হয়। একইকারণে পায়ের অনুভূতি কমে যায়। এর ফলে পায়ে কোন আঘাত পেলে বা কেটে গেলে খেয়াল করে না। একসময় সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং গ্যাংলিয়ন হয়ে পা কেটে ফেলতে হয়।

জুঁই ইয়াসমিন। লেখক ও গবেষক। পড়াশুনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে। পরবর্তীতে ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামের আওতায় 'ফুড সায়েন্স, টেকনোলজি ও নিউট্রিশন' স্নাতকোত্তর। বর্তমানে স্বাধীন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। স্বাস্থ্য ও মেডিসিন বিষয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ